বর্ষায় প্রমত্তা পদ্মা

মনকাড়া দৃশ্যের কমতি নেই রিসোর্টটিতে তিনটি ছোট বাচ্চা পা ঝুলিয়ে বসে আছে করিডরের পাটাতনের ওপর। সবচেয়ে ছোটটির বয়স মাত্র তিন! ওদের পা ডুবে আছে পানিতে। পানি ছিটানোতেই মনে হচ্ছে ওদের যত আনন্দ। দূরে রাবারের ডিঙি নৌকায় আরও দুজন। আনাড়ি হাতে বৈঠা বেয়ে যাচ্ছে। নৌকা বাওয়ার কোনো অভিজ্ঞতা ওদের নেই। ফলে নৌকা এক জায়গাতেই ঘুরপাক খাচ্ছে! আশপাশে ওদের অভিভাবকদের দেখা যাচ্ছে না। হয়তো কোনো এক কাঠের কেবিনে গল্পে মেতে উঠেছে সবাই! অথবা জানালা দিয়ে দেখা হচ্ছে পদ্মার সৌন্দর্য!

এমন সব মনকাড়া দৃশ্যের কমতি নেই এই চমৎকার রিসোর্টটিতে। বাংলা ১২ মাস আর ষড়ঋতুর নামে কাঠের কটেজ। এই রিসোর্টটির নাম পদ্মা রিসোর্ট! ঈদের ছুটিতে দল বেঁধে সেখানে বেড়াতে গিয়ে চমৎকার কিছু স্মৃতি নিয়ে এসেছি।

মুন্সিগঞ্জ জেলার সবটা জুড়ে প্রমত্তা পদ্মা। এমনকি অনেক স্থাপনায় এরই মধ্যে পানি ঢুকে পড়েছে। লৌহজং থানা কমপ্লেক্স নদীর যে পাড়ে, ঠিক তার উল্টো পাড়ে এই রিসোর্ট। আমরা কয়েক পরিবার ঢাকা থেকে গাড়ি নিয়ে সেখানে পৌঁছালাম দুপুরের দিকে। রিসোর্টের ট্রলারে করে নদী পার হয়ে পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। কাঠের পাটাতন ফেলে নদীর ঘাট থেকে রিসোর্টের গেট পর্যন্ত অস্থায়ী পথ। সেখান থেকে কাঠের সাঁকো দিয়ে অফিস বা কেবিনগুলোতে যাওয়া যায়। সোজা গেলে অফিস কক্ষ। কেবিনটির নাম ‘বসন্ত’। বুঝলাম বৈচিত্র্য আছে আরও অনেক। মোট ১৬টি কেবিন আছে এখানে থাকার। বৈশাখ থেকে চৈত্র পর্যন্ত ১২টি। বাকি চারটির নাম হলো—গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ ও বসন্ত। বাকি থাকল শীত! হুম। খাবারঘরটির নাম ‘শীত’!

আমাদের আট পরিবারের জায়গা হলো বৈশাখ থেকে অগ্রহায়ণে। প্রতিটি থাকার কেবিন দুই লেভেলের বা বলা ভালো তিন লেভেলের। দক্ষিণ দিকে মুখ করা। নিচতলায় আড্ডার জায়গা, কয়েকটি সোফা। আছে একটি খাটও। দোতলার দিকে আধাআধিতে রয়েছে খোলা ডেক। এটি নদীর দিকে। মানে এই ডেকে বসে খাওয়া যায় নদীর হাওয়া। গভীর রাতে জ্যোৎস্নার আঁকিবুঁকি দেখা যায় প্রমত্তা পদ্মার পানিতে!

বাকি অর্ধেক উঠলেই দোতলা থাকার ঘর। এ ঘরে দুটি খাট। ছনের আধুনিক ছাউনি ভেদ করে বৃষ্টির পানি নিচে আসতে পারে না বটে, কিন্তু দেখার চোখ থাকলে উপভোগ করা যায় ছাদে পানির চমৎকার সব নকশা।

নদীর পানি কূল ছাপিয়ে ঢুকে পড়েছে রিসোর্টে। পানি ঠেকানো হয়নি, ফলে সেটি অবাধে ঢুকে পড়েছে। কেবিনগুলোর নিচে দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। কয়েক ফুট গভীরতার পানি। ঝিরঝিরি বাতাস।

বিকেলে কিংবা সন্ধ্যার পর ট্রলারে করে ঘুরে আসা যায় নদীতে। ট্রলার বা নৌকা ঘণ্টা হিসাবে ভাড়া করা যায়। রিসোর্টের রয়েছে নিজস্ব দোতলা ট্রলার। বড় গ্রুপ হলে সেটি ভাড়া করা যায় ঘণ্টায় হাজার টাকা হিসাবে।
শীত নামের খাবারঘরে দুপুর, রাত আর সকালের খাবার। খোলা ডেকে বসেও খাওয়া সম্ভব। পদ্মার ইলিশ তো থাকবেই, সঙ্গে ভর্তা-ভাজি।

সেন্ট মার্টিনের মতো এখানকার বিদ্যুতের ব্যবস্থা নিজস্ব জেনারেটরে। তবে সেন্ট মার্টিনের মতো রাত ১১টায় জেনারেটর বন্ধ করে দেওয়া হয় না। ফলে ইচ্ছে করলে বাতি জ্বালিয়েই গল্প করতে পারেন সারা রাত। অথবা বাতি নিভিয়ে জ্যোৎস্না রাতেই হতে পারে জম্পেশ আড্ডা। আর যদি সঙ্গে নিয়ে যান হোম থিয়েটার বা নিদেনপক্ষে একটি ভালো মানের সাউন্ড সিস্টেম, তাহলে তো সোনায় সোহাগা।

নিজেদের গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায়। বুড়িগঙ্গা সেতু পার হয়ে সোজা মাওয়া চৌরাস্তার মোড়। তারপর বাঁয়ে লৌহজং। এই মোড় থেকে সাত কিলোমিটার দূরে লৌহজং থানা কমপ্লেক্স। সেখানেই নদীর ঘাট।

গুলিস্তান থেকে গাংচিল গাড়িতে যেতে পারবেন। আবার মাওয়া পর্যন্ত যেকোনো বাসে গিয়ে সেখান থেকে স্কুটারে করে চলে আসতে পারবেন রিসোর্টের ঘাটে। আগে থেকে বুকিং করা থাকলে রিসোর্টের লোক আপনাদের সহায়তা করবে নদী পাড়ি দিতে। বুকিং ছাড়া যদি যান, তাহলে জনপ্রতি ৫০ টাকা করে দিয়ে রিসোর্টে চলে যেতে পারেন। কটেজ খালি পেলে তো পেলেন, না পেলে শীতে খাবার খেয়ে আবার চলে আসতে পারেন।

সারা দিনের জন্য অথবা ২৪ ঘণ্টার জন্য কটেজ ভাড়া দেওয়া হয়। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত কটেজপ্রতি ভাড়া দুই হাজার টাকা। আর পরদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত থাকলে তিন হাজার টাকা। দুপুর বা রাতের খাবার ৩০০ টাকা করে আর সকালের নাশতা ১০০ টাকা। সবটাতেই ১৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে।

নিজেরা সরাসরি বুকিং করতে পারেন। পদ্মা রিসোর্টের ওয়েবসাইট (www.padmaresort.net) থেকে সব তথ্য পাওয়া যাবে। অথবা আমাদের মতো দল বেঁধে যাওয়ার বেলায় কোনো ট্যুর অপারেটরের সাহায্য নিতে পারেন। আমাদের ট্যুরের সব ঝক্কি সামলেছে সাফারি প্লাস (০১৮১৯২১৮১৫৮ বা ০১৮১৯৪০৫০০০)।

যেকোনো শুক্রবার সকালে চলে গিয়ে পরদিন সকালে ফেরত আসতে পারেন। আর যদি পূর্ণিমা হিসাব করে যান, তাহলে সেটি হবে প্রমত্তা পদ্মায় বাড়তি পাওয়া।

আপনার যাত্রা শুভ হোক।

মুনির হাসান
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১০

[ad#co-1]