‘তুমিই সকল অনর্থের মূল’

ড. মীজানূর রহমান শেলী
কথাগুলো লিখেছিলেন বাংলার অন্যতম খ্যাতিমান সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন। তার জনপ্রিয় সাহিত্যকর্ম ‘বিষাদ সিন্ধু’ এককালে অবিভক্ত বঙ্গের অগণিত পাঠকের কাছে নতুনরূপে পৌঁছে দিয়েছিল কারবালার মর্মন্তুদ কাহিনী। ফোরাতের তীরে নৃশংস এজিদ বাহিনী কর্তৃক মহানবী হজরত মোহাম্মদ (দ.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রা.)-এর অবরুদ্ধ পরিবার ও সহচরদের বিয়োগান্তক নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের মর্মস্পর্শী বিবরণ এ গ্রন্থের পাঠকদের চোখে এখনও আনে অশ্র“ধারা। নির্মম সীমার খঞ্জর দিয়ে যখন ইমাম হোসেনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে, তখন সেই হত্যাকারীর নির্দয় আচরণের মূলে লেখক মীর মশাররফ হোসেন খুঁজে পান অর্থের প্রতি কিছু মানুষের উদগ্র লোভ। ক্ষমতালোভী এজিদের নিষ্ঠুর বাহিনীর হাতে পরাজিত হওয়ার আগে হজরত ইমাম হোসেন (রা.) ও তার সঙ্গীরা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হন; তাদের শিবিরের পাশেই প্রবহমান ফোরাত নদী থেকে পানি এনে তাদের পিপাসা নিবারণও করতে দেয়নি হƒদয়হীন শত্র“রা। শেষপর্যায়ে পরাজিত ও বিধ্বস্ত ইমাম হোসেনের গলায় শাণিত অস্ত্র চালিয়ে তাকে হত্যা করে ভাড়াটিয়া হন্তা সীমার। আর তাই আক্ষেপ করে বিষাদ সিন্ধুর লেখক বলেন, ‘হায় অর্থ, হায়রে পাতকী অর্থ, তুমিই সকল অনর্থের মূল।’

কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনার প্রায় দেড় হাজার বছর আগে অর্থলিপ্সা আরেক মহাপুরুষের অকাল জীবনাবসানের মূলে ক্রিয়াশীল ছিল। নবী ঈসা (আ.) যিশুখ্রিস্ট ক্রুশবিদ্ধ হন তৎকালীন রোমান শাসকদের নির্দেশে। কিন্তু রোমান সৈন্যদের হাতে তাকে ধরিয়ে দেয় তারই এক শিষ্য জুডাস ইসকেরিয়ট। কথিত আছে, রোমান কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পড়ার আগের রাতে তার বিশ্বস্ত অনুগামী সহচরদের সঙ্গে শেষ নৈশভোজ ‘দ্য লাস্ট সাপার’-এ যিশু বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে একজন আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে।’ সেই বিশ্বাসহন্তা জুডাস মাত্র ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে যিশুখ্রিস্টকে রোমান সৈন্যদের হাতে তুলে দেয় এবং পরিণামে সাম্রাজ্যে বিশৃংখলা ও বিদ্রোহ সৃষ্টির অভিযাগে যিশুখ্রিস্টকে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হয়। পাতকী অর্থ ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণেও তার ভয়াবহ বিধ্বংসী ভূমিকা পালন করে।

আসলে অর্থ নয়, অর্থলোভ, অর্থের প্রতি অস্বাভাবিক ও বিকৃত আকর্ষণ মানুষকে অমানুষে পরিণত করে, সমাজকে করে কলুষিত এবং মানবতাকে করে বিপর্যস্ত। আজকের যুগেও এর ব্যতিক্রম ঘটে না।

অর্থের প্রতি বিকৃত আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে হাল আমলের বিশ্বমন্দা। অর্থনৈতিকভাবে উন্নত, শিল্পে সমৃদ্ধ, শিক্ষায় অগ্রসর পাশ্চাত্যের দেশে দেশে যে ভয়াবহ আর্থ-বাণিজ্যিক মন্দা ২০০৭ সাল থেকে সেসব দেশ তথা সারাবিশ্বকে মারাÍক সংকটে ফেলেছে, তার মূলেও রয়েছে কিছুসংখ্যক মানুষের উদগ্র অর্থলোভ। কথায় বলে ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সমৃদ্ধ দেশগুলোর অর্থ ও বাণিজ্য জগতের পুরোধাদের লোভ-লালসাসিক্ত আচরণ দেখে মনে হয়, ওই প্রবাদের কোন বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং অঢেল বিত্ত-বৈভবই স্বভাবকে নষ্ট করে, দেশ, সমাজ ও দুনিয়াকে মারাÍক সমস্যা ও ভয়াবহ সংকটে ঠেলে দেয়।

মহাসমৃদ্ধিশালী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘এনরন’ বা ‘ওয়ার্ল্ড কমের’ মতো বিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, লেম্যান ব্রাদার্স বা এআইজির মতো বিরাট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভয়াবহ ধ্বংস ও বিলুপ্তির মূলে দেখা যায় এদের শীর্ষ ব্যবস্থাপকদের বিবেকহীন অর্থলোভ। ‘এনরন’ ও ‘ওয়ার্ল্ড কমের’ পতনের ফলে দুই ক্ষেত্রে ৪০০ কোটি ডলার হিসাবে আনুমানিক মোট ৮০০ কোটি ডলার পরিমাণ ক্ষতিসাধিত হয়। এ অর্থ বাংলাদেশে লব্ধ মোট বিদেশী সাহায্যের প্রায় ৪ বছরের সমপরিমাণ। এই বিশাল ক্ষতির আঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ে এ দুই সংস্থায় কর্মরত সাধারণ নাগরিকদের ওপর। তারা শুধু চাকরিই হারান না, হারাতে বাধ্য হন তাদের সারাজীবনের সঞ্চয়। অথচ দেখা যায়, এসব সংস্থার শীর্ষ ব্যবস্থাপকরা সীমাহীন বিলাস-ব্যসনে দিন কাটান। খবরে প্রকাশ, এমন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী তার ছাতা রাখার আসবাব কেনার জন্য প্রায় ৫০ হাজার ডলার খরচ করেন! ইউরোপের উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশগুলোয়ও একই শ্রেণীর মানুষের উদগ্র লোভ-লালসা সৃষ্টি করেছে দারুণ আর্থিক সংকট ও সামাজিক বিপর্যয়। উদাহরণস্বরূপ আইসল্যান্ডের মতো একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র প্রায় দেউলিয়াপনার শিকারে পরিণত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের অনেক দেশেই আজ লাখ লাখ নাগরিক বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত ও দারুণ অভাবে নিষ্পিষ্ট। সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ-সাহায্য সত্ত্বেও এসব দেশের আর্থ-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিপদ কাটিয়ে উঠতে পারছে না। ফলে বেসরকারি খাতপ্রধান এসব রাষ্ট্রে জনগণ পড়েছে মারাÍক অর্থনৈতিক সংকটের কবলে। চাকরিহীন, বিত্তহীন সাধারণ মানুষের বিষণœ কাতার হচ্ছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর।

স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশে দেশে এই আর্থিক সংকট ও মন্দার অভিঘাত কমবেশি অনুভূত হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো কিছু দেশ এই মন্দার প্রচণ্ড প্রভাব থেকে অনেকাংশে রক্ষা পেলেও এখানকার অগ্রণী, উচ্চবিত্ত সমাজের একাংশের অর্থলোভ ও সীমাহীন ভোগস্পৃহা তৈরি করছে অর্থনৈতিক বিশৃংখলা ও সামাজিক অস্থিরতার বিপজ্জনক আবহ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক হিসাবে দেখা যায়, আমদানি ক্ষেত্রে বিলাসবহুল পণ্যের শতকরা হার উল্লেখজনকভাবে বেড়ে চলছে। অথচ উৎপাদনশীল শিল্পে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি যে হারে বাড়ার কথা সে হারে বাড়ছে না। এর ফলে আগামী দিনগুলোয় কর্মসংস্থান ও জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিপুল নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশংকা প্রবল হয়ে উঠছে। একদিকে কিছুসংখ্যক অবিবেচক বিত্তবানের প্রকট ভোগবাদী আচরণ এবং অন্যদিকে বেকার ও বঞ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের দুর্ভোগ সামাজিক স্থিতিশীলতা ও শান্তির প্রতি হুমকির সৃষ্টি করছে।

‘পাতকী অর্থ’ আসলেই মহা অনর্থের সৃষ্টি করে। চারদিকে চোখ মেলে দেখলে বোঝা যায়, যুগ-প্রাচীন মূল্যবোধ ক্রমেই ক্ষয় পাচ্ছে। সহজ, সরল ও পরার্থপর জীবনের বাণী আজ প্রায় অবলুপ্ত। বিত্তবান এমনকি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এক বড় অংশ আজ যেন বিবেক ও সমাজচেতনা হারিয়ে ফেলেছে। যেমন করেই হোক অর্থ ও বিত্ত লাভ করে চমক সৃষ্টি এবং অন্যের মনে দুঃখ ও বঞ্চনাবোধের জš§ দেয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা এ শ্রেণীর ব্যক্তিদের বিকৃত, বিভ্রান্ত জীবনের দিকে টেনে নিয়ে যায়। ফলে রাজনীতি ও সমাজ পরিণত হয় বিকৃত বাণিজ্যের সেবাদাসে। তথাকথিত ব্যবসা-বাণিজ্যে নেই সুস্থতার লেশমাত্র চিহ্ন। যেমন করেই হোক অর্থ উপার্জন ও সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার অশুভ প্রবণতা সমাজের প্রাণশক্তিকে দুর্বল ও নির্জীব করে তোলে।

জনসাধারণের এক উল্লেখযোগ্য অংশ, শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ নিদারুণ দারিদ্র্যে জর্জরিত দিন কাটালেও স্বাধীন বাংলাদেশের চার দশকে দেশের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটে। মোট জাতীয় উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ে কয়েক গুণ। সত্তরের দশকে এর পরিমাণ যেখানে ছিল কমবেশি ২০০০ কোটি মার্কিন ডলার, এখন তা পৌঁছেছে প্রায় ৮ হাজার কোটি ডলারে। সেই সঙ্গে মাথাপিছু বার্ষিক গড় জাতীয় আয় ৭০-৮০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৬০০ ডলারে দাঁড়ায়। জনশক্তি ও তৈরি পোশাক রফতানি করে দেশ বছরে আয় করে প্রায় ২০০০ কোটি মার্কিন ডলার। নিঃসন্দেহে আরও যোগ্য ও সক্ষম নেতৃত্ব এবং ব্যবস্থাপনা থাকলে অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি আরও বেশি পরিমাণে অর্জন করা যেত। কিন্তু যা অর্জিত হয়েছে তাও কম নয়। তবে এই অর্জন সুচারু ও সুষম ব্যবস্থাপনার অভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে কাক্সিক্ষত উন্নতি আনতে পারেনি। বস্তুত এই অক্ষমতার মূলেও রয়েছে সমাজের উচ্চবিত্তের একাংশের অর্থসর্বস্ব জীবনবাদ। এদের কাছে অর্থই যেন একমাত্র উপাস্য। অর্থলিপ্সা গত কয়েক দশক রাজনীতিকে অনেকাংশে কলুষিত ও বিপথগামী করে তোলে। রাজনীতিতে ঘটে অসুস্থ ব্যবসা-বাণিজ্যের বিধ্বংসী অনুপ্রবেশ। রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণের সঙ্গে সঙ্গে ঘটে বাণিজ্যের রাজনীতিকরণ। বৈধ বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থবিত্ত দিয়ে একশ্রেণীর মানুষ রাজনৈতিক ক্ষমতাকে শুধু প্রভাবিত করে ক্ষান্ত হয় না, কুক্ষিগতও করে। অন্যদিকে ক্ষমতাকে ব্যবহার করে অর্থবিত্তের পাহাড় গড়ে তোলার প্রবণতাও রাজনীতি ও সমাজকে কলুষিত ও অসুস্থ করে তোলে।

এই অসুস্থ পরিবেশে তরুণ প্রজš§ হয়ে ওঠে বিভ্রান্ত ও হতাশ। তাদের একাংশ বিকৃত রাজনীতির শিকারে পরিণত হয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিতে লিপ্ত হয়। তাদের উৎসাহ, পুষ্টি ও সুরক্ষা জোগায় কায়েমি স্বার্থবাদী রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের অংশবিশেষ। তরুণদের আরেক অংশ একই বিশাল বিভ্রান্তির শিকার হয়ে পা বাড়ায় তথাকথিত আদর্শবাদী বা ধর্মভিত্তিক সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের পথে। দারুণ হতাশা বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণীকে নিয়ে যায় মাদকাসক্তির পঙ্কিল আবর্তে।

দেশের ভবিষ্যৎকে সুষ্ঠুভাবে গড়ে তুলতে হলে, তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত ও বিকৃত জীবন থেকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন দৃঢ় ও সাহসী পদক্ষেপের। আর এ পদক্ষেপ গ্রহণ করার ভার পুরোপুরিভাবে ন্যস্ত পরিণত বয়স্কদের ওপর। আজ যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ ও সমাজকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের নতুন করে বুঝতে হবে যে, অর্থ আর সম্পদ বৃহত্তর কল্যাণ ও মঙ্গল সাধনের মাধ্যম মাত্র, অভীষ্ট লক্ষ্য নয়। অর্থ, বিত্ত-বৈভব অতি অনুগত ভৃত্য, কিন্তু বড় নির্দয় প্রভু। এদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে সমাজ সুস্থ থাকে, দেশ ও জাতি পায় বলিষ্ঠতা ও সমৃদ্ধি। নৈতিকতা ও মূল্যবোধের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যে অর্থ তা সত্যিই পাতকী এবং সব অনর্থের মূল।

ড. মীজানূর রহমান শেলী : সমাজবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক

[ad#co-1]