মা যখন হন্তারক

রাহমান মনি
মা কথাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্নেহ, মমতা, আদর, সোহাগ, ভালোবাসা এবং সবশেষে রয়েছে সব দুঃখ হরণকারিণী। সন্তানের সব দুঃখ-কষ্ট একমাত্র মা-ই পারেন ভুলিয়ে দিতে। সব ধর্মেই মা জাতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা দেখাতে বলা হয়েছে। সেই মায়ের জাতি হঠাৎ করেই এমন বেপরোয়া হয়ে গেল কেন? প্রশ্নটি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের চেয়ে অধিক মূল্যের। মা কেন নাড়ি ছেঁড়া বুকের ধনকে সঙ্গে নিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে? সহযোগিতা করে হত্যা করাচ্ছে গর্ভের সন্তানকে? দাম্পত্য জীবনের কলহ, পরকীয়া, একাধিক বিয়ে, বহুগামিতা, যৌতুকের শিকার, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে পারিবারিক অশান্তিতে সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তায় দিশেহারা হয়ে চিরতরে মুক্তির পথ খুঁজতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।

কিন্তু কেন? জীবন তো একটাই। একবার চলে গেলে এই নশ্বর পৃথিবীতে ফিরে আসার সুযোগ নেই জেনেও কেন এই পথ বেছে নিচ্ছে। কেন ভাবছে না যে ভালোও হতে পারে। মেঘ কেটে গেলে যেমন সূর্য হাসে। প্রকৃতিগত ভাবে মানুষ নেগেটিভ চিন্তাটাই আগে করে। ক্ষণিকের আনন্দটাই কি সব? মোহে পড়ে ক্ষণিকের আনন্দকে ভোগ করার জন্য পথের কাটা দূর করতে কেন অবুঝ নিষ্পাপ শিশুটিকে চিরদিনের জন্য মৃত্যুর হিমশীতল স্বাদ গ্রহণ করতে হবে? যে বাবা-মা সন্তানের নিরাপদ আশ্রয়স্থল, সেই বাবা-মা-ই যদি সন্তান হন্তারক হন তখন সন্তানটির যাবার আর কোনো পথ থাকে না।

সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় স্থান পাওয়া খবর অনুযায়ী দুই মাসের ব্যবধানে তিন তিনটি মা তাদের বুকের ধনকে নিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তিনটি ঘটনাই স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে দাম্পত্যের কলহ থেকে। জুরাইনের গৃহবধূ রিতা তার দুই সন্তান কবির ইসরাত পাবন এবং রাইছা রেশমী পায়েল এই দুই সন্তানসহ অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ সেবনে আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার আগে অবুঝ সন্তান দুটিকে মানসিকভাবে আত্মাহুতির জন্য প্রস্তুত করে নেন। দুই মাস যেতে না যেতেই কমলাপুরের বিলাসী তার দুই সন্তান শিশুপুত্র আবু রায়হান এবং আট বছরের কন্যাসন্তান নওরীন আক্তার রজনীকে নিয়ে কেরোসিনের আগুনে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। অবুঝ শিশু দুটি বুঝতেও পারেনি কেন তাদের গায়ে জন্মদাত্রী, গর্ভধারিণী মা আগুন দিল? রজনী মৃত্যুশয্যায়ও একই প্রশ্ন রেখেছিল। তার অল্প কিছুদিন পর আরেক গৃহবধূ মাকসুদা মাত্র ১৬ মাস বয়সী কন্যাসন্তান তানজিলাকে বুকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেয় আত্মহত্যার জন্য। ১৬ মাস বয়সী বাচ্চা মায়ের বুকের দুধ পান করার কথা। হয়ত দুধ পানরত অবস্থায় কিছু বুঝে ওঠার আগেই চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় মায়ের কোল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে মা আগে মারা গেলেও শিশু তানজিলা এখনো মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। আরেক সন্তান নিকট থেকে মায়ের আত্মহত্যা দেখেছে। অবুঝ হৃদয়ে এর প্রভাব কি হবে একমাত্র আল্লাহ্ জানেন। প্রতিটি ঘটনাই স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহজনিত কারণ। প্রতিবাদের ভাষা। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা যে কখনো আত্মহত্যায় নয় এই বুঝটি এখনো বুঝতে পারেনি মায়ের জাতি। বেঁচে থেকেও যে বিভিন্ন পন্থায় তীব্র প্রতিবাদ জানানো যায় এবং সেই পথই অবলম্বন করা উচিত এই বিষয়ে মিডিয়া বড় ভূমিকা পালন করতে পারে নাই।

পরকীয়া এখন বাংলাদেশে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রেও আকাশ সংস্কৃতির কুফল কিছুটা হলেও আছে। আর এতে করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রাণও দিচ্ছে। গর্ভধারিণী মায়ের পরকীয়া প্রেমের পথের কাঁটা দূর করতে প্রেমিকা সহায়তা করেছে। আর যেন ডিস্টার্ব করতে না পারে এই জন্য চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে শামিউল, তানহাদের। ক্ষণিকের মোহ, কামনা চরিতার্থ করার প্রয়াসে স্বামীর ঘর ছেড়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে জঠরে সযতেœ রাখা ধনকে হত্যায় সহায়তা করে আবার লাশ গুম করতে সহায়তাও করা হয়েছে। হায়রে দেহের ক্ষুধা! আড়াই হাজারে পরকীয়ার বলী হয়েছে ৯ বছরের মিশু। এ রকম অসংখ্য খবর যেগুলো প্রকাশ পেয়েছে। আর অপ্রকাশিত খবরের কোনো পরিসংখ্যান নেই।
পরকীয়ায় এগিয়ে আছে প্রবাসীদের বধূরা। দেশে কি বিদেশে। এই কথাটি অপ্রিয় হলেও সত্য। স্বামী বেচারা প্রবাসে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশে থাকা স্বজনদের জন্য টাকা পাঠান। সেই টাকায় তাদের স্বজনরা চলে। স্ত্রী তার প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো হাতের কাছে পাওয়ার জন্য নির্ভর হন অন্যের ওপর। আর এই নির্ভরতা থেকে সম্পর্ক গড়ায় পরকীয়াতে। এই পরকীয়ার জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে অনেককেই। সংসার ভেঙে ছারখার হয়ে গেছে বহু সংসার। কাফরুলে বেবী নামে এক গৃহবধূ প্রেমিক মামুনের সহায়তায় স্বামী মিজানকে হত্যা করে। সন্তানরা ঘটনা জেনে যাওয়ায় তারাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

দ্বিতীয় বিবাহজনিত কারণেই হোক কিংবা পরকীয়ার কারণেই হোক পারিবারিক বিরোধ থেকে নাগরিক জীবনে নেমে আসা কালো বিষাদের ছায়া কারো কাম্য হতে পারে না। এটা চলতে দেয়া এবং মেনে নেয়া যায় না। স্বামী-স্ত্রী উভয়কে আরো সংযোমী হতে হবে। পরমতসহিষ্ণুতা থাকতে হবে। থাকতে হবে বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধাবোধ। শ্রদ্ধাবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বাবা-মার কলহের কথা যখন সন্তানরা জেনে যায় তখন তারাও কিছুটা সুযোগ নিতে চেষ্টা করে। তারা যখন বুঝতে পারে নিজ বাবা-মার কাছেই তারা নিরাপদ নয়। তখন তারাও আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। আতঙ্কিত হয়ে তারা এই কাজটি করে থাকে।

ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় শামিউল, তানহা, রজনী, রায়হান, পাবন, পায়েলদের ঘটনা ফলাও করে যখন সচিত্র প্রচার করা হয় তখন শামিউল তানহা বয়সীরা নিজ বাবা-মাকে প্রশ্ন করে তাদের পরিণতিও কি একই হবে? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার ভাষা যেমন বাবা-মার কাছে নেই। নেই মিডিয়ার কাছেও। তার চেয়েও ভয়াবহ হবে যদি বাড়ির সামনে যেখানে কুকুর হতে সাবধান লেখা থাকে সেখানে তার বদলে মা হতে সাবধান এমন বাক্য যদি লেখা থাকে। বাক্যটি লেখার জন্য দুনিয়ার সমস্ত ‘মা’ জাতির কাছে আমি বিনীত ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

আমার মা নেই। চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে এক দশক আগে। স্বল্প শিক্ষিতা (একাডেমিক) আমার মা ছিলেন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এক মহীয়সী নারী। ১০টি ছেলেমেয়ে, স্বামী, সহায়তাকারী সব মিলিয়ে ১৫ জনের সংসার নিখুঁতভাবে পরিচালনা করতেন নিজ যোগ্যতায়। অনেক সময় হিমশিমও খেয়েছেন। কিন্তু সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে সব সহ্য করেছেন। দুপুর একটা থেকে দুপুরের খাওয়া শুরু হলেও সবার খাওয়া-দাওয়া শেষ করে গোছানোর পর গোসল করে খেতে খেতে মার চারটা পাঁচটা বেজে যেত। তখন আমারও দ্বিতীয় বার খিদে পেয়ে যেত মায়ের হাতে খাওয়ার। মা নিজে না খেয়ে আমাকে নিজ হাতে মুখে তুলে দিতেন সযতেœ। আজ মা নেই বলে ভাবতেও কষ্ট লাগে। এই হলো মায়েদের ভূমিকা সন্তানদের মুখে হাসি ঝরানোর জন্য। সব মা-ই তার নিজের সুখের জন্য না ভেবে সন্তানের সুখে উজাড় করে দেন।

প্রিয়াকে ভালোবাসার প্রমাণ দিতে গিয়ে তার কথামতো মায়ের কলিজা নিয়ে যাবার সময় যখন পড়ে যায় এখনো নাকি মা বলেন খোকা ব্যথা পেয়েছিস? গল্পটি বিভিন্ন ভাষায় রচিত হওয়ায় কম-বেশি সবাই জানে। মায়ের ভালোবাসা সন্তানের প্রতি এর চেয়ে আরো বড় কোনো উদাহরণ হতে পারে না। সে মা জাতি যখন অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে, বেপরোয়া হয়ে ওঠে তখন উদ্বিগ্ন হতে হয়। যদিও পুরুষশাসিত সমাজে সব কিছুর জন্য পুরুষকেই দায়ী করা হয়ে থাকে। কিন্তু পুরুষকে দায়ী করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলে কি তাবৎ দুনিয়ার সব পুরুষ ঠিক হয়ে যাবে? কখনো না।

প্রতিবাদের ভাষা কখনো আত্মহত্যা হতে পারে না। বখাটেদের উৎপাতে একের পর এক আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে আমার বোনেরা। তারা তাদের অনজুদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী (বাংলাদেশ) রেখে যাওয়া পথ তৈরি করছে না। কিন্তু এটা তো করতে হবে। কাজেই আর কোনো আত্মহত্যা নয়। প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। রুখে দাঁড়াতে হবে। নারী হৃদয় কোমল হলেও এই ক্ষেত্রে ইস্পাত কঠিন হতে হবে। দেখাতে হবে নারীরা অবলা নয়। নয় অবহেলার। তা হলেই পুরুষশাসিত সমাজ প্রকৃত শিক্ষা পেয়ে যাবে।

rahmanmoni@gmail.com

[ad#co-1]