বাংলার ঐতিহ্য নৌকা বাইচের উপাখ্যান

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল, মুন্সীগঞ্জ
আবহমানকাল থেকে বাংলার ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ নৌকা বাইচ। প্রমত্তা নদীবক্ষে সঙ্গীতের-তাল-লয়ে দাঁড়ীদের ছন্দময় দাঁড় নিক্ষেপে নদীজল আন্দোলিত করে যে মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের অবতারণা হয় তা অতুলনীয়। আবেগ-উত্তেজনার নৌকা বাইচ হয়ে ওঠে আপামর মানুষের নির্মল আনন্দের সপ্রাণ প্রতিভূ। নদীমাতৃক বাংলাদেশ নদীর তরঙ্গভঙ্গের সঙ্গে এ মাটির মানুষের আশৈশব মিতালি। নদী তাই হয়ে উঠেছে এখানে মানুষের প্রাণোচ্ছল ক্রীড়াসঙ্গী। এই প্রেক্ষাপটে নদীবক্ষে নৌকা শুধু যোগাযোগের মাধ্যমই নয়, হয়ে উঠেছে জলক্রীড়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নৌকা বাইচ তারই একটি দৃষ্টিনন্দন রোমাঞ্চময় দৃষ্টান্ত।

মাঝিরা একত্রে জয়ধ্বনি সহকারে নৌকা ছেড়ে দিয়েই একই লয়ে গান গাইতে আরম্ভ করে এবং সেই গানের তালের ঝোকে ঝোকে বৈঠা টানে; যার ফলে কারও বৈঠা ঠোকাঠুকি না লেগে এক সঙ্গে পানিতে অভিঘাত সৃষ্টি করতে থাকে। গায়েন বা পরিচালক কাঁসির শব্দে এই বৈঠার এবং গানের গতি বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্য সব নৌকাকে পেছনে ফেলে নিজেদের নৌকাকে সবার আগে যাওয়ার চেষ্টায় প্রয়োজন বোধে কাঁসির শব্দে বৈঠার গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয় এবং সেই সঙ্গে গানের গতিও বেড়ে চলে। এ ছাড়া এই সময় দেহ ও মনের উত্তেজনার বশেই গানের মধ্যে ‘হৈ হৈয়া’ এই ধরনের শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। এটি সারি গানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। মালস্নাদের কণ্ঠে যখন দরাজ সুর ভেসে আসে, তখন বিশাল নদীবক্ষেই যেন উন্মনা হয়ে ওঠে। কালের বিবর্তনে পাশ্চাত্যের ভাবধারায় আধুনিক সুযোগসুবিধার সম্মিলনে কতক শহর গড়ে উঠলেও গ্রামবাংলায় নৌকা বাইচের কদর এখনও ব্যাপক। নৌকা বাইচে আমজনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই তার প্রমাণ।

বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহাসিক খেলাগুলোর মধ্যে নৌকা বাইচ অন্যতম। প্রাপ্ত রেকর্ড অনুযায়ী ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২০০০ বছর আগে ‘মেসোপটেমিয়ার’ লোকেরা ইউফ্রেটিস নদীতে এক ধরনের নৌকা বাইচের আয়োজন করত। এর কয়েক শতাব্দী পর মিসরের নীলনদের জলে নৌকা প্রতিযোগিতা শুরম্ন হয়। এর পর ছড়িয়ে পড়তে থাকে এর প্রসার। অঙ্ফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতাটি এখনও ব্যাপক জনপ্রিয়। ১৯০০ সাল থেকে অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় এ পর্যনত্ম প্রায় ১৩৫টি ফাইনাল হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ বার যুক্তরাষ্ট্র, ২৫ বার জার্মানি ও ১৪ বার যুক্তরাজ্য বিজয়ী হয়।

‘বাইচ’ শব্দটি ফরাসী। ফরাসীদের সময় এই খেলার উৎপত্তি হলেও এর আধুনিক ছোঁয়া লাগে ব্রিটিশদের সময়। পরে ছড়িয়ে পরে ভারতবর্ষে। সর্বত্র জনপ্রিয় হতে থাকে খেলাটি। সেই ধারাবাহিকতায় এই জনপদে নৌকা বাইচ আমজনতার জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা হিসেবে স্থান করে নেয়। সৃজনশীল কাজের মাধ্যমেই ইতিহাসের প্রসার ঘটে। বিক্রমপুর তথা মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্য রক্ষার্থে গত ১৭ সেপ্টেম্বর মফম্বল শহর মুন্সীগঞ্জের পাশের নৌকা বাইচটি ছিল এই অঞ্চলের আলোচিত একটি বড় উৎসব। এই কর্মকা- নগণ্য মনে হলেও ঐহিত্যে মহীমান এই জনপদের হারানো ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার চেষ্টায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আয়োজকরা রেকর্ড পরিমাণ দর্শক সমাগম দেখে প্রতিবছরই এই উৎসব করার ঘোষণা দিয়েছে।

নৌকা বাইচের সামাজিক ভিত্তি নিয়ে ধলেশ্বরী তীরে কথা হয় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার আল আমিন আকাশের সঙ্গে। তিনি বলেন, খেলাধুলা মানুষের জন্য একটি সর্ব রোগের ওষুধ, এই ওষুধ শুধু মানুষের দৈহিক ও মানসিক রোগই নিরাময় করে না, এটা সামাজিক বিভিন্ন অবক্ষয়ের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সমাজ বা রাষ্টীয় ক্লানত্মি লগ্নে জনসাধারণের মনমানসিকতা, অসামাজিক, অপসংস্কৃতির চর্চা, সামাজিক অবক্ষয় রোধে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার মধ্যদিয়ে মানসিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য সহায়ক। খেলাধুলা শুধু সমাজের জনগণের বিনোদন আর রোগনিরাময় হিসেবেই কাজ করে না, এটা হতে পারে একজন ব্যক্তি, সমাজ তথা রাষ্ট্রের পরিচয়। অনুসন্ধানে দেখে গেছে, পৃথিবীতে অনেক জাতি আছে, যারা শুধু তাদের ঐতিহ্যগত খেলাধুলা খেলেই আনত্মর্জাতিক পরিম-লে তাদের পরিচিতি। যেমন ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালি ইত্যাদি।

মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা শুধু আমাদের রাষ্ট্র হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়নি, আমরা পেয়েছি আমাদের আবহমান বাংলার বিভিন্ন আঞ্চলিক খেলাধুলা। যার মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য। এই বাংলায় প্রচলিত আছে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা, যেমন_ নৌকা বাইচ, হা-ডু-ডু, ফুটবল, কানামাছি, দাড়িয়াবান্দা, গোলস্নাছুট ইত্যাদি। এই সমসত্ম খেলাধুলা সমাজের একে অপরের সঙ্গে যেমন পারিবারিক বা সামাজিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও বিনোদনের সর্বোত্তম মাধ্যম। তার মধ্যে অন্যতম খেলা আমরা ধরতে পারি নৌকা বাইচ। এটি আমাদের বাঙালীর জাতির হাজার বছরের পুরনো খেলা।’ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এমএ আউয়াল বলেন, ‘এক সময় বিভিন্ন গঞ্জে দুই-তিন গ্রাম নিয়ে বড় নদীতে বা বিলে এই ধরনের খেলার আয়োজন করা হতো। এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের মেলা, মানুষের মাঝে এক আনন্দঘন মুহূর্ত সৃষ্টি হতো, বাড়ত এক গ্রাম হতে অন্য গ্রামের হৃদ্যতা। সবাই মিলেমিশে কাজ করত, একে অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসত, একে অন্যের বিপদে এগিয়ে আসত। যার ফলে সমাজে সুখ শানত্মি বিরাজ করত এবং সেই সময়ের যুব ছেলেমেয়েদের সংস্কৃতি, খেলাধুলার চর্চার মধ্যদিয়ে তারা সামাজিক ব্যাধি থেকে দূরে থাকত। মুক্তিযোদ্ধা জামাল হোসেন বলেন, নৌকা বাইচের মতো সামাজিক সংঘবদ্ধ খেলা এই তথাকথিত আধুনিক সমাজ ও যুবসমাজকে রক্ষায় এক অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে, পারে তাদের অবক্ষয়ের হাত হতে রক্ষা করতে। যুবসমাজকে এই ধরনের খেলাধুলায় উৎসাহ দিয়ে আমরা আনত্মর্জাতিক সুনাম অর্জন এবং বর্তমানের মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে তাদের রক্ষা করতে পারে।

ধলেশ্বরী নৌকা বাইচ উৎসবের সদস্য সচিব এসএম মাহফুজুল হক বলেন, ‘সামাজিক সম্প্রীতি বোধ, ভালবাসা, সঠিক সংস্কৃতি চর্চার মধ্যদিয়ে লুকিয়ে থাকে একটি দেশকে মানবসম্পদে তৈরি করার মূলমন্ত্র যে সমাজ বা রাষ্ট্র এই মন্ত্রে দীক্ষিত হতে পেরেছে তারাই আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে এবং পারছে উন্নতির চরম শিখরে পেঁৗছতে। তাই আমরা যদি পড়াশোনার পাশাপাশি আমাদের মাঝে নৌকা বাইচের মতো অধিক সংখ্যক লোকসমাগমের মতো খেলাধুলার অভ্যসত্ম করতে পারি তাহলে আমরাও পারব একটি আদর্শ সমাজ বা সত্যিকারের সত্য আধুনিক সমাজ গড়তে। মুন্সীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান বলেন, কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে নৌকা বাইচের আয়োজন চলছে। এই আয়োজন অব্যাহত থাকলে নৌপথের খেলা দীর্ঘদিনের হারানো ঐতিহ্য নৌকা বাইচ পুরোপুরি স্বরূপে ফিরে না আসলেও টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। এই খেলাকে সারাদেশে আগের অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার পথ আমরাই নষ্ট করে ফেলেছি। বিভিন্নভাবে নদী দখল ও কল কারখানার বর্জ্যের মাধ্যমে নদীকে মেরে ফেলেছি। নষ্ট করে ফেলেছি নদীর পানি। নদী তার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলেছে। ফলে পানি শুকিয়ে নদী মরে যাচ্ছে। ফলে এমনিতেই হারিয়ে যাচ্ছে নৌপথের খেলা নৌকা বাইচ। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও ইছামতি নদীতে তাই এখন আর নৌকা বাইচের আয়োজন দেখা যায় না। মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও ধলেশ্বরী নৌকা বাইচ উৎসবের সভাপতি আজিজুল আলম বলেন, মুন্সীগঞ্জে নতুন প্রজন্মকে দেশজ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় রাখা এবং আবহমান বাংলার এই ঐহিত্যকে ধারণ করার জন্যই সুপ্রাচীন ইতিহাসসমৃদ্ধ এই জনপদে নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ ও মিরকাদিম পৌরসভায়ও বাইচের নৌকা তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে আগামী বছর এই দু’পৌরসভার নৌকাও অংশ নিতে পারে। এম ইদ্রিস আলী এমপি নৌকা বাইচের নানা স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, এই আয়োজন সর্বজনীন। নৌকা বাইচ আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে।

উলেস্নখ্য, প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মহিউদ্দিন।

[ad#co-1]