ফয়েজ আহমেদ আমাদের শিশুসাহিত্যের আলো

ফারুক নওয়াজ
সহজ করে কোনো বিষয় উপস্থাপন বা লেখা বড় কঠিন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সেটা উপলব্ধি করেছেন। মানবজীবনের দুর্বোধ্য বিষয়আশয় রবীন্দ্রকাব্য, গীতিনাট্য, উপন্যাস ও গানে আমরা দেখি। কিন্তু সেসব কঠিন বাস্তবতা রবীন্দ্রনাথ অনেক ক্ষেত্রে সহজ করেও বলতে পেরেছেন। এটা সম্ভব হয়েছে রবীন্দ্রনাথ বলেই। এ বড় কঠিন কাজ। এটা আমরা লক্ষ করি বড়দের জন্য যারা লিখেন তারা যখন ছোটদের জন্য কিছু লিখতে যান তখনই। তাদের ভাবনায় শিশু জগৎটা বড়দের মতো হয়ে যায়, ফলে ভাষা-বিষয়ও শিশু-কিশোর উপযোগী হয়ে ওঠে না।

এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায়, হাতেগোনা দু-চারজনকে। এমনই এক ব্যতিক্রমী লেখক ফয়েজ আহ্মদ। তিনি বাম প্রগতিশীল ভাবনার মানুষ। জীবনের রূঢ় বাস্তবতা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। পাশাপাশি সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে দেশ-কাল-সমাজ ও মানব জীবনের কঠিন আদলটি তিনি নিরীক্ষণ করেছেন। তার সেই অভিজ্ঞতা থেকেই লিখেছেন পিকিং থেকে লিখছি, চীনে ক্রান্তিকাল, মধ্যরাতের অশ্বারোহী (৪খ-), নবপর্যায়ে চীন, বিবিধ ভাবনা, অনেক কথার কথা, সমীপেষু, আগরতলা মামলা : শেখ মুজিব ও বাংলার বিদ্রোহ ইত্যাদি গ্রন্থ। রাজনীতি, ইতিহাস, আর্থ-সামাজিক বিষয়াবলী এবং মধ্যবিত্ত ও অধিকার বঞ্চিত মানুষের বাস্তব অবস্থা তার এসব রচনাতে উঠে এসেছে। এমন এক বাস্তব জীবনের কথাকার হয়েও তিনি আমাদের শিশু সাহিত্যের এক সফল সম্রাট। কী সহজ সাবলীল তার ভাষা, বর্ণময় আলোকোজ্জ্বল তার শিশু সাহিত্যের ভুবন এ ক্ষেত্রে তিনি এক জীবন্ত কিংবদন্তি।

গত শতাব্দীর মধ্যাহ্নে যখন আমাদের শিশু সাহিত্যে রূপকথা আশ্রয়ী এবং ছড়া ও শিশু পদ্যগুলোও সেই হাল্কা হাল্কা লোকজ আবহ থেকে বেরিয়ে আসেনি তখন ফয়েজ আহ্মদ শিশু মনের স্বপ্নময় জগৎকে আধুনিক বিষয় ভাবনায় রাঙিয়ে তুলতে এলেন।

প্রধানত তিনি ছড়া ও কিশোর কবিতার ক্ষেত্রে অনন্য অসাধারণ। শিশু মনের স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা, দুরন্তপনা, অপ্রাপ্তি, বঞ্চনা, সাহসিকতা এবং আনন্দ-ভালোলাগার বিষয়গুলো তার ছড়া-কবিতায় নানাভাবে ফুঠে উঠেছে।

আমাদের শিশু সাহিত্যের আকাশে তারার মতো মিটমিট করে জ্বলছে তার ‘জোনাকী’। এই অসাধারণ ছড়ার বইটি ছাড়াও রয়েছে ফয়েজ আহ্মদের গুচ্ছ ছড়াসহ প্রায় অর্ধশত গ্রন্থ। এগুলো আমাদের শিশু সাহিত্যের বড় সম্পদ। সাহিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় নানা পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

নিজের সম্পর্কে তার মন্তব্য ‘আমি প্রতিদিন-প্রতিনিয়ত জীবন সম্পৃক্ত কর্মকা-ের মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ করে চলেছি।’ হ্যাঁ এই ২০১০-এর ২ মে তিনি ৮২ বছর অতিক্রম করেও উদ্যোমী এক চিরকিশোর।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ক্যারল, এন্ডারসন, ওস্কার ওয়াইল্ডরা শিশু সাহিত্যেক হয়েও সৃষ্টির মূল্যায়নে বিশ্ব লেখকের মর্যাদা পেয়ে অমরত্ব লাভ করেছেন। অথচ আমাদের দেশে শিশু সাহিত্য বড়ই অবহেলিত। এখনো আঁধার এ পথটি। এই আঁধারের মাঝে একটুকরো আলো যেন আমাদের ফয়েজ আহ্মদ।

বিশেষ অর্জন

ফয়েজ আহ্মদ এ পর্যন্ত বহু পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে একুশে পদক, বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান পুরস্কার, বাংলা একাডেমীর শিশু রচনার পা-ুলিপি প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার, ভাসানী স্মৃতি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার (দুবার), সাব্বির সাহিত্য পুরস্কার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র পরিষদ সম্মাননা, ঋষিজ সম্মাননা, শিশু একাডেমী পুরস্কার, নূরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার, কবীর চৌধুরী শিশু পুরস্কার, মোদাব্বের হোসনে আরা শিশুসাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় কবিতা পরিষদ ও মুক্তিযুদ্ধ গণপরিষদ গুণীজন সম্মাননা, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার তিনি অর্জন করেছেন।

[ad#co-1]