অরক্ষিত সাতানিখিল বধ্যভূমি

আটত্রিশ বছরের বেদনায় কাতর অবসরপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা অফিসার দীপালী ভট্টাচার্য। ’৭১সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাঁর জন্মদাতা পিতা অধ্যাপক সুরেশ চন্দ্র ও সহোদর প্রধান শিক্ষক বাদল ভট্টাচার্যকে হত্যা করে পাকবাহিনী। এই দু’জন ছাড়াও এখানে আরও ১৪ জন ব্যক্তিকে একই লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়। মুন্সীগঞ্জ সাতানিখিল খালপাড়ে ঘটে মানব হত্যার এ বর্বরোচিত ঘটনা। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৩৮ বছর। কিন্তু ন্যূনতম সম্মান দেয়া হয়নি এই শহীদদের। এখনও বধ্য ভূমিটি অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। এদের সম্মানে নির্মিত হয়নি কোন স্মৃতি চিহ্ন।

পিতা ডা. সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহা এবং অগ্রজ দুই স্কুল শিক্ষক সুনিল কুমার সাহা ও অজয় কুমার সাহাকে হারিয়ে শোকে পাথর সুভাস চন্দ্র সাহা। শহরের গোয়ালপাড়ার বাসিন্দা সুভাস চন্দ্র সাহা প্রশ্ন এত ত্যাগ আর ধৈর্যের প্রাপ্তি কি এই ছিল? এই গণহত্যায় শহীদ বুদ্ধিজীবীরা পাকবাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেতে আশ্রয় নিয়েছিল ৬ কি.মি. দূরের কেওয়ার চৌধুরী বাজারের চৌধুরী বাড়িতে। রাত জেগে পালাক্রমে পাহারা দিতেন পাকবাহিনী আসে কিনা এ আশঙ্কায়। ১৩ই মে রাতের পাহারা শেষে ঘুমাতে যাচ্ছেন বা গেছেন এমন সময়ই ভোর রাতে আনুমানিক ৪টার দিকে প্রায় ৭০ জন পাকবাহিনী চৌধুরী বাড়িটি ঘিরে ফেলেন। এরপর তারা ২২ জনকে ধরে নিয়ে যায়। পরে সাতানিখিল খালের পাড়ে সকাল ৮টায় লাইনে দাঁড় করায় ১৬ জনকে। এরপর গুলি চালায়। ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান ১৪ বুদ্ধিজীবী। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় জিতু ভৌমিকসহ দু’জন। এছাড়া বাকী ৬ জনের মধ্যে আইনজীবী কেদারেশ্বর চৌধুরী, সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহাকে নিয়ে আসে হরগঙ্গা কলেজ ক্যাম্পে।

চন্দন আম্বলী নামের একজন নিজেকে মুসলমান বলে পাকবাহিনীর হাত থেকে সেদিন রক্ষা পায়। বাকি ৩ জন ছাড়া পায় নানা কৌশলে। কয়েক মাস পড়ে কেদারেশ্বর চৌধুরীকে ছেড়ে দেয় পাকবাহিনী। কিন্তু পরে তাকে আবার ধরে আনে এবং হত্যা করা হয়। আর নির্যাতন করে হরগঙ্গা ক্যাম্পে হত্যা করা হয় ডা. সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহাকে। সাতানিখিল গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী লাল মিয়া শিকদার জানান, এই গণহত্যার দুই দিন পর ১৬ই মে ১৪টি লাশ পার্শ্ববর্তী ব্রহ্মপুত্র নদীতে ভাসিয়ে দেয় দমকল বাহিনীর লোকজন।

অবস্থা এমন ছিল যে, লাশগুলো দাহ করার লোকও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তখন স্নাতক পাস করা দিপালী ভট্টাচার্যের সেই কান্না শুরু হয়েছে আজও থামেনি। তার বাবা ভাইকে হত্যার পর শোকাহত মহিলারা চলে যায় অন্যত্র। তারা একেক সময় একেক জায়গায় দিনাতিপাত করেছেন নানা কষ্টের মধ্যে। ব্রহ্মপুত্র নদী শুকিয়ে এখন খাল। তবে ঢেউয়ের দাপাদাপি এখনও আছে। শোকাহত পরিবারগুলো সেই ঢেউ দেখেই খুঁজে ফিরেন আপনজনের সমাধিস্থল। কত ঘাত প্রতিঘাত অতিক্রম করে এখনও বেঁচে আছে পিটি আইয়ের অবসরপ্রাপ্ত ইনস্ট্রাকটর ভাগ্যবালা চক্রবর্তী। তার পিতা পুরোহিত হরকুমার চক্রবর্তীকেও একই লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়। বিধবা করা হয়েছিল সেই দিন কল্যাণ মুখার্জীকে। এই বৃদ্ধা স্বামী শচীন্দ্র নাথ মুখার্জীর স্মৃতি বুকের ভেতর অপার বেদনা নিয়ে বেঁেচ আছেন। এই গণহত্যার শিকার অন্যদের মধ্যে রয়েছেন- বেকণ্ঠ পাল, বাঞ্চারাম পাল, মঙ্গল ধুপী, স্বর্ণ ব্যবসায়ী বিপদ কর্মকার, হর কুমার চক্রবর্তী প্রমুখ।

[ad#co-1]