শর্তের জালে পদ্মা সেতু

আশরাফ খান: পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়লো। তাদের একের পর এক শর্তের জালে এখন আটকা পদ্মা সেতুর ভবিষ্যৎ। এ অবস্থায় আগামী জানুয়ারিতে এ সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা যাবে কিনা তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।

বিশ্বব্যাংক নতুন করে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রাক-যোগ্যতা যাচাই এবং বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর টোল বাড়ানোর ব্যাপারে এখনই সুস্পষ্ট সরকারি ঘোষণা চাইছে। শীর্ষ দাতা হিসেবে তাদের আগে অন্যান্য দাতার অর্থ ছাড় করা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে। এ অবস্থায় অর্থমন্ত্রী আগামী মাসের প্রথম ভাগে ওয়াশিংটন গিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টসহ সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে একটা সমঝোতায় আসার চেষ্টা করবেন। যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ঋণচুক্তি সম্পাদনে বিশ্বব্যাংকের আরোপিত নতুন নতুন শর্তের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি মানবজমিনকে বলেন, তাদের বুঝিয়ে দ্রুত ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের চেষ্টা করা হচ্ছে।

যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে যে ১৮ হাজার কোটি টাকা (২ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার) খরচ হবে তার মধ্যে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার দেবে বিশ্বব্যাংক। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ৬৫০ মিলিয়ন ডলার, জাইকা ৩০০ মিলিয়ন ডলার এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক দেবে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার। এসব প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পরিচালনা পর্ষদ পদ্মা সেতুর জন্য প্রতিশ্রুত ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারকে তাদের সিদ্ধান্তের কথাও গত মাসে জানিয়েছে। এদিকে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি গত ২রা সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে যোগাযোগমন্ত্রী এবং পরে সেতু বিভাগের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে এতে আপত্তি জানিয়েছেন। বলেছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পের তারাই প্রধান দাতা। তাদের সঙ্গে ঋণচুক্তি সম্পাদনের আগে অন্যদের সঙ্গে ঋণচুক্তি করা ও অর্থ ছাড় নেয়া সমীচীন হবে না। বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর টোল বাড়ানোর এবং ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে প্রাক-যোগ্য হিসেবে বাছাইকৃত ছয়টি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রাক-যোগ্যতা পুনঃমূল্যায়নের জন্য নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের কথা বলেছেন। সূত্র জানায়, যোগাযোগমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা এতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কারণ, গত জুনে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রাক-যোগ্যতা যাচাই করা হয় প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে। যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডসের ‘মনসেল’ নামক একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান এবং অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীসহ স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি দরপত্রগুলো মূল্যায়ন করে। তারপরও বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব অনুযায়ী দরপত্রে অংশগ্রহণকারী সব নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবই বিশ্বব্যাংকসহ সব উন্নয়ন সহযোগীর কাছে পাঠানো হয় তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মূল্যায়নের জন্য। তাদের অনুমোদনের পরই ছয়টি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন করা হয়। এখন আবার নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে প্রাক-যোগ্যতা যাচাই করতে ছয় মাস লেগে যাবে।

এদিকে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের ব্যাপারটি বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুতে টোল বাড়ানোর সঙ্গে শর্তযুক্ত করেছে। চলতি অর্থবছরে তারা ৪০ শতাংশ হারে টোল বাড়াতে বলেছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলে প্রধানমন্ত্রী তা নাকচ করেন। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে পরে তা মন্ত্রিসভায় পেশ করা হয়। টোল বাড়ানো হলে মানুষ ও পণ্য পরিবহন ভাড়া বাড়বে। বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে বলে মন্ত্রিপরিষদ তা বিবেচনায় নেয়নি। সূত্র জানায়, মন্ত্রিসভায় নাকচ হওয়ার পর গত ২রা সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি যোগাযোগমন্ত্রী, সচিব ও সেতু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুতে টোল বাড়ানোসহ অন্যান্য শর্ত পূরণ করা না হলে পদ্মা সেতুর জন্য ঋণচুক্তি স্বাক্ষরে তাদের অপারগতার কথা জানিয়েছেন।

এদিকে নির্ধারিত সময়ের সাত মাস আগেই সরকার পদ্মা সেতুর ডিজাইন সম্পন্ন করেছে। জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশ প্রতিক্রিয়ার ওপর সমীক্ষা শেষে নদী শাসনের কাজে এ মাসেই হাত দেয়া হবে। মূল সেতুর নির্মাণকাজের চূড়ান্ত ঠিকাদার নির্বাচনের লক্ষ্যে এ মাসে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের জন্য দরপত্র দলিল প্রস্তুত করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের চার মাস আগেই যাতে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব হয় সেজন্য জাজিরা ও মাওয়া পয়েন্ট থেকে একযোগে কাজ শুরু করার কর্ম পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। কিন্তু উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করার আগে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের সুযোগ নেই। এ নিয়ে মহাফাঁপড়ে পড়েছে সরকার। অনাকাঙ্ক্ষিত এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে অর্থমন্ত্রী ছুটে যাচ্ছেন বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তরে। যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন আশা করছেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে একটা সমঝোতায় আসা সম্ভব হবে।

[ad#co-1]