গ্রামের পথে স্নিগ্ধ সাদা বকফুল

কোনো নিভৃত গ্রামে পথ চলতে গিয়ে বকফুলের দেখা মিলতে পারে। দেখবেন, সুদর্শন কোমল পাপড়ি মেলে ফুলগুলো তাকিয়ে আছে। এমন কমনীয় রূপ উপেক্ষা করা কঠিন। একসময় পরিত্যক্ত স্থান ও পথের ধারে এই গাছ আপনাআপনিই জন্মাত। আজকাল আমাদের অতিবৈষয়িক বিবেচনার কারণে গাছটি হারিয়ে যেতে বসেছে। মনে করা হয়, গাছটির নেই কোনো দারুমূল্য, হয় না কোনো ফলফলারি। কিন্তু তার যে আপন সৌন্দর্য ও পৌষ্পিক ঐশ্বর্য, তা কি উপেক্ষা করা যায়? কিছুদিন আগে সিরাজদিখান উপজেলার ছাতিয়ানতলী গ্রামে বেড়াতে গিয়ে সাদা রঙের এই স্নিগ্ধ বকফুলটি চোখে পড়ে।

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ছাতিয়ানতলী গ্রামে ফুটে আছে বকফুল

উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা আমাদের দেশে দুই রঙের ফুলের কথা বললেও আমার ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে তিন রঙের ফুল পেয়েছি। সাদা, রক্তলাল ও ঈষৎ গোলাপি। প্রথমোক্তটি সহজেই পাওয়া যাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের বাগানে; দ্বিতীয়টি রমনা পার্ক ও শেষেরটি পাওয়া যাবে মির্জাপুরের ভারতেশ্বরী হোমস প্রাঙ্গণে। তা ছাড়া বিক্ষিপ্তভাবে প্রায় সারা দেশেই এ গাছ চোখে পড়ে। বকফুলের তৈরি বড়া ভারি সুস্বাদু। এ তালিকায় আরও আছে স্থলপদ্ম ও কুমড়োফুল।

আমাদের প্রকৃতিতে বকফুল (Sesbania grandiflora) অনেক পুরোনো। প্রচলিত আরেকটি নাম ‘বাসনা’। প্রাচীন সাহিত্যেও এর উল্লেখ আছে। রাজনিঘণ্টু ও ভারতচন্দ্রের কবিতায় বকফুলের প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। ভারতচন্দ্র লিখেছেন: ‘অশোক কিংশুক মধুটগর/ চম্পক পুন্নাগ নাগকেশর/ গন্ধরাজ যুতি ঝাটি মনোহর/ বাসক বক শেফালিকা।’

ক্ষুদ্র আকৃতির পত্রমোচী গাছ। কাণ্ড সরল, উন্নত, ম্লান-বাদামি ও মসৃণ। যৌগিক পত্রটি পালকের মতো এবং আকর্ষণীয়, পত্রিকা আয়তাকৃতি, সজোড় ও গাঢ় সবুজ। কাক্ষিক মঞ্জরি অনিয়ত ও স্বল্পপৌষ্পিক। কোমল কলিগুলো বাঁকানো, দেখতে অনেকটা পাখির ঠোঁটের মতো; বৃতিযুক্ত, দ্বিধাবিভক্ত ও সবুজ। পুষ্পস্তবকে পরাগকেশরের সংখ্যা ১০, দুই গুচ্ছে বিভক্ত। প্রায় সারা বছর ফুল ফোটে। ফল লম্বা, প্রায় গোল, বীজপূর্ণ ও গ্রন্থিল। বীজ থেকে সহজেই চারা হয়। বৃদ্ধি দ্রুত, এক বছরেই গাছ ফুল ও ফলবতী হয়। গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার্য; বাকল ও শিকড় ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে। আদি আবাস মালয়েশিয়া। বর্ণবৈচিত্র্য তৈরির জন্য তিন রঙের ফুলের পরিকল্পিত বীথি গড়ে তোলা যায়।

মোকারম হোসেন

[ad#co-1]