ঘুড়িয়াল

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
এই যে বীরেন বাবু! নমস্কার। নমস্কার। কিন্তু আপনাকে তো চিনলাম না। চিনবেন, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। তা ভাল আছেন তো বীরেন বাবু? এই খারাপ ভালয় মিলিয়ে খানিকটা খারাপ, খানিকটা ভাল। কি আর করবেন! আমাদের সকলেরই ওই একই অবস্থা। খানিকটা খারাপ, খানিকটা ভাল। কখনও খারাপ, কখনও ভাল।

হুঁ, ঠিকই বলেছেন। তা আপনার আগমনের হেতু কি?

আজ্ঞে হেতুটা শুনলে আপনি হাসবেন। কিংবা রেগেও যেতে পারেন। আপনার ঠিক কি রকম প্রতিক্রিয়া হবে তা আমি জানি না।

দেখুন মশাই, আমি সোজাসাপটা কথাই পছন্দ করি। যা বলার তা সাদা বাংলায় বলে ফেলুন তো।

রাগ করবেন না বীরেন বাবু। আপনি রেগে গেলে আমি ভারী নার্ভাস হয়ে পড়ব কিন্তু।

আরে না, আমি মোটেও রাগিনি, রাগ করতে পারি না বলেই তো অন্যেরা জো পেয়ে যায়। গিন্নি থেকে শুরু করে বাড়ির কাজের লোক, অফিসের বড় সাহেব থেকে শুরু করে বেয়ারা, সবজিওয়ালা, মাছওয়ালা থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালা কে-না সুবিধা নিবেন বালুন! ভাল মানুষ পেয়ে সবাই আমার ওপর জুলুমই করে থাকে। সুতরাং আপনি নির্ভয়ে যা বলার বলতে পারেন।

শুনে একটু ভরসা হল মশাই। কথাটা তেমন গুরুতর কিছু নয়। বরং নিতান্তই এলোমেলো ব্যাপার। আসল কথা হল আমি একজন ঘুড়িয়াল।

ঘুড়িয়াল। তার মানে কি আপনি বলতে চাইছেন যা আপনি একজন ঘড়েল লোক?

আজ্ঞে ঠিক তা নয়। কথাটা হল ঘুড়িয়াল। আসলে ওরকম কোনও শব্দ আপনি বাংলা অভিধানে খুঁজে পাবেন না। ঠিক আভিধানিক শব্দও ওটা না কিনা।

ঘুড়িয়াল কথাটার তাহলে মানে কি দাঁড়ালো?

আজ্ঞে আমার বড্ড ঘুড়ি ওড়ানোর নেশা। ঠিক নেশাও নয়। তবে প্রয়োজনে ঘুড়িটুড়ি ওড়াই আর কি।

প্রয়োজনে ঘুড়ি ওড়ান! এতো ভারি অদ্ভুত কথা। ঘুড়ি লোকে আনন্দ করতে বা সময় কাটাতে ওড়ায় বটে। কিন্ত’ যতদূর জানি ঘুড়ি ওড়ানোটা কোনও প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে না।

যথার্থই বলেছেন। আপনি বেশ বিজ্ঞ মানুষ। সাধারণ নিয়মে ঘুড়ি ওড়ানোটা তেমন কাজের জিনিসও নয়। একরকম সময় নষ্টই বলা যেতে পারে। আপনি বোধহয় ঘুড়ি ওড়ানোটা তেমন ভাল চোখে দেখেন না।

তা বলতে পারেন। তাস পাশা খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, রকে আড্ডা এসব আমার মোটেই পছন্দ নয়।

কাজের মানুষদের ওসব পছন্দ হওয়ার কথাও নয় বীরেন বাবু।

আপনি ঘুড়ি ওড়ান বলেই কি নিজেকে ঘুড়িয়াল বলে উল্লেখ করেছিলেন?

ঠিক ধরেছেন। যে ঘুড়ি ওড়ায় তাকে ঘুড়িয়াল বলাটা ঠিক ব্যকরণসম্মত নয় বটে, কিন্তু বেশ লাগসই শব্দ। কি বলেন?

তা শব্দটা তেমন খারাপ নয়। কিন্তু আপনি ঘুড়ি ওড়ান বলে আমার কাছে এসেছেন কেন বলুন তো! আমি জীবনে ঘুড়ি ওড়াইনি. ওই বিদ্যের বিন্দু বিসর্গও জানি না। তবে বিশ্বকর্মা পূজোর সময় আকাশে নানা রঙের ঘুড়ি উড়তে দেখলে তেমন খারাপ লাগে না। এই যা।

আজ্ঞে, আপনার কাছে ঘুড়ি ওড়ানোর মারপ্যাঁচ সেখার উদ্দেশ্যে আসিনি বীরেন বাবু। কারণ নানা সূত্র থেকেই আমি খবর পেয়েছি যে, আপনি ঘুড়ি ওড়ানোর কলাকৌশল তেমন জানেন না।

হুঁ, আপনার খবরে কোনও ভুল নেই। আমি ঘুড়ি ওড়ানোর কলাকৌশল জানি না। এরকম অনেক কিছুই আমার না জানার মধ্যে পড়ে। যেমন আমি শাস্ত্রীয় সংগীত জানি না। চিনে ভাষা জানি না, সাঁতার কাটতে জানি না, গলফ খেলার নিয়ম জানি না।

আহা তাতে কি হয়েছে। আপনি যা জানেন তার বহরও তো কিছু কম নয়। আপনি বাংলা তথা ভারতের একজন ডাকসাইটে ইকোনমিস্ট, প্ল্যানিং কমিশনের একজন মেম্বার। আইআইএস-এর একজন কর্মকর্তা। এসবও তো কম কৃতিত্বের কথা নয়।

সে না হয় বুঝলুম, কিন্তু ঘুড়ি ওড়ানোর বিষয়ে আপনি যেন কি একটা বলতে চাইছিলেন।

যে আজ্ঞে। কথাটা একটু পিছন থেকে বললে ভাল হয়।

খুব বেশি পিছন থেকে কথা শুরু করলে তো অনেকটা বেশি সময় লাগবে না? ঘুড়ির বিষয়ে মানুষের তো খুব বেশি কিছু বলার থাকতে পারে না।

শুধু ঘুড়িটার বিষয় হলে আপনার কথাই ঠিক। কিন্তু আমি ঠিক ঘুড়ি ওড়ানোর কথা বলতে আসিনি। তার পিছনে একটু ইতিহাস আছে।

ইতিহাস। বা বা ইতিহাস বড় কঠিন জিনিস।

তা বটে, সে তা কেতাবী ইতিহাস। আমার ইতিহাসটা তার ধারে কাছেও নয়।

তাহলে শুরু করে দিন। এখন বিকেল চারটে ছাপ্পান্ন মিনিট। আজ ছুটির দিন হলেও সন্ধ্যে আটটা নাগাদ আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।

বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সে তো! ও নিয়ে আপনি চিন্তিত হবেন না।

আশ্চর্য? আমার অ্যাপয়েন্টমেন্টের কথা আপনি জানলেন কি করে? আজ্ঞে চোখ কান খোলা রাখলে জানা শক্ত কি?

ঠিক আছে। বলুন।

কথাটা হল, আমি ঘুড়ি ওড়ানোর খুব একটা অভ্যস্ত ছিলাম না। ওড়াতে জানতামও না।

বটে! তা সেটাই তো ভাল ছিল। হঠাৎ মরতে ঘুড়ির পাল্লায় পড়তেইবা গেলেন কেন?

আজ্ঞে সেই কথাটাই বলতে আসা।

হুঁ। কিন্তু আজ তো এ সময়ে আমার বাড়িতে থাকার কথাই নয়। এ সময়ে আমার দিল্লির প্লেন ধরার জন্য এয়ারপোর্টে যাওয়ার কথা। নিতান্তই-

যে আজ্ঞে। আমার কাছে সেরকমই খবর ছিল। আমি সেটা জেনেই এ বাড়ির সামনে যথারীতি একটু ঘুরঘুর করার জন্য চলে এসেছিলাম।

ঘুরঘুর করতে? বলেন কি? ঘুরঘুর করতে এসেছিলেন!

যে আজ্ঞে। আপনি বা আপনার স্ত্রী বাড়িতে না থাকলে আমি মাঝে মাঝেই এ বাড়ির আশেপাশে দিয়ে ঘুরঘুর করে থাকি।

কেন বলুন তো! ঘুরঘুর করেন কেন?

আজ্ঞে, ভিতরে ঢুকে পড়ার মতো সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি বলে। বাঙালী যুবকেরা এখনও ঠিক আগুয়ান পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে তেমন সাহসী হয়ে উঠতে পারেনি কিনা! আবার ভীতু বাঙালীদের মধ্যেও অমাকে আপনি একেবারে পিছনের সারির লোক বলে ধরে নিতে পারেন। আমি ভীতু এবং কাপুরুষ।

হুঁ। কিন্তু এ বাড়িতে তো কোনও জুজু নেই। আপনার ভয়টা তবে কিসের? ভয় পাওয়ার তো একটা লজিক থাকবে, নাকি!

আজ্ঞে এ ব্যাপারে আমি আপনার সঙ্গে একমত নই। ভয় পাওয়ার কোনও লজিক নেই।

বেশ, সেটা না হয় মেনেই নিলাম। কিন্তু ঘুড়ি এবং ঘুরঘুর এর কোনওটারই মাথামুণ্ডু আমি কিন্তু বুঝতে পারছি না।

আসলে, আমি এই কাছেই একটা বাড়িতে থাকি। আমাদের বাড়িতে একটা বেশ বড় ছাদ আছে। সেই ছাদে দিনের অনেকটা সময় আমার কাটে। তার কারণ, ওই ছাদেরই চিলে কোঠায় আমার বসবাস। আর ওইখানেই আমার সর্বনাশ।

বলেন কি! চিলেকোঠায় সর্বনাশ।

যে আজ্ঞে। কারণ ওই ছাদ থেকেই একদিন কাছাকাছি আর একটা বাড়ির ছাদে আমি একটি মেয়েকে দেখতে পাই। তাকে আমার রক্ত মাংসের মানুষ বলে মনেই হয়নি। রবি ঠাকুর যে বলেছেন অর্ধেক মানুষ তুমি অর্ধেক কল্পনা এ হল সেই বৃত্তান্ত। শিউলি ফুল, প্রজাপতির পাখা, হরিণের চোখ, মরালের গ্রীবা অর্থাৎ কিনা পৃথিবীর যাবতীয় অপার্থিব জিনিস দিয়ে তাকে নির্মাণ করা হয়েছে বলে আমার ধারণা। আর তাকে দেখার পর থেকেই আমার মধ্যে আর আমি নেই। কেমন অন্য মানুষ হয়ে গেলাম।

উহুঁ উঁহু, ওটা ঠিক হল না। যৌবন কালের চোখকে একদম বিশ্বাস করবেন না মশাই । বাইশ তেইশ বছর বয়সে আমারও এরকম মনে হত। আরও তিন জন সক্ষম যুবকের সঙ্গে রীতিমতো লড়াই দিয়ে যাকে দখল করলাম পরে দেখেছি তিনি অতটা কিন্তু না। একজন মহিলা মাত্র, আর পাঁচজনের মতোই।

আপনি প্রাজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ মানুষ। যা বলছেন তা অতিশয় সত্য এবং বাস্তব ঘটনা। তবে যৌবনের ওই বিভ্রম না থাকলে যৌবন যে বার্ধক্যের সমান হয়ে দাঁড়াবে। তা কি আপনার মনে হয় না? মোহ জিনিসটা ভুল ঠিকই, কিন্তু ওর মধ্যে যে রহস্যটা আছে সেটাও তো কম নয়।

বুঝলাম ফাঁদে পড়েছেন। তা পড়-ন। এরপর কি হল?

ওই ভীতুদের যা হয়। এমন সাহস হল না যে গিয়ে মেয়েটার সঙ্গে আলাপ বা ভাব করি। প্রথম সাদা চোখে, তারপর দূরবীণ দিয়ে তাকে দেখে দেখে আমার কাজ কর্ম লেখাপড়া সব শিকেয় উঠল। খাওয়া কমে গেল, ঘুম গেল, রোগা হয়ে গেলুম। ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস, বুকে হাহাকার, নিজের অক্ষমতার জন্য রাগ, কত কিছু যে হতে লাগল। আঙুলের নখ বেড়ে যায়। চুল ছাঁটতে ভুলে যাই। দাড়ি গোঁফ রবি ঠাকুরকে লজ্জা দেয়।

খুব খারাপ অবস্থা দেখছি।

যে আজ্ঞে।

তারপর কি হল?

আজ্ঞে তখন এক বন্ধু পরামর্শ দিল, চিঠি দিতে। চিঠি বা প্রেমপত্রে নাকি কাজ হয়। কিন্তু কাকে দেবো বলুন, তার নাম তো জানি না। মনে মনে তাকে অনেকগুলো নাম দিয়েছিলাম বটে। কিন্তু সেগুলো তো তার আসল নাম নয়। তারপর আর এক বন্ধু পরামর্শ দিল ঘুড়ি ওড়াতে।

ঘুড়ি! ঘুড়ি উড়ায়ে প্রেম। এ তো কখনও শুনিনি।

যে আজ্ঞে। ব্যাপারটা অভিনব বটে। তবে ঘুড়ির গায়ে কয়েক পংক্তি প্রেমের কথা লিখে যদি কৌশলে ঘুড়িটা ওই মেয়েটির ছাদে নামিয়ে দেওয়া যায় আর কৌতূহল বসে মেয়েটি যদি তা কুড়িয়ে নেয় তাহলেঃ বুঝেছি। তা বুদ্ধিটা মন্দ নয়। তাতে কাজ হল বুঝি?

আজ্ঞে না। তবে ঘুড়ি ওড়াতে শিখলাম। নির্দিষ্ট ছাদে ঘুড়িও নামল। তবে-

তাহলে তো দুঃখের ব্যাপার। কিন্তু এই দুঃখের ব্যাপার আপনি আমার মত একজন বয়স্ক মানুষকে শোনাচ্ছেনই বা কেন? এই কাহিনীর সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক?

আসলে আপনাকে শোনাতে আসা নয়। আমি ঘুরঘুর করতেই এসে পড়েছিলাম। আপনি বাড়িতে নেই দেখেই। কিন্তু হঠাৎ করে আপনি সদর দরজা দিয়ে বেড়িয়ে আপনার মুখোমুখি পড়ে যাওয়ায় আমি নার্ভাস হয়ে আপনার সঙ্গে আলাপ করে ফেলি। আসলে আমি এসেছি আমার ঘুড়িটা উদ্ধার করে নিয়ে যেতে। কারণ, আমার ঘুড়িটা আপনার বাড়ির ছাদেই নেমেছে।

অ্যাঁ। সর্বনাশ। আমার বাড়ির ছাদে? দাঁড়ান দাঁড়ান, একটু ভাবতে দিন তো!ঃতাই তো! একটা ঘুড়ি নিয়ে আমার গিন্নির সঙ্গে আমার ছোটো মেয়ে রানুর সেদিন খাওয়ার টেবিলে কি যেন কথা হচ্ছিল। আমি কথাগুলো তেমন বুঝতে পারিনি।

আজ্ঞে, তাতে হয়তো ভালই হয়েছে। বুঝে আপনার কাজও নেই।

আপনি কি বলতে চাইছেন যে, আপনার উদ্দিষ্ট মেয়েটি আমারই ছোটো মেয়ে রানু? কিন্তু রানু তো মোটেই প্রজাপতির পাখা বা হরিণের ন্যায় বা জিরাফের গলা দিয়ে তৈরি নয়।

আজ্ঞে, ওভাবে বলবেন না। প্রজাপতির পাখা, হরিণের চোখ, মরালের গ্রীবা আর খানিকটা স্বপ্ন।

ওহ! যৌবনকালটা যে পেরিয়ে আসতে পেরেছি, তাতই বাঁচোয়া। ওই বয়সে এত ভুলভালও দেখে আর ভুলভাল বোঝে মানুষ!

আজ্ঞে ওইটেই যৌবনের ধর্ম, আমি জানি যখন আমার বয়স হবে তখন আর এই ভুলগুলো হবে না। আর সেটাই হবে ভারী দুঃখের বিষয়।

আমি এই নিয়ে আপনার সঙ্গে কোনও তর্ক করতে চাই না। কারণ এ তর্কের কোনও সমাধান নেই।

যে আজ্ঞে।

কিন্তু ঘুড়ি কি আর আপনি ফেরৎ পাবেন?

পাবো না?

পাওয়া শক্ত হবে। কারণ ঘুড়িটা বোধহয় এখন আমার গিন্নির হেফাজতে। আর আজ সকালেই তিনি বলেছিলেন বটে যে, ডাক্তার ব্যানার্জির সঙ্গে দেখা করে তার ছেলে ভাস্কর সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে।

কিন্তু কেন?

বোধহয় পুলিশকেও জানাতে চান। আহা, আপনি এত ঘাবড়ে যাচ্ছেন কেন?

আজ্ঞে পুলিশে জানালে আমাদের যে বড় হেনস্থা হবে। বাবা বোধহয় আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়েই দেবেন।

হুঁ। সেটাও ভাবনার কথা। তবে আমার গিন্নি কি ভেবে খোঁজ-খবর নিতে বলেছেন সেটা আমিও ভাল জানি না। পরিবারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুবই কম। আমি ব্যস্ত মানুষ, জানেন তো!

আজ্ঞে জানি।

এমনও তো হতে পারে যে তিনি মৈনাক ব্যানার্জির ছেলের সঙ্গে রানুর বিয়ের সম্বন্ধই করতে চাইছেন। যতদূর খবর পেয়েছি ছেলেটা তেমন খারাপও নয়। ডাক্তারি পাশ করে ইন্টার্নি করছে।

যে আজ্ঞে।

কপাল ভাল থাকলে ঘুড়িটা একদিন ফেরত পেতেও পারেন। কিছুই বলা যায় না।

[ad#co-1]