লাউয়ের ডগা

নূর কামরুন নাহার
এ জায়গায় পাড়টা উঁচু। সামনেই আবার ঢালু। পাড়ের নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মেঘনা। নদীর ভাঙ্গন থেমেছে পাঁচ বছর। এদিকে নদী এখন আর ভাঙ্গে না। তবু মেঘনার কোন বিশ্বাস নেই। ওর বড় যৌবনের দেমাক। যে কোন সময় কোমর বাঁকিয়ে ঢুকে পড়বে গ্রামে। ভাঙ্গবে পাড়, ফসলের মাঠ, গৃহস্থের উঠোন।

বিকেলের রোদ শুয়ে পড়েছে ধানক্ষেতের উপর। মাঠগুলো ক’দিন পর হলুদ রং নিবে। পুরুষ্টু ধানে এখনই হলুদের ছোঁয়া লেগেছে। বিকেলের রোদ ক্ষেত, নদী আর গ্রামের রেখায় সোনা রং মেখে দিয়েছে।

পাড়ের উঁচু জায়গায় হাঁটুর উপর দু’পা ভাঁজ করে পাশাপাশি বসে আছে মাজু আর ছেদু। বহুদিনের বন্ধু ওরা। দু’জনেই নদীভাঙ্গা মানুষ। ঘর ছাড়া, জমি ছাড়া। মাজু থাকে আমানউল্লা মুন্সীর ভিটার এক কোণে। আর ছেদু পুবপাড়ার সোনামিয়ার ভিটাতে।

মাজুর ভিটে নেই বহু বছর। বুঝ হবার পর থেকে সে ভিটে দেখেনি। মাঝে মাঝে তার বাজান মাঝ নদীর দিকে আঙ্গুলে ইশারা করে দেখাতো-ঐ যে দেখতাছস বাজান ,ঔ যে মাদখাইনটা ঐ হানেই আমরার ভিডি আছিলো,আছিলো তোর দাদার দুইডা চৌচালা ঘর। বড় ঘরডাত ছয়ডা লোয়া কাডের পাল্লা আছিলো।

আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলত- আছিলো খেতও, ঘরের ধানে বছর যাইত। সব এই মেঘনায় নিছে। হুদা কি আমরারটা নিছে। নিছে কালাম মুন্সী ,আউয়াল মেম্বর, যদু মিয়ার বাড়িও। কোন চিন নাই। ঢলঢলা গাঙের পানি।

মাজুর বাপ কথায় কথায় বাপের কালের এই ক্ষেত আর ভিটার কথা বলতো। বুড়া বাপের দীর্ঘশ্বাস বেড়েছে, বেড়েছে হাপানির টান। কিন্তু মাথার উপর চালা উঠেনি। মরার আগে বড় বড় চোখ করে মাজুকে বলেছে- বাজান তোরে ভিডা দেহাইতে পারি নাই। মাথার উফরে নাই বালা একডা চালা। সারাজনম পরের জমিন চাষ করলাম। পারলে তোর ছুইটকাগুলারে ভিডা দেহাইছ। মাইনষের জমিনে আর কত খাটবি। পায়ের নিচে নি পারস এটটু জমিন করতে।

বাপের মৃত্যু মাজুকে শোক দেয়নি। বুড়া বাপ, অসুইখ্যা। অষুদ নাই। পথ্য নাই। বাঁচবে কিসের জোরে। কিন্তু বাপের শেষ কথাটা কানে বাজে- পায়ের নীচে নি পারস ইটটু জমি করতে। পায়ের নীচে এক খন্ড জমি কি সোজা কথা। এই কথা বাপ কেন কইলো। হেয় কি জানে না এক খন্ড জমি খোয়াবের চাইতেও মিথ্যা। মাজুর ছয়টা ছেলেমেয়ে। বড় মেয়েটা আবার প্রতিবন্ধী। কাজ বলতে পরের সামান্য জমি চাষ। ঘর বলতে মাথার ওপরে ভাঙ্গা একটা চালা। তার জন্য জমি আকাশের চাঁদের চাইতেও দূরের জিনিস।

মাজুর মত ছেদু পরের বাড়িতে থাকার এত কষ্ট করে নি। বছর বিশেক হলো ছেদুর বাড়ি মেঘনায় পানি হয়েছে। তার আগে ছেদুদের একটা সুন্দর উঠান আর দোচালা ঘর ছিল। ঘরটার অবস্থা ভালো ছিল না কিন্তু ওদের সংসারটা সুন্দর ছিল। দু’ভাই, দু‘বোন। বোন দ‘ুটোর বিয়ে হয়েছে দুরের গ্রামে। বছরে একবার করে ওরা নাইউর আসে। দু‘ভাই মানুষের জমিতে বর্গা খাটে। ছেদুর বাবা বাড়িতে বাড়িতে গান গায়। ভাবের মানুষ। গ্রামের মানুষ তাকে ভালো জানে। খুশী মনে সামান্য যা দেয় তাতে সংসার চলে। সংসারে অনটন ছিল কিন্তু হাড়ে হাড়ে বাড়ি খাওয়া অভাব ছিল না। কিন্তু একরাতে মেঘনা অজগরের মত গিলে ফেলল ভিটাটা। চোখের সামনেই থৈ থৈ জল হয়ে গেল।

বাড়ী ঘর কিছু না, আমরা শুধু দুই দিনের মুছাফির। এসব কথা মুখে বললেও ছেদুর বাপ ভিটার শোকে অর্ধেক হয়ে গেল। গলায় আর আগের মত গান উঠে না। গুম মেরে বসে থাকে। সন্ধ্যায় চলে যায় মেঘনার পাড়ে। কালো জলের দিকে তাকিয়ে থাকে। কখনও আসমান দেখে। জমিন আর আসমানের ফারাক দেখে। মাঠের উপর শুয়ে থাকে। রাত বাড়ে। ঘরে ফেরে না। মাঠের মধ্যেই পড়ে থাকে। শোকে শোকে মানুষটা কেমন অন্যমানুষ হয়ে যায়। একসময় ক্ষয় কাশি ধরে। এই ক্ষয় কাশিতেই শেষ হয়ে যায়। বাপ মরার পরের বছরই চক্ষু বুজে মা। ছেদুর ভেতরটা মেঘনার ভাঙ্গনের মত ভেঙ্গে পড়ে। বাপ আর মা হারিয়ে সোনা মিয়ার বাড়ীর ভিটায় ভাঙ্গা ঘরটা কোনো রকম তুলে। ভাইটা শহরে কোন এক বস্তিতে থাকে। ঠেলা চালায়। বছরে দু’একবার আসে। বোনগুলো এখন আর আসে না। আসবে কি। ছেদুরই থাকার জায়গা নাই। মেহমান সামলাবে কোথায়?

আজ হাটের দিন। হাট বসে দু’গ্রাম পরে। দু’গ্রাম হলেও দুরত্ব খুব বেশী নয়। মেঘনার ভাঙ্গনে গ্রামগুলো ছোট হয়ে গেছে। নদীর পাড় ধরে মানুষ হাটে যাচ্ছে ,আসছে। মানুষগুলোকে উদাস তাকিয়ে দেখে মাজু। দেখে শেষ বিকেলের রোদটা ক্ষেত আর পাড়ের কিনার পেরিয়ে ধীরে ধীরে মেঘনায় নেমে যাচ্ছে। এখনও আকাশ আর জমি আলো ধরে রেখেছে। এই আলো হঠাৎ ঝুপ করে মিলিয়ে সন্ধ্যা নামবে। তারপর অন্ধকারে ঢেকে যাবে সব। লুুঙ্গির গুছা থেকে একটা বিড়ি বার করে ধরায় ছেদু এক গাল ধোয়া ছাড়ে।

আরো দুই তিন টান দিয়ে বলে- খাবিনি।

দে দেহি, দেই দুই টান । মনডা বালা না। হাটে যাওনের কাম আছিলো। ঘরে চাইল ডাইল কিছ্ছুই নাই।

অহন যাবি কেমনে। বেইলতো এক্কেবারে পইরা গেছে।

যামু কি? একটা টেহাও নাই। কেমনে যে দিনডি যাইব। ময়নার লাইগ্যা একটা জামা কিনন ফরজ অইয়া গেছে। মাইয়্যাডা একটা ফারা ত্যানা পিন্দা থাহে। কি যে করমু মাথাত আর দরে না।

ছেদু দুরে তাকিয়ে বলে- আমারও তোর লাহানই দশা। হুদা ভাত খাওনেরও উফায় নাই।

সন্ধ্যা গাঢ় হয়। অন্ধকারে মাজু আর ছেদু বসেই থাকে।

একসময় ছেদু বলে- বাইত যাইতি না।

হ,ল যাই।

২.

আমানউল্লার বাড়ির এককোণে মাজুর ভাঙ্গা ঘর। ঘরের সামনে সামান্য একটু উঠান। উঠানের পাশেই অনেকটুকু জায়গা জুড়ে গর্তের মতো। এটাও আমানউল্লারই সীমানা। এখান থেকে মাটি তুলেই ঘর বাধা হয়েছে। গ্রামের প্রায় বাড়ির সীমানাতেই এমন একটু নিচু জায়গা আছে। যাকে সাধারণত গাতা বলে অভিহিত করা হয়।

মাজু এসে উঠানে দাড়ায়। উঠানের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে ময়না কঞ্চি দিয়ে বাঁধছে।

হাইনজালা ঐ হানে কি করছ ময়না।

ময়না দৌড়ে এসে বাপের হাত ধরে তোতলানো স্বরে বলে- বা-জান।

ঐ হানে কি করতাছস?

কিছু ক-লি না।

অহন বড় অইছস। আন্ধাইরে যাবি না।

কাত করা মাথাকে আর একটু কাত করে ময়না ।

মেয়েটা কচি লাউয়ের ডগার মত লকলক করে বাড়ছে। শখ করে মাজু মেয়ের নাম রেখেছে ময়না। ময়নার মতই কালো গায়ের রং। মুখটায় ছড়িয়ে আছে কচি বয়সের মায়া। মেয়েটা স্বাভাবিক না। তোতলা তোতলা কথা বলে। হাটে একপাশে বাঁকা হয়ে। ঘাড়টা একদিকে বাকা। মাথার ডানদিকটা একটু কাত হয়ে থাকে। মুখটাও ডানদিকে একটু বাঁকা। নীচের ঠোঁটটা বেকে ঝুলে থাকে। ঠোঁটের পাশ গলিয়ে লালা ঝরে। বাকা ঠোট আর কাত করা ঐ মুখটায় মুক্তার মত সাদা এক সারি ঝকঝকে দাঁত। দাঁত বের করা একটা সরল হাসি মুখটায় সারাক্ষণ লেপ্টে থাকে। কালো মুখটায় র্চটের মত জ্বলজ্বল করে দুটি চোখ। এত বড় ,উজ্জল আর মায়ামাখা চোখ ছিল মাজুর মার। মেয়েটার চোখের দিকে তাকালে মনে হয় মা তাকিয়ে আছে। মেয়েটার স্বাভাবিক বুদ্ধি কম। সারাক্ষণ হাসে। যে কোন কথায় মাথা নাড়ে। সবার সব ফরমায়েস শুনে। সারাদিন সবাই ওকে ফুট ফরমায়েস দিতে থাকে। দৌড়ে দৌড়ে হাসিমুখে করে। আড়ালে সবাই মুখ টিপে হেসে হেসে বলে- বেক্কল।

আবার কেউ বলে- ব্যাহা ।

মাজু জানে তার মেয়ের বুদ্ধি নাই। কিন্তু মেয়ের হাতে সোনা ফলে। ময়নার একটাই নেশা গাছ লাগানো। নিজের ভিটা নাই। জমিন নাই। তারপরও ঘরের পাশে। বাড়ির নামায়, গাতার কাছে ময়না নানা ধরণের গাছ লাগায়। সারাদিন গাছগুলোর যতœ নেয়। লাউ, কুমড়া, সীম টমেটো, বেগুন যখন যেটা পায়। ছোট চারা পেলেই হল। গাছ তার জান। গাছই তার সঙ্গী।

প্রথমে প্রথম মাজু রাগ দেখাতো- মাইনষের জমিতে আবার কিয়ের গাছ লাগান।

এখন আর কিছু বলে না। মেয়েটা তার বড় হচ্ছে। মেয়ে তাকে মায়ের মত আগলে রাখে। বাপের সব দিকে তার খেয়াল। বাপেরে দেখলেই ময়নার মুখের হাসিটা বাড়ে। বাঁকা করা মাথাটা আরো একটু হেলে পড়ে।

এমুন হাইনজালা সব ঘুমাইছে ক্যান।

না ঘুমাইয়া করবো কি? হারিকেনডাত তেল নাই। কুফিডাও আর বেশীক্ষণ জলতোনা।

মাজু কথা বলে না। বাইরেই ভালো ,বাতাসের মধ্যে বসে থাকা। ঘর মানেই একশ একটা চাহিদা। একশ একটা প্রশ্ন। চোখের সামনে হতাশার ছায়া। বিপন্ন ,বিমর্ষ মুখের বিষণœ মিছিল। মাঝে মাঝে নিজেরেই সে প্রশ্ন করে- সংসারে এত কিছু লাগে ক্যান।

তার বউভাগ্য খারাপ না। আর দশটা মেয়ের চাইতে সুফিয়া অনেক বেশী বুঝের। গলা উঁচু করে ঝগড়া করে কম।তবে এখন মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়,দু একটা তেরছা কথা বলে। মাজু কিছু বলে না। বউটা তার খাটে প্রচুর। সুফিয়ার শরীরটা শক্ত বাঁধনের। সারাদিন কাজ করে। কয়দিন পরে ধান উঠলে মানুষের বাড়িতে ধান নিবে। কাজে কামে সুফিয়ার চাহিদা আছে ভালোই। তবে কোলের দুইটা বাচ্চা রেখে কাজ করতে কষ্ট হয়। ছোট দুই ভাই-বোনকে ময়নাই দেখে। ওর কাছে রেখেই সুফিয়া বাড়ি বাড়ি যায়।

মাজু উঠানেই দাঁড়িয়ে থাকে।

অমুন থমক ধইরা খাড়াইয়া রইছে ক্যান। কইলাম কুফিডাত তেল নাই। খাইয়ানা লাইবো।

মাজু কথা বলে না। ঘরে ঢুকে নিশব্দে পাটির উপর বসে।

ময়নায় খাইছে?

না খায় নাই। বাপেরে ছাড়া খাইছে কবে।

ময়না বাসন হাতে বাপের পাশে বসে।

সুফিয়া ভাত বাড়ে। ভাত, আলুর ভর্তা সাথে একটু টমেটোর ভর্তা। ছোট একটা বাটিতে একটু ডাল।

চুহা বাগুন পাইলা কই?

ময়নায় নাজমারার গাতার হেপার গাছ লাগাইছে, হেনতেই আনছে কয়ডা।

দেহ চাইন তাইর কাম, এমবেলা কেউ চুহা বাগুন লাগায় তাও মাইনষের বাইত।

সুফিয়ার একবার মনে হয় উত্তর করে বাড়িতো সবই মাইনষের। নিজের কি ভিটা আছে নি। কিন্তু বলে না। কিসমতে নাই এসব বলে কি হবে। তার বাপেরও ভিটা নাই। ভিটা ছাড়ারাই আসে ভিটা ছাড়ার কাছে। ভিটা ওয়ালা বাপের মাইয়্যা কি আর ভিটা ছাড়া লাউইড়া ভাদাইমার লগে সংসার করবো। জগতে দুঃখীর কপালে দুঃখীই থাকে। আর দুঃখীর দুঃখ দুখীই বুঝে।

সুফিয়া কুপিটা নাড়া দিয়ে ভেতরের তেল অনুমান করে তারপর বলে -ঘরডাত কিছুই নাই । কয়ডা কলই আছে সহালে হিজান যাইবো দুফুরে খাইবো কি।

কাসেমের কাছে কয়ডা টেহা পামু সহালে দিব কইছে।

টমেটোর ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে তৃপ্তির একটা ঢেঁকুর তোলে মাজু উঠানে এসে দাড়ায়।

তারপর ঘরের দিকে মুখ করে বলে- কুফি নিবাইয়া হুইয়া থাহ। আমি একটু বাতাসে জুড়াইয়া লই। পরে হুমু।

সুফিয়া কথা বলে না। ঘুমিয়ে যাওয়া বাচ্চাগুলোকে টেনে জায়গা মত শোয়ায়। তারপর চকিতে শুয়ে পড়ে।

একটু পরে বলে- ময়না দেখতো পাহালের আগুন নিবাইছিনি। না নিবাইলে নিবাইয়া দে।

৩.

চৈত্রের শেষ। খরানে পুড়ছে গ্রাম। ঝিম ধরা লাট্টুর মত রোদ মাথার উপর দাঁড়িয়ে থাকে। তাপ একটুও কমে না। গাছের পাতারাও নড়ে না। যেন মন্ত্রপড়া মূর্তি কারো নির্দেশের অপেক্ষায় স্থির হয়ে আছে। সামনে তাকালে রোদে চোখ ধা ধা করে। কপালের উপর হাত রেখে আকাশের দিকে তাকায় মাজু। সূর্য পশ্চিম দিকে হেলেছে। ঘামে আঠালো শরীরটা চটচটে হয়ে গেছে। সকাল থেকে পাট ক্ষেতে নিরানি দিচ্ছে সে। কয়েক ক্ষেত পরে কাজ করছে-ছেদু-ও। হাত থেকে কাঁচিটা নামিয়ে মুখের দুপাশে হাত দেয় মাজু তারপর আযানের মত করে ডাক দেয় ছেদু..ওছেদু অ.অু. উ। চহে আছো নি অ।

একটু পরেই ছেদু ুর উত্তর শোনা যায়- মাজু আঃ ছি. ওঃ আঃ ছিঃ ও অুঃ।

মাজু আবার বলে- গাঙ্গে যাইবা নি অঃ।

ছেদুর কথা শোনা যায় না। আস্তে আস্তে পূর্ব দিকের জমিতে স্পষ্ট হয়ে উঠে ছেদু র শরীর।

কাছাকাছি হলে মাজু বলে- শইলডা তাইতা গেছে। লও যাই একটা ডুব দিয়া আই।

হাত থেকে কাঁচি রেখে ছেদু বলে- আসমান কি গইলা পরবনি।

তেইতা বারও এইরহমই ওনতা আছিলো। হেইবার দেখছিলানি কি তুফানডাই না অইলো। আমি তো ওনতারে ডরাই না ডরাই তুফানরে।

বছরের এই সময়টায় মাজু বুকটা খামচা ধরে থাকে। না জানি ভাঙ্গা ঘরডা উড়িয়ে নেয় বাতাসে। জোরে বাতাস হলে জোরে জোর আল্লারে ডাকে। আর চালের দিকে চেয়ে থাকে। এবারের এ গুমোট গরমও ঝড়ের আলামত। আল্লাই জানে কপালে এবার কি আছে।

মেঘনায় এসে হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে দুজনে মুখে পানির ছিটা দেয়,দুইহাত আজলা করে কয়েক ঢোক পানি খায়। তারপর শরীরটাকে ঝুপ করে ছুড়ে দেয় মেঘনায়।

দুজনে ডুবায়, সাতঁরায়। মেঘনার জলে রেখে দেয় সারাদিনের তাপ, কষ্ট, দুঃখ ,বঞ্চনা।

গোছল শেষ করে ভিজা গামছাটা উঠানের দড়ির একপাশে ছড়ায় মাজুর। বাপকে দেখে বাঁকা ঠোঁটের হাসিটা বিস্তৃত করে ময়না।

তোর মায় কই?

গা-ঙ্গে গা- দু-ইতে গেছে।

ময়নার হাতে একটা বাটি। সেদিকে তাকিয়ে মাজু বলে-তোর হাতে কি?

আমে-ল ভর্তা। বা-জান হাইবা?

অপুষ্ট ঝরে পড়া কড়া কয়েকটা আম কুড়িয়ে এনে ভর্তা বানিয়েছে ময়না সেটাই বাপের সামনে ধরে। বাটি থেকে সামান্য একটু তুলে মুখে দেয় মাজু। মুখটা টক মিষ্টিতে আর ঝালে ভরে যায়। ভর্তাটা খুব স্বাদ লাগে মাজুর।

মেয়ের কাধে হাত রেখে বলে- তুই বানাইছস?

ময়নার মুখে আবার হাসি ছড়ায়। হাসিতে বাঁকানো ঠোঁটটা ঝুলে পড়ে। মেয়ের মুখটা কি যে সরল মায়া মায়া দেখায়। সেদিকে তাকিয়ে মাজুর চোখটা ভিজে যায়। আল্লার এ কি লীলা। তার এমন মায়া মায়া এমুন সুন্দর স্বভাবের মাইয়াডা কেন আর দশটা মাইয়ার মতন অইল না। কেন আল্লা তারে এমুন খুত দিয়া বানাইলো। কার গুণায় এমুন হইল। সে সাধারণ একজন মানুষ। আল্লায় কেন তারে এমুন শাস্তি দিল।

৪.

ঘরের সামনের দরজায় বসে ময়নার চুলে দুইটা কলা বেনী বাধে সুফিয়া। মাইয়াডার চুলও। যেমন কালো তেমন ঘন। এক মাথা চুল পিঠ ছাড়িয়ে কোমর ছুঁয়েছে। কালো চামড়ার সাথে কালো চুল ঝিলিক মারে। বেণী বাঁধা শেষ করে ফিতাটা দিয়ে ভালো করে ফুল তোলে। কানের দুপাশে গন্ধরাজের মত দোলে দুটি ফুল।

মাজু একপাশে বসে বিড়ি টানছে। ছেদু ছোট করে একটা কাশ দিয়ে উঠানে এসে দাড়ায়। ছেদুকে দেখে সুফিয়া মাথায় কাপড় তোলে।

বাউজ ভালা আছেন নি?

হ আছি। আফনে কেমুন?

আমরার দিন চলতাছে।

এমুন মাদানে কই যাইতাছেন?

মাছিননগর মেলাত যাই। জমির যাবিনি?

এমুন মাদানে গিয়া ফিরবি কহন?

হাইনজালা ফিরা আমু। পা চালাইয়া যামু আর আমু।

অহন মেলাত গিয়া কাম কি তোর।

তোর বাউজে এই কয়ডা পানখা শিলাইছে বেচন নি যায়।

বৈশাখ মাসের আজ দুই তারিখ। গতকাল থেকেই মেলা শুরু হয়েছে। দুই গ্রাম পরেই মাছিননগর। সময় খুব বেশী লাগবে না। মাজুর এখন অবশ্য কোন কাজ নেই। ইচ্ছে করলেই যাওয়া যায়। তবে বেলাও বেশী নাই।

মাজু আবার বলে-বেইলডা পইরা যাইতাছে।

তোর এত ভাইব্যা কি? আন্দাইরেও আওন যাইবো। আসমানে চান্নি উঠবো। সড়ক ধইরা আইয়া পড়মু। আর কত মানু আইবো যাইবো। ল, যাই।

মাজু আর না করে না। শার্টটা গায়ে দিতে ঘরে ঢোকে।

ময়না এসে বাপের গলা ধরে- বা- জান আমা-লে মেলা-ত নিবা না?

ময়না বাপের সাথে যাবার জন্য গো ধরে

তুমি মেলাত যাইবা ক্যামনে?

অইছে এই আধালুলা মাইয়্যা মেলাত নিয়া আর দেহান লাগদো না।

সুফিয়া এসে বাপ মেয়ের মাঝখানে দাড়ায়। মাজু কথা বলে না। মেয়েটাকে সে ভালোবাসে। এই ভালোবাসা সবসময় স্ত্রীকে দেখানো যায় না। ময়না ভালোবাসা পাবার যোগ্য না। কালো, বিকৃত মুখের খোড়া মেয়ে সে। জগৎ এদের জন্য নরম নয়। ভালো সচল সুন্দরকে সবাই পছন্দ করে। কালো কুৎসিত খোড়া মেয়ে জগতের কাছে ভালোবাসার দাবী রাখে না। জগৎ তাকে বিদ্রুপ করে, তাকে দেখলে মুখ ফেরায়। ঐ বিকৃত মুখের ছায়া মানুষের চোখকে প্রশান্ত করে না বিরক্তি ছাড়ায়। তার পাওনা মানুষের ঘৃণা ও কটুক্তি। বিধাতাই তাকে পছন্দ করে বানায়নি। মানুষ তাকে কি পছন্দ করবে।

ময়না তুই মায়ারে দেহিস। আমি একটু কালারার বাইত যামু। হেই বাইত পিঠার জো উঠাইছে। হাত চালাইয়া কয়ডা বানাইয়া দিয়া আই।

আমা-ল লাইগ্যা পিঠা আন-ন লাগ-বো।

দেহ মাইনষের বাড়ির পিডার লাইগা কি লালছ। এইডা কি আমরার নিজের। যে কইলেই আনন যাইবো।

ময়না মুখ কালো করে দাড়িয়ে থাকে।

মাজু একটু অসহায়ের মত চেয়ে থাকে তারপর বলে -দেহি তোর লাইগ্যা চুড়ি নি আনন যায়।

ময়না খোড়া পা টেনে লাফ দিয়ে বাপের কাছে আসে। চোখেমুখে সেই হাসি ছড়িয়ে বলে- বা জান নাল চুড়ি আই-নো।

সুফিয়া মুখ অন্ধকার করে বলে- পেংচা দেহ। ঘরে ভাত খাওনের চাইল নাই, চুড়ি আনবো।

ময়না আবার মুখটা নিচু করে দাড়িয়ে থাকে।

মাজু কিছু না বলে ছেদুুর সাথে গোপাটে নেমে আসে।

মেলা ভালোই জমেছে।

ছেদু এক দোকানীর কাছে দরদাম করে পাখাগুলো বিক্রি করে। আকাশের অবস্থা খারাপ দেখা যায় মেঘে কালো হয়ে আছে। বাতাস বন্ধ হয়ে চারদিকে গুমোট একটা গরম ভাপ ছড়িয়ে পড়ে।

মাজু বলে-দিনে যেমুন হাজ করছে আর যেমুন দমখুডা ওনতা ছুটছে আজগা একটা তুফান চালাইবো।

ছেদু চারদিকে একটু তাকিয়ে বলে-হ দিনডা আন্ধার হইয়া আইছে।

দুজনে দ্রুত হেটে বড় সড়কের মাথায় উঠতেই সাইসাই আওয়াজে তুমুল ঝড় শুরু হয়। গাছের শাখাগুলো প্রবল বেগে দুলে উঠে। উড়ন্ত খড়কুটো,ঝরা পাতা আর ধূলিতে মুহুর্তে চারদিক ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। বাতাস আর গাছের ঘর্ষণের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। ধূলিতে চোখ বন্ধ হয়ে আসে। পাশের মানুষকেই অষ্পষ্ট দেখায়। ওরা সামান্য এগিয়েই আর এগোতে পারে না।

মাজু বলে- কুনো হানে খাড়ান লাগবো।

কথার সামান্য বুঝে নিয়ে ছেদু বলেÑ এইহানেই গাছের তলে খাড়া ।

ওরা দাড়িয়ে থাকে। কিন্তু বাতাসের বেগ বাড়তে থাকে। এভাবে দাড়িয়ে থাকা ঠিক না। যে কোন সময় গাছ ভেঙ্গে পড়তে পারে। ওরা পাশের গ্রামে ঢুকে। কারো কারো ঘর থেকে আজানের শব্দ শোনা যাচ্ছে। উচ্চকণ্ঠে কেউ কেউ দোয়া ইউনুস পড়ছে।

মাজু বলে- আজগা মনে হয় ঘরডা গেছে।

৫.

মানিক মিয়ার চায়ের দোকানে সকাল থেকেই ভিড়। বিনে পয়সার চা। চুলের উপর বসে সাহেবের ভঙ্গিতে ফুরুত ফুরুত শব্দে চা খাচ্ছে সবাই।। বাজারে বেশ কয়েকটা চায়ের দোকান। চালু দোকানের মধ্যে মানিকের দোকান একটা ।

গাভীর দুধের চা স্বাদই আলাদা। সকালে আশেপাশের গ্রাম থেকে দুধ এসে জড়ো হয় এখানে। বালতিতে বালতিতে করে নিয়ে আসে দু’চার গ্রামের মানুষ। মানিক আজ সকালে দুই মন দুধ কিনেছে। বিকালে বাজারে গিজগিজ করছে মানুষ। দোকান ভরা ক্রেতা। হাত দুটোর এক মিনিট ফুরসৎ নেই। টুংটাং চামচের বাড়ি চলছেই। দোকানের সামনেও একটা টুল পাতা হয়েছে। সেখানে বসে আছে কয়েকজন। মাজু আর ছেদু বাইরের টুলে বসে চায়ের অর্ডার দিয়েছে। সবার মধ্যে সাহেবী ভাব। কনুমিয়া একটু গলা চড়িয়ে বলে- কিরে চা দিবি না নি?

রাহেন রাহেন হইয়া গেছে। কি করমু কন দুইজনে মিল্লা বানাইতাছি। তাও কুলান যাইতাছে না।

কনু গ্রামের নেতা গোছের মানুষ। দু’চার জনের সালাম নিয়ে চলে। তাকে বসিয়ে রেখে অন্যকে চা দেয়া একটু বেয়াদবির সামিল। কিন্তু এখন ইলেকশনের সময়, সবাই এখন চুল ঝাঁকি দিয়ে কলার টেনে সাহেবের দল ভিড়েছে। এখন সবার সমান গুরুত্ব। ইলেকশন মানুষের দাম বাড়ায়। নিজেকে দামী ভাবায়। এসময় আগে পিছে নিয়ে হট্টগোল করা যাবে না। নেতা, পাতি নেতা, চামচা, সাধারণ মানুষকে এখন কিছুদিন এক কাতারে চিন্তা করতে হবে। আর উঠতি বয়সের পোলাপান আর নতুন ভোটারদের খাতিরটাও একটু বেশী দেখাতে হবে। মানিকের দোকানের কাষ্টমার এখন সবাই। সবার সমান অধিকার। পায়ের উপর পা তুলে ঐ মানিককা চা দে এই হুকুম দেবার ক্ষমতা এখন সবার সমান। তাই কনুমিয়ারও ধৈর্য রাখতে হয়। এই সময় গোলমাল করলে লিডারের কাছে পার পাওয়া যাবে না।

একটু পরেই চা আসে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কনু মিয়া বলে- ভোট তোমরার অধিকার। যারে মনে চায় হেরেই দিবা। এইডা নিয়া কোন কওনের নাই। দেইখ্যো ভুল জাগাত দিওনা। কত আর ভুল করবা।

বলে কন ু এদিক ওদিক তাকায়। জনতা চা খায়। আর অতি জ্ঞানীর মত তাকায়। বাইরের টুলে বসে ছেদু আর মাজুও চায়ে চুমুক দেয়।

মাজু আস্তে আস্তে বলে-বাইরে বউনওই বালা হইছে। গাঙ্গের বাতাসডা পাইতাছি ।

রাখ তোর গাঙ্গের বাতাস। ইলেকশনের ফের কিছু বুঝলি।

আমি কি বুঝমু। ইত্তান আমরার বুইঝ্ঝা কাম নাই। ঘরে নি কিছু চাল নিতারি হেইডাই ভাবতাছি।

আমিও কি কম ভাবতাছি। হুন, কনু মিয়া এই বার মতি চেয়ারম্যানের দলে নাই।

কস কি তুই। মতি চেয়ারম্যান পিছ পিছ থাইক্যাইতো হিলা নেতা হইলো।

থাক অহন আর কথা কওনের কাম নাই। কোনডা কইতে কোনডা কবি ।

কনু আরেকবার সবার দিকে তাকিয়ে বলে- চা পাইছনি তোমরা। না পাইলে খুইজ্যা লইয়া খাইবা। আবারও হুইন্যা রাহ। ভোটটা বুইঝা দিও। গাঙ্গের পানিত ফালাইও না।

কনু চলে যেতে গুঞ্জনটা স্পষ্ট হয়ে উঠে। দু’চারজন করে সবাই বলতে থাকে এবার কনু মিয়া মতি মিয়ার বিরুদ্ধে ইলেকশন করবে। এবার সে সার্পোট দেবে নুরু মিয়াকে।

কনু মিয়া চলে যেতে যেতেই কালু মেম্বার আসে। সে এতক্ষণ বাজারেই ছিল বশিরের দোকানে।। বশিরের দোকানেও চলছে চা এর মহোৎসব। কালু মেম্বারকে দেখে দু’একজন নড়ে চড়ে বসে জায়গা দেয়।

কালু মেম্বার বলে- আরে বও, বও, তোমরা চা খাইছনি।

কয়েকটি কণ্ঠ বলে উঠে- হ খাইছি।

ছোকরার মত দুতিন জন বলে উঠে- চা খাইছি কিন্তু পুরি খাই নাই।

কালু মেম্বার হাসে- খাইলে খাইবা ,পুরি খাইবা। মানিককা তোর দোকানে হগলরে দেওয়ার লাহান পুরি হইবনি।

আগে এই গ্রামের বাজারে পুরি পাওয়া যেত না। এখন শহরের মত পুরি সিঙ্গারা চলে। পরিমানে খুব বেশী বানানো হয় না। তবে এখন নির্বাচনের সময়। সিঙ্গারা পুরি বেশীই বানানোর কথা। কিন্তু চা বানানো সামলিয়ে মানিক পুরি খুব বেশী ভাজতে পারেনি। ডালার উপরের পুরিগুলো দেখে মানিক বলে- হইবো। কিছু টান টান। গরম ভাইজা দেই কয়ডা। বানাইতে সময় লাগদো না।

দে তাইলে, গরম গরম পুরি ভাজ।

কালু মেম্বার মনে মনে খুশী হয়। পুরি ভাজার এই সময়টুকুকে যে ভালোভাবেই কিছু কথা ওদের মগজে ঢোকাতে পারবে। আর পুরির লোভে এখন আর কেউ নড়বেও না। আর পুরিই ভালো হয়েছে। চা বোধ হয় নুরু মিয়ার চেলা হইয়া কনুমিয়া খাইয়ে গেছে। কালূ মেম্বার আশেপাশে ভালো করে তাকায় দেখ কারা আছে। না লোক আছে ভালোই। জোয়ান, বুড়া, মধ্যবয়সী, গৃহস্থ ,গোচাষী, কামলা, মিল্লাঝিল্লা মোটামুটি ভালোই একটা মেল সে পেয়েছে।

কালু মেম্বারের কোন কথা বলতে হয় না মুরব্বীর মধ্যে ধলা মিয়া কয়Ñ কি মেম্বর বাতাস দেহি কেমুন কেমুন লাগে।

কেমুন লাগে চাচা।

তুমিই কও দেহি। আমরা আর কি বুঝমু।

বুঝেনা আবার কেডা। আফনেরা আমার থেইক্যা জানেন আরো বেশী। আপনারা বুঝেন দেইখাইতো অহনও এই গেরামে শান্তিতে দুইডা ভাত মুহে লওন যায়।

কেউ কোন কথা বলে না। শুধু ইলেকশনের আবহাওয়া বোঝার চেষ্টা করে।

কালু মেম্বারই আবার বলে-ইলেকশনের সময় কতজনেই বেডাগিরি দেহায়। ইতানে কাম হইতো না। ইতান আমরার দেহা আছে।

দু’একজন নিরবে মাথাটা এদিক ওদিক করে। মানিক মিয়া পুরি ভাজা শেষ করে। পুরি দেবার এত গুলি পিরিচ নাই। কি করবে বুঝে উঠে না।

কালু মেম্বার তাগাদা দেয় -কি মানিককা তোর হইল।

হইছে তো দিমু কেমনে। এতডি পিরিচ তো নাই।

পিরিচ আবার কি টেবিলের উপরে কয়েকটা বাসনে বাসনে দিয়া দে।

কেডা কয়ডা খাইলো হিসাব থাকবনি।

হেইডা দিয়া তুই কি করবি। যার জয়ডা মন লয় খাইবো। তুই তোর হিসাব রাখ।

এভাবে পুরি দিতে দেখে মাজুর চোখ খুশিতে চকচক করে। গরম গরম পুরি সে পেট ভরে খাবে। কেউ তো আর গনবে না কয়টা খেল। মাজু আবার মনে হয় কয়েকটা ঘরের জন্য নিতে পারলে খুব ভাল হত। ময়না খুব খুশি হতো।

মাজু আস্তে করে বলে-ছেদু ও ছেদু কয়ডা পুরি লইয়া লই। বাড়ীত নিতাম।

কস কি? তোরে কি বেহুবে ঠেলা দিছে, মাইনস্যে দেখলে কইবো কি।

ছেদুর কথা শুনে মাজু দমে যায়। সে আরো দুইটা পুরি খায় কিন্তু তার মুখে তেমন মজা লাগে না। সুফিয়া, ময়না তার ছোটছোট বাচ্চাগুলোর জন্য ভেতরটা জ্বলতে থাকে। চা পুরি শেষ করে নদীর পাড় ঘেঁষে বাড়ীর পথ ধরে মাজু আর ছেদু। সূর্য় ডুবেছে কিছুক্ষণ। মেঘনার উপর সন্ধ্যা নেমেছে। অন্ধকারে মেঘনাকে ফাঁকা শূন্য দেখাচ্ছে।

ছেদু একটু দাড়ায়- খাড়া কতদুর। অন্ধকারে দিশ করন যাইতাছেনা। ইটটু পরে চান্নি উঠবো। চান্নির ফরে ফরে যামু।

ছেদুর কথা শুনে মাজু দাড়ায়। তারপর বলে Ñমনডা কেমুন করতাছে বাইত কয়ডা পুরি নিতারলে বালা অইত।

নিস। পরে আরও কত খাওয়াইবো তখন সময় বুইঝা নিস। অহনো দো ইলেকশনের আওবাওই ঠাওর করতারতাছিনাা।

হ সব কেমুন উল্ডাফাল্ডা লাগতাছে।

এইবার ইলিকশনডা জমবোরে। মতি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে নরু মিয়া দাড়াইলে খেইল অইবো একটা।

কেমনে বুঝলি?

বুঝছ না। ইলেকশনের আছে অহনও দুইতিন মাস। অহনই দুনো র্পাটি কেমনে কমোর বাইন্দা লাগছে।

ইলেকশন জমলে তো বালাই ।

সন্ধ্যা গাঢ় হয়েছে। আকাশে চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় নদীর পানি চিক চিক করছে। নদীর পাড়, জমি ,পাড়ের উপরের গাছ চাঁদের আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দুরে তাকালে অস্পষ্ট রেখার মতো গ্রাম চোখে পড়ে । চারদিকে গলে পড়া জোস্নার মায়াবী ঘোলা আলো।মাজু আর ছেদু হাটতে থাকে।

নদীর দিকে তাকিয়ে মাজু বলে -দেখছস গাঙ্গের পানি কেমুন বাড়তাছে।

গত কদিন নদীর পানি অনেক বেড়ে গেছে। আর কয়েকদিন পর নদীর পাড় ধরে আর হাটা যাবে না। ডুবে যাবে নদীর পাড়ের জমি। পাড়ের কাছের জমির মালিকেরা এখনই জমির ঘাস কেটে ফেলছে।

এ নদীর কোন বিশ্বাস সেই। দুতিন দিনেই ভাসিয়ে নিতে পারে পাড়।

এইবার পানি হইবো। অহনই গাঙ্গের যেই ভরা শইল।

বড় পানির সময় তোর উঠানে কি পানি আইছিলো?

না মুন্সীবাড়ীর উঠানটা উচা আছে।

পানি না উঠলে হইবো কি। গাদলা ধরলে ঘরটা নি ডাইব্যা যায়। হেইডা ভাবতাছি। আরও বড় বিপদ হইছে হেদিনের তুফানে ঘরের টুয়াডা এক্কেবারে ছুইটা গেছে। একটু গাদলা হইলেই ঘরের বিতর পানিত ভাইস্যা যাইবো।

আমার ঘরডার একটা ধর্নাও বালা নাই। তোর বাউজে কইততে একটা নিমের ডালা আইন্যা ঠেক দিছে।

মাজুর ঘর গ্রামের সামনের দিকে। ছেদুর ঘর একটু ভেতরে। আসা যাওয়ার পথে মাজুর ঘরটাই আগে পড়ে। বাড়ীর কাছে এসে মাজু বলে- বাইত আয়।

না অহন যামু না রাইত হইয়্যা গেছে। তো যাইগা।

উঠানে চাঁদের আলো গড়াগড়ি খাচ্ছে। সুফিয়া, ময়না, হাফিজা হাবিউল্লা সখিনা সবাই উঠানে। সুফিয়া পিঁড়ি পেতে বসে আছে। ময়না ঘরের কোনাকুনি পিছন ফিরে পুঁইশাকের গাছে কি করছে। বাকী তিনটা বাচ্চা খেলছে। মাজু উঠানে দাড়ায়। বাচ্চাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে- আবদুইদা দুইডা কই?

ঘরে ঘুমাইছে।

বাপের গলার আওয়াজ পেয়ে ঘুরে তাকায় ময়না । দৌড়ে আসে মাজুর একটা হাত ধরে বলে-

বা -জান।

কি মা, কি করতাছো।

গাছ বানতাছি।

এমুন নিশি রাইতে কেউ গাছ বানধে।

ময়না বাপের হাত ছেড়ে দৌড়ে ঘরে ঢোকে ফিরে আসে একটা পুরা হাতে।

পুরার ভিতর কয়েকটা কাঠাল বিচি ভাজা। পুরাটা বাপের হাতে দেয়। ভাজা কাঠাল বিচি দেখে মাজু চোখে পানি এসে পড়ে। ভাল করে ময়নার দিকে তাকায়। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট হয়ে আছে ময়নার মুখ। কালো মুখে জ্বলজ্বলে চোখ। ঘাড় থেকে একটু বাঁকানো মাথাটা। ঝোলানো ঠোঁটের হাসি। ঠোঁটের পাশ দিয়ে বের হওয়া লালা। মাথার দুপাশে ঝোলানো কলা বেনী। কানের ঠিক দু’পাশে ফিতার দুটো ফুল।

বা-জান হাও ।

বুক ভেঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয় মাজুর – হ খাইতাছি।

সুফিয়া বলে- বাপের হোয়াইদা ঝি আর কাউরে দেয় নাই। বাপের লাইগ্যা রাইখ্যা দিছে।

মাজুর চোখ আবার ভিজে উঠে। মেয়েটা তাকে খুব ভালোবাসে। তার আরো তিনটি মেয়ে আছে। তারপরও এই মেয়ের জন্য তার বুকটাও সবসময় খা খা করে। তার জীবনের প্রথম সন্তাব কেন যে আল্লায় কোল ভরাইয়াও তার বুকটায় এমন পাহাড় বসাইয়া দিলো।

মাজু কয়েকটা কাঠালের বিচি ময়নাকে সাধে।

আমি হাই-ছি।

মাজু কয়েকটা বিচি সুফিয়ার দিকে এগিয়ে বলে -খাইবানি।

লাগদোনা। আমি খাইছি।

খাওয়া শেষ করে মাজু সুফিয়ার দিকে পুরাটা এগিয়ে দেয়-ফুরাডা লও । কাডালের হালি পাইলা কই?

আম্মায়ই কয়ডা দিছিলো।

আমানউল্লাহ মুন্সির স্ত্রীকে সুফিয়া আম্মা ডাকে। আর বাচ্চারা নানী ডাকে। আমানউল্লার ভিটাতে থাকে বলে সুফিয়া ঐ বাড়ীর অনেক কাজ করে। বাড়ীর সবাই সুফিয়াকে ভালোই জানে। বাচ্চাদের জন্য এটা সেটা দেয়। মৌসুমী কাঠাল বিচি খেতে খেতে মাজুর আবার দুইটা পুরির জন্য বুকটা জ্বলে। পুরি দুইডা পাইলে বাচ্চাডি কত খুশি হত।

৬.

আষাঢ়ের আগেই বৃষ্টির ঢল নামে। যেন ধুয়ে নিয়ে যাবে পৃথিবী। নদীর পেট ফুলে দুকুল ছাপিয়ে গেছে। জমিতে পানি এসেছে। হু হু করে বাড়ছে পানি। সকাল থেকে বৃষ্টি নেমেছে। মাজু ঘরের ভেতর থেকে তাকিয়ে থাকে উঠানের দিকে। ঘন বৃষ্টিতে দৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে আসে। ঘরের ভেতর বিভিন্ন জায়গায় মালশা, খুড়া, বালতি দিয়ে রেখেছে সুফিয়া। সেদিনের ঝড়ে তার ঘর উড়ে না গেলেও টুয়া একেবারে খুলে গেছে। সারা ঘরেই পানি পড়ে। মেঝে ভিজে থকথকে হয়ে গেছে। কোলের বাচ্চাটা চৌকির এক কোনে ঘুমাচ্ছে। বৃষ্টির পানি চুঁইয়ে দুফোটা গায়ে পড়তেই শরীর মোচড় দিয়ে কেদে উঠে।

সুফিয়া বাচ্চাটাকে টান দিয়ে একটু সরায়- ছুকাইয়াড়ার কপাল বেরাইয়া পানি পড়তাছে। ডরে ছুইকাডা নাই।

সরাইয়া দেও না।

সরাইয়া নিব কই। কোন হানে কি পানি পরনের হুব আছে। এই গাদলা যাইব কেমনে।

মাজু ও বসে বসে তাই ভাবছিলো এই বর্ষা সে কি করে পার করবে। ঘরের ভেতরের প্রায় সব জায়গায় পানি পড়ে। এইসব খুড়া গামলা বালতিতে এ পানি সামাল দেয়ার মত নয়। বাচ্চাগুলো সব আধা ভিজা হয়ে বসে আসে। বৃষ্টির ছাট ঘরের কাথা বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে। মাটির মেঝে পুরাটাই কাদাকাদা। বাইরে বের হওয়া দরকার কিন্তু ঘরে একটা ভালো ছাতাও নাই। ছাতাটা এত ভেঙ্গে গেছে যে এটা দিয়ে কোনভাবেই মাথাটাও বাচানো যাবেনা। ছাতাটা ঠিক করা দরকার। কিন্তু বছর বছর মেরামত করাতে এটা এখন এমন হয়েছে যে মেরামত করাও মনে হয় আর সম্ভব হবে না। তারপরও বৃষ্টিটা একটু ধরলে ছাতাটা নিয়ে যেতে হবে। কোন রকম যদি মাথাটা বাচানো যায়। বৃষিট পড়তেই থাকে। মাজু বসে থাকে। তার এখনি বাইরে যাওয়া খুবই প্রয়োজন ।

অপেক্ষা করে করে এসময় সে বলে- ময়না, দেহছেন একটা সারে কাগজ আছেনি।

ময়না খুজে খুজে বাপের হাতে একটা পলিথিনেরর কাগজ তুলে দেয়।

দুপুরে রোদের চেহারা দেখা যায়। মনটা একটু খুশী খুশী লাগে মাজুর। রোদটা যদি একটু তাতানো হয় তবে ঘরটা একটু শুকাবে। রোদ দেখে সুফিয়াও উঠে বসে। রান্না ঘরের চুলাটা একেবারে ভিজে গেছে। এই চুলায় আগুন ধরানো সহজ হবে না। আজ দুপুরের রান্না আমানউল্লাহর রান্না ঘরেই সারতে হবে। কাদা কাদা ঘরটা লেপে সমান করতে হবে। কাথাগুলোও রোদে মেলে দিতে হবে। এই রোদেরও কোন ভরসা নেই কখন আবার ডুব মারে কে জানে।

ঘরের পাশে ছোট্র গর্তের মধ্যে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে দুইটা হাঁস শরীর ডুবাচ্ছে। অল্প পানি ঠিকমতো শরীর ডুবে না। আনন্দে ওরা কাদায় মাখামাখি করছে। ময়না একটা ইটের ওপর আরেকটা ইট দিয়ে শামুক ভাঙ্গছে। কয়েকটা শামুক বেশ বড়। নতুন পানিতে এ শামুকগুলো ভেসে এসেছে। হাঁস দুইটা সুফিয়ার হলেও ওদের সব যতœ ময়নাই করে। ভাঙ্গা শামুকগুলো ছড়িয়ে দিলে হাঁসগুলো দৌড়ে এসে গদগদ আওয়াজ তুলে খায়। কাত মাথাটা আরো কাত করে হাসে মেয়েটা। চেখেমুখে ছড়িয়ে থাকে তৃপ্তি আর আনন্দ।

সেদিকে তাকিয়ে বলে সুফিয়া-সামনের হাঠে হাস দুইডা বেইচ্যা লাইও।

হাঁসগুলোর মাত্র শরীর হওয়া শুরু হয়েছে। আরো এক-দু মাস পরে কার্তিক অগ্রহায়ণে শরীরে তেল হবে। শীতের দিনে তেলওয়ালা হাসের ভালো চাহিদা। তখন ভালো দামে বেচা যায়।

ঠান্ডার দিন আইলে বালা দামে বেচন যাইবো।

বালা দামের লাইগ্যা রাহন যাইতো না। ছেরিডা হুদা ফাড়া জামা পিন্দা থাহে। লাসে যেমুন তরতরাইয়া বাড়তাছে। এমুন আবিয়্যাইত্তা জোয়ান মাইয়্যা এমুন তেনা পিন্দা থাহেনি।। মাইষসে কি কয় ।

মাজু কথা বলে না। ময়নার জামাগুলো সত্যি একেবারে গায়ে দেবার অনুপযুক্ত হয়ে গেছে।

বিকেলে মাজু ভাঙ্গা ছাতাটা নিয়ে বাজারের দিকে রওয়ানা হয়। ছাতাটা একটু সারাতেই হবে। মাঝে মাঝে অন্তত বাজারে তো যাওয়া আসা করা যাবে। পুরোনো পঞ্জের সেন্ডেল জোড়া পায়ে ঢুকিয়ে কোনাকুনি সড়ক ধরে হাটে। এখন আর নদীর পার ধরে যাওয়ার কোন উপায় নেই। নদীর পাড়ে পানি আর কাদা। জমিতে পানি আসছে তবে এদিকের জমিগুলোতে এখন পানি ঢুকে নাই। এই আমনের ধানগাছ কদিন পরে লাফিয়ে লফিয়ে বাড়বে। পানিও বাড়বে। ধান গাছও বাড়বে। ধানগাছের এই বেড়ে উঠা দেখতে মাজুর খুব ভালো লাগে। ধানগাছগুলো কেমন যুদ্ধ করে পানির সাথে। যুদ্ধ কি তারও কম। ধানগাছ তো এক মৌসুমে যুদ্ধ করে আর তার যুদ্ধ সারা বছর,সারাদিন । ক্ষেতের আইল ধরে আগানো যাবে না। জমিতে এখন কাদাপানি। সড়ক ধরেই আগায় মাজু। ক্ষেতের দিকে চোখ রাখতে ছেদুর সাথে দেখা হয়।

ছেদু একটু জোরে হাক দেয়- মাজু ও.. যাস কই।

ছেদুর দিকে তাকিয়ে জোরে বলে-বাজারো যাই। যাইবানি।

খাড়াও।

ক্ষেতের মাঝে থেকে ধীরে ধীরে সড়কে উঠে আসে ছেদু । পানিতে ছেদুর পায়ের পাতা গোড়ালীর উপর পর্যন্ত ভেজা।

লুঙ্গির কোচা খুলে একটা নাড়া দিয়ে আবার লুঙ্গি বাধে ছেদু । তারপর বলে-আমারও বাজারের যাওনের কাম। তোর এহানেই যামু ভাবছিলাম।

তারপর মাজুর দিকে ভালো করে তাকিয়ে বলে- তোর কেতকুতির তলে কি?

মাজু ভাঙ্গা ছাতাটা বগলের তলায় থেকে বের করে বলে- ছাত্তি।

ছাতিটা দেখে হঠাৎ খুব হাসি পায় ছেদুর।

সে হাসতে হাসতে বলে -এইডা ছাত্তি কস কি। আমি তো কই ছেড়া পোটলা লইয়া তুই যাস কই।

ছেদুর হাসিতে মাজু অপ্রস্তুত হয়ে যায় তার একটু লজ্জাও লাগে। ছাতিটা আসলেই অনেক বেশী ভেঙ্গে গেছে। এটাকে ভাঙ্গা চোরা ফাল্যাইনা জিনিষ বলেই মনে হয়।

ছেদু হাসি থামিয়ে বলে- হ এইবারের গাদলায় মনে হয় আর বাচন নাই। তোর বাউজ তো খালি কয় মাডি ডাইব্যা ঘরনি ড্যাইবা যায়। একবার ডাবলে বুঝ সরাইতে কতলা লাগবো।

মাজু কিছু বলে না। তার ভাঙ্গা ঘরের কাহিনী ছেদুর পাটে পাটে জানা। তার ঘরের সব ছেদু জানে। কোন বেলায় কি খায় তাও তারা জানে। নতুন করে আর কি বলবে। শুধু দুঃখ দুঃখ কথা এসময় শুনতেও বিরক্ত লাগে। বন্ধুত্ব যত গভীর হোক। যতই একে অপরকে বুঝুক তারপরও সবসময় অভাবের কথা ভালো লাগে না। অভাবের কথায় আসলে কোন রস নেই।

বাজারে দোকানে দোকানে বর্ষার আমেজে এখনও চলছে ইলেকশনের চা। বর্ষাটা গেলেই ইলেকশনের তারিখ পড়বে। তার এখনো দু’মাস বাকি। কিন্তু গত এক মাস ধরেই দোকানে চা চলছে। এবারের ইলেকশনটা অন্যরকম। ইলেকশন নিয়ে কথাবার্তা চলছে কয়েকমাস ধরে। সম্ভাব্য প্রার্থী মতি মিয়া আর নুরু মিয়া শক্ত প্রার্থী। মতি মিয়া পরপর চারবারের চেয়ারম্যান। তার সাঙ্গ পাঙ্গর কমতি নেই।

নুরু মিয়ার বাড়ীর সাথে আত্মীয়তায় সম্পর্ক এক ডাটসাইটে মন্ত্রীর। কারো জোর কারও চেয়ে কম না। টাকা উড়ানোর জোরও তাই বেশী। আর এই টাকা উড়ানোয় গ্রামবাসীর উৎসাহও বেশী।

ইলেকশনের সময় বাতাসে যদি কিছু টাকাই না উড়লো,যদি টাকার খেলাই না হলো তবে আর কিসের ইলেকশন।

মাজু তার ভাঙ্গা ছাতাটা নিয়ে লেচুর কাছে যায়। বাজারের এক কোনে বসে লেচু। আগে লেচু এসময় শুধু ছাতাই সারাতো। বর্ষাকালে তার ভালই আয় হতো। এখন মানুষ আর খুব বেশী ছাতা সারায় না। গ্রামে শিকের বড় ছাতার চল এখনো রয়েছে। টুকটাক সমস্যা হলে সারায়ও কিন্তু গ্রামের মানুষের অবস্থা আগের মত নেই। ঘরে ঘরেই এখন কেউ না কেউ বিদেশ থাকে। তাদের হাতে কাঁচা টাকা আসে। তারা এখন আর ছাতি সারানোর জন্য বসে থাকে না। সমস্যা হলে নতুন ছাতি কিনে ।

লেচু ছাতিটা হাতে নিয়ে বলে- এক্কেবারে ভাইঙ্গা গেছে। ঠিক করন যাইতোনা।

দেহ যতদুর হয়।

ছাতি সারাতে দিয়ে এক দোকানে বসে মাজু আর ছেদু চা খায়। মাজু কথা বলে না মনটা তার ভার হয়ে আছে। এবারের গাদলা তাকে ঠিক ঠিক খোলা আকাশের নিচে বসিয়ে দিবে।

৭.

নদীর পানি ক্ষেত ডুবিয়ে বাড়ির উঠানের কোনায় এসে দাড়িয়েছে। আর কয়েকদিন বাড়লে উঠান ডুবিয়ে দেবে। মাজু উঠানের কাছে দাড়িয়ে পানি দেখে। বাশের খুটায় আমানউল্লার ছোট্ট নৌকা বাধা। এসময় আনেকের বাড়ির কোনাতেই বাধা থাকে এরকম ছোট নৌকা। যাদের বাড়ির মাঝে জমি পার হয়ে সড়কে উঠতে হয় তাদের তো নৌকা ছাড়া গতিই নাই। আমানউল্লার বাড়ি থেকে অবশ্য সড়কে উঠা যায়। নৌকা না হলেও চলে। তবু বর্ষাকালে এই নৌকাটা খুটার সাথে বেধে রাখা হয়। বাড়ীর পোলাপান নৌকার বসে কম পানিতে অনেক সময় মাছ ধরে। নদী ভেসে আশেপাশের গাতায় অনেক মাছ এসেছে। নতুন পানি পেয়ে মাছগুলো লাফায়। অল্প পানিতে মাছ ধরতে সুবিধা। মাজু ও কয়টা মাছ ধরার কথা ভাবে। ভাবতে ভাবতে দেখে পুব কোন দিয়ে বড় বড় ধইনচা গাছের পাশ দিয়ে একটা নৌকা আসছে।

মাজু নিজে নিজেই বলে-অহন আবার নাও লইয়া কেডা আইতাছে।

ধীরে ধীরে লোকগুলি স্পষ্ট হয় নৌকায় চেয়ারম্যান মতি মিয়া, পুব পাড়ার সিদ্দিক, তনু আর ছেদু।

চেয়ারম্যানকে আসতে দেখে মাজু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকে। তারপর ঘরে গিয়ে ছেড়া গেঞ্জিটা পরে আসে।

নৌকা এসে লাগে মাজুর ঘরের কোনার দিকে। মাজু হাত তুলে সালাম দেয়

কি মাজু কেমুন আছস।

আছি কুনো রহম। গাদলার দিন আমরার আর থাহা।

চেয়ারম্যান উঠানে দাড়ায় না। হেটে যেতে থাকে আমানউল্লার ঘর বরাবর। চেয়ারম্যানের গলার আওয়াজ পেয়ে আমানউল্লাহ ঘর থেকে বের হয়ে উঠানে নেমে আসে।

স্লামালুকুম চেয়ারম্যান সাব।

ওয়াইকুম আস সালাম বলে মতি মিয়া আমানউল্লার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।

ঘরে আয়েন।

চেয়ারম্যান দাড়িয়ে থাকে- অহন ঘরে যামু না। সময় কম। আরও কয়হানে যামু। আছো তো ভালাই।

হ আছি আফনের দোয়ায়।

আমানউল্লার বাজারে কাঠের ব্যবসা আছে। এই ব্যবসার সূচনায় মতিমিয়ার কিছু অবদান আছে। সেজন্য আমানউল্লাহ বরাবরই মতির লোক। তবে ইলেকশনের সময় অনেক সময় কাছের লোকও বেঈমানী করে। তাই তাদের মতটা আর মনটা আরেকবার ঝালাই দিতে হয়। মতি মিয়া ঝানু লোক। কাছের মনে করে কারো সাথেই সে যোগাযোগে গাফিলতি করে না। সেজন্যই আমানউল্লার বাড়িতে আগমন।

ইলেকশনতো আইস্যা পড়লো। তুমি আমার নিজের মানুষ আর কি কমু। নূরু মিয়া একটু বেডা গিরি দেহাইতোছে দেহাক। তোমরার আর কিছু জানার বাহি নাই। এই গেরামের লাইগ্যা কি করছি। নতুন কইরা আর কি কমু।

আফনে নিশ্চিন্ত থাহেন। আমানউল্লারা হেই রহমের মানুষ না। লোক চিননাই ভোট দেয়।

তোমার ব্যাপারে আমার কুনো কউনের নাই। এইডা ভালা কইরাই জানি তুমি যে আমার লোক।। বুঝইতো শত্রু শত্রুই হেরে ছোড কইরা দেহন ঠিক না।

আমানউল্লাহ চা-নাস্তার জন্য সাধাসাধি করে। মতি মিয়া দাড়ায় না। আবার আসবে বলে নৌকার দিকে আগায়। দু এক কদম সামনে এসে মাজুর ঘরের সামনে দাড়ায়। মাজু সেই তখন থেকে মতি মিয়ার পিছনেই বিগলিত হয়ে দাড়িয়ে আছে।

ঘরটার দিকে তাকিয়ে বলে-তোর ঘরডার দশাদো দেহি খুবই খারাফ। শেখুর ঘরডারও এই অবস্থা। দেহি এইবার তরার লাইগ্যা কিছু করন যায়নি।

ছেদু আর মাজু দুজনেই কোন কথা বলে না চেয়ারম্যানের দিকে গদগদ হয়ে তাকায়।

মতিমিয়া আর দাড়ায় না নৌকায় উঠে।

ছেদু আর মাজুর ঘর নেই, জমি নেই ওদের নির্বাচন করা আর না করা এক কথা। তবে নির্বাচনের সময় ওদের দাম কিছুটা বাড়ে। দুজনেই অসুরের মত খাটতে পারে। ওদের গতরের এই দামটা ইলেকশনের সময় পাওয়া যায়। নির্বাচনে ওরা খাটনি দেয়। তার বিনিময়ে কয়েকদিন একটু ভালমন্দ খায়। ঘরে দু’চারটা পয়সা আনে। ওরা প্রতিবার মতি মিয়ার ইলেকশান করে। মতি মিয়ার ইলেকশন করার কারণ হলো পরের ভিটার এ ঘরটুকু বেধে থাকার পিছনে মতিমিয়ার সুপারিশ আছে। মতিমিয়ার সুপারিশেই আমানউল্লা আর সোনামিয়া তাদের ভিটের এক কোনে তাদেরকে ঠাই দিয়েছে। তাছাড়া মতিমিয়া প্রভাবশালী লোক। চার চারবারের চেয়ারম্যান। ওরা খড়কুটোর মত ভেসে চলা মানুষ। তাদের জোর নেই, মত নেই, ন্যায়-অন্যায়ের বোধও নেই। ওরা শুধু জানে ওরা নদী ভাঙ্গা মানুষ, ভেসে থাকা মানুষ। তাদের মাটি নেই ,তাদের কোন শিকড়ও নেই।

৮.

নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। পাড় ঘেঁষা বাড়ীগুলো মানুষগুলো রাতে ঘুমায় না। যে কোন সময় ভিটা চলে যেতে পারে রাক্ষসী নদীর থাবায়। পালা করে তারা রাত্রি জাগে। দিন পাচেক আগে সরকার বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। ঘরের পিছনের গাতায় নৌকা লাগিয়ে নিয়ে গেছে সব। পুব পাড়ার জয়নাল মিয়ার বাড়িতেও ডাকাত এসেছিলো গেল বারের আগের দিন। ডাকাতির ভয়ে গ্রামের ভেতরে জোয়ানরা এখন রাত জাগে।

আকাশটা সন্ধ্যা থেকে থম ধরে আছে। গত কদিন ধরেই এমন হচ্ছে। মনে হয় বৃষ্টি হবে, বৃষ্টি হয় না, কিন্তু পানি বাড়ে। মাজু উঠানে পানি উঠতে এখনও বাকী আছে। তারপরও সারারাত দুচোখ এক হয় না। রাতভর এপাশ ওপাশ করে। যদি একবার আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামে তবে সব ভেসে যাবে। আর ঘরটা কোনভাবেই রক্ষা করা যাবে না।

পাড়ের কাছের মানুষেরা কিছুক্ষণ পর পর আওয়াজ তোলে। গ্রামের ভেতর থেকেও আওয়াজ ভেসে আসে। এই আওয়াজ বুঝিয়ে দেয় মানুষ জেগে আছে। মনু মিয়ার ছেলের গলাটা খুব মিষ্টি। রাতে কয়েকজন মিলে গোল করে বসে ওর গান শোনে। ঘরের ভেতর শুয়ে থেকে মাজু কানে আসে গানের সুর। রাত কয়টা বাজে বোঝা যায় না। ভেতরটা তার আনচান করতেই থাকে। দরজা খুলে মাজু বাইরে দাড়ায়। বাতাস নেই। পুরোটা গ্রাম থমথম করছে। ঘরে ঘরে মানুষ জেগে আছে। নদী ভাঙ্গনের ভয়,ডাকাতের ভয়,পানিতে ঘর ডুবে যাবার ভয়।

উঠানে দাড়িয়ে মাজু জোরে একটা নিশ্বাস নেয়। মন দিয়ে গানের কথা শোনে। মনু মিয়ার ছেলেটা গলা ছেড়ে গাইছে -এই যে দুনিয়া কিসের লাগিয়া রাতের বাতাসে সুর ছড়িয়ে পড়ে। সুরটা খুব ভালো লাগে মাজু । উঠানে দাড়িয়ে পানির দিকে তাকায়। তাকিয়েই থাকে। পানিটাও মনে হয় থম মেরে আছে। গতকালের জায়গাতে স্থির। পেটের ভেতর থেকে বুক পর্যন্ত একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে বুক কাঁপিয়ে বের হয়ে যায়। এ দুনিয়ার এই মাজুদের কি কাম। কেন তারা আইলো আর এই রাইত জাইগ্যা ঘর পাহাড়া দেওন। এই ঘর,এই আকাশ,এই মাটি আল্লা কেন বানাইছে, কেন?

৯.

শেষ মুহুর্তে নদী নরম হয়েছে, পানি টান দিয়েছে। তিনদিন ধরে পানি নামছে । মানুষের ভেতরের চাপ একটু কমেছে। সড়কের উপর জমে থাকা মানুষের একটাই কথা- আল্লার রহমত নাইম্যা আইছে।

টান দেয়া পানিতে মাছ ধরতে ছেদু আর মাজু সকাল থেকেই নালার পাশে চাই পেতে রেখেছে। কয়টা মাছ যদি পাওয়া যায়। উঠান ঝাড়- দিয়ে সুফিয়া পাতা জমাচ্ছিল। এবারে বৃষ্টির কারণে জ্বালানির কমতি হয়েছে। ঘরে সামান্য কিছু পাটখড়ি ছাড়া আর তেমন কিছুই নেই। ধইনচা কাটতে এখন এক -দুইমাস। এসময় বুঝে শুনে লাকড়ি জ্বালাতে হবে।

ঝাড়ু দিয়ে পাতাগুলো জমিয়ে সুফিয়া গলা উচিয়ে বলে- ময়মুনা পাতিডা আন। আর পিছদোরে থেইক্যা পাহালের কাছে কয়ডা হোলা নে, দুইডা লেয়ুনও নিস।

পুইগাছটা মোটাতাজা হয়ে লকলকিয়ে চালের উপর উঠেছে। গোড়ায় উঠছে আরো কয়টা গাছ। ময়না গাছগুলোর গোড়ার মাটি আলগা করে গাছের আগাছাগুলো উপড়ে ফেলছিল। হাতে তার একটা কাচি।

মার ডাকে উঠে যায়। সুফিয়া আবার বলে-মানুডার আওয়ের কোন খবর আছে। অহনও মাছ ধরতাছে। খাইবো কহন।

বেলা মাথার উপরে থেকে হেলে যাচ্ছে। মাজু কয়েকটা নলা মাছ নিয়ে রান্নাঘরের মাটিতে ঢেলে বলে- না, মাছ নাই। থাকবো কইততে। সারাদিন মাছ ধরনের কোন হুব আছে।

সুফিয়া কথা বলে না। মাছ কাটার আয়োজন করে।

মাজু একা একাই বলে- আর কয়দিন ইলেকশন আইয়া পড়ছে। মতিমিয়া কইছে এইবার আমার অবস্থা ফিরাইয়া দিব।

ইলেকশনের পয়সার জনম যাইবো আরকি। ঘরে পাছতলা বিল্ডিং উঠবো।

মাজু চুপ মেরে যায়। ইলেকশনের সময় দু’চার পয়সা পায় সত্যি। কিন্তু সে আর কয় টাকা। সংসারের হা করা মুখ কোন ভাবেই ভরানো যাবে না। কত কিছু যে দরকার। চেয়ারম্যান ঘরটার কথা বলেছে। যদি ঘরটা ঠিকমত খাড়া করে দেয় তাহলেও খুব বড় উপকার হবে।

পানি আর একটু কমে গেলেই ইলেকশনের তারিখ পড়বে। তখন অবশ্য মাজুর ভাল খাটনি দিতে হবে। সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি নানা ধরনের কাজ করতে হবে। সে সব কাজের কোন আগা মাথা নেই। তবে এবার একটা সমস্যাও দেখা দিয়েছে। সব জায়গায় কানা ঘুষা চলছে মতিমিয়ার বাজার এবার ভালো না। নূরু মিয়াই নাকি এবার জিতে যাবে। এবারের টার্মে চেয়ারম্যান খুব বেশি অনাচার করেছে। গ্রামে তার সাঙ্গপাঙ্গদের জন্য কথাই বলা যায় না। মতি মিয়া না জিতলে আবার মাজুর খুব সমস্যা হবে। বিপক্ষ পার্টি ভিটে আছে কি না তা দেখবে না। সোজা ঘরটা ভেঙ্গে দিয়ে যাবে। নূরু মিয়ার হয়ে ইলেকশন করবে তারও কোন উপায় নেই। মাজু আর ছেদু মতি মিয়ার কাছে বান্ধা। মরলেও মতি মিয়ার ইলেকশানই করতে হবে।

পানি ভালই টান দিয়েছে। প্রতিদিনই কমছে। বাড়ীর পাশের গর্ত থেকে পানি এখনো সরেনি। তবে দিন পাচেকের মধ্যেই সরে যাবে। ক্ষেতের পানি কমতে অবশ্য লাগবে আর দিন বিশেক ইলেকশনও এখন জমে উঠেছে। মাজু আর ছেদু প্রতিদিনই মতি মিয়ার ক্যাম্পেইন করে। আগ পাছের নানা কাজ করে। তবে গ্রামে ধুয়া উঠে গেছে। এবার মতিমিয়ার বেইল নাই। মাজু আর ছেদু ুও বুঝে এবার হাওয়া অন্য দিকে।

ইলেকশনের কাজ সেরে রাতে সড়ক ধরে ঘরে ফিরে ছেদু আর মাজু। চেয়ারম্যানের বাড়ী দুইগ্রাম পড়ে। ক্ষেত দিয়ে কোনাকুনি আসলে পথ অনেক কমে। কিন্তু ক্ষেতে এখনও কাদা পানি আছে। সড়ক ধরেই আসতে হয়। হিজলতলীর মোচড়াটায় এসে থামে দুজন। এখানে এসে সড়কটা দুদিকে দুটো শাখা টেনে দিয়েছে বাদিকে গেলে সোনার কান্দি আর ডানদিকে গেলে দুলার পাড়। তিন রাস্তার দুপাশে ক্ষেত আর ক্ষেত। প্রশস্ত সড়কের উপর দাড়িয়ে আছে দুটি মেড্ডা আর শিশু গাছ। ঘন ছায়া আর উদ্দাম বাতাস যেন পথিককে ডাকে এখানে থেমে যেতে।

বাতাসকে আড়াল করে বিড়ি ধরায় ছেদু। মাজুরটায় আগুন দেয় তারপর বলে- এইবারে মনে হয় চেয়ারম্যানে পারতোনারে। নূরু মিয়াই আইয়া পারবো।

হেমনইতো মনে হয়। আমরা আর কি করমু। যা করনের করতাছি।

মতি মিয়া না টিকলে দেখবি খবর হইবো।

খবর আর কি? কি করবো। আমরার কি দোষ। কয়দিন বেডাগিরি দেহাইবো আর কি।

কথাটা ঠিক ওদের আছেই কি নেবেই কি। ছেদু চুপ করে থাকে।

একটু পরে আবার বলে -মতিমিয়ার রহমসহমও বালা ঠেকতাছে না।

কেন কি হইছে।

দেহছ না কেমন কুত্তা খাইয়া লাগছে। আমার তো ডরই করতাছে।

মাজু কথা বলে না। সে এসব এতো ভালো বুঝে না। এসব ক্ষেত্রে ছেদুই তার ভরসা। তবে ইলেকশনটা যে এবার আসলেই ম্যারপ্যাঁচের খেলা হয়ে উঠেছে। তা সে বুঝতে পারে । সামনে কি হবে বলা মুশকিল। কিন্তু দুই পার্টিই মুখোমুখি। একজন আরেকজনকে হারিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে।

এ পথে গ্রামে ঢুকলে প্রথমে ছেদুর ঘর পড়ে। ছেদু চলে গেলে মাজু একা একা হাটে। ভিতরটা তার কেমন আনচান করে উঠে। যেন কি একটা উলট পালট হয়ে যাচ্ছে।

১০.

কথাটা একেবারে মুখে মুখেই ছড়িয়ে পড়লো। এবার মতিমিয়ার ফিল্ড খুব খারাপ। মতি মিয়াও দু’দিন ধরে খুব ছোটাছুটি করছে কিন্তু মানুষের কাছে তেমন সাড়া পাচ্ছে না। উপরে উপরে অনেকেই ভাব দেখালেও বোঝা যাচ্ছে এবার ভোট পড়বে নূরু মিয়ার বাক্সেই। ভোটেরও আর খুব বেশী দিন নেই।

মতিমিয়ার কাচারী ঘরে এতক্ষণ লোক ছিল। ছেদু আর মাজু আপ্যায়ন নিয়ে ব্যস্ত ছিল।

সবাই চলে গেল সব গুছিয়ে ওরা যায়। সাধারণত রাত তাই বেশী হয়। ঘর ফাকা হলে মাজু আর ছেদুুকে ডাকে মতি মিয়া তাদের দিকে তাকিয়ে বলে-

তোরা তো খুব খাটাতাছস। মাইনষে কি কয় হুনছ কিছু।

ওরা কথা বলেনা।

মতি মিয়া আবার বলে- মাজু তোর না একটা ব্যাহা মাইয়্যা আছে।

ব্যাহা না কতা কইতে পারে। জšে§র সময় দোষ পড়ছিলো

ঐ তো এক কতাই। তা মাইয়াডা সেয়ানা হইছে না। বিয়ার কথা কি ভাবছস।

এই মাইয়্যা কেডা বিয়া করবো। আর করলেও যতলা চাইবো আমি দিমু কইততে।

হ, অহন তো ভালা মাইয়্যাই বিয়া দেখন যায়না ব্যাহারে কেডা নিব। কিন্তু মাইয়্যাডাতো ডাঙ্গর হইছে কুনদিন কুনো কলঙ্ক হইলে সামলাইবি কেমনে।

চেয়ারম্যান সাব মাইয়্যাডার আমার স্বভাব বালা।

তোর মাইয়্যা এ না বালা গেরামের শয়তান পোলারা কি বালা নি।

মাজু কথা বলে না। নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে।

মতি মিয়া আবার বলে-

তোরা হইলি আমার মানুষ তোরার সব বালা বুড়া আমারই দেহন লাগে।

চেয়ারম্যান বাড়ী থেকে বের হয়ে মাজু আর ছেদু হাটে। আকাশে চাদের কোন কনাও নেই। আমাবশ্যা নাকি মেঘে ঢাকা আকাশ। গাছের পাতার আওয়াজ শোনা যায়। অন্ধকারেই বোঝা যায় প্তাা আর শাখা হেলে দুলে ছন্দ তুলে বাতাস বইছে। খুব আরামের বাতাস। কিন্তু বাতাসে মাজু শরীর কাটা দিয়ে উঠে।

মাজু একটু জোরে বলে-ছেদু এত আন্ধ্যার ক্যান। লাইটটা একটু টিপ দে দেহি।

ছেদু হাতের টর্চ টিপে আলো ফেলে। চারিদিকে শুনশান নীরব। ক্ষেতের পর ক্ষেত। তিন দিকে নিরবে নেমে গেছে তিনটা মোঠো পথ। সড়কের পাশ ঘেষে তিনটা ক্ষেত পরে মাঠের মধ্যে ভিটা জাগিয়ে বানানো নতুন একটা ঘর দাড়িয়ে আছে নিসঙ্গ। টর্চের এক ঝলক আলোয় নতুন ঘরের চালাটা চকচক করে উঠে। জ্বলে উঠা ফিরতি আলোটা এসে সাৎ করে লাগে মাজুর বুকে।

মাজু বলে- ছেদু আমার কেমুন ডর করতাছে।

ঘরে ফিরে ময়নাকে খোজে মাজু। বেশ কদিন ধরে রাত করে ঘরে ফেরায়

মেয়ের সাথে তার দেখা হয় না। মেয়েটা ঘাড় কাত করে মুখটা একটু হা করে ঘুমিয়ে আছে।। নিষ্পাপ একটা মুখ। ঘুমানো মেয়েটাকে এখন অনেক বাচ্চা দেখাচ্ছে।

ময়নায় ঘুমাইছে কহন?

এতক্ষণ বাট চাইয়া এই ইটটু আগে ঘুমাইছে।

ভাত খাইছে নি?

না কয়দিন ধইরাই বাপে আইলে খাইবো কইয়া ঘুমাইয়া যায়।

মাজু মেয়ের গায়ে হাত দিয়ে ঝাকি দেয়- মা ময়না দুইডা খাইবা না।

ময়না হু বলে আবার পাশ ফিরে শোয়।

১১.

ইলেকশনের আর মাত্র ১০দিন বাকী। নির্বাচনী প্রচারণায় উš§াদ হয়ে উঠেছে দু’পক্ষ। মতিমিয়াকে দুুিদন ধরে বেশ গম্ভীর দেখা যাচ্ছে। ইলেকশন দিনদিন জটিল অবস্থা ধারণ করছে। মতিমিয়ার পায়ের নীচ থেকে মাটি মনে হয় সরেই গেল। সন্ধ্যার পর থেকে মতিমিয়াকে বেশ অস্থির দেখায় কয়েকবার ঘর আর উঠানে পায়চারি করে। তারপর ঘরে এসে সিগারেট ধরায়। দুটা টান দিয়ে বলে-তোরা যাওনের আগে কথা কইয়া যাইস।

বাড়ী যাবার পথে প্রতিদিন ওরা চেয়ারম্যানের অনুমতি নিয়েই যায়। আজ আবার চেয়ারম্যান কি কথা বলবে বুঝে না। দুজনে মুখ চাওয়া চায়ি করে। তারপর ওদেরও বুকটা কেমন ভার হয়ে থাকে। বৈঠক ঘরে আর কোন মানুষ নেই। বাতাসও যেন থমকে আছে। মতি মিয়া সিগারেটের ধোয়া ছাড়ে। ধোঁয়া কুন্ডুলী পাকিয়ে ঘরের ভেতর ফেরে।

মতি মিয়া কণ্ঠটা হিসহিস করে- মাজু তোর মাইয়া ময়নার কথা কি ভাবছস।

প্রশ্নটার মানে বুঝে না মাজু। ফ্যালফ্যালিয়ে শেখু দিকে তাকায়।

ছেদু একটু শুকনা হাসি হেসে বলে- অয় কি ভাববো। আফনে আছেন মুরব্বী। বিপদে অফনেইদো যা বালা বুঝবেন করবেন।

শোন আমি অনেক ভাইবা দেখলাম। মাইয়াডার কপালে সারাডা জীবন কষ্টই লেহা। এই মাইয়া বিয়া করবো কেডা, করলেও লইয়া খাইবনি হেইডা একটা কথা আর বিয়া দিতে লাগবোও এতলা। হেইডা তো বুঝছঅই।

মাজু কথা বলে না।-ছেদুও মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে।

চেয়ারম্যান আবার বলে মাইয়াডার শইলের যেই বান। যেমুন তরতর কইরা বাড়তাছে এই মাইয়া ঘরে রাহন ও বিপদ। কুমবালা কুন আকাম ঘডবো কউন যায় না। আজকাল কার পোলাপানের কুন ঠিক আছে। কহন দেখবি তোর মাইয়ারে কলংক কইরা দিছে। হেই সময় কি করবি।

মাজু এবার শুকনো কণ্ঠে বলে-হেইডাদো বুঝিঅই অহন কি করমু আল্ল­ায় দিছে।

হ কতাডা তো ঠিহই। আল্ল­ায় দিছে কি করবি। আমি একটা উফায় কইতারি । তাতে তরারও বালা আর আমারও ইলেকশনের লাইগ্যা ফিল্ডটা ইটটু বালা হইবো। তরারে আমি জমি দিয়া ঘর তুইল্লা দিমু। এহন তোরা ভাইব্যা দেক কোনডা করবি। আর এই কথা কাকপক্ষীও জানলে দুইজনের লাস খালের মধ্যে পইরা থাকবো।

মাজু আর ছেদু দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে কাঠ হয়ে থাকে। কি বলবে ভেবে পায় না। চেয়ারম্যান আবার বলে-ডেহুরনির পুত নুরুমিয়া আজগায়ই আমার লগে বেডাগিরি দেহায়। আজগায়ই বেড সরদার হইয়া সারছে। শইলে মানে নি।

তারপর ছেদু আর মাজুর দিকে তাকিয়ে বলেÑ ইলেকশনে আমি হারলে তোগো অবস্থাও মনে করিছনা ভালা থাকবো। নুরু মিয়ার লোকেরা তোরারে ছাইরা দিব না। ঘর ছাড়া করবো। তহন থাকবি কই। আর তোর ডাঙ্গর মাইয়া ফর দিবি কেমনে।

ছেদু আস্তে আস্তে বলে- আফনেই কন দেহি কি করমু।

চেয়ারম্যান দু’জনকে কাছে ডেকে ফিসফিস করে কথা বলে- তারপর আবার কঠিন চোখে চেয়ে বলে কাকপঙ্খীও জানলে তোগো রক্ষা নাই।

সড়কের উপর দিয়ে মাতালের মত পাশাপাশি হাটে মাজু আর ছেদু। অন্ধকারে চোখ আটকে থাকে। ছেদু হাতের টর্চটা জ্বালাতে ভুলে যায়। উঁচু নিচু পথে হোঁটচ খেয়ে মাজুর শরীরটা সামনে অনেকটুকু ঝুকে পড়ে। দ্রুত হাত টেনে ধরে ছেদু । সামনেই হিজলতলীর মোড়। সেখানে এসে দাড়ায় দুজন। উদ্দাম বাতাস নেচে যায় শরীরের উপর দিয়ে।

মাজু গাছে ঠেস দিয়ে দাড়িয়ে উদভ্রান্তের মত বলে- ছেদুরে আমার জারে ধরছে।

এমুন করলে হইবো কেমনে। একটু বল আন দেহি।

আমার মাথাটা ঘুরতাছে। আমি অহন কি করমু।

আমিওতো কোন দিশ করতে পারতাছি না। ছেদু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে- চেয়ারম্যান যখন মুহের তে কথা মাডিত ফালাইছে অহন তুই আর আমি হুমুক না দিলেও হেয় আমরারে ছাড়তোনা হের কাম হে করবো। হের বিরুদ্দ গিয়া গেরামে থাহন যাইতোনা।

তুই ক অহন কি করমু।

আমার মাতাত ধরতাছে নারে ।

রাস্তার উপর হঠাৎ বসে পড়ে মাজু তারপর ধরা গলায় বলে- আমি বাইত যাইতে পারমুনা রে ছেদু ।

মাজুর পাশে ছেদুও বসে পড়ে।

ক্ষেতের পাশ থেকে খসখস শব্দে সড়কের দিকে কিসের একটা ছায়া এগিয়ে আসে। হাতের র্টচটা জ্বালায় ছেদু। একটা কুকুর নিশব্দে সড়কে উঠে আসে। হাতের চর্টটা এবার এদিক ওদিক ঘোরায় ছেদু। জমিন পাড় হয়ে ছাড়া বাড়ির নতুন টিনের উপর আলো পড়ে ঝকঝক করে উঠে চালাটা। সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ ছেদুর চোখটা জ্বলে উঠে।

তারপর একটু সময় নিয়ে বলে- হোন আমরা গরীব মানু। গরীব মানুর এত দয়া দরমো থাহুন নাই। তর মাইয়্যা আর আমার মাইয়্যা এক কথাঅই। ভাইব্যা দেখ আসলেই মাইয়্যাটা কুন দিন শান্তি পাইতোনা। আমরা আর মাইনষের লাত্তি গুতা কত খামু। চেয়ারম্যান যা কইছে হেইডা এক রহম বালাই কইছে। গরীবের জানের কোনে দাম আছে কি?

ছেদু একটু থেমে আবার বলে-কত আর লইলাডি বাবি। তর কি একটা ঘর আর ইটটু ভিডার লাইগ্যা মনডা পইরা থাহে না?

মাজুর বাপের শেষ কথাটা মনে পড়ে। পায়ের নীচে নি পার এক খন্ড জমি করতে। এক খন্ড জমির স্বপ্ন কে না দেখে। মাজু তো দেখেই। রাতদিন চব্বিশ ঘন্টা দেখে। তবু সে তো বাপ । তার বুকের ভেতর মেঘনার চেয়ে বড় একটা নদী আছে সে নদী স্নেহের ,মমতার।

ছেদু আবার বলে- দুইননাইডাত ভাতের চেয়ে আফন কিছু নাই।

দুজনে সড়কের উপর বসে থাকে। রাত গভীর হয়।

ছেদু মাজুর হাতে নাড়া দিয়ে বলে- চল যাই। বুকডার মইধ্যে পাত্থর বান। মাথার উফরে যদি একটা চালা হয় আর পায়ের নীছে যদি কদ্দুর জমি হয় তাইলে সুইটকাডি লইয়া কোন রহম জীবনডা যাইবো। তোর আরও তিনডা মাইয়ার কথা ভাব। দুইডা সুইকার কথা ভাব। মাইয়্যাডা তোর অসুইখখা, হেইডাও ভাব।

মাজু ছেদুরে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদে- ছেদুরে আমার সব শেষ।

১২.

আগামী সোমবার ইলেকশন। মাঝে আর মাত্র পাঁচদিন। গ্রামে ইলেকশন ছাড়া আর কোন বিষয় নেই। হাটে বাজারে চায়ের দোকানে ইলেকশনের কথা। বাড়ীর বৌ-ঝিদের মুখেও এই ইলেকশন। মাজুর মুখে দুদিন ধরে কোন কথা নেই। ইলেকশনের কাজ করে ঘরে ফিরে আসে তাড়াতাড়ি। সারাক্ষণ কি যেন ভাবে। আজ সারাদিন কোথাও যায়নি। দুপুরে ভাত খয়েছে কয়েকটা। তারপর ঘরের চলার কাছে ময়নার লাগানো পুঁইশাক গাছটার কাছে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। দুদিনে শরীর অর্ধেক হয়ে গেছে চোখগুলে কে যেন গর্তের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে।

বসে বসে ভাবে মাজু মানুষের কি করার আছে। সব নিয়তির কাছে সর্মপিত। সে কি চাইলেই কিছু করতে পারে। কি করবে সে তার হাত পা বাধা। কেন ,বাধা কেন? সে যদি এখন চেয়ারম্যানের কথা না শুনে যদি আজ পালিয়ে যায়। শহরে চলে যায়। সুফিয়া খাটতে পারে। মানুষের বাসায় কাজ করবে। সে একটা কিছু করবে। কিন্তু থাকবে কোথায়। এতগুলো ছেলেমেয়ে নিয়ে কোথায় থাকবে। তার ওপর তার এ বাড়ন্ত বুদ্ধিহীন মেয়ে। আর সে যে যাবে তার কি টাকা আছে । শহরের কিছু কি সে চেনে?

নিজেকে মাজুর পিঁপড়ার চেয়ে ক্ষূদ্র মনে হয়। পিঁপড়ারও বাচার শক্তি আছে তার সেটাও নেই। পিঁপড়াও স্বাধীন ইচ্ছে মতো চলাচল করতে পারে। সে পারে না। পদে পদে সে বাধা সমাজের কাছে, পরিবারের কাছে, ক্ষুধার কাছে। যাযাবর এই জীবন। ভিটা নেই ,ঘর নেই। সারাজীবন গোলামি,মানুষের পায়ের কাছে পড়ে থাকা।

হিজলতলীর মোড়ে জমির উপর মাটি ফেলে বানানো নতুনবাড়ির নতুন টিনের চালা তার চোখে ভেসে উঠে। এমন একটা ঘর একটা ভিটা তার কি হবে? চেয়ারম্যান তাকে কথা দিয়েছে ঘর আর ভিটা দেবে। একটা ঘর আর ভিটা তার দরকার,খুব বেশি দরকার।

আর তার মেয়েটা? সে তার ভাগ্য নিয়ে এসেছে। মানুষের কোন কিছুর ওপর মানুষের কি হাত আছে? তার মনে পড়ে হুজুরের ওয়াজ-তার ইচ্ছা ছাড়া গাছের একটা পাতাও নড়ে না।

ময়না জিহবায় শব্দ তুলের তেঁতুল খাচ্ছে। দুপুরটা একটু হেলে গেছে। বাপের কাছে আসে ময়না হাত বাড়িয়ে বলে- বা-জান তেতুল হাইবা।

না অহন কি তেতুল খাওনের টাইম।

ময়না হেসে হেসে হাত পা নেড়ে বাপের কাছে আরও কিছু কথা বলে। মাজু কোন কথাই শুনে না।

এক সময় বলে- মা ময়না তুমি ঘরে যাও। আমার শইলডা বালা না।

ময়না বাপের কথা মত ঘরে ঢুকে।

সুফিয়া এসে বলে- এই রহম আলিখখির লাহান গালে হাত দিয়া ধুন ধইয়া কি ভাবতাছে?

মাজু কোন কথা বলে না,ঠায় বসেই থাকে।

সুফিয়া আবার কিছুক্ষণ পর এসে বলে- কি হইছে অহনও দেহি বইয়াই রইছে।

মাজু তারপরও কোনো কথা বলে না।

সুফিয়া এবার একটু রাগ করে বলে-দেহ মানুডা উমাস নি ফালায়। কতা কি কানে যায় না।

মাজু একটা নিশ্বাস ফেলে বলে-মাদানে ইটটু কদমতলী যাওন লাগবো, রাতে থাহনও লাগতারে।

কদমতলী কার বাইত?

ফিরোজ মিয়ার বাইত। ইলেকশনের কিছু কাম আছে । বেশী রাইত হইলে আমু না।

শইল না বলে বালা না। আজগা না গেলে কি হইব।

না যাওন লাগবো।

বিকালে একটা কাপড়ের ব্যাগে একটা লুঙ্গি গামছা আর শার্ট নিয়ে কদমতলী যাবার জন্য রেডী হয় মাজু হাতের ব্যাগটা নিয়ে উঠানে দাড়িয়ে থাকে। পা দুটে যেন নড়ে না। সুফিয়া ঘরের দরজায় থেকে নেমে আছে। এমুন মাদানে আজগা যাওনের কাম কি। কালকা সহাল সহাল গেলে গা।

না যাওন লাগবো। মায়নায় কই দেখতাছি না।

নাজমারার বাইত গেছে মনে হয়। ডাহুম নি।

না ডাহনের কাম নাই।

মাজু দু কদম এগিয়ে উঠানে কোনায় আর একবার দাড়ায়।

সুফিয়া এগিয়ে এসে বলে- শইলডা কি বেশী খারাফ লাগদাছে নি। আমার কেমুন বালা ঠেকতাছে না। আজগা যাওনের কাম নাই।

মাজু কথা বলে না, উঠানের পাশ দিয়ে নেমে ক্ষেতের দিকে হেটে চলে। তিনটা ক্ষেত পার হয়ে সড়কে উঠে যেতে হবে কদমতলী।

সন্ধ্যায় মায়মুনা নাজমাদের বাড়ি থেকে আসে। কোচরে একমুঠ চালভাজা। পুঁইগাছটার গোড়ায় বসে চালভাজা খায়। অন্ধকার গাঢ় হয়ে এলে সুফিয়া বলে- কুফিডাত তেল নাই। কতদুর তেল ভর দিহি।

সুফিয়া পাতিলের ভাত দেখে। তার পর অল্প কয়টা ভাত বসায়। কুপিডা ধরিয়ে ঘরে রেখে ময়না নিশব্দে রান্না ঘরের বেড়ার কাছে দাড়িয়ে থাকে। চুলার আগুনের লালচে আলো এসে পড়ে তার মুখে। সুফিয়া আবার বলে- ঘরেরতে ভাতের ফেন গালনের ফরাডা আন দেহি।

মার কাছে মাটির সরাটা দিয়ে ময়না চুলার পাশে স্তূপ করে রাখা ছাই থেকে ভাঙ্গা থালায় কয়েক মুঠ ছাই নেয়।

এমুন রাইতে ছাই দিয়া অহন কি করবো। এমুন বেআনতাইজা মাইয়্যা আছে নি। রাইতবিরাত নাই শুধু গাছ আর গাছ।

ভাত রান্না শেষ করে সুফিয়া চুলার আগুনটা ঢেকে দেয়। উঠানে দাড়িয়ে ময়নাকে ডাকে। কোন সাড়া না পেয়ে আমানউল্লার ঘরের কাছে এসে বলে- চাচী, ময়নায় আইছে

ময়নারে তো একটু আগেও দেখলাম গাতাডার নামাত কি জানি করতাছে।

আমানউল্ল­ার ছেলের বউ বলে- হ আমিওতো আমরার হুমুক দোরে দেখছি।

পাহালের কাছ তন কয়ডা ছাই আনলো। হেরপর তাইরেদো আর দেখতাছি না।

আমানউল্ল­ার বউ ঘর থেকে নেমে উঠানে আসে। দুজনে গাতাডার কাছে আসে। অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না।

টাট্টিত গেসে নি।

না আমি টাট্টিত দেখছি।

সুফিয়া আবার ডাকে – ময়না ও ময়না । কোন সাড়া আসে না।

ঘর থেকে কুপি নিয়ে এসে দাড়ায় আমানউল্ল­ার ছেলের বউ। একটু নিচু করে কুপিটা ধরে। কতগুলো ডাটা গাছ বেড়ে উঠছে। তার পাশে ছোট্ট একটা লাউয়ের চারা। গাছগুলোর গোড়ায় সদ্য ছড়ানো ছাই।

সুফিয়া বলে – এই যে দেহেন গাছের গোড়াত ছাই দিছে। অহন গেল কই।

ময়নাকে পাওয়া যায় না। নাজমাদের বাড়ির আশপাশে দেখা হয়। সব জায়গায় খোজা হয়। আমাবশ্যার অন্ধকার রাত।। টর্চ জ্বেলে জ্বেলে দেখা হয়। কিন্তু এই ঘন অন্ধকার ভেদ করে ময়নাকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

সুফিয়া উঠানে বসে বিলাপ করে।

আমানউল্ল­ার বউ বলে- এমুন বেচুন হইও না। বিয়ান হোক। পাওনা যাইবই, দজেগজে মানুডা যাইব কই।

আশপাশের দুজন মহিলা বলে- খারাপ তানে নি ধইরা নিলো। একবার হুজুরের কাজে গেলে হয়।

কেউ বলল- খারাপ বাতাসেই নিছে।

আরেকজন বলে- আন্ধাওয়ালায় ধরছে মনে হয় ।

সুফিয়া কিছুই বলে না। সারারাত শুধু বিলাপ করে।

সকালের আলো ফোটে। পূর্ব আকাশে সূর্য উঠার আভাস দেখা যায়। হালকা লাল হয়ে আছে আকাশ। এমন সময় মায়মুনার লাশটা প্রথমে দেখে পুবপাড়ার জহির। বর্ষার পানি এখনও জমি হতে পুরো নামে নি। সড়কের কাছ ঘেষে একটা জমির মাঝখানে ধইনচা গাছের গোড়ায় গোড়ায় লেগে থাকা কাদা পানিতে গাছের গোড়ায় আটকে আছে লাশটা।

মুখটা হা হয়ে আছে। চোখ দুটো খোলা। পেটটা আড়াআড়ি ফাড়া।

আস্তে আস্তে ভিড় বাড়ে। কদমতলী থেকে ফিরে আসে মাজু। খবর পাওয়া যায় আরেকটা। রাতে চেয়ারম্যান বাড়ি থেকে ফেরার পথে কে জানি ছেদুর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। হিজলতলী মোড়ের সড়কের উপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা ছেদুকে ধরে দুজনে নৌকা দিয়ে নদী পাড় করে নিয়ে যায় সদরে।

ময়নার লাশের খবর পেয়ে পুলিশ আসে। নারী পুরুষের ভিড় ঠেলে খুনের জায়গা দেখে। নানা রকম প্রশ্ন করে। জোয়ান উঠতি বয়েসের মেয়ে কারো সাথে প্রেম ছিলো কি না? পারিবারিক কোনো শত্রুতা? মতি মিয়া দৌড়ে আসে। এ খুন আর ঔ হামলার কারণ যে ইলেকশন এটা বুঝার আর কোনো বাকি থাকে না। কে না জানে মাজু আর ছেদু মতি মিয়ার খাস লোক। মতি মিয়া বাবরার কপাল ঠুকে – আমার পক্ষে কাজ করনেই আজ ওগো দুইজনের এই অবস্থা। এমুন কাজ মাইনষে করে। এমুন শত্রুতা মাইনষে করে।

পুলিশ লাশ নিয়ে যায়। চেয়ারম্যান মতি মিয়ার সাথ কথা বলে। সম্ভাব্য আসামীদের নাম লিখে। গ্রামের কয়েকজনের সাথে কথা বলে। নুরুমিয়ার পক্ষে কাজ করা সক্রিয় কর্মীদের মধ্যে সন্দেহভাজন কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। কয়েকজন ইতোমধ্যেই গা ঢাকা দিয়েছে। তাদের বাড়িতে ধর পাকড় চলে। পুরো গ্রামটা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে থাকে। মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসে ছেদু । তেমন বড় কোন ক্ষতি হয়নি। তবে বেশ রক্তক্ষরণ হয়েছে। দুর্বল ছেদু জানান- আমবশ্যার অন্ধকার রাতে সে কাউকেই চিনতে পারেনি। ময়নাতদন্ত শেষে পরদিন সন্ধ্যায় গ্রামে আসে ময়নার লাশ। মাজু মিয়ার উঠানে ভেঙ্গে পড়ে গ্রামের মানুষ। রাতে লাস দাফন হয়। পরশু দিনের ইলেকশনের বাতাস বিকালেই অনেক ঘুরে গেছে। মানুষের মুখে এখন ইলেকশনের সাথে এই খুনের গল্প। চা খেতে খেতে দোকানে দোকানে চলে নানা কথা। নুরু মিয়ার পক্ষের অধিকাশংই লোককেই দেখা যায় না । অনেকেই গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে গেছে। যাদের দেখা যায় তাদেরও মনমরা দেখা যায়। একদিনেই এলাকায় ওদের ভিত অনেক নড়ে গেছে।

ইলেকশনে দুইপক্ষে হাতাহাতি ,মারামারি লাঠালাঠি অনেক হয় কিন্তু এরকম খুন এই প্রথম তাও আরার একটা মেয়েমানুষ।

ঘুরে ফিরে তাই সবার মুখে একই কথা-এমুন সিমারের কামডা কে করলো। নির্দোষী মাইয়্যাডারে মাইরা লাইলো।

বাজারে কেউ কেউ আফসোস করে- ব্যাহা মাইয়াডারে কেমনে মারলো। হাতডাকি ইটটুও কাফলোও না। মরণের কথাও কি মনে হইলো না। এই দুইনাত কি সারাজনম থাহন যাইবো।

১৩.

ইলেকশনের দিন মতিমিয়া ছেদুকে সাথে নিয়ে মাজুর বাসায় আসে-ছেদুর মাথায় এখনো ব্যান্ডেজ। শরীরও যথেষ্ট দুর্বল।। তিনদিনের না খাওয়া মাজুর শরীর একবারে মাটির সাথে মিশে আছে। এ তিনদিন সে কারো সাথে কথাও বলেনি শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকেছে। মতি মিয়া নরম সুরে বলে- না খাইয়া থাইকা শইল নষ্ট কইরা কি করবি। হাত মুখ ধুইয়া খাইয়া ভোট দিতে যা।

মাজু কথা বলে না হাটু ভেঙ্গে বসে থেকে মাটির দিকে চেয়ে থাকে।

মতিমিয়া একটু চুপ থেকে আবার বলে- তোগো দুইজনরে আমি ভিটা আর জমিন দিমু। দুইডা ঘরও বানাইয়া দিমু। অহন আর বইয়া থাহিস না , যা ভোট দিতে যা।

মতি মিয়া চলে গেলে মাজু আর ছেদু মুখোমুখি বসে থাকে।

সুফিয়া বলে- চেয়ারম্যানে যহন এত কইরা কইয়া গেল। যান একটু ঘুইরা আইয়েন।

ইলেকশনে জিতে মতি মিয়া বেঈমানী করে না, কথা রাখে। ছয় মাসের মধ্যেই মাজু আর ছেদুকে একটুকরা ভিটা আর একখন্ড করে জমি দেয়। ভিটার জমিটা মতি মিয়া পুবপাড়ার তারু কাছ থেকে নাম মাত্র মূল্যে ক্রয় করে। জমিটা নিয়ে তারু মিয়ার সাথে চেয়ারম্যানের আগেই ঝামেলা ছিল। তারু মিয়া এবার ইলেকশানে নুরুমিয়ার পক্ষের লোক ছিলো। ইলেকশানে জিতে আগের ঝামেলাকে আবার তাজা করে চেয়ারম্যান। শেষ পর্যন্ত তারু মিয়া জমিটা বেচতে বাধ্য হয়্ জমিটা কিনে আবার চেয়ারম্যান সাফ কবলা করে দেয় মাজু ছেদুর নামে। জমিতে মাটি ফেলে ভিটা বানায় তারা। মাটি ফেলার জন্য চেয়ারম্যানের সাথে টাকা দেয় আমানউল্লা ,হারেস মিয়া কালু মেম্বর । চেয়ারম্যানের এ ভালো কাজে সাহায্য করে নিজেদের আখের আর একটু পোক্ত করে তারা। দুজনকে দুটুকরো জমিও দেয়। সেখানে বেশ কজন সজ্জন ব্যাক্তির দান দক্ষিণা আর আর্শীবাদ থাকে। ঘর বাধার কাজেও সাহায্য করে কয়েকজন। চকচকে টিনের দুটো ঘর উঠে উঠানের দু’পাশে। গ্রাম থেকে দুর জমিনের মধ্যে বেখাপ্পাভাবে ভাবে দাড়িয়ে থাকে ঘর দু’টো। চেয়ারম্যানের বেশ সুনাম হয়। মতি মিয়া যে মানব দরদী মানুষ আর এ গ্রামের সব খড়কুটো যে তার দয়াতেই বেচে আছে তা আর একবার প্রমাণিত হয়।

১৪.

উত্তরের বাতাস বইবে কিছু দিন পরই। নদীর হাওয়া এখনি শরীরে হিম দিয়ে যায়। সন্ধ্যায় কয়লা কালো আকাশটার মিছরির চাকার মত তারা উঠে। আওলা পাথারি বাতাস ধানের ক্ষেতে ছরছর শব্দ তুলে। ক্ষেত ভরা ধান পাকা, আধা পাকা। হাওয়ায় ভাসে পাকা ধানের গন্ধ।

এদিকে তেমন ঘর নেই। ক্ষেত আর ক্ষেত। ওপাশে ক্ষেত ছাড়িয়ে সড়কের রেখা। তবে বেশ কয়েক ক্ষেত পরপর দু’একটা বাড়ী মধ্য মাঠে বেঢপ দাড়িয়ে আছে। এখন মানুষের ভিটাবাড়ির চাহিদা বেড়েছে। গ্রাম ছাড়িয়ে ফসলী জমিতে দিন দিন বাড়ছে বাড়ির সংখ্যা।

মাজু আর ছেদুর বাড়ীটা একেবারে শেষ মাথায়। উঠানে অন্ধকারে দুটো আগুনের মাথা জ্বলছে। মাঝে মাঝে উজ্জ্বল, মাঝে মাঝে নিভু নিভু। মাজু আর ছেদু দাড়িয়ে দাড়িয়ে বিড়ি টানছে। দুজনেই নীরব। সামনের মেঘনা, ক্ষেত ভরা ধান এখন শুধু নিঃসীম কালো। দৃষ্টি কালোর মধ্যে আটকে থাকে। অন্ধকারে শোনা যায় বাতাসের ছরছর শব্দ আর পাড়ে মেঘনার আছড়ে পড়ার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ।

অন্ধকারে দৃষ্টি রেখে মাজু বলে-তোমার ধান কেমুন?

হইবো ভালোই। বছর না গেলেও কাছাইবো।

তোমার খবর কি?

আমারও খারাপ হয় নাই। হইলে কি হইবো। জানোই তো খাওনের মাইনষের অভাব নাই। তাও আল্লার কাছে সবুর কই। নিজের জমির ধান এইডা কি কোনদিন সফনেও ভাবছি।

হ ঠিহই কইছো। নিজের জমির ধান মনে হইলেও বুকডা লাফায়। কেমুন জানি উমাস আটকাইয়া আইয়ে। হেইডা কি দুক্ষে না সুহে বুঝি না। কেমুন অবিশ্বাসী লাগে।

কার উঠান কতটুকু তার সীমানা আছে। কিন্তু সীমানায় কোন বেড়া নাই। দু’জনের একই উঠানে হাটে,চলে। দুজনের বাচ্চারা খেলে। আল্লায় দিলে এই উঠানে এবার দু’জন ধান শুকাবে। প্রতিরাতে দু’জনেই এখানে দাড়ায়। অন্ধকারে সামনের ক্ষেত দেখে। দেখে তাদের নতুন বাড়ি। নতুন মাটি। গন্ধ টেনে নেয় নতুন মাটির ,পাকা ধানের। বুকে তাদের চিকন সুখের ঢেউ। বাতাসে তাদের শরীর হিম হয়ে আসে, মেঘনার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শরীরে ঝিম ধরিয়ে দেয়। তবু তারা প্রতি রাতে দাড়িয়ে থাকে অন্ধকারে বাড়ী দেখে, ক্ষেত দেখে। দেখে দেখে আউস মেটে না।

মাজুর দৃষ্টি আবার উঠানে আসে। উঠানের মাচানে তরতর করে বাড়ছে একটা লাউ গাছ। নতুন মাটি সুফিয়াকে নেশা ধরিয়েছে। উঠানের বেড়ার কাছে জঙ্গলের মত বাড়ছে সিমের ঝাড়। নতুন মাটি পেয়ে যেন মাথা ঝাঁকি দিয়ে বেড়ে উঠছে। সুফিয়া নতুন মাটিরও ভরসা করে না। দুইবেলা যতœ নেয় গাছের। লাউগাছের গোড়ায় দেয় চাল ধোয়া, ডাল ধোঁয়া পানি। সিম গাছের গোড়ায় ছড়িয়ে দিয়েছে ছাই।

নীরব দাড়িয়ে ওরা মেঘনার ছলাৎ ছলাৎ শুনে। বাতাসে শরীরটা হিম হয়ে আসে।

দাড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ ছেদু মাজুর হাতটা চেপে ধরে- বছছর ঘুইরা গেল। ঘর ক্ষেত সবই হইলো তাও মনডাত কুনো বুঝ পাইনা, মাজু তুই কি আমারে মাফ দিছস।

এইডা কি কস।

বিশ্বাস কর বুকডার ভিতরডা কেমুন যে করে। তোর মাইয়াডার চেহারাডা খালি ভাসে। কেমুন দরদ কইরা যে কাহা কইতো। আর আমি পাষ্ষানের লাহান নিজে হাতে এই গুনার কামঃ

হেইসব কথা থাক। হেডি আর মনে কইরা কি হইবো।

জানি মাইয়াডা তোর জানের জান আছিলো।

হ, ময়নায় আমারে খুব বালাবাসতো।

তোর মাইয়াডাই আজকা পায়ের নিচে এই মাডি দিয়া গেছে ,মাথার উপরে দিয়া গেছে চালা।

হ আমার মার লোউ এর উফরে খাড়াইয়া পাহা ধানের বাস লই। মাজুর কণ্ঠ একেবারে বুজে আসে।

ছেদু আবার বলে- তুই সত্য কইরা ক আমার উপরে তোর কোন লাগ নাই। তুই আমারে মাফ দিছস।

মাফ দেওনের আমি কেডা ক। যের লগে জুলুম করছি হেয় তো চইললাই গেছে। হেয় কি আর ফিরা আইবো, না আনুন যাইবো।

ছেদু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলে- যে যায় হে কি আর কুনদিন আইয়ে।

মাজু একটু চুপ থেকে তারপর ধ্যানমগ্ন ভাবে বলে- তোর উফরে আমার কুনো লাগ নাই। চেয়ারম্যানের ওফরেও নাই। এইডা আমার নিয়তি। কার কফালে কি লেহা আছে তুই আর আমি কেমনে জানমু। এইডা তাইর কপালের লেহা। তুই আর আমি কেমনে ঠেহামু। বাচলেই আর কি হইত। লুলা মাইয়ার কপালে কি আর সুখ থাকতো।

ছেদু বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে- নিষ্পাপী আছিলো। বেহেস্তে রানীর লাহান বইয়া অহন হাসতাছে।

ওরা স্বান্তনা খুজে।

নিরবে দাড়িয়ে একসময় ছেদু চলে যায়।

মাজু একা একা দাড়িয়ে থাকে। ঘরের চালার দিকে তাকায়। মাচানের দিকে তাকায়। তরতর করে বেড়ে উঠা লাউয়ের ডগাটা অন্ধকারে কালো হয়ে দোল খায়।

হঠাৎ মাজুর মনে হয় ওটা লাউয়ের ডগা নয়, ওটা একটা কালো মেয়ের একটু বাঁকানো মুখ। এক পাশে বাঁকানো ঘাড়। মাজুকে দেখে মেয়েটা মাথা কাত করে হেসে উঠে। অন্ধকারে চকচক করে তার দুটি চোখের তারা।

[ad#co-1]