মাভূমি

ইমদাদুল হক মিলন
বাড়িটা ওরা চারদিক থেকে ঘেরাও করেছিল, না বাবা?
নাকি পেছন দিয়ে এসেছিল?
আমার ধারণা পেছন দিয়েই এসেছিল। ওদিক দিয়ে আসাই সুবিধার। গ্রামের শেষ প্রান্তের বাড়ি। পুবমুখী বাড়ির পেছন থেকে শুরু হয়েছে ফসলের মাঠ। খানিক দূরে গিয়ে সেই মাঠ মিশেছে ধানিবিলের সঙ্গে। দেড়-দু মাইল লম্বা বিলের শেষে নদী। অসাধারণ সুন্দর নাম নদীর_’রজতরেখা’। নদী থেকে বিলের পেট কেটে গ্রামে ঢুকেছে চিরল একখানা খাল। আমাদের বাড়ির গা ছুঁয়ে চলে গেছে পুবে, বাজারের দিকে। কাঞ্চনপুর বাজার।
গ্রামের নামও কাঞ্চনপুর।

কবিতার মতো গ্রাম। ‘আমাদের গ্রামখানি ছবির মতন’। সত্যি, ছবির মতন গ্রাম। ধান-কাউনে বছরভর আলোকিত হয়ে থাকে মাঠ, বিল। আশ্বিন-কার্তিক মাসে যখন পাকতে শুরু করে ধান, সকাল-দুপুর আর বিকেলের রোদে, হাওয়ায় হাওয়ায় যখন দোল খায় পাকা ধান, মনে হয় সোনার নহর বইছে বিলে। তাকালে ঘোর লেগে যায় চোখে।

ওই খাল দিয়েই, বিল-পাথালে নিশ্চয় গ্রামে ঢুকেছিল ওরা। নদীর দিকে গানবোট রেখে নৌকা নিয়ে ঢুকেছিল। রাজাকাররা নৌকা নিয়ে তৈরি ছিল আগেই। গানবোটের শব্দ পেয়েই আট-দশটা নৌকা নিয়ে হাজির। প্রভুদের পথ দেখিয়ে গ্রামে এনেছে। আমাদের বাঁশঝাড়তলায় এসে লেগেছে একটার পর একটা নৌকা। তেইশ বিঘার বিশাল বাড়ি। বাঁশঝাড়তলার ওদিকে কী হচ্ছে টেরও পাওয়ার কথা না তোমাদের। হঠাৎই কানে এসেছে বুটের শব্দ। অথবা ঘর থেকে বেরোতে গিয়েই দেখতে পেয়েছ বাড়ির আনাচকানাচ আর উঠোন ভর্তি খাকি পোশাক পরা জন্তুরা রাইফেল তাক করে আছে, স্টেনগান তাক করে আছে। অথবা লাথি মেরে মেরে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকেছে ওরা।
এ রকমই তো ঘটনা, না বাবা?

বিলের দিক থেকে এই যে এতগুলো নৌকা আসছিল গ্রামের দিকে, ওদিক থেকে আসা মানে প্রথমেই আমাদের বাড়ি, নিশ্চয় তোমাদের কারো চোখে পড়েনি সেই দৃশ্য। তোমরা কেউ কিছুই টের পাওনি। পেলে নিশ্চয় পালানোর চেষ্টা করতে। নৌকা নিয়ে না হোক, বর্ষাজলে নেমে সাঁতরে যেতে পারতে মাঠের দিকে। ধানক্ষেতে শরীর ডুবিয়ে শুধু মাথাটা তুলে রাখতে পারতে শ্বাস নেওয়ার জন্য। এভাবেও তো বাঁচতে পারতে।

যখন টের পেয়েছ, তখন তোমাদের আর কিছু করার ছিল না। পালানোর পথ ছিল না।

নাকি তখনো পুরোপুরি ভোর হয়নি, বাবা? পুবপাড়ার মসজিদে মাত্র ফজরের আজান দিচ্ছেন ইমাম সাহেব। আজানের শব্দে তোমার ঘুম ভেঙেছিল, মায়ের ঘুম ভেঙেছিল। আমাদের এই অঞ্চলটি নিম্নাঞ্চল। বর্ষায় রজতরেখা উপচে খাল দিয়ে পানি ঢোকে গ্রামে। এক দিকে নদীর পানি, আরেক দিকে আকাশভাঙা বৃষ্টি। মাত্র দশ-বারো দিন, মাঠ-বিল সব ডুবে যায়। কৃষকরা ব্যস্ত হয় তিল-কাউন কাটায়। তারও কিছুদিন পর ব্যস্ত হয় পাট আর আউশ ধান কাটায়। বিলে-মাঠে তখন প্রতিদিনই বাড়ছে পানি। নিম্নাঞ্চল বলেই বাড়িগুলো মাঠ থেকে চার-পাঁচ হাত উঁচুতে। ভরা বর্ষায় একেকটা বাড়ি একেকটা দ্বীপ, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। হেঁটে এবাড়ি-ওবাড়ি করা যায় না। নৌকাই হচ্ছে একমাত্র বাহন।

আমাদের দুটো নৌকা। একটা গরু-ছাগলের ঘাস-বিচালি আর বাড়ির সাধারণ কাজে ব্যবহার করে কদম। আরেকটা ছইঅলা সুন্দর ছিমছাম নৌকা। ওই নৌকা নিয়ে বিকেলের দিকে প্রায়ই গ্রামের এদিক-ওদিক ঘুরতে বেরোও তুমি। মা আর বকুল যায় এবাড়ি-ওবাড়ি। বর্ষায় পানিবন্দি হয়ে বাড়ির ভেতর কাঁহাতক বসে থাকা যায়। বকুলের লেখাপড়াও তো নেই। বিএ পাস করে বাড়িতে বসে আছে। তুমি তার বিয়ের কথা ভাবছ আর শুরু হয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধ। সব বন্ধ।

দুটো নৌকার মাঝিই কদম। আমাদের বহুকালের পুরনো কাজের লোক। পদ্মার ওপারকার এক চরের মানুষ। ঘরসংসার, বউ-ছেলেমেয়ে সব চরের বাড়িতে। কদম পড়ে আছে আমাদের এখানে। বছর-ছমাসে একবার বাড়ি যায়। মাসের বেতন মাসে নেয় না। বাড়ি যাওয়ার সময় একবারে নেয়। একবারে ছমাস এক বছরের বাজার করে দিয়ে আসে বাড়িতে, নাকি নগদ টাকা দিয়ে আসে বউয়ের হাতে, ছেলেমেয়ে নিয়ে সেই টাকায় সংসার চালায় বউ। তিন ছেলে, এক মেয়ে কদমের। মেয়ে ছোট। তার পরও বোধ হয় বিয়ের বয়স হয়ে এল। বড় দুই ছেলের একজন ঠাকুরগাঁওয়ে দর্জির কাজ করে। বিয়ে করে সেখানেই রয়ে গেছে। মা-বাবার খোঁজ নেয় না। মেজটা আছে ঢাকায়। নারিন্দার ওদিককার এক রেস্টুরেন্টের মেসিয়ার। সেটা মা-বাবার খোঁজখবর রাখে। তিন নম্বর ছেলে আর মেয়েটি আছে সংসারে। ছেলে পদ্মায় মাছ ধরা জেলেদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করছে। মাছের কারবার বোঝার চেষ্টা করছে। মাছের বেজায় নেশা। কদম দু-চার হাজার নগদ টাকা দিলেই মাছের কারবারে নেমে পড়বে সে, এ রকম পরিকল্পনা করে আছে।

বাবা, কদম এসব কথা একদিন বলেছিল, তোমার মনে আছে? আমার মনে আছে।
কিন্তু ওই অত সকালে কদম কোথায় গেল?

ছোট নৌকা নিয়ে বিলের দিকে গিয়েছিল গরু-ছাগলের ঘাস-বিচালি তুলতে? ওদের আসতে দেখে আগেই নৌকা নিয়ে পালিয়ে গেছে? আবার এমনও হতে পারে, নৌকা ফেলে লাফিয়ে পড়েছে বিলের পানিতে। ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে পানকৌড়ির মতো ডুব দিয়ে দিয়ে পালিয়ে গেছে কোনো দিকে। নিজেকে বাঁচিয়েছে।
নাকি কদমই লাশ হয়েছে প্রথম!

গ্রামে ঢোকার আগে হাতের কাছে একজন বাঙালি পেয়ে কদমকে দিয়েই কাজটা শুরু করেনি তো ওরা? কদমের লাশ কি দুপুরের দিকেই ভেসে উঠেছিল বিলের পানিতে? ধানক্ষেতের আড়ালে কোথাও কদমের লাশ খেতে আকাশ থেকে কি নেমে এসেছিল শকুনের দল? দু-চারটা ক্ষুধার্ত কাক কি গ্রাম থেকে কদমের লাশ খেতে উড়ে গিয়েছিল বিলের দিকে?
আমাদের ঘাস-বিচালির নৌকাটা কোথায় গেল?
রাজাকাররা কেউ নিয়ে গেছে?
এই এলাকায় রাজাকার হয়েছে কারা?

পাব, সব খবর আমরা পাব। অথবা সব খবর আমাদের কেউ কেউ পেয়েও গেছে। আমি পাইনি। আমি চার দিন আগে ঢুকেছি দেশে। মে মাসের প্রথম দিকে বিদায় নিয়েছিলাম তোমাদের কাছ থেকে। কুমিল্লার ওদিক দিয়ে চলে গেলাম আগরতলায়। অতিকষ্টে যেতে হয়েছিল, বাবা। জীবনটা একেবারে হাতের মুঠোয় নিয়ে। চারদিকে মিলিটারি, চারদিকে ওদের নফরগুলো। যখন-তখন গুলি, যখন-তখন মৃত্যু। একবার বর্ডার ক্রস করতে পারলেই হলো। আমি আর বাচ্চু ছিলাম একসঙ্গে। আমরা পেরেছিলাম, বাবা। আখাউড়ার ওদিক দিয়ে আগরতলায় ঢুকে গেলাম। তারপর শুরু হয়েছিল আমাদের ট্রেনিং। মাস দুয়েকের একটানা ট্রেনিংয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেলাম।

দেশে ঢোকার আগে টুকটাক বহু রকমের খবর পাচ্ছিলাম আগরতলায় বসে। আগস্টের শুরু, বাংলায় শ্রাবণ মাস। শ্রাবণ শব্দটার সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গানের কথা মনে পড়ে। ‘আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে’।

আশ্চর্য ব্যাপার! মানুষের মন কী বিচিত্র! কী জটিল! একসঙ্গে কত রকম বিষয় খেলা করে মানুষের মনে! কত কী একত্রে আনাগোনা করে মনে! এ রকম পরিবেশে, এই সন্ধ্যারাতে, পুব আকাশে মাত্র উঠি উঠি করছে শ্রাবণের চাঁদ, তুমি পড়ে আছ বাড়ির উঠোনে, তোমার বুক বরাবর, মাটিতে লেছড়ে-পেছড়ে বসে আমি কিনা ভাবছি রবীন্দ্রনাথের গানের কথা?

কেন এই গানটির কথা আমার মনে পড়ল, বাবা? কী কারণে? এই গানের সঙ্গে কোথাও কি কোনো যোগসূত্র আছে আমার? দেখো, পরের লাইন দুটোও ঠিক ঠিক মনে আসছে।

দুয়ার কাঁপে ক্ষণে ক্ষণে,
ঘরের বাঁধন যায় বুঝি আজ টুটে।

আজ কেন ঘরের বাঁধন টুটে যাবে? আজ তো বরং আমি ঘরে ফিরেছি। তোমাদের একপলক দেখে ভোর হওয়ার আগেই ফিরে যাব। সব মিলিয়ে দুটো দিনের ছুটি। আসা-যাওয়ার সময় ছাড়া বাকি মাত্র একটা রাত। সেই রাত কাটাতেই আমি বাড়ি ফিরেছিলাম। তিনটা মাস তোমাদের মুখ দেখিনি। যোগাযোগ বলতে বাজারের মুদি দোকানদার বদরুর কাছে একটা চিরকুট পাঠিয়েছিলাম এক লোকের হাতে। আগরতলা থেকেই পাঠিয়েছিলাম। বদরু তোমাকে পেঁৗছে দিয়েছিল। ‘আমি ভালো আছি, বাবা। আমাকে নিয়ে ভেবো না। স্বাধীন বাংলাদেশে তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে।’

কী আশ্চর্য! তার আগেই দেখা করার সুযোগ পেয়ে গেলাম।
কিন্তু এই কি দেখা হওয়া, বাবা? এই কি দেখা হওয়া?

ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা এখন প্রতিদিনই দুটো-চারটা করে দলে ভাগ হয়ে ঢুকছে বাংলাদেশে। একেক দিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে একেক দল। মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়ে গেছে। প্রথম পর্ব ছিল এলোমেলো যুদ্ধ। যে যেভাবে পারে পাকিস্তানিদের মারবে, পাকিস্তানিদের ঠেকাবে। দ্বিতীয় পর্ব হচ্ছে গেরিলা যুদ্ধ। গেরিলারা বিচ্ছুর মতো নিঃশব্দে এগোচ্ছে ওদের দিকে। ওদের এক শটি, আমাদের একটি। চারদিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ চালাব আমরা। প্রকাশ্য আক্রমণ, গুপ্ত আক্রমণ।

আমিও এ রকম এক দলের সঙ্গে ঢুকেছি। আমার যুদ্ধক্ষেত্র আসল জায়গায়_ঢাকায়। আমার দলের সবাই ঢাকার দিকে চলে গেছে। শুধু আমি কমান্ডারকে ম্যানেজ করে দুটো দিনের ছুটি নিয়েছি তোমাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য। কী যে সাবধানে কাজটা আমাকে করতে হয়েছে, বাবা! নিজ গ্রামে, নিজ বাড়িতে আসতে হয়েছে চোরের মতো। চাঁদপুরের ওদিক থেকে উঠেছিলাম এক জেলেনৌকায়। পরনে পুরনো একখানা লুঙ্গি আর হাফহাতা ছেঁড়াখোড়া শার্ট। লুঙ্গির রংটা একসময় আকাশি ছিল, এখন আর রং বোঝা যায় না। শার্টটা ছিল সাদা। এখন হয়ে গেছে মাটির রং। কোমরে বাঁধা পুরনো একটা গামছা। বাড়ি থেকে বেরোনোর পর আর শেভ করিনি, চুল কাটাইনি। সব মিলিয়ে আমি যে তোমার ছেলে রবি, রবিউল হক চৌধুরী, পরিচিত অনেকেও সে কথা বিশ্বাস করবে না। জেলেনৌকায় আমাকে জেলেদের মতোই লাগছিল। খাঁটি জেলে। নৌকা বাইছিলাম অবিকল জেলেদের ভঙ্গিতে।
জেলেনৌকার তিনজনের একজন পরেশ। নৌকার মালিক। প্রথমে হিন্দু নামটা বলতে চায়নি। হিন্দু আর ছাত্রদের ওপরই তো ওদের সবচেয়ে বেশি আক্রোশ। পঁচিশে মার্চের পর থেকেই বেশির ভাগ হিন্দু দেশ ছেড়ে গেছে। একেবারেই দীনদরিদ্র যারা, তারা কেউ কেউ রয়ে গেছে। ওদের হাত থেকে বাঁচার জন্য ওপরে ওপরে নাম-ধর্ম বদলে নিয়েছে প্রায় সবাই। পরেশ জেলেও সে রকম। প্রথমে কী একটা মুসলমান নাম বলেছিল। শুনে আমি বুঝে গিয়েছিলাম, বানানো নাম। বোঝার অন্য একটা কারণও ছিল। এ দেশের জেলে নাপিত কামার কুমোর তাঁতি এই শ্রেণীর বেশির ভাগ মানুষ হিন্দু। হিন্দু তাঁতি থেকে যারা মুসলমান হয়েছে তাদের বলে ‘জোলা’। এই তথ্য তুমিই আমাকে দিয়েছিলে।

জীবনের সব কিছুই তো আমি তোমার কাছ থেকে শিখেছি, বাবা।
মুসলমান তাঁত ব্যবসায়ী বা কর্মীরা ‘জোলা’ শব্দটা পছন্দ করে না। কী যেন কী কারণে শব্দটাকে ঘৃণাই করে। জোলা শব্দটাকে গাল হিসেবে ধরে। নিজেদের কারিগর বলতে পছন্দ করে তারা।

জেলেদের সেই সমস্যা নেই। পরেশের মুসলমান নাম শুনে আমি যেমন বুঝে গিয়েছিলাম এই নাম প্রকৃত নাম না, আমার চেহারা দেখে পরেশও বুঝে গিয়েছিল আমি কে। বলল, দাদা, আমি সব বুঝছি। চিন্তা কইরেন না। পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ ধরি আমরা। আপনে যেই দিকে যাইবেন, সেই দিকে আমরা যাই না। যাওয়ার দরকার হয় না। ঘুরপথ। তাও আপনের জইন্য যামু। আপনেরে জায়গামতন নামায় দিয়া আমু। আপনে দেশের কাজ করতাছেন, আর আপনের জন্য এইটুকু কাজ আমরা করুম না? খালি মাছ ধইরা বউ-পোলাপান বাঁচানের চেষ্টা করলেই হইব?
আহা, কী ভালো আমাদের দেশের মানুষগুলো!

দুপুরের পরপর রজতরেখায় ঢুকল জেলেনাও। দীঘিরপারের ওদিককার এক নির্জন জায়গায় নামলাম আমি। খাঁ খাঁ নির্জন চারদিক। বর্ষাজলে টইটম্বুর। এখান থেকে তিন সাড়ে তিন মাইল হবে আমাদের গ্রাম। গৃহস্থলোকের দু-একখানা ডিঙ্গিনাও ধানিমাঠে। এদিক-ওদিক যায় কোনো কোনো ডিঙ্গিনাও, কোষানাও। সেই সব নাওয়ের লোকজনকে ধরে ধরে গ্রামের মাইলখানেক দূর পর্যন্ত এসেছি।

কেউ বুঝতে পারেনি আমি কে! কোন গ্রামে যাব? দু-একজন জানতে চেয়েছে। বলেছি, দিনমজুর মানুষ ভাই। নিজের গ্রামের নাম না বলে অন্য গ্রামের নাম বলেছি। সেই গ্রামে যাচ্ছি নৌকা বাওয়ার কাজে।
একজন একটু সন্দেহ করেছিল। দেশগ্রামের অতি সাধারণ গৃহস্থলোক। বলল, সত্যই নৌকা বাওয়ার কামে যাইতাছেন? সত্যই নৌকার মাঝি আপনে?

অভিনয়টা তার সঙ্গে আমি নিখুঁতভাবে করেছি, বাবা। প্রায় তার মতো ভাষায় বলেছি, হ মিয়াভাই, সত্যই আমি নৌকার মাঝি। আপনের লগে মিছা কথা কই না।

লোকটার বোধ হয় তার পরও সন্দেহ যায়নি। নিজের কোষানাওখানা বাইতে বাইতে আড়চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। একবার ভেবেছিলাম সত্য কথাটাই বলি তাকে। না ভাই, আমি মাঝিমাল্লা না, আমি মুক্তিযোদ্ধা। কাঞ্চনপুর গ্রামের চৌধুরীবাড়ির ছেলে। বাড়ি যাচ্ছি মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে। ছোট বোন আছে, বউ আছে_সবার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।

বলিনি অনেক কিছু ভেবে। বলা তো যায় না, যাকে বলছি সে লোক কেমন। দেখা গেল, রাজাকারদের জানিয়ে দিয়েছে। আমিও বাড়ি পেঁৗছলাম, রাজাকাররাও ঘেরাও করল বাড়ি।

দুপুরবেলা পরেশ জেলে তাদের তিনজনের ভাত থেকে আমাকেও একথালা দিয়েছিল। দুটুকরা ইলিশ মাছ ভাজা দিয়েছিল, আর একটুখানি ডাল। কী যে তৃপ্তি করে সেই ভাত আমি খেয়েছি! খেতে বসে মনে হয়েছিল, আহা, কত দিন এত আরাম করে খাইনি!

তারপর ওই এক মাইল পথ, বাবা, তুমি ভাবতে পারবে না আমি কীভাবে এসেছি। কোথাও কোথাও কোমরজল ছিল, কোথাও কোথাও বুকজল। থই যেখানে পেয়েছি, সেখানে ঘাস-বিচালি আর ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে জল ভেঙে ভেঙে হেঁটেছি। যেখানে থই পাইনি, সেখানে সাঁতরেছি। যখন বাড়ির কাছাকাছি এসেছি, তখন দ্রুত ফুরাচ্ছে শ্রাবণ মাসের বিকেল। আকাশে মেঘের চিহ্নমাত্র নেই। স্বচ্ছ নির্মল আলোকিত আকাশ। পৃথিবী থেকে নিজের দিকে সব আলো তুলে নিচ্ছিল সেই আকাশ।

বাড়ির দক্ষিণ দিককার ধনচেক্ষেতের ভেতর দিয়ে যখন বাড়িতে উঠেছি, তখন আর নিজের শরীর নিজের মনে হচ্ছিল না। এত ক্লান্ত হয়েছি! না দাঁড়াতে পারি, না বসতে পারি। শরীর যেন দুমড়েমুচড়ে ভেঙে পড়তে চাইছে। ওদিকটায় হিজল বরুণ আর কদম তেঁতুলের জঙ্গল। বর্ষার বৃষ্টিতে আগাছা আর লতাপাতার ঝোপে দিনের বেলাও অন্ধকার হয়ে আছে জায়গাটা। কোনো রকমে শরীর টেনে টেনে ওখানটায় উঠেছি। তারপর চিত হয়ে শুয়ে থেকেছি কতক্ষণ, কে জানে।

একটু সুস্থির হওয়ার পর, শরীরে বল ফিরে আসার পর উঠোনের দিকে পা বাড়িয়েছি। ততক্ষণে আমাদের বাড়ির পুরনো দরদালানের আনাচকানাচে আস্তে-ধীরে ঢুকছে অন্ধকার। নিঝুম-নির্জন হয়েছে চারদিক। কোথাও কোনো শব্দ নেই। একটা পাখিও ডাকে না। ঝিঁঝিপোকারা ডাকছিল নিশ্চয়, আমি শুনতে পাচ্ছিলাম না।

আশ্চর্য ব্যাপার, এই যে এতটা পথ জল ভেঙে এলাম আমি, গ্রামের ভেতর দিয়েই তো এলাম। ধান-ধনচেক্ষেতের এদিক-ওদিক দূরে দূরে মানুষের ঘরবাড়ি তো ছিলই, কই, সেই সব বাড়িতে তো প্রাণের শব্দ পেলাম না! মানুষের সাড়া তো পেলাম না! মাঠেঘাটেও দেখলাম না গৃহস্থজনের নৌকা কিংবা তাদের কাউকে! দেশগ্রামের মানুষ সব কোথায় চলে গেল!

এই গ্রামে টাকা-পয়সাঅলা সচ্ছল মানুষ বলতে গেলে আমরাই। আর সবাই গৃহস্থলোক, চাষি, বর্গাদার। একসময় আমাদের প্রজাই ছিল সবাই। মুসলমান হওয়ার পরও তোমার বাবাকে, অর্থাৎ আমার দাদাকে সবাই বড়কর্তা ডাকত। তোমাকে কেউ কেউ ডাকত ছোটকর্তা। তুমি ধমক দিয়ে থামিয়েছ। ওসব কর্তামর্তা আজকের দিনে চলে না। আমাকে কর্তা ডাকা যাবে না। আমি কর্তা না, আমি তোমাদের মতোই সাধারণ একজন মানুষ।

তবে একজন কর্তা আমার খুব প্রিয়, বাবা। তোমার কারণেই প্রিয় হয়েছেন। তুমি তাঁর গানের মহাভক্ত। শচীন কর্তা। শচীন দেব বর্মণ। আগরতলায় মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নেওয়ার ফাঁকেও আমি একদিন শচীন কর্তার বাড়ি দেখতে গিয়েছিলাম। আর ওই যে তাঁর ওই গানটা, ‘তাকদুম তাকদুম বাজে, বাজে ভাঙা ঢোল’ ওই গানটা তো তিনি আমাদের জন্য, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরপরই বদলে দিয়েছিলেন।

বাজে তাকদুম তাকদুম বাজে বাংলাদেশের ঢোল।
সব ভুলে যাই তাও ভুলি না বাংলামায়ের কোল।

আরেক দিন ইব্রাহিম ভাই, তিনি ছিলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের টিচার, আমাদের একদল মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে গিয়েছিলেন শরণার্থী ক্যাম্পে। কী অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে বেঁচে আছে মানুষগুলো! কী ভয়াবহ কষ্টের মধ্যে বেঁচে আছে! না আছে খাদ্য, না আছে থাকার জায়গা, না আছে চিকিৎসা, না শিশুখাদ্য। রোগে-শোকে জর্জরিত, কলেরা-ডায়রিয়া এসব রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে মানুষ। সবচেয়ে কষ্টে ছিল বৃদ্ধ আর শিশুরা। কোনো কোনো ক্যাম্প একেবারেই শিশুশূন্য হয়ে গেছে। অর্থাৎ একটি শিশুও বেঁচে নেই।

ইব্রাহিম ভাই বলছিলেন, এই সব দৃশ্য তোমাদের দেখাতে এনেছি একটাই কারণে, যুদ্ধ করে এই মানুষগুলোকে তোমরা একটা স্বাধীন দেশ দাও। নিজের দেশে নিজের মতো করে বাঁচতে দাও মানুষগুলোকে।
যোদ্ধাদের চোখে পানি আসতে নেই। কিন্তু শরণার্থী ক্যাম্পে দেশের মানুষদের ওই অবর্ণনীয় কষ্ট দেখে আমরা কেউ কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। আমরা কেউ কেউ কেঁদেছিলাম। চোখ মুছতে মুছতে কেউ কেউ গিয়েছিলাম শক্ত হয়ে। পায়ের রক্ত লাফিয়ে উঠেছিল মাথায়। চোয়ালে চোয়াল এঁটে বলেছিলাম, ছাড়ব না, ওদের একটাকেও আমরা ছাড়ব না। আমাদের মানুষগুলোকে অবশ্যই আমরা ফিরিয়ে নেব স্বাধীন বাংলাদেশে।
বাবা, আগরতলায় গিয়ে শরীরের খুব ভেতরে অদ্ভুত এক শিহরণ অনুভব করেছিলাম। আগরতলার মাটিতে পা দিয়ে শরীরের রোম খাড়া হয়ে গিয়েছিল আমার। এত রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম, কী বলব তোমাকে! সেই অগি্নযুগে, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কালে তোমার বাবা বহুবার আশ্রয় নিয়েছেন আগরতলায়। ব্রিটিশদের উচ্ছেদ করার জন্য আমার দাদা যেখানে এসে আশ্রয় নিতেন, তার কত কত বছর পর সেই পরিবারের আরেকজন, পাকিস্তানিদের উচ্ছেদ করার জন্য, পূর্ব বাংলা কিংবা পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার জন্য, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে এসেছে সেই আগরতলায়। মুক্তিযোদ্ধা হয়ে দেশে ফিরে অস্ত্রহাতে সে পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে, বাংলাদেশ স্বাধীন করবে।

আগরতলা সম্পর্কে ভালো রকমের একটা ধারণাই আমার ছিল। আগরতলায় কখনো আর্যদের পা পড়েনি, কোনো বিদেশি শক্তি কখনো দখল করে নেয়নি আগরতলা। মোগল পাঠান ইংরেজ_কেউ না। ভারতবর্ষের অন্যান্য নগর যেভাবে লুণ্ঠিত হয়েছে বিদেশিদের হাতে, সেভাবে কখনো লুণ্ঠিত হয়নি আগরতলা। আগরতলার জনক হচ্ছেন মহারাজা কৃষ্ণকিশোর মাণিক্য।

এই শহরে একদিন এসে উঠেছিলেন তরুণ রবীন্দ্রনাথ। আখাউড়ার কাছাকাছি মোগড়ার রেলস্টেশনে এসে নেমেছিলেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে ত্রিপুরার মহারাজাদের যোগসূত্র দীর্ঘকালের। পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় যখন বাংলা ভাষার সরকারি মর্যাদা ছিল না, ফারসি ও ইংরেজি ভাষা যখন এই উপমহাদেশের সর্বত্র সরকারি ভাষা, ত্রিপুরার রাজভাষা তখনো বাংলা।

ত্রিপুরার মহারাজারা ছিলেন প্রবলভাবে স্বাধীনতাকামী। ব্রিটিশবিরোধী বাঙালি যোদ্ধারা আশ্রয় নিতেন ত্রিপুরায়। মহারাজারা তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। উপমহাদেশের বহু বাঙালি বিপ্লবী সেই সময় আশ্রয় নিয়েছিলেন ত্রিপুরার বিভিন্ন অঞ্চলে। আগরতলায়।

১৯০৯ সালে বিপ্লবী দলগুলোর প্রকাশ্য কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল ব্রিটিশরা। তখন বিপ্লবী দলগুলোর নেতা-কর্মীরা দলে দলে আশ্রয় নিয়েছিলেন আগরতলায়। আমার দাদাও ছিলেন তাঁদের মধ্যে। এই ভেবে কার না গা শিউরে ওঠে, বাবা?

আশি বছরের দীর্ঘ জীবনে ষাট বছরই ত্রিপুরার মহারাজাদের সঙ্গে জড়িত ছিলেন আমার ভাষার শ্রেষ্ঠতম কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ত্রিপুরার চার মহারাজা এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথের সানি্নধ্যে। রবীন্দ্রনাথের নানা লেখায় এ জন্যই ঘুরেফিরে এসেছে ত্রিপুরার কথা। যেমন ‘রাজর্ষি’, যেমন ‘বিসর্জন’। কত গান, কত কবিতা রবীন্দ্রনাথ উপহার দিয়েছেন আগরতলাকে! রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় হাত খুলে টাকা দিয়েছিলেন ত্রিপুরার মহারাজারা। মহারাজা বীরচন্দ্রই সর্বপ্রথম রবীন্দ্রনাথকে ‘কবি’র সম্মানে ভূষিত করেছিলেন। বীরচন্দ্রর চতুর্থ প্রজন্ম বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য একেবারে শেষ বয়সে কবিগুরুকে ‘ভারতভাস্কর’ উপাধি দিলেন। কবির সম্মানে আগরতলায় বিশাল, বর্ণাঢ্য এক ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই সম্মান দেওয়া হয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে।

বিক্রমপুরের রাঢ়িখাল গ্রামে জন্মেছিলেন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বিলাতে গিয়ে বিজ্ঞান গবেষণা করবেন জগদীশচন্দ্র। প্রচুর টাকার দরকার। বন্ধুর জন্য টাকা সংগ্রহে মাঠে নামলেন রবীন্দ্রনাথ। এই কথা ত্রিপুরার মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্যর কানে গেল। বন্ধুর জন্য ভিক্ষার ঝুলি হাতে নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ এটা তাঁর মনঃপূত হলো না। কবিকে তিনি লিখলেন, ‘এ বেশ আপনার সাজে না। আপনার বাঁশি বাজানই কাজ। আমরা ভক্তবৃন্দ ভিক্ষার ঝুলি বহন করিব।’

চিঠির শেষ দিকে লিখলেন, ‘প্রজাবৃন্দের প্রদত্ত অর্থই আমাদের রাজভোগ জোগায়, আমাদের অপেক্ষা জগতে কে আর বড় ভিক্ষুক?’

রাধাকিশোর মাণিক্য কবির সম্মানে তাঁর বন্ধু জগদীশচন্দ্র বসুকে তাঁর বিজ্ঞানসাধনার জন্য সেই যুগে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। নানা রকম সহায়তা দিয়েছিলেন ‘বসুবিজ্ঞান মন্দির’ প্রতিষ্ঠায়।

বাঙালি অন্ধকবি হেমচন্দ্র এবং ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’খ্যাত মনীষী দীনেশচন্দ্র সেন তাঁদের জীবনের সংকটময় মুহূর্তে ত্রিপুরার মহারাজাদের কাছ থেকে আর্থিক মাসোহারা পেয়ে সংকট কাটিয়েছেন।

আমি একটা বই পড়েছিলাম, বাবা। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের লেখা। ‘হিস্ট্রি অব ফ্রিডম মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া’। এই গ্রন্থের এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘ত্রিপুরার রাজাদের অনুগত প্রজা বা সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য পাহাড়ি এলাকা বিলোনিয়া ও উদয়পুরে দুটি খামার ছিল। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়, রবীন্দ্রনাথের বিশিষ্ট ভূমিকার ফলে বাংলার হিন্দু-মুসলমান রাখি বেঁধেছিলেন। ১৯০৬ সালে স্থানীয় উমাকান্ত একাডেমীতে ‘রাখিবন্ধন উৎসব’ পালিত হয়।

সেই আমলে ‘প্রশিক্ষণ খামার’ বলতে যা বোঝানো হয়েছিল, সে প্রশিক্ষণ খামারই এখন হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্প। আমরা ট্রেনিং নিচ্ছি। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ট্রেনিং। দেশ স্বাধীন করার ট্রেনিং।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রধান আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে আগরতলা। ধর্মনগর থেকে শুরু করে আব্রুম-ত্রিপুরার প্রতিটি মানুষের কাছে ‘জয় বাংলা’ হচ্ছে গভীরতর এক ভালোবাসার নাম। শ্রদ্ধা, সম্ভ্রমের নাম। ওই অঞ্চলের জাতি-উপজাতি সবার কাছে, সর্বস্তরের মানুষের কাছে। ত্রিপুরা ছোট রাজ্য, ভারতের একেবারেই পিছিয়ে পড়া রাজ্য। এই রাজ্যে পঁচিশে মার্চের পর থেকেই আশ্রয় নিতে শুরু করেছে বাঙালিরা। প্রতিদিন এ দেশের হাজার হাজার মানুষ ঢুকে যাচ্ছে আগরতলায়। চারদিকে শুধুই শরণার্থী ক্যাম্প, শুধুই এ দেশের মানুষ। কত চেনা মানুষ, কত পরিচিত মানুষ। আরেকটা বড় পরিচয় তো সবার আছেই, সবাই স্বাধীনতাকামী মানুষ। সবাই চাইছে, বাংলাদেশ হবে স্বাধীন দেশ। স্বপ্নের দেশ। পাকিস্তানি তো দূরের কথা, তাদের ছায়াও থাকবে না এ দেশে।
আমাদের দেশের সঙ্গে ত্রিপুরার ভৌগোলিক অবস্থানটাও বেশ অদ্ভুত, বাবা। ভারত তিন দিক থেকে বেঁধে রেখেছে বাংলাদেশকে, বাংলাদেশ তিন দিক থেকে আলিঙ্গন করে আছে ত্রিপুরাকে। ত্রিপুরা সীমান্তের নব্বই ভাগেরও বেশি আমাদের দেশের সঙ্গে। বাদবাকি অংশের কিছুটা আসামের সঙ্গে, কিছুটা মিজোরামের সঙ্গে। ঢাকা থেকে ট্রেনে করে কুমিল্লার আখাউড়া যাওয়া মানেই আগরতলার বুকে ঢুকে যাওয়া। সড়কপথে ঘণ্টা তিনেকের পথ। এ জন্যই স্রোতের মতো লোক প্রতিদিন ঢুকছে আগরতলায়।

কিন্তু গ্রাম এত নির্জন কেন? কেন কোথাও নেই প্রাণের সাড়া? কেন কোনো বাড়িতে কান্না শোনা যায় না কোনো শিশুর? কেন কোনো বাড়িতে চিৎকার করে কেউ কাউকে ডাকে না? কেন কোনো বাড়ির আথালে হাম্বা ডাকে না গাইগরু? কুকুরের ঘেউ ডাক নেই কেন কোথাও? এমনকি পাখিও ডাকে না কোথাও। কাকপক্ষীর ডাকটি পর্যন্ত শোনা যায় না। দিনের বেলাই যেন অন্ধকার গভীর, গভীরতর চারদিকে। শুধু ঝিঁঝি ডাকে। ঝিঁঝি।
বাড়িতে ঢোকার মুহূর্তেই যেন ব্যাপারটা আমার মনে এল বা খেয়াল করলাম আমি। আসার পথে মনে হয়নি।
কী কারণ?

নিশ্চয় বাড়ি ফেরার আনন্দে আমি ছিলাম এক ঘোরের মধ্যে। অন্য কোনো দিকে আমার মন ছিল না। আমার মন ছিল শুধু তোমার দিকে, বাবা। তোমার সঙ্গে দেখা হবে। মন ছিল মায়ের দিকে। মায়ের মুখখানি দেখব কত দিন পর! আর আমার আদরের বোনটি, বকুল। বকুলকে দেখিনি তিন মাস, এমন কি কখনো হয়েছে!

আরেকজন মানুষ, বাবা। তোমার পুত্রবধূ। মায়া। মায়ার গর্ভে আমার সন্তান। এ সময় স্বামীকে খুব দরকার মেয়েদের। আর আমি আছি তাকে ছেড়ে। যদি একটা রাতের জন্যও তার পাশে থাকতে পারি, তাকে সঙ্গ দিতে পারি, ওই একটি রাতের স্মৃতি নিয়ে আমরা দুজনেই পারব আরো কতগুলো দিন কাটিয়ে দিতে। মাস দুয়েকের মধ্যে আমাদের সংসারে আসবে নতুন অতিথি, তোমার তৃতীয় প্রজন্ম। থার্ড জেনারেশন। থার্ড জেনারেশন নাকি ফার্স্ট জেনারেশনের স্বভাব-চরিত্র আর মেধা পায়। আমার পুত্র কিংবা কন্যা যা-ই হোক, আমি চাই সে তোমার মতো হোক। তোমার চরিত্র, ব্যক্তিত্ব আর মেধায় যেন উজ্জ্বল হয় তার জীবন।
এই ঘোরের কারণেই গ্রাম কেন নির্জন হয়ে আছে খেয়াল করিনি আমি!

তা-ই হবে।
কী যেন বলছিলাম, বাবা? ও, মানুষের মনবৈচিত্র্যের কথা! কখন কোন ঘটনা কেন মনে আসে, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। আবার এমনও হতে পারে, ব্যাখ্যা আছে, আমরা জানি না। রবীন্দ্রনাথের গানের কথা কেন আমার মনে এল? ‘আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে’। মনে হয় কোনো না কোনো কারণে শ্রাবণ শব্দটা মনে এসেছিল। ওই শব্দ থেকেই হয়তো রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত চলে গেছি।

আর যেন কী বলছিলাম? দেশের খবরাখবর পাওয়ার কথা! এই তো কদিন আগে শালদা নদীতে পাকিস্তানি সেনাবোঝাই সাত-আটটা নৌকাকে অ্যাম্বুশ করে মুক্তিবাহিনী। তাদের গুলিতে চার-পাঁচটা নৌকা নদীতে ডুবে যায়। পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটে পাল্টা আক্রমণ চালায়। দুপক্ষের মধ্যে আধঘণ্টাখানেক গোলাগুলি হয়। যুদ্ধ চলে। এতে পাকিস্তানিদের ষাট-সত্তরজন সৈনিক হতাহত হয়। তাদের রসদ নষ্ট হয় প্রচুর। অন্যদিকে পাকিস্তানিদের আক্রমণে চারজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। একজন আহত হন।

আরেকটি খবর হচ্ছে, শান্তি কমিটির অন্যতম নেতা এবং কাউন্সিল মুসলিম লীগের সহসভাপতি পাকিস্তানের আদর্শ ও অখণ্ডতা রক্ষার জন্য দৃঢ়প্রত্যয় ও সাহসিকতার সঙ্গে সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আহ্বান জানান। মুসলিম লীগের সব গ্রুপকে একত্র করে একটি প্রকৃত জাতীয় সংস্থারূপে গড়ে তোলার দৃঢ়সংকল্প ব্যক্ত করেন।
আরেকটি খবর, ঢাকা শহরে মুসলিম লীগের এক সভায় মুসলিম লীগ সেক্রেটারি মুসলিম লীগের প্রতিটি কর্মী ও সদস্যকে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়ে দুষ্কৃতকারীদের দমন করার নির্দেশ দেয়।
দুষ্কৃতকারী বলতে মুক্তিযোদ্ধাদের বুঝিয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধারা দুষ্কৃতকারী?
বলিস কিরে শুয়োরের বাচ্চা!
তবে এই শুয়োরের বাচ্চাদের সবার খবরই আমরা নেব, বাবা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। তখন ওদের প্রত্যেকটাকে আমরা ধরব। যেভাবে আমাদের ওরা মারছে, তারচেয়েও বহুগুণ বেশি কষ্ট দিয়ে ওদের আমরা মারব।

এখনো মারছি! সুযোগ পেলেই মারছি। আর দেশের আনাচকানাচে থানায়-ইউনিয়নে যেখানে যত রাজাকার আছে, শান্তিবাহিনী, আলবদর-আলসামস যে নামের কুত্তাগুলোই আছে, একটিকেও আমরা ছাড়ব না। প্রত্যেকের খবর আমরা নিচ্ছি। প্রত্যেকের লিস্ট করছি। ধরব প্রত্যেকটাকেই।

আবার এমনও হতে পারে, স্বাধীনতার আগে আগেই পাকিস্তানিগুলোর সঙ্গে ওদের এ দেশীয় চাকর-নফরগুলোকে আমরা খতম করে দেব। স্বাধীন বাংলাদেশে ওদের অস্তিত্বই আমরা রাখব না।
কোথা থেকে যেন একটু হাওয়া আসছে, বাবা। মৃদু শব্দে নড়ছে গাছের পাতা। হাওয়াটা কি এখনই এল, নাকি আগে থেকেই বইছিল? গাছের পাতা কি এখনই নড়ছে, নাকি আগে থেকেই নড়ছিল?

আমি কিছুই টের পাচ্ছিলাম না, বাবা! এখন হঠাৎই যেন পেলাম। এই যে এতক্ষণ ধরে পাশে বসে তোমার বুকে হাত বুলাচ্ছি, রক্তে চটচটে হয়ে আছে তোমার বুক, যে মাটিতে বসে আছি, সেখানেও রক্ত শুকিয়ে মাটি হয়েছে চটচটে, এসবের কিছুই যেন এতক্ষণ অনুভব করিনি। এখন যেন অনুভূতিগুলো অতি ধীর-মন্থর গতিতে শরীরে এসে ভর করছে। এই প্রথম টের পেলাম, তোমার শরীর বরফের মতো শীতল হয়ে আছে। যেন শীতকালের কচুরিভরা পুকুরজলে অনেকক্ষণ ডুব দিয়ে ছিলে তুমি।

আচ্ছা বাবা, এই যে বাড়ির উঠোনে এইভাবে পড়ে আছে তোমার লাশ, একবার ভাবো তো, এ রকম দৃশ্য কি এই তল্লাটের কেউ কখনো কল্পনা করেছে? কেউ কখনো ভেবেছে, না ভাবতে পারবে?

তবে উঠোনের দিকে ক্লান্ত শরীর টেনে টেনে হেঁটে আসার সময়ই, দূর থেকে উঠোনের দিকে তাকিয়েই, তোমাকে পড়ে থাকতে দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম কী ঘটেছে বাড়িতে। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই বাবা, কিছুই মনে নেই। পদে পদে ভয়-উৎকণ্ঠা, কখন ধরা পড়ে যাই রাজাকার কিংবা আর্মির হাতে, কখন কিভাবে বাড়ি পেঁৗছব, কখন তোমাদের সঙ্গে দেখা করে কিভাবে ফিরে যাব সহযোদ্ধাদের কাছে_এসব ভয় উৎকণ্ঠা উত্তেজনা ইত্যাদি কাটিয়ে, ক্লান্ত-বিপর্যস্ত ছেলেটি তোমার যখন বাড়ির উঠোনের দিকে আসছে, তোমাকে দেখেছে এভাবে পড়ে থাকতে, তখন তার শুধু একটাই অনুভূতি, যেন আচমকা সে পাড়া দিয়েছে বিষাক্ত এক কালজাতের লেজে, মুহূর্তে সেই সাপ সাঁ করে ফণা তুলেছে, ছোবল দিয়েছে পায়ে। কালজাতের বিষ মুহূর্তেই মিশে যাচ্ছিল রক্তে। বিষে বিষে জর্জরিত ছেলেটি তোমার দিশেহারা হয়ে ছুটছিল উঠোন, উঠোন পেরিয়ে দাদার আমলের দরদালানের বারান্দা, বারান্দার পর বসার ঘর, মা আর তোমার ঘর, বকুলের ঘর, আমার আর মায়ার ঘর, পেছন দিককার আঙিনা…
কতক্ষণ, কতটাক্ষণ ও রকম দিশেহারা ভাব গেছে, কে জানে! তারপর, তারপর কেমন যেন নিস্পৃহ হয়ে গেলাম। স্মৃতিশূন্য, বোধহীন মানুষের মতো দেখতে এক জড় পদার্থ। কারণ আমার ততক্ষণে দেখা হয়ে গেছে কাকে কিভাবে মেরেছে ওরা। আমার মা পড়ে আছে বারান্দায়, বোনটি তার বিছানায়, পেছন দিককার দরজা খুললেই রান্নাঘরের ওদিককার আঙিনা, সেখানটায় পড়ে আছে মায়া। তার চারপাশে ভ্যানভ্যান করছে বেশ কিছু মাছি। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, তবু যাচ্ছিল না মাছিগুলো।

হাত নাড়িয়ে আমি একটু মাছিগুলো তাড়ানোর চেষ্টা করেছিলাম।

তারপর কখন কিভাবে তোমার কাছে ফিরলাম, তোমার পাশে বসে পড়লাম, কিছু মনে নেই, বাবা। তোমার বুকে কতক্ষণ ধরে হাত বুলাচ্ছি, মনেই নেই। একসময়, ধীরে, অতিধীরে অনুভূতিগুলো ফিরতে শুরু করল শরীরে। স্মৃতিশূন্য ফাঁকা মাথায় এসে ভর করতে লাগল স্মৃতি। কালজাতের বিষে জর্জরিত রক্ত থেকে ধীরে ধীরে কমতে লাগল বিষ। মানুষের অনুভূতি অনুভব স্মৃতিসত্তা, অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যৎ_সব একাকার হয়ে জেগে উঠতে চাইল এই নরদেহে।
তুমি বলেছিলে, মানুষের চেয়ে বিচিত্র এই পৃথিবীতে আর কিছু নেই। মানুষ সব পারে। প্রকৃতি মানুষকে নিজস্ব অদ্ভুত এক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করে।
আমাকে কি এখন নিয়ন্ত্রণ করছে, বাবা?

আমার কেন এত কথা মনে পড়ছে? কাঞ্চনপুরের চৌধুরীরা তিনপুরুষ ধরে বিখ্যাত।

তোমার বাবা, অর্থাৎ আমার দাদা সিরাজুল হক চৌধুরী ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করা লোক। অগি্নযুগের মানুষ। সেই আমলের এনট্রান্স পাস। আন্দোলনের জন্য জেল খেটেছেন। জেলে অনশন করেছেন, পুুলিশের নির্যাতনে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন কয়েকবার। অতি কঠিন ধরনের মানুষ। হাজার নির্যাতন করেও ব্রিটিশ পুলিশ তাঁর মুখ থেকে বের করতে পারেনি স্বদেশি আন্দোলন করা তাঁর সঙ্গীদের নাম। নির্যাতনে নির্যাতনে জ্ঞান হারিয়েছেন। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর আবার বলেছেন, দরকার হলে আমাকে তোমরা মেরে ফেলো। আমি মৃত্যুর জন্য তৈরি। কিন্তু সঙ্গীদের কারো নাম আমি বলব না। তাদের কারো হদিস তোমাদের দেব না।
শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদেরকে এই ভূখণ্ড থেকে তাড়িয়েই ছেড়েছিলেন তাঁরা।
আগরতলায় বসে একজন মুক্তিযোদ্ধার কথা শুনলাম, বাবা। জুন মাসের ঘটনা। রাজশাহী জেলার রোহনপুর এলাকার একজন মুক্তিযোদ্ধা ধরা পড়েছেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে। ধরা পড়ার পর তাঁর ওপর চালানো হচ্ছে অবর্ণনীয় অত্যাচার-নির্যাতন। আর একটার পর একটা প্রশ্ন। তোমার সঙ্গীরা কে কোথায় আছে, তাদের নাম-পরিচয় বলো, ঠিকানা বলো। শত অত্যাচারেও সেই বীর, তরুণ মুক্তিযোদ্ধা মুখ খুলছেন না। অত্যাচারের মাত্রা বাড়ছে, মৃত্যুমুখে চলে যাচ্ছেন তরুণ, তবু মুখ খুলছেন না। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি এক মেজর তাঁর বুকে স্টেনগান ধরল। আমাদের প্রশ্নের উত্তর দাও।

মুক্তিযোদ্ধা বললেন, না।
তাহলে তোমাকে মরতে হবে। এখনই আমি তোমাকে গুলি করে মেরে ফেলব।
নির্ভীক সেই তরুণ বীর, বাংলার শ্রেষ্ঠতম এক সন্তান মুখ নিচু করে মাতৃভূমির মাটিকে শেষবারের মতো চুমু খেলেন। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। আমার রক্ত আমার প্রিয় দেশটিকে, আমার মাতৃ-পিতৃভূমিকে স্বাধীন করবে।
এই হচ্ছে আমাদের দেশপ্রেম! এই হচ্ছে বীরত্ব!

আমার দাদার মতো বীরদের দেখে ব্রিটিশরা যেমন বুঝেছিল ভারতবর্ষ তাদের অবশ্যই ছাড়তে হবে, রোহনপুরের সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে দেখে পাকিস্তান সেনাবাহিনীও বুঝে গেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা তারা ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না, মুক্তিযোদ্ধাদের তারা পরাজিত করতে পারবে না। দুদিন আগে কিংবা পরে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বেদম মার খেয়ে, পরাজয়ের গ্লানি স্বীকার করে, মাথা নিচু করে এই দেশ ছেড়ে যেতে হবে তাদের।

যৌবনকাল থেকে শুরু করে মধ্যবয়স পর্যন্ত দাদা থেকেছেন তাঁর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন নিয়ে। দুই বাংলার কোন কোন সব জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। বেশির ভাগ সময়ই থাকতেন পশ্চিমবঙ্গে। বর্ধমান বীরভূম কৃষ্ণনগর কলকাতা। একটা পর্যায়ে মাসের পর মাস আগরতলায়।

সেই আমলে অল্প বয়সে বিয়ে করার প্রচলন ছিল। বিশ-একুশ বছর বয়সে বিয়ে করে ফেলেছিলেন দাদা। দুটি প্রতিবন্ধী ভাইবোন ছিল। সে দুজন আবার যমজ। তাদের দেখভালের জন্য বাড়িতে অতি আপন একজন মানুষ দরকার। বিয়ে করার এটাও একটা কারণ। দাদার মা-বাবা অল্প বয়সে মারা গিয়েছিলেন। দাদা নিজে জড়িয়েছেন আন্দোলনের সঙ্গে। যদিও বাড়িতে কাজের লোকজনের অভাব নেই, কিন্তু লোকজনের হাতে ভাইবোনকে কেমন করে ছেড়ে দেওয়া যায়!

প্রতিবন্ধী দেবর-ননদের দায়িত্ব নিয়ে সংসারে এসেছিলেন দাদি। তিনি ছিলেন একটু দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। অন্যদিকে দাদার পরিবার হচ্ছে বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক। কাঞ্চনপুর গ্রামটা বলতে গেলে পুরোটাই তাঁদের। সেই সংসারে এসে দাদি, ওইটুকু বয়সে, কত বয়স হবে তাঁর তখন, চৌদ্দ-পনেরো, ওই বয়সেই তিনি হয়ে গেলেন প্রতিবন্ধী যমজ দেবর-ননদের মা। সত্যিকার মায়ের স্নেহে আগলাতে লাগলেন তাদের। এদিকে বছর ঘুরতে না ঘুরতে তিনিও মা হলেন। ফুপু জন্মালেন, চাচা জন্মালেন, তারপর তুমি, আমার বাবা। দেবর, ননদ আর ছেলেমেয়ে নিয়ে দাদি পড়ে থাকেন কাঞ্চনপুরে আর দাদা তাঁর আন্দোলন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কোথায় কোথায়। না চিঠিপত্র, না মাসের পর মাস কোনো যোগাযোগ। হঠাৎ এক অন্ধকার রাতে বাড়ি এলেন। কয়েকটা দিন হয়তো কাটালেন। দাদির কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে আবার উধাও হয়ে গেলেন।

তোমাদের পরিবারের এই ইতিহাস আমি তোমার কাছ থেকে জেনেছি, বাবা। গল্পের মতো করে আমাকে তুমি সব বলেছ। সাত শ বিঘার ওপর জমি ছিল দাদার। ওয়ারিশ বলতে দাদা আর তাঁর দুই প্রতিবন্ধী ভাইবোন। নিজেদের চাষবাস করার প্রশ্নই ওঠে না, সব জমি বর্গা দেওয়া। যারা ফসল ফলাবে তারা পাবে অর্ধেক, মালিক পাবে অর্ধেক। সেই অর্ধেকেরই যা আয়, এক বছরের আয়ে পাঁচ বছর চলা যায়।
সেই আমলেই ধান বিক্রির হাজার হাজার টাকা থাকত দাদির কাছে। আন্দোলনের কাজে স্বামীকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দিয়ে দিতেন তিনি।

তোমাদের শিশু বয়সেই দাদার সেই যমজ প্রতিবন্ধী ভাইবোন মারা যায়।
প্রথমে মারা যায় ভাইটা। তার মৃত্যুর পর বোনটার এমন অবস্থা হলো, কথা বলতে পারে না, মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না, অবলা প্রাণীর মতো শুধু শব্দ করে আর দিশেহারা ভঙ্গিতে চারদিকে তাকিয়ে ভাইটিকে খোঁজে। হাঁটাচলা করতে পারে না, শরীর টেনে টেনে, লেছড়ে লেছড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চায় ভাইয়ের খোঁজে।
তারপর খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিল। হাজার শক্তি খাটিয়েও মুখে কিছু দেওয়া যায় না তার। খাওয়াতে গেলে মুখ থেকে থু করে সব ফেলে দেয়, বমি করে ফেলে। আর সারাক্ষণ অবলা প্রাণীর মতো গোঙাচ্ছে। চোখে পানি নেই, দিশেহারা দৃষ্টি। ভাইটাকে খোঁজে, শুধু ভাইটাকে খোঁজে।
এইভাবে কত দিন বাঁচতে পারে মানুষ?

মাসখানেকের মাথায় সেও চলে গেল ভাইয়ের পথে। সে যেন এক ইচ্ছামৃত্যু, সে যেন এক আত্মহত্যা।
এই ঘটনা শুনে আমরা খুব কষ্ট পেতাম, বাবা। তোমার চাচা-ফুপুর এমন মৃত্যু!
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যমজ হয় সাধারণত দুটো বোন আর নয়তো দুটো ভাই। আমার দাদার ছিল ভাইবোন। আহা, যদি প্রতিবন্ধী না হতো তারা! যদি স্বাভাবিক মানুষ হয়ে বেঁচে থাকত, তাহলে চৌধুরী বংশ ডালপালা ছড়িয়ে আরো বড় হতো। আমাদের চারপাশে থাকত অনেক আত্মীয়, অনেক মানুষ।

তবে তাদের মৃত্যুতে দাদি নাকি একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন, মাথায় গণ্ডগোল হয়ে গিয়েছিল তাঁর। যেন নিজের যমজ সন্তান মারা গেছে, যেন নিজের বুকের মানিক চলে গেছে তাঁকে ছেড়ে, উঠোনে বসে এমন করে বিলাপ করতেন, এমন করে কাঁদতেন। তাঁর কান্না দেখে তোমরা তিনটি ভাইবোন স্তব্ধ হয়ে থাকতে। বাড়ির কাজের লোকজন স্তব্ধ হয়ে থাকত।

ভাইবোনের মৃত্যুর খবর আগরতলায় বসে পেয়েছিলেন দাদা। বাড়ি এলেন। পুলিশ তখনো তাঁকে খুঁজছে। এবার ধরা পড়লে হয় দ্বীপান্তর, না হয় ফাঁসি। রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে বাড়ি এলেন তিনি। এই যে আমি যেমন দিনের বেলাও গা ঢাকা দিয়ে এলাম। মানে নিজেকে একেবারে অচেনা মানুষ হিসেবে তৈরি করে এলাম। বললাম না, আমাকে দেখে গ্রামের সাধারণ মানুষ অনেকেই চিনতে পারবে না।

বুঝতে পারি, দাদারও তখন আমার মতোই অবস্থা। মুক্তির জন্য যুদ্ধ করা সব মানুষের চেহারা এক রকম হয়, বাবা। পৃথিবীর যে প্রান্তের মানুষই দেশের স্বাধীনতার জন্য, মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছেন বা করছেন, তাঁরা সবাই এক রকম। তাঁদের আচার চালচলন চিন্তাচেতনা এক রকম। তাঁদের প্রত্যেকের একটাই পরিচয়_মুক্তিযোদ্ধা।
এই মুহূর্তে একটা প্রশ্ন মনে আসছে, বাবা। ব্রিটিশরা কি পাকিস্তানিদের মতো এত নিষ্ঠুর ছিল? তারা কি কখনো এইভাবে মানুষ মেরেছে? এইভাবে সম্ভ্রমহানি করেছে ভারতবর্ষের নারীদের? একজন মুক্তিযোদ্ধাকে ধরতে পারলে পাকিস্তানি সেনারা যেভাবে তাঁর ওপর অত্যাচার করে, যে অত্যাচারের বর্ণনা মানুষের ভাষায় দেওয়া সম্ভব না, কোনো স্বদেশিকে ধরতে পারলে ব্রিটিশরা কি ও রকম অত্যাচার করত?

আমার মনে হয় না। যদি তা-ই হতো তাহলে ধরা পড়ার পর দাদা আর বেঁচে থাকতেন না। দাদা আর ফিরে আসতে পারতেন না সংসারে।
পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়ার পর কোনো মুক্তিযোদ্ধা কি জীবন নিয়ে ফিরতে পেরেছেন?

তোমার পাশে বসে আজ দাদার সঙ্গে নিজের অনেক মিল খুঁজে পাচ্ছি, বাবা। ওই যে একবার বললাম না, থার্ড জেনারেশন অনেকটাই পায় ফার্স্ট জেনারেশনের স্বভাব-চরিত্র। দাদা ছিলেন ব্রিটিশ শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করার যোদ্ধা আর আমি পাকিস্তানিদের হাত থেকে আমার দেশকে মুক্ত করার যোদ্ধা। দুজনই এক রকম। একটাই পরিচয় আমাদের_মুক্তিযোদ্ধা।

তুমি অবশ্য সেই ছেলেবেলা থেকেই বলতে, আমি নাকি তোমার বাবার মতো হয়েছি। এ জন্য আমাকে তুমি কখনো নাম ধরে ডাকোনি। ডাকতে বাবা বলে। রেগে গেলে, শাসন করলে, কখনো চড়চাপড় মারলেও বাবা শব্দটাই তোমার মুখে থাকত। রাগ-অভিমান করেও রবি নামে আমাকে কখনো ডাকোনি।
বাবাকে কি কেউ নাম ধরে ডাকে কখনো?

আমি কি তোমাকে মতিনুল হক চৌধুরী বলে ডাকব?
তাই কি হয়?
তখন কাঞ্চনপুর আরো অজগ্রাম। এত বাড়িঘরও হয়নি। দূরে দূরে বিচ্ছিন্ন একটা-দুটো বাড়ি। ডোবানালা-পুকুরে ভর্তি। চারদিকে শুধুই ধান-পাটের ক্ষেত, তিল-কাউনের ক্ষেত। বিলের ওপারে রজতরেখাও তখন বহুদূরে। কাঞ্চনপুর থেকে চার-পাঁচ মাইল হবে। কালে কালে নদী তার স্বভাবমতো ভেঙেছে। ভাঙতে ভাঙতে বিলের দিকে এগোচ্ছে। রজতরেখার সঙ্গে কাঞ্চনপুরের দূরত্ব কমে গেছে।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজাকারদের মতো নফর ব্রিটিশদের তেমন ছিল না। যে দু-চারজন ছিল, সেগুলো শহরটহরেই থাকত, মহকুমা বা থানা পর্যায় পর্যন্তও হয়তো ছিল। গ্রামে গ্রামে, ইউনিয়নে ইউনিয়নে ছিল না। একজন স্বদেশি নিজের বাড়িতে এলেই যে ধরা পড়ে যাবে, তেমন সম্ভাবনা ছিল শহরাঞ্চলে। গ্রামে, বিশেষ করে একেবারেই পথঘাট নেই, যোগাযোগের ব্যবস্থা শোচনীয়, এমন গণ্ডগ্রামে সেই সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। যদিও ব্রিটিশদের কোনো অনুচর জেনে যেত, হ্যাঁ, অমুক গ্রামের অমুক বাড়ির অমুক স্বদেশি এখন বাড়িতেই আছেন, তাঁকে ধরার জন্য থানা পর্যন্ত খবর পেঁৗছাতে পেঁৗছাতে, পুলিশ আসতে আসতেই তিনি পালিয়ে যেতে পারতেন নিরাপদে।

আর ব্রিটিশ পুলিশ কিংবা তাদের সঙ্গের ভারতীয় পুলিশ কোনো স্বদেশিকে ধরতে না পারলে যে তাঁর বাড়িঘর পুড়িয়ে দেবে, তাঁদের বাড়ির বা গ্রামের প্রতিটি মানুষকে মারবে, নারীর সম্ভ্রমহানি করবে, এমন ঘটনা ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। ব্রিটিশরা পাকিস্তানিদের চেয়ে কোটিগুণ ভালো ছিল।

ভাইবোনের মৃত্যুর খবর পেয়ে বাড়ি এসে স্ত্রীর করুণ অবস্থা দেখে, তিন ছেলেমেয়ের অসহায় অবস্থা দেখে দাদা ভাবলেন, এই মানুষগুলোকে তাঁর রক্ষা করা উচিত। ভারতবর্ষের সব মানুষকে ব্রিটিশদের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টার চেয়ে এই চেষ্টাটাও কম না। নিজ পরিবারকে রক্ষা করাও বিশাল কাজ। এও এক রকমের মুক্তিযুদ্ধ।
তবে পুলিশ লেগে আছে পেছনে, এই অবস্থায় কী করবেন? কেমন করে বাড়িতে থাকবেন, কেমন করে ঠিক করবেন এলোমেলো হয়ে যাওয়া সংসার!

লোকবলের অভাব ছিল না দাদার। গ্রামের লোকজন সবই তাঁর চাষি, সবই তাঁর প্রজামতো। সবাইকে বলে দিলেন চোখ-কান খোলা রাখতে। গ্রামের দিকে পুলিশ আসছে দেখলেই মুহূর্তে যেন সেই খবর আসে দাদার কাছে। মুহূর্তেই যেন পালাতে পারেন তিনি।

দিনের বেলার জন্য এই ব্যবস্থা আর রাতের বেলা অন্য ব্যবস্থা। নিজের বাড়িতে তিনি থাকতেনই না। গ্রামের এবাড়ি-ওবাড়িতে গিয়ে থাকতেন।
এভাবে কেটেছে অনেকগুলো বছর।
আশ্চর্য ব্যাপার, ওই অতগুলো বছরে একবার মাত্র দাদাকে খুঁজতে পুলিশ এসেছিল গ্রামে। দুপুরের দিকে। যথারীতি মুহূর্তে খবর এল দাদার কাছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিলের ওদিককার এক পাটক্ষেতে সারা দিন গা ঢাকা দিয়ে রইলেন তিনি। সন্ধ্যার দিকে ফইজু নামের এক চাষি তাঁকে খুঁজে বের করে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল। খেয়েদেয়ে সেই বাড়িতে রাতটা কাটালেন তিনি।

সে এক অদ্ভুত জীবন। সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধার জীবন।
তারপর এল সাতচলি্লশ সাল। ব্রিটিশরা পাততাড়ি গোটাল। জন্ম হলো ভারত আর পাকিস্তান নামের বিচিত্র একটা দেশ। যে দেশের দুটো ভাগ। একটা পশ্চিম পাকিস্তান আরেকটা পূর্ব পাকিস্তান। এক পাকিস্তান থেকে আরেক পাকিস্তানের দূরত্ব বারো শ মাইল। মাঝখানে ভারত। সত্যি সত্যি বিচিত্র দেশ। এমন দেশ পৃথিবীতে আর নেই।
বাবা, দেশভাগের অনেক অনেক বছর আগেই তোমরা তিন ভাইবোন বড় হয়ে গেছ। দাদি মারা গেলেন। ফুপুর বিয়ে হয়ে গেল। ফুপা লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়েন। যে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জীবনভর আন্দোলন করেছেন দাদা, তাঁর কন্যা সংসার করতে চলে গেল ব্রিটেনে। তারপর পিঠোপিঠি ভা

[ad#co-1]

Leave a Reply