মাওয়ায় চাঁদাবাজির মহোৎসব ॥ কৃত্রিম যানজট ॥ দুর্ভোগ

মোহাম্মদ সেলিম, মাওয়া থেকে ফিরে
মাওয়ায় এখন চলছে চাঁদাবাজির মহোৎসব। এই চাঁবাজির জন্য আবার সৃষ্টি করা হচ্ছে কৃত্রিম যানজট। এতে ঈদে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌছেছে। এই চাঁদাবাজির সঙ্গে পুলিশ, আনসার, বিআইডব্লিউটিসি, বিআইডব্লিউটিএ এবং পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন জড়িত। সোমবার মাওয়ায় দিনভর অবস্থান করে এসব চিত্র দেখা গেছে। ট্রাক চালক মিজানুর রহমান (ট্রাক নং যশোর ট-১১-১৯৮৪) ফেনী থেকে কাঠ বোঝাই করে শুক্রবার আসেন মাওয়ায়। অপেক্ষায় থেকে সিরিয়ালের পেয়ে সোমবার দুপুর দেড়টায় তার ফেরিতে উঠার সুযোগ হয়। তবে এ পর্যন্ত আসতে শুধু মুন্সিগঞ্জ সিমানায় চার পয়েন্টে পুলিশকে দিতে হয়েছে ৪ শ’ টাকা। সিরিয়ালের জন্য মাওয়ায় আনসারকে ৩০ টাকা, মাওয়ায় পুলিশকে ৫০টাকা, পার্কিং ইয়ার্ড ব্যবহার না করেও ৫৫ টাকা, রামশ্রী ফেরির লস্কর খায়রুল আলমকে ১শ’ টাকা, মালিক সমিতির নামে ২০ টাকা এবং ফেরি ভাড়া ১২৬০ টাকার স্থলে ১৮শ’ টাকা গুনতে হয়েছে তার।

প্রায় একই রকম অভিযোগ, ট্রাক চালক হাফিজুর রহমান (ট্রাক নং যশোর ট-০২-০২৫৩), চালক রাজু (ট্রাক নং যশোর ট-১১-০৭৫৫), চালক রফিকুল (ট্রাক যশোর নং ট-১১-০৫১৫),চালক মো. আবু বক্কর (ট্রাক নং ঝিনাইদহ ট-১১-০২৭৮), চালক শামীম শেখের (খুলনা মেট্রো ট-১১-০৪৬৪)।

এর আগে মাওয়া পুলিশ ফাঁড়ির একবারে সামনে গিয়ে দেখা যায় মহাসড়কে প্রকাশ্যে প্রতিটি যান থেকে টাকা আদায় করে চলেছে সবুজ নামে এক যুবক। তার ছবি তুলতেই এগিয়ে এসে বলেন. বাংলাদেশ ট্রাক কভার্ডভ্যান মালিক সমিতির নামে তিনি ২০ টাকা করে চাঁদা তুলছেন। একই পয়েন্টে বিআইডব্লিউটিএ’র পার্কিং ইয়ার্ডয়ের নামে আদায় করা হচ্ছিল ৫৫ টাকা। গাড়িগুলো পার্কিং না করে সরাসরি ফেরিতে যাচ্ছিল। তা সত্ত্বেও কেন পার্কিংয়ের টাকা নিচ্ছেন? এই প্রশ্নের উত্তরে আদায়কারী কামরুল জানান, এটাই এখানে নিয়ম। মাওয়ার ২নং ফেরি ঘাটে ডিএফ যমুনা ফেরি ভিড়ে যানবাহনগুলো খালাস করছে। এখানে ফেরির লস্কর শাহ আলম পরিচয়দানকারী মধ্য বয়সী এক স্টাফ প্রতিটি যান থেকে ১শ’ হতে ৫০ করে টাকা নিচ্ছেন। জানতে চাইলেই বলেন, ঈদের বকশিস। কিন্তু কেউ যে ইচ্ছায় নয় বাধ্য হয়ে দিচ্ছেন একথা জানালেন, ভুক্তভোগী কাভার্ড ভ্যানের চালক আতিক। মাওয়া ১নং ফেরি ঘাটে রামশ্রী ফেরিতে এসেও একই দৃশ্য দেখা গেল। এখানে ট্রাক উঠানো হচ্ছে ফেরিত তখন। প্রতি ট্রাক থেকে ১শ’ করে টাকা নেয়া হচ্ছে। লস্কর খায়রুল আলম ও নরুল আমিন এই টাকা নিচ্ছেন। কেউ কম দিতেই গালিগালজ করে ফেরি থেকে ট্রাক নামিয়ে দিতে চাইছেন।

পুলিশ ফাঁিড়র একেবারে দেয়াল ঘেষা স্থানে বিআইডব্লিউটিসির টিকেট কাউন্টার। এখানে টিকেট দেয়া হচ্ছে ১২৬০ টাকা আদায় করা হচ্ছে ১৮শ’ টাকা। অন্যান্য ক্ষেত্রেও এমন তারতম্য। এব্যাপারে কাউন্টারের টিকেট মাস্টার নাম প্রকাশে অস্বীকৃতি জানান। এর কারণ সম্পর্কেও কিছু বলতে তিনি নারাজ।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে বিআইডব্লিউটিসি’র ম্যানেজার (বানিজ্য) সিরাজুল ইসলাম বলেন, এমন ঘটনা তার জানা নেই, তিনি খোঁজ নিবেন।

এর পরে আমাকে বহনকারী সিএনজিটিও পড়ে চাঁদাবাজের খপ্পরে। হাসান নামে কালো সানগ্লাসপড়া এক যুবক গতি রোধ করেন পুলিশ ফাঁড়ির সামনে। তিনি ২০ টাকা চাঁদা দাবী করেন। গড়িমসি করায় সিএনজি চালকে বকাঝকা শুরু করেন। টাকা দিতেই পাশ দিয়ে যাচ্ছিল আলমগীর নামের এক দারোগা। তার হাতে এই চাঁদাবাজকে সোর্পদ করার চেষ্টা করতেই, এই দারোগা বলেন-“ওদের এই চাঁদা নেয়ার বৈধতা আছে… যা কাগজ নিয়ে আয়,” এই বলে চাঁদাবাজকে তাড়িয়ে দেয়। একটু পরে দারোগাও কেটে পড়ে। পরে আর কারও দেখা নেই। দুপুরের ঘটনা এটি। পরে বিকালে ম্যাজিস্ট্রেট সাফিউল আলম এই চাঁদাবাজকে হাতেনাতে আটক করে।

মাওয়া চৌরাস্তায় এসে দেখা গেলো পুলিশই এখানে কৃত্রিম যানজট তৈরী করে নানাভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। গাড়ির কাগজপত্র চেক করছে মহাসড়কের উপড়ে গাড়ি থামিয়ে। মুহুর্তের মধ্যে জটলা, শতশত গাড়ির জট। এরপর পুলিশের নানা রকমের লোকজন টাকা আদায় করতে থাকে নানা কথা বলে। আর এখানে ট্রাকগুলো থেকে ২০ টাকা ও ৩০ টাকা হারে আদায় করে সিরিয়াল দিচ্ছে আনসার সদস্যরারা। প্রতিটি পয়েন্টেই পুলিশের উপস্থিতি। কোন কোন স্থানে পুলিশ সরাসরি চাঁদা না নিলেও নিরব থেকে এই আদায়ে সহযোগিতা করছে। ঈদ উপলক্ষে এই ঘাটে অতিরিক্ত পুলিশ ও আনসার মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু এ সব সদস্যকেই মনে হয়েছে এই ঘাটে এসেছে চাঁদাবাজি করতে বা করার সহায়তা করতে। এসব ব্যাপারে পুলিশ সুপার মো.সফিকুল ইসলাম বিকালে জানান, বিষয়টি আমার জানা নেই। পরে রাত সাড়ে ৭টায় ঘটনাস্থল থেকে সেল ফোনে বলেন,“ ঘটনাস্থলে আমি সিভিল ড্রেসে এসে আপনার অভিযোগ অধিকাংশই সত্য পেয়েছি। চাঁদাবাজি বন্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এখন থেকে কোন চাঁদাবাজি হবে না। কোন বৈধ দাবীকারী পরিবহন সংগঠনও চাঁদা আদায় পারবে না।

এসব বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও হুইপ সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি জানান, যে কোন রকমের চাঁদাবাজি আর অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কারীর বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, এই চাঁদাবাজির সাথে দলীয় কোন লোক জড়িত নেই। মাওয়ায় দায়িত্বরত সরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোকজনই এগুলো করছে বলে তিনি অবগত হয়ে তাদের কৃর্তপক্ষকে বিষয়গুলো অবগত করেছেন।

মোহাম্মদ সেলিম, মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি। ০১৯১১১৪২৬৭০

০৬.০৯.১০

[ad#co-1]