ফেরি স্বল্পতা ॥ লক্কড়-ঝক্কড় ফেরি দিয়েই চলছে এ রুট

মাওয়া-কাওড়াকান্দি সমাচার-২
মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল, মুন্সীগঞ্জ ॥ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে যোগাযোগের অন্যতম প্রবেশদ্বার মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরম্নট। এ রম্নট দিয়ে গড়ে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ছোট বড় যানবাহন ও লক্ষাধিক যাত্রী পারাপার হয়ে থাকে। অথচ এ রম্নটে চলাচলকারী যাত্রীসাধারণ থাকেন চরম আতঙ্কের মধ্যে। লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা ত্রম্নটিপূর্ণ ফেরি সার্ভিস যাত্রীদের জন্য মৃতু্য চিনত্মার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাঝে মধ্যেই ফেরির তলা ফুটো হয়ে ফেরিতে পানি উঠতে শুরম্ন করে। ঈদকে সামনে রেখে ফেরি বহরে ফেরি ‘ফরিদপুর’ ও পুনর্বাসিত ফেরি ‘রানিক্ষেত’ যোগ হওয়া ছাড়া তেমন কোন সুসংবাদ নেই ঈদে ঘরমুখো মানুষের জন্য। শনিবার নৌ সচিব আঃ মান্নান হাওলাদার এ নৌরম্নটে চ্যানেল পরিদর্শনে এসে জানিয়েছেন, ঈদে ড্রেজিংকৃত হাজরা ক্রস চ্যানেলটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই ফেরি ভেদে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টায় প্রকৃতির তৈরি চ্যানেল দিয়ে ফেরিগুলোকে চলাচল করতে হবে। এ সময় পদ্মার পানি কমে গেলে ঈদে মহা বিপর্যয় দেখা দিতে পারে মাওয়া ঘাটে। এমনকি কয়েক বছর আগের ন্যায় ঘরমুখো মানুষকে ঈদের নামাজও আদায় করতে হতে পারে মাওয়া ঘাটে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিআইডবিস্নউটিসি ১৯৮৮ সালে ‘গড়াই’ নামে একটি ফেরি দিয়ে এ নৌরম্নটের শুভ সূচনা করে। বর্তমানে এ নৌরম্নটে মোট ১২টি ফেরি রয়েছে। ‘ভাষা শহীদ বরকত’ ও ‘শাহ মখদুম’ নামের দুটি রো রো ফেরি ছাড়া মধ্যম আকৃতির ফেরি ‘ঢাকা’, ‘কাকলী’, ‘যশোর’, ‘কিশোরী’ ও একমাত্র ভিআইপি ফেরি ‘কর্ণফুলী’। এছাড়া ৫টি ড্রাম্প ফেরি রয়েছে এ বহরে। এর মধ্যে মাসাধিককাল পূর্বে লেন্টিং নামের ফেরিটি পুনর্বাসনে নেয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে ফেরী ‘রামশ্রী’ লেন্টিংয়ের জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হয়ে এ নৌরম্নটে চলাচল করছে। ফেরি টৈলুয়া বর্তমানে ‘যমুনা’ নাম ধারণ করে এ ফেরি রম্নটে চলাচল করছে। ১৯৩৮ সালে ‘যমুনা’ নির্মাণ করা হলেও পুনর্বাসন বা সংস্কার করা হয়েছে মাত্র দু’বার । ‘রানীগঞ্জ’ নামের ফেরিটি ১৯২৫ সালে নির্মাণ করার পর এ ফেরিটিও দু’বার পুনর্বাসন করা হয়েছে। ‘থোবাল’ নির্মাণ করা হয়েছে ১৯৩৮ সালে। গত ২০ আগস্ট ফেরিটি ঘাট থেকে ২০ মিনিট চলতেই পানি উঠা শুরম্ন হলে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পানি অপসারণের জন্য রাখা পাম্পটিও ছিল অচল। অবস্থা বেগতিক দেখে সাড়েং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে দ্রম্নত ফেরিটিকে আবার ঘাটে ফিরে আনে। ভরা বর্ষার তীব্র স্রোতের মধ্যে ডুবুডুবু অবস্থায় ফেরিটি তীরে এসে পেঁৗছলে যাত্রীরা অনেকেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। ১৯২৫ সালে নির্মিত টাপলু নামের ফেরিটিও মাত্র দু’বার সংস্কার করা হয়েছে। একমাত্র ভিআইপি ফেরিটি নির্মিত হয়েছে ১৯৬৩ সালে। সর্বশেষ আট বছর পূর্বে এটি পুনর্বাসন করা হয়েছিল।

নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ফেরিকে প্রতি বছর সার্ভে করাতে হয়। কিন্তু এ নৌরম্নটে চলাচলকারী এসব ফেরির দীর্ঘদিন কোন সার্ভে করানো হয়নি। বিআইডবিস্নউটিসির একটি সূত্র থেকে জানা যায়, বিআইডবিস্নউটিএর সমুদ্রপরিবহন অধিদপ্তরে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার্ভেয়ার না থাকায় ফিটনেসবিহীন এ সকল ফেরিগুলোকে সার্ভে করানো সম্ভব হচ্ছে না। অপরদিকে ফেরিগুলোকে যখন মেরামতের জন্য ভাসমান কারখানায় নিয়ে আসা হয়, তখন এ সকল ফেরির চালকরা চলে যান অলিখিত ছুটিতে। আর ভাসমান কারখানার কর্মকর্তাদের পকেটও এ সুবাদে গরম হয়ে উঠে। এ সকল বিষয়গুলো স্থানীয় লোকজন, যাত্রী সাধারণ ও সচেতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন বলে মনে করেন অভিজ্ঞ মহল। মেরামত ও ফেরি চলাচলে তেল চুরিসহ নানা রকমের চুরি রয়েছে এই সেক্টরে। অনেকেই নানাভাবে পকেট ভারি করেন। যার ভাগ যায় ক্ষমতাসীন শ্রমিক সংগঠনের নেতাসহ অনেক বড় কর্মকর্তার পকেটে। এ ব্যাপারে মাওয়ার বিআইডবিস্নউটিসির ম্যানেজার সিরাজুল ইসলাম এসব অনিয়মের কথা অস্বীকার করে বলেন এগুলো চোখে পড়ে।

এছাড়া মাওয়া-কাওড়াকান্দি ফেরি সেক্টর থেকে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় করে থাকে। আথচ যাত্রীসহ পরিবহনগুলো নিরাপদে পারাপারে সরকার তেমন কোন ব্যবস্থাই গ্রহণ করছে না। লক্কড়-ঝক্কড় ও ত্রম্নটিপূর্ণ মান্ধাতা আমলের ফেরি দিয়ে দায়সারাভাবে ফেরি সার্ভিস অব্যাহত রেখেছে বিআইডবিস্নউটিসি। এ রম্নটের ১২টি ফেরির মধ্যে অধিকাংশ ফেরি মাঝে মধ্যেই মেরামতের নামে চলে যায় ডক ইয়ার্ড বা ভাসমান কারখানায়। ফলে ধর্মীয় উৎসব ও ছুটির দিনগুলোতে মাওয়া ও কাওড়াকান্দি উভয় ঘাটে দেখা দেয় তীব্র যানজট। আর যানজটের শিকার হয়ে শত শত যাত্রীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় এখানে।

বিআইডবিস্নউটিসি সূত্রে জানা যায়, এ রম্নটে চলাচলরত ফেরিগুলোতে প্রতিদিন কোন না কোন সমস্যা লেগেই থাকে। সূত্র মতে ফেরিগুলোতে অতিরিক্ত লোডের কারণে ফেরি ও পল্টুনের র্যাম্প, র্যামের পিন, ডেকপেস্নট, গার্ডার ও এঙ্গেল প্রায়ই ভেঙ্গে যায়। তখন মাওয়া ঘাটের ভাসমান কারখানায় ৩/৪ দিন সময় ধরে এগুলোকে মেরামত করাতে হয়। এ সময় ফেরি স্বল্পতার কারণেও ঘাটে দেখা দেয় তীব্র যানজট।

[ad#co-1]