উপেক্ষিত উচ্চ আদালতের আদেশ : নির্বিচারে চলছে বালি উত্তোলন

মোস্তফা সারোয়ার বিপ্লব
উচ্চ আদালতের আদেশ অমান্য করে নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের বালু মহালগুলো থেকে অবাধে চলছে বালি উত্তোলন। হাইকোর্টের বিচারপতি মামুন রহমান ও বিচারপতি সৈয়দা আফসার জাহানের বেঞ্চ এ বছরের (২০১০) ১৪ জুলাই এক আদেশে মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ সংলগ্ন নয়টি বালু মহালের টেন্ডার কার্যক্রম পরবর্তী ছয় মাসের জন্য স্থগিতের আদেশ দেয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উচ্চ আদালতের রায়ের অনুলিপি পাঠানো হয় মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক; সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা; সোনারগাঁও, গজারিয়া, মুন্সীগঞ্জ সদর ও নারায়ণগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে। গত ১৮ জুলাই তারিখে এই রায়ের অনুলিপি উল্লিখিত সরকারি কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে সিল-স্বাক্ষর দিয়ে দাপ্তরিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। ঐ পর্যন্তই। বালু মহালের প্রভাবশালী সন্ত্রাসীরা উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে রীতিমতো অবজ্ঞা করে বিনা টেন্ডারে বালি উত্তোলন করে চলেছে। আর তাদের এই কাজে সহায়তা করছে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ।

জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে এলাকাবাসীরা নির্বিচারে বালি উত্তোলনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে চলেছে একযুগ ধরে। বিভিন্ন এলাকায় গঠন করা হয়েছে চর কাটা প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটি। নারী-পুরুষ মিলে ঝাড়– মিছিল হচ্ছে প্রায়ই। গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে অসংখ্যবার। কিন্তু কখনো বন্ধ হয়নি বালি উত্তোলন। অবাধে বালি উত্তোলনের ফলে সোনারগাঁও ও গজারিয়ায় অন্তত ১২টি গ্রাম অনেক আগেই বিলীন হয়ে গেছে নদীগর্ভে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে একাধিকবার প্রতিবেদন হয়েছে। তাতে টনক নড়েনি কর্তৃপক্ষের। বালু মহাল দখল নিয়ে বিভিন্ন গ্র“পের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হয়েছে অসংখ্যবার। প্রাণ হারিয়েছেন অনেকে।

মহাসিন্ডিকেট
নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ জেলার বালু মহালগুলো বরাবরই নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা। তবে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই ধারায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। গত দুই বছর ধরে এই দুই জেলার বালু মহালগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে ‘মহাসিন্ডিকেট’ নামে একটি সংগঠন। এই সিন্ডিকেটে রয়েছে সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ সদর, মুন্সীগঞ্জ সদর, গজারিয়া এবং কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতা। মহালগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত ও অধুনা বিলুপ্ত ফ্রীডম পার্টির নেতারা মিলে গঠন করেছে এই মহাসিন্ডিকেট। জানা গেছে, এই চক্র এতটাই শক্তিশালী যে, প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। অবশ্য জেলা প্রশাসকসহ সার্বিক প্রশাসনের গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়েই এই চক্রের নেতারা নিজেদের ইচ্ছেমতো বালি উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

কার্যাদেশ ছাড়াই বালি উত্তোলন
মুন্সীগঞ্জ সদর, গজারিয়া ও সোনারগাঁও প্রত্যেক উপজেলায় মহাসিন্ডিকেট সদস্যদের লভ্যাংশ ভাগ করেছে ৩০% করে মোট ৯০%। বাকি অতিরিক্ত ১০% মেঘনা থানা ও নারায়ণগঞ্জ সদরের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের নামে বরাদ্দ। বালু মহাল নিয়ন্ত্রণ ও ভাগের টাকা প্রতিমাসের ১৫ তারিখের মধ্যে প্রতি উপজেলায় বণ্টনের জন্য রয়েছে ৭ পরিচালক। পরিচালকদের প্রত্যেকের মাসিক বেতন ৭০ হাজার টাকা। আবার উপজেলাভিত্তিক রয়েছে তিন প্রতিনিধি। এদের মাধ্যমে প্রতি উপজেলায় বালু মহালের নামে শেয়ার ছাড়া হয়েছে। প্রতিটি শেয়ার দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা করে। উপজেলা প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই সাধারণ শেয়ারের লভ্যাংশ বণ্টন করা হয়। জানা গেছে, দুই জেলায় বর্তমানে ৪৫০টি শেয়ার রয়েছে বিভিন্ন বালু মহালের নামে। এভাবেই চলছে মহাসিন্ডিকেটের কার্যক্রম। অথচ এভাবে শেয়ার ছাড়ার বা বিক্রি করার আইনী কোনো এখতিয়ার কারো নেই।
ক্ষমতাধর এই মহাসিন্ডিকেটের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন গজারিয়ার আমিরুল ইসলাম। জাতীয় পার্টির সরকারের আমল থেকেই তিনি বালু মহালগুলোর নেতৃত্বে আছেন। মহাসিন্ডিকেট গঠনের উদ্যোক্তাও তিনি। বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত জাতীয় পার্টির এই সাবেক নেতা। আগে জাতীয় পার্টি ও বিএনপি দু’দলই করেছেন। তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেসার্স এ ইসলাম এন্টারপ্রাইজ (ঠিকানা : ৪২-৪৩, সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোড, ঢাকা-১১১৭)। তার প্রতিষ্ঠানের নামে বালি উত্তোলন হচ্ছে নয়ানগর, রমজানবেগ ও কাজিপুরা মৌজায়। জানা গেছে দুই জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় বালু মহাল এটি। আয়তন ১২৮.৭৩ একর। ৭০ থেকে ৮০টি ড্রেজার দিয়ে প্রতিদিন ন্যূনতম ২০ লাখ টাকার বালি উত্তোলন করা হয়। মেসার্স এ ইসলাম এন্টারপ্রাইজের নামখচিত পরিচয়পত্র বুকে লাগিয়ে প্রতিদিন ১০০ লোক তদারকি করছে বৃহৎ এই মহালটিতে। মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসকের টেন্ডারে এ মহালটির সম্ভাব্য মূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৫১ লাখ ১১ হাজার ১১১ টাকা। কিন্তু আমিরুল ইসলামের জমা দেয়া সিডিউলের মূল্য দেখানো হয়েছে, ১ কোটি ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। পুনরায় দ্বিতীয়বার দরপত্রে একই মূল্য দেখানো হয়েছে। তৃতীয়বার এ দরপত্র আহ্বান করলে কোনো দরপত্র জমা পড়েনি। যে কারণে দ্বিতীয়বারের সর্বোচ্চ দর অনুমোদনের জন্য জেলা প্রশাসক বালু মহাল ইজারা প্রদান সম্পর্কিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটিতে পাঠায়। তবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বালু মহাল ইজারা প্রদান সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সভাপতি মোঃ আতাহারুল ইসলাম ১৫ জুন তারিখে স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে, চতুর্থবার দরপত্র আহ্বান করার পরে দ্বিতীয়বারের দরপত্র অনুমোদন করার আইনগত কোনো সুযোগ না থাকায় আন্তঃমন্ত্রণালয়ের কমিটির সভায় অনুমোদন করা গেল না। জেলা প্রশাসক পুনরায় দরপত্র আহ্বানের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিন্তু পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। অথচ ফেব্র“য়ারি মাস থেকেই আমিরুল ইসলামের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটির নামে এ মহাল থেকে বালি উত্তোলন চলছে।

টেন্ডার ঘোষণায় অনিয়ম
চলতি বছরের ১১ ফেব্র“য়ারি মুন্সীগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) একেএম হুমায়ন কবির স্বাক্ষরিত ১০টি বালি মহালের ইজারার দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি ঘোষণা করে। দরপত্র ঘোষণার শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘মহামান্য হাইকোর্টের ২০৫৪/২০০৯ রিট মামলার ১৪-০৫-২০০৯ইং তারিখের রায়ের প্রেক্ষিতে হাইড্রোগ্রাফিক চার্ট/ রিভার চ্যানেল এলাকা ব্যতীত।’

জানা গেছে, কাগজপত্রে হাইকোর্টের আদেশ মানার কথা হলেও হাইড্রোগ্রাফিক চার্ট চিহ্নিত এলাকাকে বালু মহাল দাবি করে টেন্ডার ঘোষণা করেছে। যেমন রায়পাড়া, ভাটিবলাকী, দৌলতপুর, নয়াচর ও চরমুসারিয়া রমজানবেগ এলাকা হাইড্রোগ্রাফিক চার্ট হিসেবে বাংলাদেশ গেজেট প্রকাশিত হলেও জেলা প্রশাসক তা ইজারার দরপত্র ঘোষণা করেছেন। আবার কার্যাদেশও দেয়া হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সিনিয়র সহকারী সচিব কাজী মেরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত ২০০৬ সালের ৩ আগস্ট বাংলাদেশ গেজেটে (অতিরিক্ত) এ সংক্রান্ত সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রকাশিত হয়েছে। এর দুই দিন আগে ১ আগস্ট গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় টিএ শাখা থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এসআরও নং ১৯৩ আইন/২০০৬ চষড়ঃ অপঃ ১৯০৮ (ঢঠ০৮ ৯০৮)।

কিন্তু বাংলাদেশ গেজেটকে উপেক্ষা করে মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক হাইড্রোগ্রাফিক চার্টের চিহ্নিত স্থানকে বালু মহাল দাবি করে বরাবরই ইজারা দিয়ে গেছে।

আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত
বিভিন্ন নদীর তলদেশ থেকে বালি/মাটি উত্তোলনের অনুমতি প্রদানের বিষয়ে ২০০৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভা হয়। তৎকালীন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ও বর্তমান স্বরাষ্ট্র সচিব আবদুস সোবহান শিকদারের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন বিআইডব্লিউটিএ-এর চেয়ারম্যান মোঃ আবদুল মান্নান হাওলাদার, ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার (যুগ্ম সচিব) মোঃ ইমদাদুল হক, ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (প্রশা-২) জালাল উদ্দিন আহম্মেদ, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (প্রশা-২) মোঃ বাইতুল আমিন ভূইয়া, একই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (টিএ) সৈয়দ মেহেদী হাসান, বিআইডব্লিউটিএ পরিচালক (বন্দর) মাহাবুবুল আলম ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব মোঃ আব্দুল মতিন। সভায় সিদ্ধান্ত হয় বিআইডব্লিউটিএ-এর নিয়ন্ত্রণাধীন ২১টি নদী বন্দরের সরকার কর্তৃক ঘোষিত সীমার মধ্যে চড়ৎঃ অপঃ ১৯০৮ ও চড়ৎঃ ৎঁষবংং ১৯৬৬ অনুযায়ী নদী বন্দরের সংরক্ষক হিসেবে বিআইডব্লিউটিএ সরাসরি অনুমতি প্রদান করবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠান প্রতি ঘনফুট বালি/মাটির জন্য বিআইডব্লিউটিএকে বিধি মোতাবেক ০.১৫/টাকা হারে রয়্যালিটি প্রদান করবে। এ ক্ষেত্রে ইজারাদার সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ভ্যাট ও আয়কর প্রদান করবে এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসককে ০.২৫ টাকা হারে রয়্যালিটি দেবে।

বাংলাদেশ গেজেট অতিরিক্ত ও আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০০৯ সালের ৫ এপ্রিল ঊর্ধ্বতন পরিচালক (নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর) মুহাম্মদ আবু জাফর হাওলাদার স্বাক্ষরিত মেসার্স জুলেখা ট্রেডার্সের মালিক জামাল উদ্দিনকে ১৫ লাখ ঘনফুট বালি উত্তোলনের কার্যাদেশ দেয়া হয়। সীমানা দেয়া হয় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও ও মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থানার চরকিশোরগঞ্জ ও দৌলতপুর মৌজার মেঘনা নদীর তলদেশ থেকে হাইড্রোগ্রাফি চার্টে চিহ্নিত এমডি ৩৬৪/২০০৬ স্থান হতে। ৭ এপ্রিল জুলেখা ট্রেডার্স সরকারি খাতে রয়্যালিটি, আয়কর, ভ্যাট পরিশোধ করে। একই দপ্তর থেকে ২০ এপ্রিল মেসার্স রিপা এন্টারপ্রাইজ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে ১৫ লাখ ঘনফুট বালি উত্তোলনের কার্যাদেশ দেয়া হয়। সীমানা নির্ধারণ দেখানো হয়েছে মেঘনা নদীর চালিভাঙ্গা হতে ফরাজিকান্দি নৌপথ পর্যন্ত। এই প্রতিষ্ঠানও সরকারি খাতে রয়্যালিটি, ভ্যাট, আয়কর প্রদান করে।

কিন্তু গত বছর দুই জেলার দুই জেলা প্রশাসক বালি মহলের সঙ্গে নৌ-রুটকেও ইজারা দরপত্র বিজ্ঞপ্তি ঘোষণা করে। ইজারা পায় মহাসিন্ডিকেট। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন মামলা করে আগের দুটি প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদার। ২০০৯ সালের ৩০ মার্চ হাইকোর্ট বালু মহালের টেন্ডারের কার্যক্রম স্থগিতের আদেশ দেন। পরে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন ২০৫৪/০৯। আপিলের রায়ে বলা হয়েছে নৌ-রুটে কোনো বালু মহাল ঘোষণা করা যাবে না। কিন্তু তারপরও মহাসিন্ডিকেট বালি উত্তোলন করেছে।

এরপর আবারো টেন্ডার ঘোষণা করা হলে জুলেখা ট্রেডার্স, রিপা এন্টারপ্রাইজ ও তালুকদার ট্রেডার্স রিট পিটিশন মামলা করে ৫২৬৮/২০১০। আদালত ৬ মাসের জন্য টেন্ডার কার্যক্রম স্থগিতের আদেশ দেয়। সরকার পক্ষ এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলেও উচ্চ আদালত স্থগিতাদেশ বহাল রাখে। কিন্তু তারপরও মহাসিন্ডিকেট বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে। গত ২২ জুলাই মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসকের পক্ষে রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর স্বাক্ষরিত হাইকোর্টের রিট পিটিশন বাস্তবায়নে রায়পাড়া বালি মহাল থেকে বালি উত্তোলন বন্ধ করতে চিঠি দেয় ইজারাদার মুহাঃ আব্দুল মান্নান সরকারকে। স্মারক নং ৮৫২/১ (৬) (স.)। কিন্তু এ চিঠি পর বালি উত্তোলন বন্ধ করেনি মহাসিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য মুহামদ আব্দুল মান্নান সরকার। একজনকে চিঠি দিয়েই যেন দায়িত্ব সম্পন্ন করেছেন মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক। আর কাউকে চিঠি দেয়া বা চিঠির আদেশ বাস্তবায়নে কোন ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি প্রশাসনকে। আর অন্যদিকে নারায়নগঞ্জ জেলা প্রশাসন এখন পর্যন্ত কোন উদ্যোগই নেননি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক বলেন, আমি এ বিষয়ে তেমন কিছু জানি না, এডিসি রেভিনিউ-এর সঙ্গে কথা বলেন। ফোনে অনেকবার চেষ্টা করেও এডিসি-কে পাওয়া যায়নি। পরে ইউএনও ফিরোজ আহমেদ এর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাইকোর্টের নির্দেশ মতে রায়পাড়া ঝাপটা, দৌলতপুরে বালু উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, গত তিন দিন যাবৎ প্রতিদিন সকালে নৌ-পথে প্রতিটি বালু মহাল আমি ঘুরে দেখি। আমার জানামতে, কোনো বালু মহাল থেকে অবৈধ উপায়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে না। এদিকে সোনারগাঁওয়ের ইউএনও বলেন, আমার জানামতে কোনো বালু মহালে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ নেই। এখানে যারা বালু উত্তোলন করেন তারা সবাই সরকারি ইজারায় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুমতি নিয়ে বালু উত্তোলন করছেন।

স্থানীয় প্রশাসনের কণ্ঠে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের স্বার্থই প্রতিধ্বনিত হয়। তাদের নীরব সমর্থনে তাই চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন।

গেজেটের নির্দেশনা
বাংলাদেশ (অতিরিক্ত) গেজেটে বলা হয়েছে : ঝবপঃরড়হ ৪-এর ঝঁনংবপঃরড়হ (১)(ধ) এবং (২) এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার নিম্ন তফসিলে বর্ণিত এলাকাকে মেঘনাঘাট নদী বন্দরের সীমানা নির্ধারণপূর্বক উক্ত নদী বন্দরের ক্ষেত্রে উক্ত অপঃ-এর বিধানাবলীর প্রয়োগ বিস্তৃত করেন এবং ঝবপঃরড়হ ৭-এর ঝঁনংবপঃরড়হ (১) এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষকে মেঘনাঘাট নদী বন্দরের সংরক্ষক নিযুক্ত করল। যথাÑ তফসিল উত্তর সীমানা মেঘনা নদীর পশ্চিম পাড়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও থানার বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের বড় তিলক (মৌজা) নামক স্থান, নদী ও পূর্বতীর হয়ে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর ২৩০৩৯’০৭’’ উত্তর অক্ষ রেখা পর্যন্ত। পশ্চিম সীমানা মেঘনা নদীর উত্তর-পশ্চিম তীরের নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও থানার পিরোজপুর ইউনিয়নের চর রমজান ছানাউল্লাহ মৌজা এবং নদীর দক্ষিণ তীরের মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া থানার হোসেন্দী ইউনিয়নের আশরাফদি মৌজা দিয়ে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর ৯০০৩৫’৩১’’ পূর্ব দ্রাঘিমা রেখা পর্যন্ত। দক্ষিণ ও পূর্ব সীমানা এলাকায় রয়েছে ৯০০৩৫’৩১’’ পূর্ব দ্রাঘিমা রেখা মেঘনা নদীর দক্ষিণ তীরকে যে স্থানে স্পর্শ করেছে উক্ত স্থান (হোসেন্দী) হতে ২৩০৩৬’৪৯’’ উত্তর অক্ষ রেখা নদীর দক্ষিণ তীরকে যে স্থানে স্পর্শ করেছে উক্ত স্থান (রায়পাড়া) পর্যন্ত নদীর দক্ষিণ সীমানা। ভূভাগের সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে ভরা কাটালের সময় নদীর সর্বোচ্চ পানির সমতল বন্দর সীমাভুক্ত তীরের যে সীমানা পর্যন্ত উঠে উক্ত পানি সীমা হতে মূল ভূভাগের ৫০ মিটার পর্যন্ত।

[ad#co-1]