তখন লটারি করা হতো

চাষী নজরুল ইসলাম
আমি চলচ্চিত্রাঙ্গণে পা রাখি ষাটের দশকের শেষের দিকে। তখন ঈদে মাত্র একটি করে ছবি মুক্তি পেত। এই একটি ছবি নিয়েই পুরো রমজান মাস চলচ্চিত্রপাড়া সরগরম। দর্শকরা কিভাবে নেবে? প্রযোজক পারবেন তো এফডিসির সব টাকা পরিশোধ করে প্রিন্ট নিতে? অন্য কোনো দিক থেকে বাধা আসবে না তো? এসব হাজারো সংশয় বাসা বাঁধত মনে। কিন্তু যে যা-ই ভাবুক না কেন, সবাই কিন্তু শেষে এক হয়ে যেত আবার। যদি প্রযোজক টাকা জোগাড় করতে না পারতেন, তখন ক্যামেরাম্যান থেকে শুরু করে ইউনিট বয় পর্যন্ত একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় ছবি মুক্তি পেত। হলে দেখা যেত দর্শকের ভিড়। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, ছেলে-বুড়ো_সবাই ঈদের দিন পাশাপাশি বসে ছবি দেখছে। মনে হতো, কত আপন তারা। চলচ্চিত্রকর্মী হিসেবে তখন গর্বে বুক ভরে যেত। নতুন ছবিগুলো শুধু ঢাকায়ই মুক্তি দেওয়া হতো। দু-তিন সপ্তাহ পর মুক্তি দেওয়া হতো ঢাকার বাইরে। বলা উচিত, ছবিগুলো নতুন হিসেবে ঢাকায় যে রকম জনপ্রিয়তা পেত, ঢাকার বাইরেও ততটা জনপ্রিয়তা পেত। ফলে প্রযোজকের টাকা দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে উঠে যেত। তত দিনে কোরবানির ঈদ চলে আসত। ওই প্রযোজক কোরবানির ঈদের দিন চলচ্চিত্রের সব কর্মীকে নিয়ে পার্টি দিতেন।

সত্তরের দশকে স্বর্ণযুগ শুরু হলো। তখন রাজ্জাক, আলমগীর, ফারুক, সোহেল রানা, কবরী, শাবানা, ববিতা ও সুচন্দার মতো একাধিক তারকা ইন্ডাস্ট্রিতে। আগে যেখানে বছরে ২৫ থেকে ৩০টি ছবি নির্মিত হতো, সেখানে নির্মিত হতে থাকল ৪৫ থেকে ৫০টি ছবি। ফলে ঈদের জন্যও তখন সেন্সরে জমা পড়তে শুরু হলো চার-পাঁচটি করে ছবি। সবাই চান, তাঁর ছবিটি ঈদে মুক্তি পাক। নিজেদের মধ্যে তো ঝগড়া-বিবাদ লাগার অবস্থা। এ সময় চলচ্চিত্রের বড় নেতারা একদিন মিটিং করলেন। মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলো, যে ছবি আগে সেন্সরে জমা পড়বে, সেটাই আগে ছাড়পত্র পাবে। ঈদের সপ্তাহ আসতে আসতে দেখা গেল, পাঁচ-ছয়টি ছবি মুক্তির মিছিলে। আবার মিটিং হলো। এবার সিদ্ধান্ত হলো, প্রকাশ্যে লটারি হবে। যে দুটি নাম উঠবে, সেই দুটি ছবিই মুক্তি পাবে। এই নিয়ম হওয়ার পর থেকে প্রতি ঈদে ছবি মুক্তির জন্য যেদিন লটারি হতো, সেদিন দেখা যেত বড় তারকা থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মীরাও উপস্থিত। দেখা যেত রাজ্জাক, আলমগীর, সোহেল রানা লটারির দিন উপস্থিত। রাজ্জাকের ছবির নাম লটারিতে উঠেছে, তো সঙ্গে সঙ্গে আলমগীর ও সোহেল রানা তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। এভাবে আশির দশকের মাঝামাঝি নতুন করে জায়গা করে নিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন, দিতি, জাফর ইকবাল, চম্পা, সোহেল চৌধুরীসহ অনেকে। ছবি নির্মাণ আরো বাড়ল।

১৯৮৬ কি ‘৮৭ সালের দিকে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রতি ঈদে তিনটি ছবি মুক্তি পাবে। দুটি ঢাকা শহরে এবং একটি পাবে ঢাকার বাইরে। ঢাকার বাইরে মুক্তি পাওয়া ছবিটি দুই সপ্তাহ পর আবার ঢাকায় মুক্তি দেওয়া যাবে। সেই সঙ্গে লটারির নিয়মটাও থাকল। এভাবে ছয়-সাত বছর পার হলো। কিন্তু ‘৯৪ সালের দিকে এসে কেউ আর কারো কথা মানতে চাইল না। যে যার মতো ঈদের ছবি রেডি করে মুক্তি দিতে থাকল। একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা। দিন গড়াল, অবস্থার আরো অবনতি ঘটল। একসময় চলচ্চিত্র থেকে সম্মানিত প্রযোজকরা তাঁদের ব্যবসাটা গুটিয়ে নিলেন। আর এখনকার অবস্থা তো সবারই জানা। কার কী আসে-যায়, ভাবার সময় নেই। দর্শকও হয়তো জানে না ঈদে কোন ছবি মুক্তি পাচ্ছে, কারা অভিনেতা-অভিনেত্রী!

[ad#co-1]