দাবদাহে পুড়ছে জাপান

মনজুরুল হক
জাপানের ঐতিহ্যবাহী চন্দ্রপঞ্জিকার হিসাব অনুযায়ী, দেশে গ্রীষ্ম এখন শেষ হয়ে আসার পথে। তবে বাস্তবে জাপানের গ্রীষ্ম এখনো প্রচণ্ড দাপট নিয়ে উপস্থিত। দেড় দশকের জাপান প্রবাসে টোকিওর গ্রীষ্মকে আমার কাছে সব সময়ই অসহনীয় এক সময় বলে মনে হয়েছে। টোকিওর গ্রীষ্ম বাংলাদেশের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি অসহনীয় হয়ে ওঠার পেছনে অবশ্য প্রকৃতিকে বশ মানানোয় মানুষের নেওয়া নানা রকম পদক্ষেপ অনেকাংশে দায়ী। জাপানের প্রায় সব ভবন এবং পরিবহন যান শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় খোলা জায়গা থেকে ভেতরে ঢুকে গেলে স্বস্তির সন্ধান সহজেই মেলে। তবে কথা হচ্ছে, সে রকম কৃত্রিম স্বস্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার মাশুল গুনতে গিয়ে যে পরিমাণ গরম ও আর্দ্র হাওয়া জাপানের অফিস-আদালত, দোকানপাট, বাড়িঘর, বাস-ট্রাক-মোটরগাড়ি বাইরে ছেড়ে দিচ্ছে, তা কিন্তু রাস্তাঘাট আর আশপাশের খোলা জায়গাগুলোকে করে দিচ্ছে অনেক বেশি উত্তপ্ত। সেই সঙ্গে পিচঢালা পথ আর কংক্রিটের সব ভবনে প্রতিহত হয়ে ফিরে আসা উত্তাপ গ্রীষ্মে নগরের পরিবেশকে করে তুলছে অনেকটাই যেন অসহনীয়, যে অবস্থার নামকরণ বিশেষজ্ঞরা করেছেন ‘হিট আয়ল্যান্ড সিনড্রম’। গরমের সেই প্রচণ্ডতা কমিয়ে নিতে পথে পানি ছিটিয়ে দেওয়ার পরামর্শ শহরবাসীকে দিচ্ছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আর নগর প্রশাসনের কর্মকর্তারা। ফলে একটুতেই ঘাম ঝরা আর অস্বস্তি বোধ করা হচ্ছে জাপানের বড় বিভিন্ন শহরে গ্রীষ্মের স্বাভাবিক এক বৈশিষ্ট্য।

অন্যদিকে গ্রীষ্ম জাপানে বরাবরই স্বল্পস্থায়ী হওয়ায় এর দাপুটে তেজকে এ দেশে অনেকেই বিরক্তির সঙ্গে না দেখে বরং সেটাকে উপভোগের চেষ্টাও করে আসছে। সেই সঙ্গে গ্রীষ্মের আরেক চমক হচ্ছে দেশজুড়ে সমানে চিৎকার করে যাওয়া ঘুর্ঘুরে পোকার আর্তি, যা কিনা দেশের কবি-সাহিত্যিক আর শিল্পানুরাগীদের সব সময়ই আকৃষ্ট করছে। আমাদের অঞ্চলের ঝিঁঝিপোকার মতো দিনভর শুনতে পাওয়া সেই টানা চিৎকারও হচ্ছে গ্রীষ্মের জাপানের আরেক পরিচিতি। ঘুর্ঘুরে পোকার প্রজাপতিতে রূপান্তরিত হওয়ার মধ্য দিয়ে উড়ে যাওয়া বলে দেয়, গ্রীষ্মের সমাপ্তি এগিয়ে আসছে। ফলে মাত্র দুই মাস স্থায়ী গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ অনেকের কাছে আবার বছরের খুবই আকর্ষণীয় এক সময়ও বটে। তবে গ্রীষ্মের এত সব আকর্ষণ সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপ ক্রমে আরও বেশি তেজি হয়ে ওঠায় বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এখন যে আর দূর থেকে উপলব্ধি করতে পারার কোনো কিছু নয়, বরং ঘরের পাশে এসে উপস্থিত হওয়া ক্ষতিকর এক প্রপঞ্চ, সে কথা আজকাল জাপানে অনেকেই বলতে শুরু করেছে।

আমাদের অপরিণামদর্শী নানা রকম তৎপরতার ফলে পৃথিবী যে বদলে যাচ্ছে, অনেক দিন থেকেই সে কথা আমরা শুনে আসছি। আর এই বদলে যাওয়া ঠেকাতে নানা রকম পদক্ষেপ নেওয়ার যেসব কথা বলা হচ্ছে, তাও আমরা শুনে আসছি অনেক দিন থেকেই। তার পরও যে পৃথিবীর বদলে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে তা তো নয়। ফলে কথা আর বাস্তবতার মধ্যে কোথায় যেন মস্ত এক ফাঁক রয়ে গেছে। তার ভেতর দিয়ে অনায়াসে ভেতরে প্রবেশ করে আমাদের গোছানো সংসার লন্ডভন্ড করে দেওয়ার মতো এক খেলা প্রকৃতি যেন অবিরাম খেলেই চলেছে। অনেকটা এ কারণেই জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে ইদানীং যারা বুক চাপড়ে হা-পিত্যেশ করে বেড়াচ্ছে, তাদের সে রকম মনোভাবকে আমার কাছে কেন যেন কথার ফুলঝুরি বলে মনে হয়। যুক্তির মারপ্যাঁচে যেখানে থেকে গেলেও বাস্তবের সঙ্গে এর বিস্তর পার্থক্য থেকে যাওয়ায় ফলাফল আমরা যা পাচ্ছি তা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। ফলে যে তিমিরে আমাদের অবস্থান তার থেকে বের হয়ে আসার সঠিক পথের খোঁজ আমরা যেন কিছুতেই আর খুঁজে পাচ্ছি না।

টোকিওতে প্রায় মাসখানেক ধরে তাপমাত্রার পরিমাপক কাঁটা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক ওপরে ওঠানামা করছে। এমনকি রাতের বেলায়ও তাপমাত্রা ৩০-এর ওপরে বিরাজমান। সেই সঙ্গে সারা দিন বজায় থাকা সূর্যের প্রখর তাপ এবং বাতাসে আর্দ্রতার আধিক্য জীবনকে করে তুলছে অসহনীয়। সাম্প্রতিক সময়ের পরিসংখ্যানগত কিছু হিসাবও অবশ্য সেই একই কথা বলছে।

এবারের গ্রীষ্মে তাপমাত্রার আধিক্য থেকে অসুস্থ বোধ করে হাসপাতালে যারা ভর্তি হয়েছে, তাদের সংখ্যা এ পর্যন্ত ৩০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া রাজধানীর টোকিওতে গরমের প্রচণ্ডতায় মারা গেছে ১০০ জনের বেশি, যাদের একটা বড় অংশ হলো একাকী বসবাসরত বৃদ্ধ। ফলে বড় শহরগুলোতে বসবাসরত নিঃসঙ্গ বৃদ্ধদের ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের দুর্দশা কীভাবে লাঘব করা যায়, সে বিষয়টিও এখন নতুন করে আবার আলোচনার শীর্ষে চলে আসছে।

বৃদ্ধদের সে রকম একাকী জীবনের সমস্যা শুধু জাপানের একার সমস্যা নয়। এ হচ্ছে বৈষয়িক অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা নাগরিক জীবনের সংকটময় পরিস্থিতিরই অন্য একটি দিক। বস্তুগত প্রাপ্তির দিক থেকে জীবন আমাদের সমৃদ্ধ হয়ে চললেও নাগরিক জীবনে ক্রমেই বেড়ে চলেছে মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব। ফলে নগরবাসী মানুষজন ক্রমেই হয়ে পড়ছে নিঃসঙ্গ, একাকী। সে রকম একাকী জীবনে সবচেয়ে অসহায় হচ্ছে বৃদ্ধদের অবস্থা, প্রয়োজনের সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে তেমন কারও উপস্থিতি যাঁদের আশপাশে আজকাল প্রায় নেই। ফলে অসুস্থ হয়ে একাকী এঁরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে এবং কখনো কখনো মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ কিংবা এমনকি কয়েক মাস পর তাঁরা যে মারা গেছে সে সম্পর্কে লোকজন জানতে পারছে।

চলতি দশকের শুরুর দিকে প্যারিসে গ্রীষ্মের দাবদাহ আঘাত হানার সময়ও প্রাণ হারানো লোকজনের মধ্যে একাকী বসবাসরত নিঃসঙ্গ বৃদ্ধদের আধিক্যের বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করার জন্য নীতিনির্ধারকদের উৎসাহিত করেছিল। তা সত্ত্বেও খুব বেশি দূর যে সে পথে অগ্রসর হওয়া যায়নি, টোকিওর সাম্প্রতিক ঘটনাবলি মনে হয় সেই প্রমাণ তুলে ধরছে। তবে দাবদাহের সমস্যা তো কেবল বৃদ্ধ নাগরিকদের সমস্যা নয়। এর পেছনে সার্বিকভাবে ভোগের প্রাচুর্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের অভ্যস্ত হয়ে পড়া জীবনযাত্রা মূলত দায়ী হওয়ায় ভোগবাদী সমাজের আলস্যময় জীবন থেকে বের হয়ে আসার তাগিদ এখন অনেকেই স্বল্পমাত্রায় হলেও উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। তবে এখানেও আছে যেন সেই ক্যাচ ২২ (Catch 22) অবস্থা। অসহনীয় এক অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যা কিছু আমরা করছি, তা যেন পরিস্থিতিকেই শেষ পর্যন্ত করে তুলছে আরও একটু বেশি অসহনীয়।

এবারের গ্রীষ্মে টোকিওতে বিদ্যুতের ব্যবহার স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পেয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্রের সাহায্য ছাড়া বাড়িঘর, অফিস-আদালত, দোকানপাটে সময় কাটানো অসম্ভব হয়ে ওঠায় বাড়ছে ঘর শীতল রাখার যন্ত্রের ব্যবহার, যা কিনা অন্যদিকে আবার বাড়িয়ে দিচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা এবং এর থেকে বেড়ে চলেছে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা। আর এমনই এক দুষ্টচক্রের পাকে পড়ে পৃথিবী হয়ে উঠছে আরও বেশি উত্তপ্ত।

পরিবেশবিজ্ঞানীরা অবশ্য বলছেন, দাবদাহ হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের একটি মাত্র ক্ষতিকর প্রপঞ্চ, যার ক্ষতির ব্যাপ্তি অন্য নানা রকম প্রপঞ্চের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম। দৃষ্টান্ত হিসেবে তারা হঠাৎ করে শুরু হওয়া বন্যা, যা কিনা ইদানীং পাকিস্তানে নিয়ে এসেছে ভয়ংকর এক দুর্যোগ, এবং প্রচণ্ড গতিতে আঘাত হানা ঝড়ের উল্লেখ করছেন। জাপানও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সে রকম প্রভাব থেকে মুক্ত থাকেনি। প্রবল বর্ষণ থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল কাদার ধস শুরু করে দেওয়ায় বিগত বছরগুলোতে প্রাণহানির সংখ্যাও জাপানকে গুনতে হয়েছে। অন্যদিকে আবার সামুদ্রিক ঝড় জাপানে নিয়মিত আঘাত হেনে গেলেও ইদানীং হঠাৎ করেই যেন বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে সে রকম ঝড়ের ক্রোধ। ফলে ঝড় হয়ে উঠছে মারমুখী আর প্রচণ্ড।

দাবানল এখন পর্যন্ত জাপানে দেখা না গেলেও আবহাওয়াবিদদের ধারণা, কোনো কোনো অঞ্চলে খরার পদধ্বনি ইতিমধ্যে দেখা দেওয়ায় সেটাও হয়তো অচিরেই এ দেশে এসে যাবে। দুই দশক আগেও কারও পক্ষে চিন্তা করা কঠিন ছিল যে মস্কোর মতো শহরে গ্রীষ্মের হালকা গরমে এয়ারকুলারের দরকার হতে পারে। মস্কোয় এবারের গ্রীষ্ম কিন্তু এই বার্তা নিয়ে এসেছে যে এখন আর আগের সেই হালকা গ্রীষ্ম নেই। জাপানে গ্রীষ্মের চলমান দাবদাহও তাই আবারও যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে আমাদের এই পৃথিবীর একক অস্তিত্বের কথা, যার একদিকে আঘাত লাগলে গোটা দেহে ব্যথা অনুভব করা যায়। ফলে অনেকেই এখন বলছে, ক্ষতিকর এই প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হলে শুরুতেই যা দরকার তা হলো আমাদের চিন্তাভাবনার সমন্বয়। আমরা জানি, ভাবনাচিন্তার সমন্বয় করে নিতে হলে প্রথমেই যা প্রয়োজন তা হলো পারস্পরিক আস্থার ভিতকে আরও পোক্ত করে নেওয়া। হানাহানি আর ধ্বংসের খেলায় মত্ত বিশ্বনেতৃত্ব পারবে কি সেই আস্থার ভিতকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দিতে? এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে ভবিষ্যতে কতটা সফল আমরা হতে পারব আমাদের এই পৃথিবীর কখনো মাত্রাতিরিক্ত উত্তপ্ত, কখনো আবার প্রচণ্ড শীতল হয়ে ওঠার প্রবণতা ঠেকাতে।

মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

[ad#co-1]