বাংলা গান ও অতুলপ্রসাদ সেন

বাংলা গানের ইতিহাস বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। প্রাচীন বাংলা গানই বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন। ১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজ দরবার থেকে বৌদ্ধদের সাধন সঙ্গীত চর্যাপদ সন্ধান করে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। এ সাধন সঙ্গীত বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন। পণ্ডিতদের মত অনুযায়ী এ সাধন সঙ্গীতের রচনাকাল পাল রাজাদের আমলে ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। চর্যাপদের পর বাংলা গান তথা বাংলা সাহিত্যের বন্ধ্যত্ব চলে দীর্ঘদিন। এরপর চতুর্দশ শতকে ধর্মের বাতাবরণে বাংলায় রচিত গ্রন্থ ‘শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন’ তাও গীত আকারে। শুধু তাই নয়, মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের যে বিকাশ মঙ্গলকাব্যকে কেন্দ্র করে সেসব রচনাও সঙ্গীতের আদলে। রচয়িতারা কাব্যের কোন অংশ কোন রাগে গীত হবে তা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। কীর্তন, পাঁচালি, বৈষ্ণব পদাবলি, শ্যামা সঙ্গীত, টপ্পা, ঠুংরি প্রভৃতি গানের ভেতর দিয়ে বাংলা গান কাল পরম্পরা অতিক্রম করতে থাকে। এসবের ধারাবাহিকতায় বাংলা গানের সমৃদ্ধির কালে যে ক’জন সঙ্গীতজ্ঞ বাংলা গানের ভূমিতে অবতীর্ণ হয়ে বাংলা গানের আকাশ আলোকিত করেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অতুলপ্রসাদ সেন, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ।

ভারতবর্ষ পরাধীনতার শৃঙ্খলে থাকাকালীন অতুলপ্রসাদ সেন সঙ্গীত রচনায় ব্রতী ছিলেন। ব্রিটিশদের শোষণের বিরুদ্ধে সরাসরি বিরুদ্ধাচরণ করাটা ছিল দুরূহ ব্যাপার। তারপরও বাঙালি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধাচরণ থেকে পিছু হটেনি। কখনও সাহিত্যে, কখনও সঙ্গীতে তার প্রভাব পড়েছে। অতুল প্রসাদ সেনের গানগুলোর মধ্যে দেশাত্মবোধের লক্ষণ খুব পরিষ্কার। রামনিধি গুপ্তের গানে সঙ্গীতের মাধ্যমে দেশাত্মবোধের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। ‘নানান দেশের নানান ভাষা বিনে স্বদেশি ভাষা মিটে কি আশা’_ চরণে তার ভাষাপ্রেম উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সঙ্গীতে দেশপ্রেম পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রজনীকান্ত সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, কাজী নজরুল ইসলামের গানেও দানাবদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামের প্রচুর গানে দেশপ্রেম লক্ষ্য করা যায়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় লিখেছেন_ ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা/তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা’। স্বদেশি চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রজনী কান্ত সেন লিখেছেন_ ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই/ দিন দুঃখিনী মা যে আমার তার বেশি আর সাধ্য নাই।’ এই একই চেতনার ভেতর দিয়ে উচ্চারিত হলেন অতুলপ্রসাদ সেন। তিনি লিখেছেন_ ‘মোদের গরব, মোদের আশা/আ-মরি বাংলা ভাষা/তোমার কোলে/তোমার বোলে/ কতই শান্তি ভালোবাসা/কী জাদু বাংলা গানে/গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে’। অতুলপ্রসাদ সেনের গানে অনেকের প্রভাব থাকলেও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে তার গানগুলো সমুজ্জ্বল।

অতুলপ্রসাদ সেনের গানের সংখ্যা বেশি নয়। প্রায় দুইশ’। তার গানের সংকলন ‘গীতিগুঞ্জ’ গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে। তার গানের কথা এবং বিষয় সমৃদ্ধ। কীর্তন, ঠুংরি এবং বাউল গানের প্রভাব তার গানে লক্ষ্য করা যায়। হিন্দুস্থানি গানের ধরন-ধারণ করেও তিনি বাংলা গান রচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব থেকেও তিনি মুক্ত নন। অতুলপ্রসাদ সেনের গানকে অতুলপ্রসাদী গান বলা হয়।

অতুলপ্রসাদ সেন ২০ অক্টোবর ১৮৭১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তার পিতৃবিয়োগ হয়। বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করে এসে আইন পেশার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। নিজের অর্জিত সম্পত্তির অধিকাংশই তিনি মানসেবায় দান করে গেছেন। ২৬ আগস্ট ১৯৩৪ সালে তিনি প্রয়াত হন।

ড. তুহিন ওয়াদুদ

শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

বিস্তারিতঃ

[ad#co-1]