“হত্যার বিষয় আমি জানি না, বেলায়েতকে জিজ্ঞাসা করুন”

মুন্সিগঞ্জে প্রবাসী শিল্পপতি হত্যা॥ স্ত্রীর রেশমার মন্তব্য
মোশারফকে গুলি করে ঢাকার কিলার টিটু
প্রবাসী শিল্পপতি মোশারফ হোসেনকে (৪০) হত্যার পরিকল্পনাটি হয় গত ৮ আগস্ট। এদিন সকালে মোশারফ গ্রীস থেকে দেশে ফিরে। সৎভাই বেলায়েত(৩০) ভাড়াটে খুনিদের সঙ্গে চুক্তি করে ৯ আগস্ট ঢাকার যাত্রবাড়ি এলাকায় হত্যার সিদ্ধান্ত নিলেও মোশারফ বাসা থেকে বের না হওয়ায় তা ভন্ডুল হয়ে যায়। পরদিন ১০ আগস্ট মোশারফ মুন্সিগঞ্জে শ্বশুরালয় তথা মামার বাড়ি আসলে সেটিকেই টার্গেট করে। বেলায়েতের নেতৃত্বে ৪ জন মটোরবাইক যোগে সেখানে গিয়ে হরগঙ্গা কলেজ এলাকায় অবস্থান নেয়। বিকলে মোশারফ ঢাকায় ফেরার পথে মুন্সিগঞ্জ শহরের লেচুতলাস্থ নতুন বাসষ্ট্যান্ডের কাউন্টারের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার পর মুন্সিীগঞ্জের আদালতের সামনে দিয়ে মহাকালী হয়ে সিপাহিপাড়া আসে। এখান থেকে ভাগ হয়ে যায় চার জন। দু’জন মোটারবাইকে চালিয়ে এবং দু’জন বাসে করে মুন্সিগঞ্জ ত্যাগ করে মুক্তারপুর ব্রিজ দিয়ে। কিলিং মিশনে থাকা ঘাতক ফারুক পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এসব কথা বলেন। তবে রিমান্ডের দ্বিতীয় দিনেও রেশমা স্বামী হত্যার সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন। রেশমা (২৩) পুলিশকে বলে, “হত্যার বিষয় আমি জানি না বেলায়েতকে জিজ্ঞাসা করুন।”

ঘাতক ফারুক আরো জানায়, সৎ ভাই বেলায়েত ও অপর একজন মটর সাইকেল চালানোর দায়িত্বে ছিল। সে অস্ত্রবহন করলেও বেলায়েতের মটর সাইকেলে থাকা ঢাকার কিলার টিটু মোশারফকে লক্ষ্য করে ৪ রাউন্ড গুলি ছুড়ে। এরপরই তারা সিপাহীপাড়া যায়। সেখান থেকে অস্ত্রসহ টিটু ও সে মটর সাইকেল থেকে নেমে বাসযোগে ঢাকা চলে যায়।

হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র ভাড়ায় গেছে অন্যত্র

মুন্সিগঞ্জে প্রবাসী শিল্পপতি মোশারফকে হত্যায় যে ২টি পিস্তল ব্যবহার করা হয় তা এখন ভাড়ায় গেছে অন্যত্র। প্রবাসীকে হত্যার পর অস্ত্র যে স্থান থেকে সংগ্রহ করেছিল সেখানে তা জমা দেয়ার পর অপর একটি সন্ত্রাসী গ্র“প তা ভাড়া নিয়েছে। ওই অস্ত্র বর্তমানে ঢাকার বাইরে রয়েছে। বুধবার রিমান্ডে মুন্সিগঞ্জ পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত ফারুক এ তথ্য প্রদান করেছে। তবে কার কাছ থেকে অস্ত্র ভাড়া করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে কারা ওই অস্ত্র আবার ভাড়া নিয়েছে তা পুলিশ অবগত হলেও মামলার তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে ফারুকের দাবী একটি পিস্তল থেকেই গুলি চারটি হয়েছিল। তবে এই অস্ত্র দিয়ে আবার কার মায়ের বুক খালি করে তাই এখন শঙ্কা।

আমেনা ও রেজোয়ানে অনিশ্চিত ভবিষ্যত!
শিল্পপতি মোশারফের দু’সন্তান এখন অহসায়। বাবা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। আর মা জেল খানায়। বড় মেয়ে আমেনা (৬) দাদীর কাছে অনেক কষ্টে দিন কাটালেও ছেলে রেজোয়ান(২) মায়ের সাথেই হাজত বাস করছে। দুধের শিশু রেজোয়ানকে ঘুমে রেখেই পুলিশ রেশমাকে যাত্রাবাড়ি থেকে আটক করে মুন্সিগঞ্জ থানায় নিয়ে আসে। পরে কান্নাকাটির কারণে দাদী মামলার বাদী রেজোয়ানকে নিয়ে আসলে লাফ দিয়ে মায়ের কোলে চলে যায়। এই যে মায়ের কোলে আর কোনভাবেই দাদী মায়ের কাছ থেকে নিতে পারেনি।

কিন্তু শিশুটি জানে না বাবাকে আর কোন দিনও পাবে না। আর এজন্য দায়ী এই মা। মায়ের পরকীয়া প্রেমের বলি হয়ে বাবা মোশারফ এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু তাও সে বুঝে না । বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ থানার মহিলা হাজত খানায় এই শিশুটির বিষয়ে পুলিশ বিশেষ সর্তকতা নিয়েছে। সদর থানার ওসি শহীদুল ইসলাম জানান, শিশু রেজোয়ানের বিষয়টি আদালতের নোটিশেও রয়েছে। শিশুটি খাওয়াসহ সব দিকেই নজর রাখছে পুলিশ। রেশমার আপন ফুপু ও শ্বাশুরী হাজেরা বেগম মামলার বাদী। তিনি পাকিস্থানে থাকেন। মাস দেড়েক আগে দেশে আসেন। কিন্তু পুত্রের মৃত্যু এবং ভাতিজি তথা পুত্রবধুর এই অবস্থায় এখন তিনি শিশু ২টি নিয়ে বিপাকে।

ঘাতক ফারুক পেশাদার অপরাধী

এই কিলিং মিশনে নেতৃত্বদানকারী বগা ফরুক পেশাদার অপরাধী। তার বিরুদ্ধে নরসিংদীতে ২০০৩ সালের একটি ডাকাতি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়াও সে পুরান ঢাকা, শনির আখরা, গেন্ডিরিয়া, মিজিমিজিসহ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ এবং আশপাশে নানা অপরাধের সাথে জড়িত।

যেভাবে গড়ে উঠে পরকিয়া

দ্বিতীয় ঘরের সন্তান বেলায়েত। এই ঘরে তিন ভাই এক বোনের মধ্যে সবার ছোট বেলায়েত। সে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব থাকে। গত ৬ মাস আগে দেশে ফিরে বিয়ে করতে। কিন্তু বিয়ে করতে এসেই ভাবীর প্রেমে পড়ে যায়। এই প্রেমের কারণে বেলায়েত বিয়ে করেনি আর সৌদি আরবও ফিরে যায়নি। যাত্রাবাড়ির ২শ’গজের মধ্যেই বেলায়েত ও রেশমার স্বামীর নিজের বাড়ি। রেশমার সাথে রাসেল নামে রেশমার এক ভাই থাকতো। আপন বলতে দুই শিশু সন্তান ছাড়া আর কেউ ছিল না। তবে মাস খানেক আগে এক ভাড়াটিয়া দরজা আটকানো অবস্থায় বেলায়েতর সাথে রেশমাকে দেখতে পায়। বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। এই খবর পেয়েই রেশমার স্বামী মোশারফ দেশে আসে। আসার ২দিন পরেই একা শ্বশুড়ালয়ে আসেন শ্বাশুরিকে বিষয়টি জানাতে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে। মামলাটি দায়েরের পর থেকেই তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন সদর থানার দারোগা ওবায়দুল হক। কিন্তু তার কাছে তথ্য চাইতে গিয়ে বুধবার জানাগেলো তিনি আর এখন এই মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে নেই। মামলাটির বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর থানার ওসি মো.শহিদুল ইসলাম। গুরুত্বপূর্ণ দুই আসামী গ্রেফতারের পর তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তনের সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি।

মোহাম্মদ সেলিম, মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি। ০১৯১১১৪২৬৭০
২৫ আগস্ট ২০১০

[ad#co-1]

———————————————–

রিমান্ডে খুনের কথা বলছেন না রেশমা
গুলি করার কথা স্বীকার ঘাতকের

স্ত্রী ও সৎভাইয়ের পরকীয়ার জের ধরে মুন্সীগঞ্জ শহরের লিচুতলাস্থ বাসস্ট্যান্ডে গ্রিস প্রবাসী গার্মেন্ট ব্যবসায়ী মো. মোশারফ হোসেন (৪০) হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। তাছাড়া প্রথম দিনের রিমান্ডে নিহতের স্ত্রী রেশমা ও ঘাতক ফারুক ওরফে বগা ফারুককে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ও গতকাল বুধবার দিনভর পুলিশ ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। বুধবার দুপুরে কিলিং মিশনে অংশ নেয়া রিমান্ডে থাকা কিলার ফারুক ওরফে বগা ফারুকের স্ত্রী কেয়া (২৪) সদর থানা হাজতে স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। বগা ফারুকের বিরুদ্ধে নরসিংদী সদর থানায় ২০০৩ সালের একটি ডাকাতি মামলা দায়ের হওয়ার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, মোটরবাইক আরোহীদের গুলিতে গ্রিস প্রবাসী গার্মেন্ট ব্যবসায়ী হত্যাকা-ের পরদিন থানায় নিহতের মা হাজেরা বেগম বাদী হয়ে মামলা করেন। এতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত হন সদর থানার এসআই ওবায়দুল হক। পরবর্তীতে মামলার ক্লু উদঘাটন ও নিহতের স্ত্রী, ঘাতক ফারুক ধরা পড়লে গতকাল বুধবার পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তার পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন সদর থানার অফিসার ইনচার্জ শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, আরো ৩ দিন আগেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তার পরিবর্তন করা হয়। রিমান্ডে আনা গ্রেফতারকৃত প্রবাসীর স্ত্রী এখনো হত্যাকা-ের সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করছেন। তবে সৎভাই বেলায়েতের সঙ্গে এ ঘটনার ৬ মাস আগে থেকে প্রেমে জড়িয়ে পড়ার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন তিনি। প্রতিদিন পরকীয়া প্রেমিকের সঙ্গে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে মুঠোফোনে আলাপচারিতায় লিপ্ত থাকতেন বলে রেশমা পুলিশকে জানিয়েছেন। অন্যদিকে প্রথম দিনের রিমান্ডে ঘাতক ফারুক ঘটনার দিন বিকালে গ্রিস প্রবাসীকে লক্ষ্য করে নিজের অবৈধ অস্ত্রের গুলি ছোড়ার কথা জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২৩ আগস্ট ঢাকার ২৪/বি উত্তর যাত্রাবাড়ী থেকে রেশমাকে ও বগা ফারুককে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলার মিজমিজি এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত ১০ আগস্ট বিকালে মুন্সীগঞ্জ শহরের লিচুতলাস্থ বাসস্ট্যান্ডে মোটরবাইক আরোহীদের গুলিতে খুন হন ওই ব্যবসায়ী।কান্নায় ভেঙে পড়েন ফারুকের স্ত্রী কেয়া ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা কেয়ার (২৪) স্বামী ফারুক ওরফে বগা ফারুক এখন ৪ দিনের রিমান্ডে মুন্সীগঞ্জ সদর থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। শহরের চাঞ্চল্যকর গ্রিস প্রবাসী হত্যাকা-ের ঘাতক চিহ্নিত হওয়ার পর ৩ দিন আগে গত সোমবার ২৩ আগস্ট সকালে নারায়ণগঞ্জের শানারপাড়া এলাকার মিজমিজি থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। গত মঙ্গলবার বিকালে ঘাতক ফারুককে সদর থানায় পুলিশের রিমান্ডে আনা হয়েছে। গতকাল বুধবার ঘাতক স্বামীকে দেখতে এসে থানা কম্পাউন্ডের ভেতর কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী কেয়া। এ সময় ফারুকের এক ভাবিও ছিলেন কেয়ার সঙ্গে। কেয়া জানান, তার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার শানারপাড়া এলাকার মেয়ে তিনি। ২ বছর আগে ফারুকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বর্তমানে তিনি ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। পেটের সন্তানের জন্যই এখন ভাবনায় কান্নায় ভেঙে পড়ছেন কেয়া।

ডেসটিনি
———————————————————-