সিনথিয়া আমাদের ক্ষমা করো

মাঈন উদ্দিন আহমেদ মাহী
প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই আমাদের চোখে পড়ে নানা দুর্ঘটনার খবর। তাই ধীরে ধীরে এসব দুর্ঘটনা আমাদের জন্য স্বাভাবিক দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তেমনি বিগত কয়েক মাসের পত্রিকা দেখলে মনে হবে বখাটেদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কিশোরীদের আত্মহননের পথ বেছে নেয়া এক সাধারণ ঘটনা। একের পর এক কিশোরী প্রাণ দিয়ে যেতে থাকলেও এখনও পর্যনত্ম সেসব বখাটেদের উল্লেখযোগ্য শাস্তি হয়নি। বিগত সময়ের ইলোরা, পিংকি, তন্বী, রুমি, রুনা, রেশমা, রিনার মতো বহু নারী ও কিশোরী আত্মহত্যা করেছে এবং সিনথিয়ার মতো প্রতিবাদী কিশোরীও আত্মহত্যা করছে বখাটেদের নির্যাতনের কারণে। যা একটি স্বাধীন দেশে বড্ড বেশি বেমানান। ১১ আগস্ট মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় বারৈখালী গ্রামের দশম শ্রেণীর ছাত্রী হাসনা রহমান সিনথিয়া পাড়ার এক বখাটে জাহাঙ্গীরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহত্যা করে। অথচ এক মাস আগেও বখাটে সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করা এবং ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সেস্নাগান নিয়ে ছাত্রীরা যে শোভাযাত্রা করেছিল সিনথিয়া ছিল সেই শোভাযাত্রায় সামনের সারিতে। তারপরও নিশ্চয় মানসিকভাবে সে এতটাই দুর্বল ও অসহায় হয়ে পড়েছিল যে বখাটে জাহাঙ্গীরের হাত থেকে রৰা পেতে আর কোন উপায় না পেয়ে অবশেষে আত্মহত্যাকেই মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে। সিনথিয়া তো কোন দোষ করেনি, তবে কেন সে নিজেকে শাসত্মি দিবে। যেসব বখাটেরা দোষী তারা আজ গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর তাদের অত্যাচারে একের পর এক কিশোরীরা প্রাণ দিয়ে যাচ্ছে। এ ধারা তো আর চলতে দেয়া যেতে পারে না। সামাজিকভাবে এসব বখাটেদের প্রতিহত করার এবং তাদের উপযুক্ত শাসত্মির মধ্যে দিয়েই ভবিষ্যতে বহু কিশোরীর জীবন বাঁচানো সম্ভব।

প্রতিটি কিশোরীর মনে করা উচিত, আজকে সে তার জীবননাশের মধ্যে দিয়ে তার মা-বাবা, ভাই যারা তাকে এত বড় করে তুলেছে, তাকে নিয়ে যাদের এত স্বপ্ন সে আত্মহত্যায় তাদের এত বড় শাসত্মি দিতে পারে না। যদি তার শাসত্মি দিতে হয় তো শাসত্মি দিতে হবে সেই বখাটেকে যার নির্যাতনের জ্বালায় আজ তার আত্মহত্যাকেই মুক্তির পথ বলে মনে হচ্ছে। আর তার জন্য প্রয়োজন সামাজিক সহায়তা ও আইনের যথাযোগ্য প্রয়োগ।

ইভটিজিং প্রতিরোধের জন্য এমন আইন প্রণয়ন করতে হবে যেন বখাটেরা কিশোরীকে অত্যাচার করার আগে তার ভবিষ্যত শাসত্মি কথা মনে করে ভয় পায়। বর্তমানে বখাটেদের অত্যাচারে কিশোরীদের প্রাণনাশের এ ধারা বন্ধের জন্য নারীদের মনোবলকে আরও বলিষ্ঠ করে তুলতে হবে। তাই সামাজিকভাবে প্রতিটি বিদ্যালয়ের কিশোরীদের মধ্যে এ উপলব্ধি গড়ে তুলতে হবে যে তারা মোটেও অসহায় নয়। সমাজ ও দেশের আইন তাদের সাথে রয়েছে। তারা চাইলেই বখাটেদের প্রতিহত করতে পারে।

কিন্তু পরৰণই মনে হয় প্রতিবাদী কিশোরী সিনথিয়ার কথা। সিনথিয়াও প্রতিবাদ করে ছিল কিন্তু সে নিজেও আত্মহত্যার পথকে বেছে নেয় মুক্তির পথ হিসেবে। মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে নিজের নোট খাতায় সিনথিয়াকে খোলা চিঠি লিখি। সিনথিয়া, বখে যাওয়াদের বিরম্নদ্ধে তোমাদের যূথবদ্ধ মিছিলের ছবিটি পত্রিকার পাতায় আমি দেখেছি।

আশান্বিত হয়েছিলাম ইভটিজিং প্রতিরোধে তোমাদের সম্মিলিত শপথ প্রেরণার ফুল হয়ে ছড়িয়ে পড়বে আমাদের শহর-গ্রাম-জনপদে। তোমাদের বিদ্রোহের ভাষা কাঁপন ধরিয়ে দেবে বিপথগামীদের বুকে। আমি সত্যি খুশি হয়েছিলাম, আমাদের বোনেরা জানে কিভাবে অন্যায়ের বিরম্নদ্ধে প্রতিবাদ করতে হয়। কিন্তু এ কী হলো।

মিছিলে যে তুমি ছিলে সাহসের সবুজ সাগর_সে তুমি আজ নেই। প্রতিবাদে যে তুমি ছিলে প্রেরণার পাখি, সেই তুমি নেই। আমাদের মিছিলকে মৌন করে, আমাদের সাহসকে শূন্য করে, আমাদের স্বপ্নকে চূর্ণ করে এভাবে কেন চলে গেলে? এভাবে চলে যেতে নেই সিনথিয়া।

আগামী মিছিলগুলোতে তোমাকে যে বড্ড বেশি প্রয়োজন ছিল। কার জন্য চলে যাওয়া? ওই অভিশপ্তদের জন্য নিজের ওপর কেন এই অভিমান? এই পৃথিবীটা তো জাহাঙ্গীর নামক নরকীটদের নয়। শুধুই নষ্টদের নয় সবকিছু। এইসব কিছুর মাঝেও কিছু মানবিক মন তো আছে। মা-বাবা, ভাইয়ের ভালবাসা আছে। মায়ের মমতা আছে অবারিত। আছে বন্ধু সুজন তোমার বিরহে বড় বিষণ্ন আমাদের বুকের বাগান।

আজ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব ও কর্তব্য যেসব বখাটেরা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে আইনের মাধ্যমে সেসব বখাটেদের যথোপযুক্ত শাসত্মি কার্যকর করার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের এ পদৰেপ ও বখাটেদের শাসত্মি ভবিষ্যতে অন্য সকল কিশোরীদের মনোবল জোগাবে। বর্তমানে এত বেশিসংখ্যক কিশোরী বখাটেদের নির্যাতনে যন্ত্রণায় ও মানসিক অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিলেও বাংলাদেশের কিশোরীদের মানসিক অবস্থা তাদের আত্মহত্যার প্রবণতা ও এর কারণ নিয়ে এখনও কোন গবেষণা করা হয়নি।

আমরা আশা নয়, বিশ্বাস করি, এদেশে আর কোন সিনথিয়া আত্মহত্যা করবে না। আমার এ স্বপ্ন দেখা কী ভুল। আমরা কী মনে করতে পারি না সিনথিয়া আমার বোন। আর কোন আত্মহত্যা দেখতে চাই না।

বাংলাদেশের মানুষ স্বপ্ন দেখে সন্ত্রাস মুক্ত বাংলাদেশ। শুধু একটি প্রশ্ন করতে চাই : আর কত সিনথিয়ার চলা যাওয়ায় আমাদের টনক নড়বে? কর্তাব্যক্তিগণ বলবেন কি?

সিনথিয়া আমায় ৰমা করে দিও। আমরা তোমাদের রৰা করতে পারিনি।

ছাত্র, ড্রইং এ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগ
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন চারম্নকলা ইনঃ ময়মনসিংহ

[ad#co-1]

One Response

Write a Comment»
  1. we hope criminal should be punish by law (otherwayes punish by public)