তত্ত্বাবধায়ক সরকার সীমা লংঘন করেছে :হাইকোর্ট

বেআইনিভাবে আদায়কৃত ২৯৭ কোটি টাকা ফেরত দিতে সরকারকে নির্দেশ
জরুরি অবস্থাকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুইটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বেআইনিভাবে আদায়কৃত ২৯৭ কোটি টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই কার্যক্রমকে অসাংবিধানিক, বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে বলা হয়, সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে নির্বাচন ও দৈনন্দিন কাজ সম্পাদন করা। আইন বহির্ভূত উপায়ে কারো কাছ থেকে টাকা আদায় ওই কাজের মধ্যে পড়ে না। তাই এ দুইটি কোম্পানির কাছ থেকে টাকা আদায়ের বিষয়টি সীমা লংঘন এবং অসাংবিধানিক। এছাড়া সংবিধানের ৮১, ৮২ ও ৮৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কারো কাছে কোনো পাওনা না থাকলে সরকার কোনো টাকা আদায় করতে পারে না। আর পাওনা থাকলে বিষয়টি আইনগতভাবে নিষ্পত্তি করে সরকার টাকা আদায় করতে পারবে। রায়ে বলা হয়, সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষের সংবিধান বহির্ভূত কোনো ক্ষমতা নেই। সব ক্ষমতা সংবিধান ও আইনানুযায়ী প্রয়োগ করতে হবে। বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি সৈয়দা আফসার জাহানকে নিয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এই রায় দেন। রায়ে ক্যাথেলি ডেটেড টি এন্ড ল্যান্ড বাংলাদেশ লিমিটেড এবং এস আলম গ্রুপের কাছ থেকে নেয়া মোট ২৯৭ কোটি টাকা আগামী তিন মাসের মধ্যে ফেরত দেয়ার জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

জরুরি অবস্থার সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সামরিক গোয়েন্দা ডিজিএফআই ক্যাথেলি ডেটেড টি এন্ড ল্যান্ড বাংলাদেশ লিমিটেডের কাছ থেকে ৯টি পে-অর্ডারের মাধ্যমে ২৩৭ কোটি টাকা এবং ৪৮টি পে-অর্ডারের মাধ্যমে এস আলম গ্রুপের কাছ থেকে ৬০ কোটি টাকা আদায় করে। তখন দুইটি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আটক ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে ঐ পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয়। ঐ অর্থ আদায়ের রসিদ দেয়া হয়। এরপর এই সব টাকা একটি সমঝোতার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেয়া হয়। বর্তমানে এই টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসপেন্ডেড এ্যাকাউন্টে জমা রয়েছে বলে রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়। আবেদনে বলা হয়, আইনানুযায়ী এভাবে কোন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা যায় না। এজন্য প্রতিষ্ঠান দুটির পক্ষ থেকে ঐ টাকা ফেরত চেয়ে এবং টাকা নেয়াকে অসাংবিধানিক ঘোষণার দাবি জানিয়ে রিট আবেদনে প্রার্থনা জানানো হয়। আবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক ও গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইকে বিবাদী করা হয়। গত এপ্রিল মাসে এই রিট দায়ের করা হয়। রিট আবেদনের ওপর শুনানি গ্রহণ করে গত ১৩ এপ্রিল হাইকোর্ট সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুল জারি করে। গতকাল রুলের ওপর শুনানি গ্রহণ করে হাইকোর্ট টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেয়। এদিকে রিটের শুনানি চলাকালে ডিজিএফআই এফিডেভিট দিয়ে আদালতে বলেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ডিজিএফআই এভাবে কোন টাকা গ্রহণ করেনি। এছাড়া গোয়েন্দা সংস্থা হিসাবে কারো কাছ থেকে অর্থ আদায় করা ডিজিএফআইয়ের কাজের মধ্যে পড়ে না।

রিট আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এডভোকেট আব্দুল বাসেত মজুমদার, এডভোকেট মাহমুদুল ইসলাম, এডভোকেট আব্দুল হান্নান, এডভোকেট সাইদ আহমেদ রাজা, এডভোকেট এস এম আমিনুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ব্যারিস্টার এম আমীর-উল-ইসলাম মামলা পরিচালনা করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন সহকারী এটর্নি জেনারেল এডভোকেট রাশেদ জাহাঙ্গীর।

আদেশের পর বাসেত মজুমদার সাংবাদিকদের বলেন, ভয়ভীতি দেখিয়ে গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই তাদের কাছ থেকে টাকাগুলো আদায় করেছে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। হাইকোর্ট আগামী তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে এই টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

সালেহউদ্দিন ও দিদারুল আলম

[ad#co-1]