হুমায়ুন আজাদের প্রবন্ধ সাহিত্য ও তাঁর স্বকীয় ভাষাবোধ

তুষার তালুকদার
বহুমাত্রিক ও প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদ। সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায়ই তিনি প্রচুর লেখালেখি করেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি লিখেছেন প্রবন্ধ। আশি পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে প্রবন্ধ রচনায় হুমায়ুন আজাদ ভিন্নতার সৃষ্টি করেন। ভিন্নতা তৈরি করেন বিষয়বস্তু ও ভাষাশৈলীর দিক থেকে। বহু সাহিত্যিক তাঁর সাহিত্যকর্ম মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছেন, হুমায়ুন আজাদ তাঁর রচনার বিষয়বস্তু নির্বাচনে ছিলেন প্রথাবিরোধী। তবে কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এক সাহিত্য অনুষ্ঠানে বলেন, হুমায়ুন আজাদ প্রথমত জরুরী তাঁর ভাষাবোধের জন্য। তারপর বিষয়বস্তু। সত্যিই সব সাহিত্যিক পারেন না স্বকীয় একটি ভাষাবোধ তৈরি করতে। কিন্তু হুমায়ুন আজাদ নির্মাণ করেছিলেন সম্পূর্ণ তাঁর স্বকীয় একটি ভাষাশৈলী। বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর প্রবন্ধ রচনা করেছেন তিনি। কবি ও কবিতা, কবিতার ভবিষ্যত, আধুনিকতাবাদ, সমকালীন সাহিত্য, রাজনীতি, বাংলা বানান, ধ্বনিমালা প্রভৃতি বিষয় উঠে এসেছে তাঁর প্রবন্ধে।

২.
হুমায়ুন আজাদের সাহিত্যজীবনের শুরুর দিকের একটি প্রবন্ধ সমগ্র ‘আধার ও আধেয়’। প্রকাশকাল ১৯৯২। মোট প্রবন্ধ সংখ্যা ২৩। বইটির শুরু ‘কবিতার ভবিষ্যত’ প্রবন্ধ দিয়ে। হুমায়ুন আজাদ পূর্ববর্তী প্রবন্ধ সাহিত্যে কবিতা বিষয়ক লেখা খুব একটা পাওয়া যায় না। হুমায়ুন আজাদের অন্যতম একটি পছন্দের সাহিত্যশাখা কবিতা। তাঁর ভাষায়_ সমস্ত শিল্পকলার মধ্যে কবিতার আহ্বানই সবচেয়ে দূরগামী। কবিতা তাঁর কাছে সৌন্দর্যের বিরামহীন বিস্তার। স্পষ্ট ভাষায় ‘কবিতার ভবিষ্যত’ প্রবন্ধে তিনি বলেন_ অতীতে কবিতার স্থায়ী আবেদন ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। নতুন সমাজব্যবস্থার জন্য কবিতা অপরিহার্য। তাছাড়া কবিতার আধুনিকতা নিয়েও অনেক বস্তুনিষ্ঠ কথা বলেছেন ‘সামপ্রতিকতা, আধুনিকতা এবং আধুনিক কবিতা’ প্রবন্ধে। তীক্ষ্ন কাল ও সমাজ সচেতনতা ছাড়া কবিতা আধুনিক হয় না। অর্থাৎ কবিতা লেখার জন্য কাল সচেতনতা বড় একটি বিষয়। কবিদের মধ্যে সমকালীন চেতনা প্রগাঢ় না হলে কবিতা সামপ্রতিকতা বিবর্জিত হয়। আর সামপ্রতিক চিন্তাবিহীন কবিতা পাঠকদের কাছে টানতে পারে না। তাই আজাদ মনে করেন, কাল হ’লো কবিতার নির্দেশক। আবার হুমায়ুন আজাদ ‘সামপ্রতিকতা, আধুনিকতা এবং আধুনিক কবিতা’ নামক প্রবন্ধে আধুনিকতা ও সামপ্রতিকতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরেন। আধুনিকতা হচ্ছে কালের অভ্যন্তরীণ রূপ এবং সামপ্রতিকতা কালের বাহ্যিক রূপ। যদিও আধুনিকতা, সামপ্রতিক বা সমকালীন তীক্ষ্ন চিন্তাচেতনার উপর নির্ভর করেই গড়ে ওঠে। হুমায়ুন আজাদ পশ্চিমা আধুনিক কবি টি. এস. এলিয়টের ‘দি ওয়েস্ট ল্যান্ড’ বা পতিত জমি কবিতার কথা বলেন এ প্রবন্ধে। এ কবিতায় এলিয়ট বিংশ শতাব্দীর বিশ্বকে পাথুরে জঞ্জাল, ক্লান্তিময় এবং রুগ্ন বলেছেন। আজাদ মনে করেন এলিয়ট তাঁর সমকালীন সমাজে বাহ্য ঘটনাবলীর (যুদ্ধ, মহামারী, বিশ্বাসশূন্যতা, লোভ, হিংসা) উপর নির্ভর করেই এ কালকে জরাজীর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। এভাবেই আধুনিক কবিরা সামপ্রতিক তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে কালের অভ্যন্তরীণ রূপ তুলে ধরেন পাঠকদের সামনে।

৩.
‘শব্দের প্রকৌশল : বনলতা সেন’ প্রবন্ধে আজাদ বলেন, মধুসূদন বাংলা ভাষায় শব্দের প্রথম আধুনিক প্রকৌশলী। তিনিই প্রথম কবিতায় শব্দ প্রবাহ তৈরি করেন। শব্দের পর শব্দ বসালেই কবিতা হয় না । কবিতা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন শব্দের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে শব্দকে অনুধাবন করা। এ প্রবন্ধে আরো আছে, রবীন্দ্রনাথ নতুন নতুন শব্দ ব্যবহার করতেন তাঁর কবিতায় এবং এই নতুনত্বে পাঠক হৃদয় স্নাত হতো। নতুন শব্দ প্রয়োগ পাঠকের চিন্তা শক্তি ও অনুধাবন ক্ষমতা শাণিত করতো। রবীন্দ্রনাথকে হুমায়ুন আজাদ বিশুদ্ধতম কবি বলেছেন। রবি ঠাকুর সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদের দৃঢ় উচ্চারণ ‘কবি’ প্রবন্ধে :

“রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষায় শুধু শ্রেষ্ঠ নন, বিশুদ্ধতম কবিও; যা কিছু কবিতা নয়, তার থেকে রবীন্দ্রনাথের কবিতাই সবচেয়ে বেশি মুক্ত। তাঁর কবিতার স্তবকে স্তবকে বোধ করতে হয় যে রচয়িতা কবি। আবেগ, কল্পনা, স্বপ্ন এমন আর দেখা যায় নি বাংলা ভাষায়; এবং বাংলা ভাষা আর কখনো এমনভাবে কবিতা হয়ে ওঠে নি। কিন্তু তাঁকে ভোগ করার জন্যে দরকার প্রশান্তি। যেদিন বাঙালি কোলাহল-কলরোল থেকে, সহস্র উত্তেজনা থেকে মুক্তি পাবে, খুঁজবে প্রশান্তি, কবি ও কবিতা, সেদিন বাঙালিকে খুঁজে নিতে হবে রবীন্দ্রনাথকে ও রবীন্দ্রনাথের কবিতা। কেননা একজন ছিলেন ও আছেন, যার নাম রবীন্দ্রনাথ : কবি।”

বাংলাদেশে সত্তর আশির দশকের সাহিত্যিকদের নিয়ে হুমায়ুন আজাদ একটি বিস্তর প্রবন্ধ লেখেন। বাংলাদেশের প্রবন্ধ ও সমালোচনা-সাহিত্য (১৯৭২-১৯৭৯) নামক এ প্রবন্ধে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় অনেক সাহিত্যিকদের সৃষ্ট রচনা নিয়ে সমালোচনা করেন। আবার কারো কারো রচনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। সৃষ্টিশীল সাহিত্যের সাধনা আর মৌলিক সাহিত্যিকদের যথার্থ মূল্যায়ন তিনি করতেন।

৪.
হুমায়ুন আজাদ তাঁর লেখকজীবনের শুরুতে প্রভাবিত হয়েছিলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বুদ্ধদেব বসুর গদ্যরীতি দ্বারা। বুদ্ধদেবের যতি ব্যবহার আর সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার_ এ দু’য়ে হুমায়ুন আজাদ ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তাছাড়া বক্তব্য উপস্থাপনেও তিনি ছিলেন সজাগ। ঘুরিয়ে লেখার চেয়ে সরাসরি বাক্য লিখতেন। এ ?ক্ষেত্রে বুদ্ধদেব বসুর গদ্যরীতি তাঁকে আলোড়িত করেছিল। তাই হুমায়ুন আজাদ ‘কালের পুতুল’ প্রবন্ধ সংকলনের ‘কালপুরুষ’ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসুর গদ্যরীতিকে আধুনিক কালের শ্রেষ্ঠ গদ্যরীতি বলে উল্লেখ করেছেন। বক্তব্য ও শৈলীর সামঞ্জস্য রক্ষায় তিনি ছিলেন সদা সজাগ। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন :

“কবিতায় আমি ঠিক একক কোনো কবি দিয়ে প্রভাবিত হয়েছি ব’লে মনে হয় না, যদিও সুধীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দ, এবং পশ্চিমের কোনো কোনো কবি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। গদ্যে আমি সচেতনভাবেই, তিনিশ বছর পর্যন্ত, মেনেছি বুদ্ধদেব বসু এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রভাব। তারপর আমার গদ্যে সুধীন্দ্রনাথ নেই, বুদ্ধদেবও নেই।”

৫.
আজাদের ভাষায় একটি অনিঃশেষ প্রবাহ আছে। আমাদের স্বকালে এ ভাষা ব্যতিক্রমী ও ব্যক্তিগত। তাঁর ভাষা প্রত্যয় সৃষ্টি করতে উদ্যত। আজাদের প্রবল যুক্তিবোধ ভাষাকে আরো গতিশীল করেছে। আবার আমরা বলতে পারি তাঁর ভাব ও ভাষা দু’টোই স্বকীয়। তাঁর চিন্তার স্বকীয়তাই ভাষার নিজস্বতা সৃষ্টি করেছে। ভাষার শক্তিই লেখকের শক্তি। আবার স্পষ্ট চিন্তাচেতনাই শক্তিশালী ভাষার জন্ম দেয়। হুমায়ুন আজাদের ভাষা মেদহীন। কারণ তাঁর চিন্তাশক্তি প্রবল এবং অনাহত। আহত চিন্তা শক্তিশালী ভাষা নির্মাণের অন্তরায়। তাঁর চিন্তা ও প্রতিফলনের মধ্যে বিন্দুমাত্র ফাঁক ছিল না। তাঁর ভাষায় প্রবন্ধের প্রাণ হচ্ছে আইডিয়া বা মৌলিক চিন্তা। আর মৌলিক চিন্তা ছিল তাঁর প্রবন্ধ রচনার গাঁথুনি।

৬.
মৌলিক চিন্তক হুমায়ুন আজাদের ভাষা আধুনিক। ভাষা আধুনিক কারণ তা পুরোনো থেকে আলাদা হতে চায়। তাঁর নিজের ভাষায় : আধুনিক কবি তাঁর স্বভুবন সৃষ্টি করতে চায়; সে ভুবন অব্যবহিত পূর্ব ভুবন থেকে পৃথক আত্মায় এবং আঙ্গিকে, রূপে এবং অপরূপে। হুমায়ুন আজদের ভাষা দুরূহ নয়, বরং সাবলীল। তিনি ব্যক্তিত্বে আধুনিক এবং ভাষা ব্যক্তিত্বেও আধুনিক। তাঁকে এজরা পাউন্ডের ভাষায় বলা যায়, ংবষভ সধফব সড়ফবৎহরংঃ কিংবা স্বগঠিত আধুনিক। সব সাহিত্যিকই শব্দের পর শব্দ নির্মাণ করেন। তবে হুমায়ুন আজাদের শব্দ নির্মাণ ছিল অত্যন্ত অর্থপূর্ণ। তাই তিনি শব্দের যথার্থ প্রকৌশলী।

[ad#co-1]