বিউটি বোর্ডিং রাজধানীর পরশপাথর

কোন কিছুই বদলায়নি, সব রয়েছে সেই আগের মতোই
মহিউদ্দিন আহমেদ
মানুষের পদধূলিতে স্থান বড় হয়ে ওঠে, নাকি স্থান মানুষকে বড় করে_এ দুটি বাক্যের মধ্যে কোনটি সত্য হবে বিউটি বোর্ডিংয়ের ৰেত্রে। এ তর্ক হয়ত থেকেই যাবে। তবে যাঁরা এ বোর্ডিংয়ে আড্ডা দিতেন তাঁদের অধিকাংশই নিজ স্থানে খ্যাতির শীর্ষে রয়েছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডা দিয়ে কি তাঁরা কাঙ্ৰিত লৰ্যে পেঁৗছতে পেরেছেন, নাকি তাঁদের আড্ডা বিউটি বোর্ডিংকে ঐতিহাসিক বোর্ডিংয়ের মর্যাদা দিয়েছে? তবে কেউ কেউ এ বোর্ডিংকে পরশপাথর বলেই মনে করে থাকেন।

গত ছয় দশকে পৃথিবীর অনেক কিছু বদলে গেছে। বদলে গেছে বাংলাদেশের মানচিত্র এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি। পরিবর্তন এসেছে মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদেও। শুধু বদলায়নি ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিং। এখনও রয়েছে সেই আগের মতোই। নির্মল পরিবেশ। কিন্তু ভাটা পড়েছে শুধু আড্ডার। প্রতি শুক্রবার বিকালে বসত সাপ্তাহিক আড্ডা। এতে রাজনীতিক তাজউদ্দীন আহমদ, দেশবরেণ্য কবি শামসুর রাহমান, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, নায়করাজ রাজ্জাক ও জাদু শিল্পী জুয়েল আইচসহ বিভিন্ন বয়সের বন্ধুদের বসত আড্ডা। নবীন-প্রবীণের মতবিনিময়ে মুখরিত হয়ে উঠত বোর্ডিং প্রাঙ্গণ। রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যেকেই নিজেকে সমৃদ্ধ করে নিতেন। অনেকে এই আড্ডা থেকেই খুঁজে নিতেন লেখার পস্নট। এ কারণেই বিউটি রোর্ডিং অনেকের কাছে হয়ে উঠেছিল পরশপাথর।

১৯৫২ সালে পুরনো ঢাকার প্যারিদাস রোডের শ্রীষদাস লেনে বিউটি বোর্ডিং প্রতিষ্ঠা হয়। প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা এবং তার ভাই নলিনী মোহন সাহা এ বোর্ডিং প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বোর্ডিংয়ের পরিবেশ মুগ্ধ করে ওই সময়ের কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিক ও চলচ্চিত্র শিল্পীদের। বোর্ডিংয়ের নির্মল পরিবেশের কারণে আড্ডাবাজরা ছুটে যেতেন পুরনো ঢাকার সরম্ন এ গলিতে। তখন ঢাকা বলতে ওই এলাকাকেই বোঝান হতো। বোর্ডিংয়ে প্রথম আড্ডা শুরম্ন করেন দেশের শ্রেষ্ঠ কবি শামসুর রাহমান, সহিদ কাদরী ও সৈয়দ শামসুল হকের মতো কবি-সাহিত্যিকরা। শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতাটিও এই বোর্ডিংয়ে বসে লেখা। কবি, সাহিত্যিকদের এই আড্ডায় ক্রমেই আসতেন দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী ও সংস্কৃতির অন্যান্য ৰেত্রের ব্যক্তিত্বরা। এক সময় জমে ওঠে বোর্ডিংয়ের আড্ডা। ৫০ এবং ৬০ দশককে ধরা হয় আড্ডার স্বর্ণযুগ। ৭০ দশকের দিক থেকে আড্ডায় ভাটা পড়তে থাকে। তখন আড্ডাবাজদের সবাই স্ব স্ব ৰেত্রে নৰত্র হয়ে যান। যে জন্য ব্যসত্ম হয়ে পড়ে অনেকে। ইচ্ছা থাকলেও আর প্রিয় বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডায় যেতে পারত না অনেকে। দেশের খ্যতিমান যত কবি-সাহিত্যিক আছেন তাঁদের সবাই তখন আড্ডা দিতেন সেখানে। মুখ ও মুখোশ ছবির স্রি্কপটও লেখা হয় এ বোর্ডিংয়ে বসেই।

প্রতি শুক্রবারের আড্ডায় আরও যোগ দিতেন সাংবাদিক কলামিস্ট আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, নাগরিক কবি ফজল সাহাবুদ্দিন, আব্দুলস্নাহ আবু সায়ীদ, কবি সহিদ কাদরী, ফটোগ্রাফার বিজন সরকার, সুরকার সমর দাস, সত্য সাহা, রাজনীতিক তাজউদ্দীন আহমদ (পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী), ড. রজনী মোহন দেবনাথ, কবি গোলাম মোসত্মফা, গোপাল পোদ্দার, মৃণাল কৃষ্ণ, শিৰক কানত্মি বিকাশ সেন, গিটার শিৰক মোফাজ্জল হোসেন বিথু, নায়করাজ রাজ্জাক, প্রবীর মিত্র, রফিকুন নবী, কালিদাস কর্মকার, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ, দেবদাস চক্রবতর্ী, চিত্রশিল্পী নিতুন কুন্ডু, কবি রফিক আজাদ, বেলাল চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ প্রমুখ। তখন এ বোর্ডিং থেকে ‘কবিতাপত্র’ প্রকাশ করা হতো। আড্ডা জমে ওঠার পিছনে এটিও একটি কারণ বলে জানা যায়। এখন প্রতিমাসে একদিন কবি সংসদ বাংলাদেশ আড্ডার আয়োজন করে থাকে। ওই আড্ডায় নবীন-প্রবীণ কবি সাহিত্যিকরা অংশগ্রহণ করে থাকেন। ওই সময় বর্ডিংয়ের ভাড়া ছিল ১০ থেকে ১৫ টাকা। যে জন্য অনেকে বোর্ডিংয়ে নিয়মিত থাকতেন। জুয়েল আইচ প্রথম ঢাকায় এসে ওঠেন বিউটি বোর্ডিংয়ে। দীর্ঘদিন তিনি এখানে ছিলেন বলে জানালেন বোর্ডিংয়ের তত্ত্বাবধায়ক তারক সাহা। ২৫টি কৰ নিয়ে যাত্রা শুরম্ন করে এ বোর্ডিং। এখনও সেই ২৫টি কৰই রয়েছে। ঐতিহ্য রৰার্থে আর সংস্কার করা হয়নি। বোর্ডিংয়ের সব কিছুই রয়েছে আগের মতোই।

সে সময়ে যাঁরা আড্ডার প্রাণ বলে খ্যাত ছিলেন তাঁদের অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই। কিন্তু স্মৃতিকে ধরে রাখতে বিউটি বোর্ডিং তাঁদের সম্মাননা দেয়ার রেওয়াজ চালু করে। ১৯৯৫ সাল থেকে এ সম্মাননা দেয়া শুরম্ন হয়। সম্মাননা দেয়ার জন্য একটি ট্রাস্ট গঠন করা হয়। এ ট্রাস্টের ৬০ জন সদস্য রয়েছে। এ বোর্ডের সভাপতি হচ্ছেন কবি ইমরম্নল চৌধুরী। সদস্য সচিব বোর্ডিংয়ের প্রতিষ্ঠাতার ছেলে তারক সাহা। এখন পর্যনত্ম যাঁদের সম্মাননা দেয়া হয়েছে তাঁদের মধ্যে আছেন কবি শামসুর রাহমান, সহিদ কাদরী, দেবদাস চক্রবতর্ী, সৈয়দ শাসুল হক ও কবি আল মাহমুদ। সম্মাননা হিসেবে দেয়া হয় একটি ক্রেস্ট এবং ১০ হাজার টাকা। প্রতি বছর এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ সম্মাননা তুলে দেয়া হয়। এছাড়াও যে বিখ্যাতদের নিয়ে বিউটি বোর্ডিং গর্ববোধ করে তাঁরা অনেকে জম্মদিনের অনুষ্ঠান তাঁদের সোনালী জীবনের আড্ডাস্থল বিউটি বোর্ডিংয়ে উদযাপন করে থাকেন। বর্তমানে বোর্ডিংটি তত্ত্বাবধান করেন প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহার দুই সনত্মান তারক সাহা এবং সমর সাহা। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ বোর্ডিং থেকে পাক হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে যায় বোর্ডিংয়ের মালিক প্রহ্লাদ সাহাসহ ১৭ জনকে। তাঁদের কেউই আর ফিরে আসেননি। আর কখনও ফিরে আসবেনও না। বোর্ডিংয়ে গিয়ে দেখা হয় তারক সাহার সঙ্গে। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয় বোর্ডিংয়ের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে? তিনি বললেন, শুধু ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য বাবার ব্যবসাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তাঁরা। আগের চেয়ে ব্যবসা অনেক কমে গেছে। আড্ডাও আগের মতো হয় না। যাদের আড্ডায় মুখরিত হয়ে উঠত বিউটি বোর্ডিংয়ের উঠান, আগামী ২০ বছর পর হয়ত তাঁদের কেউ বেঁচে থাকবেন না।

বিস্তারিত…১

বিস্তারিত…২

[ad#co-1]