স্বপ্নের সেতু পদ্মা

মাহমুদুল বাসার
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি নাড়ির সম্পর্কের শ্লোগান, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা।’ কবি অন্নদা শঙ্কর রায়ের একটি অসামান্য কবিতার লাইন হচ্ছে-

‘‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা
গৌরী মেঘনা বহমান
তত কাল রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান।’’

অর্থাৎ পদ্মা মেঘনা যমুনা আমাদের অস্তিত্বে নিবিড়ভাবে মিশে আছে। বাংলা ভাষার সর্ববৃহৎ কলেবরের একটি উপন্যাসের নাম ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, লিখেছেন আবু জাফর শামসুদ্দীন। নদীমাতৃক বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি নদী যোগাযোগ ব্যবস্থাকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলো। অনেক সাধনার পর তিনটির দুটি নদীতেই সেতু নির্মাণ করে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হয়েছে। আশির দশকে এরশাদ সরকারের আমলে নির্মাণ করা হয়েছে মেঘনা সেতু। ঢাকা রাজধানীর সঙ্গে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগের যোগাযোগ সচল হয়ে ওঠে মেঘনা সেতু এবং দাউদকান্দি সেতু নির্মিত হওয়ার ফলে। দাউদকান্দি সেতু গৌরী নদীর ওপর অবস্থিত।

এরপর শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সম্পূর্ণ হয় যমুনা সেতু। এই সেতুটির নামকরণ করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু সেতু’। বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মিত হওয়ার পর আমার কাছে মনে হয়েছে বাংলাদেশের বাঙালিরা যেনো সভ্যতার দিকে একধাপ এগিয়ে গেলো। আমাদের হাজার বছরের সাধনার স্বপ্নের একটি ধাপ বাস্তবে রূপ নিয়েছে বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মিত হওয়ার পর। পুরো উত্তরবঙ্গের মানুষ এই সেতুর কল্যাণে আধুনিক আর্থ-সামাজিক জীবনের স্বাদ খুঁজে পেয়েছে। দেশ স্বাধীনের পরে বঙ্গবন্ধু এই সেতুর স্বপ্নের বীজ রোপণ করেছিলেন। তিনি তখনকার যোগাযোগ মন্ত্রী মনসুর আলীকে বলেছিলেন, টাকার যোগাড় আমি করবো, আপনি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নিন।’

আমরা উপর আল্লাহর ওপর ভরসা করে আশায় বুক বেধেছি, শেখ হাসিনার সরকারের আমলেই স্বপ্নের সেতু পদ্মার নির্মাণ কাজ শেষ হবে, তিনি এই ঐতিহাসিক সেতু উদ্বোধন করবেন, আমরা তা টিভির পর্দায় দেখবো।

ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ দল হংকংয়ে চলে গেছেন সেতুর নকশা প্রণয়নের ব্যাপারে এবং নকশার কাজ চূড়ান্ত হয়েছে। নকশার প্লান অনুযায়ী সেতুটি হবে দ্বিতল, ভূমিকম্প সহনশীল; তা হবে ৯ মাত্রার।

যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন জানিয়েছেন সাংবাদিক সম্মেলনে যে, সেতু নির্মাণের কাজ দ্রুত করা হবে, যতদূর সম্ভব ২০১৩ সালের মধ্যে শেষ হবে তিনি আশা ব্যক্ত করেছেন। মন্ত্রী মহোদয়ের আশা সফল হোক, আমরা তা চাই।

নকশার কাজটি চূড়ান্ত হওয়াতে যথাসময়ে ঠিকাদার আহবানের কাজ করা সম্ভব হবে, সেতু কর্তৃপক্ষ ঠিক সময়ে ঠিকাদার নিয়োগ করবেন। ইতোমধ্যে এর প্রাকযোগ্যতা যাচাই শেষ করেছেন। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে দাতা সংস্থাগুলোর একটি দল ঢাকায় আসবে। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ঋণ চুক্তি সই হবে। ঋণচুক্তির পর সেতু নির্মাণের জন্য নদী শাসন ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য বাছাইকৃত, নির্বাচিত ঠিকাদারদের আদেশ দেয়া হবে কাজের।

এই ঐতিহাসিক সেতু নির্মাণে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক। জানা গেছে, পদ্মা সেতু হবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ। ব্যয় হবে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দ্বিতল বিশিষ্ট সেতুর নিচতলায় থাকবে রেল সংযোগ। সেতুতে থাকবে বিদ্যুৎ, গ্যাস লাইন ও টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থা। (কালের কণ্ঠ ৩০/৭/২০১০)

বাংলাদেশের দক্ষিণাংশের মানুষের সুদিন শুরু হবে, যেদিন পদ্মা সেতু চালু হবে। শ্রদ্ধেয় কলামিস্ট নির্মল সেন এই সেতুর পক্ষে কয়েকবার কলম ধরেছেন। দক্ষিণাঞ্চলের সংগ্রামী মানুষ অনেক আন্দোলন করেছে, মানববন্ধন করেছেন। ঢাকা রাজধানীতে মানুষকে আসতেই হবে। বরিশাল থেকে সড়ক পথে ঢাকা আসতে এতবার ফেরি পার হতে হয়, যার ফলে দুর্ভোগের সীমা থাকে না। আরিচা এবং দৌলতদিয়া দিয়ে পদ্মা পার হতে এতকাল যাবৎ মানুষ সীমাহীন কষ্ট ভোগ করে আসছে। ছেলে-মেয়ে শিশু-বদ্ধ-রোগী-বাক্স-পেটরা মাল সামানা নিয়ে ফেরি পার হতে ৫০ বছর যাবৎ দেখছি অবর্ণনীয় কষ্টের ছবি। নদীর মধ্যে কেটে যায় ঘন্টার পর ঘন্টা।

নদীর বিছিন্নতার কারণে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের দক্ষিণ অংশে গ্যাস যেতে পারেনি। এই একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক যুগে বাংলাদেশের বিরাট একটি অঞ্চলে গ্যাসের অভাবে মান্ধতার আমলের চুলায় লাকড়ি ঠেলে রান্না করে একথা ভাবতে কষ্ট হয়। অথচ আমাদের গ্যাস সম্পদ আছে।

যদি বঙ্গবন্ধু আর কয়েকটি বছর বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি পদ্মা সেতু নির্মাণ করে দিয়ে যেতে পারতেন। ঐ যে মনসুর আলীকে বলেছিলেন, ‘টাকার যোগাড় আমি করবো’ এই দক্ষতা তাঁর ছিলো। তিনি তাঁর সাংগঠনিক প্রতিভা দিয়েই ম্যানেজ করার কাজটি করতে পারতেন।

শেখ হাসিনার সদিচ্ছার বরাতে ( নিয়ত গুণে বরকত), তার স্বপ্নের ফসল পদ্মা সেতু অতি সত্বর নির্মিত হবে, যদি দৈবাৎ কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা, গ্যাস লাইন পাবে, তারা অভিশাপ মুক্ত হবে। তাদের আর্থ-সামাজিক জীবন দ্রুত সচল হবে, দেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে।

[লেখক: প্রাবন্ধিক ]

[ad#co-1]