ব্যর্থতা কার ?

আজিজুর রহমান প্রিন্স
মৃত্যু অবধারিত, সবাইকে মরতে হবে একদিন। প্রতিদিন যেমন জন্ম হচ্ছে মানুষের, মৃত্যুও হচ্ছে। মরণ মানুষকে দুঃখ দেয়, কষ্ট হয় স্বজনের। আবার কিছু মরণ ব্যথিত করে সমাজকে, জাতীকে। ইতিহাস হয়ে থাকে যে মরন যেমন মরেছে ৭১ এর শহীদরা। দূরারোগ্যে নয়, মানুষ নামের নরপশুরা নির্বিচারে হত্যা করেছে এবং তাদের অপরাধ একটাই, তারা বাঙালী ছিল। এমন ত্রিশ লক্ষ মানুষের মরণ হয়েছিল পাকিস্তানী সৈন্যের গুলিতে।

৭১ এর রমজান মাস। দিনটি ছিল শুক্রবার (এখন আর তারিখ মনে নেই)। লৌহজং থানাধীন শিমুলিয়া গ্রামেরই ছামাদ খাঁ’র বড় ছেলে আবেদ আলী জুম্মার শেষে গ্রামেরই এক মহিলার লাশ দাফন করতে গেছে সাতঘড়িয়া গোড়স্থানে। দাফন শেষ, সবাই দোয়া পড়ছে এখোনই খবর এল মিলিটারী আসছে। তিন দিন আগেই মঙ্গলবার, গোয়ালীমান্ডা হাটে পাক সেনাদের সাথে যুদ্ধ হয়েছে। আবেদ আলীও সেই যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। একদিন একরাত প্রচন্ড যুদ্ধ করে বুধবার সকালে পাক সেনারা আত্মসমর্পণ করে। ৫০ জন জীবীত পাকসেনাকে ধরে আনে মুক্তিবাহিনী, বাকীরা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় সেখানে। ধৃত সৈন্যদেরও একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে মুক্তি সেনাদের হাতে।

শুক্রবার সকালে একদল মিলিটারি শ্রীনগর থেকে খালের পার দিয়ে হেঁটে আসে হলদিয়া পর্যন্ত। তাদেরকে সৈন্য বোঝাই দুটি লঞ্ঝবোর্ড অনুসরণ করে খালে। দুইজন রাজাকার মিলিটারীদের সাথে হেঁটে হেঁটে দেখিয়ে দেয় আর পাক সেনারা গুলির মত রাইফেল দিয়ে ছুড়ে আগুন লাগিয়ে দেয় বাড়ীগুলিতে, কাবপাশার চান খাঁ’র বাড়ীতে যখন আগুন দেয় সেই আগুনের লেলিহান শিখা সাতঘড়িয়া গোড়স্থান থেকেও দেখা গেছে।

ছামাদ খাঁ (আবেদ আলীর বাবা) রমজানের শেষ দশদিন এতেকাফে বসেছে, বাড়ীর কাছেই শিমুলিয়া মসজিদে। সাতঘড়িয়া গোড়স্থান থেকে মসজিদের দূরত্বও বেশি না। আবেদ আলী দৌঁড়ে গিয়ে বাবাকে বলে এল ‘মিলিটারী ঢুকেছে, বের হবেন না’। দৌঁড়ে আবার এসেছে গোস্থানে, ততক্ষনে মুসল্লিরা ভয়ে সব পালিয়েছে। আবেদ আলীও পালাতে পারত কিন্তু লাশ বহনকারী খাটটা নেওয়ার জন্য কয়েকজনকে ডাকাডাকি করতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। মিলিটারিরা হলদিয়া থেকে মোড় নিয়েছে মাওয়া সড়কের উপর দিয়ে। এই দৃশ্য দেখে আবেদ আলী দৌঁড় দিল। মিলিটারীরাও আবেদ আলীকে দেখে থামার নির্দেশ দিল। না থেমে আবেদ আলী গোরস্থানের পাশে কাঠের পুলের নীচে লুকানোর চেষ্টা করলো। নিরাপদ নয় ভেবে দৌঁড়ে গিয়ে ঋষি বাড়ীর পুকুরে ডুব দিল। কচুরিপানার নীচে কিছুক্ষণ নাক ভাসিয়ে রাখলেও বেশিক্ষন থাকতে পারেনি।

ভয়ে উঠে এসে কড়জোড়ে প্রাণ ভিক্ষা চাইল বলল, আমাকে মারবেন না। আমার দুইটা বাচ্চা আছে, আমার স্ত্রী বিধবা হয়ে যাবে! আমি মুসলমান, এই দেখেন একজনের লাশ দাফন করতে এসেছিলাম। কান্নাবিজড়িত কন্ঠে বলল, আমি রোজা রাখছি স্যার, লা ইলাহা ইল্লা……….বিকট শব্দে কেঁপে উঠল গ্রামটি। কাক পাখিরও শব্দ শোনা যাচ্ছে না আর। প্রথম হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল আবেদ আলী। তারপর উপুর হয়ে কাঁদা মাটিতে ঘুমিয়ে গেল চিরতরে। বন্যার শ্রোতের মত দেহের সব রক্ত ঝড়ে গেল আবেদ আলীর।

‘সে কি আনন্দ মিলিটারীদের। উৎফুল্ল মিলিটারীরা রাজাকারটিকে সাথে করে চলে গেল মাওয়ার দিকে। সেখানে পদ্মায় গানবোড প্রস্তুত ছিল, গানবোডে উঠে নিরুদ্দেশ হল হায়নার দল নরপিশাচ পাকসেনারা।

কানাঘুষা, বলাবলি শুরু হল এই গ্রামে ঐ গ্রামে। জানাজানি হল আবেদ আলীর জীবনাবসান । প্রচার হল সন্ধ্যায় ইফতারের পরে জানাজা হবে ছামাদ খাঁ’র বাড়ীতে। ভীতসন্ত্রস্ত গ্রামবাসী গোপনে এসে হাজির হল ছামাদ খাঁ’র বাড়ীতে। হ্যাজেক লাইট জ্বালানো হয়েছে, উঠানে লোকলোকারন্ন। মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার ঢালী মোয়াজ্জেমও এসেছেন ষ্টেনগান কাঁধে ঝুলিয়ে আর মুক্তিরা সব পাহারা দিচ্ছে চারপাশে। ঘরের পাশেই উঠানে আবেদ আলীর প্রাণহীন দেহটি সেই খাটেই শুয়ে আছে যেটি কাঁধে করে বয়ে নিয়েছিল গোরস্থানে।
মাগরিবের নামাজের পর পরই এলেন সাতঘড়িয়া ফজলু মাতব্বর। ছামাদ খাঁ’র চেয়ে বড় হলেও বন্ধুসম এবং দীর্ঘদিনের সম্পর্ক তাদের। তাকে দেখেই ছামাদ বুকফাটা চিৎকারে বলে উঠলেন “ মিয়াভাই আমার আবেদ আলীকে ওরা মাইরা হালাইছে’’। বাড়ীর মেয়েরাও বিলাপ করে উঠেছে। উঠানে উপস্থিত সকলেরই চোখে জল। ফজলু মাতব্বর চাদরটি সরিয়ে দেখলেন আবেদ আলীকে। বুকের বামদিকে একটা ছিদ্র এবং পিঠের দিক তা বিশাল গর্ত হয়ে শিশা আর বারুদ আবেদ আলীর হৃদয় ছিন্নভিন্ন করে বেড়িয়ে গেছে।

আবেদ আলীর সুন্দরী স্ত্রী সূর্য্য। সূর্য্যের মতোই বর্ন তার, স্বামীর শোকে বিহ্বল হয়ে পাগল প্রায়। বৃদ্ধা মা পুত্র শোকে কাতর আর আবেদ আলীর ছেলেরা পিতার নিথর লাশটির সামনে নির্বাক দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই মৃত্যু কোথায় নিয়ে যাবে পরিবারটিকে কেউ জানেনা শুধু অমন হাসিমাখা মুখে বাড়ী এসে আর কখনো বাবা বলে ডাকেব না, মায়ের বকুনি খেয়ে স্ত্রীর কাছে গিয়ে বলবে না, সূর্য্য ভাত দেও, মায় চেইত্তা গেছে। আর কোনদিন ছেলেকে কোলে নিয়ে নাচবে না, সবই এখন স্মৃতি হয়ে গেল।

সেই রাতে উঠানেই গোসল করানো হলো আবেদ আলীকে। ফজলু মাতব্বর উঠানে দাঁড়িয়ে জানাজা পড়লেন তারপর সেই খাটে করেই আবেদ আলীকে নিয়ে যাওয়া হলো সাতঘড়িয়া গোড়স্থানে। কাঠ বাদাম গাছটির তলায় চির শায়িত হয়ে রইল আবেদ আলী। দুপুরেই সেখানে দাফন করতে এসেছিল অন্যের লাশ। আবেদ আলী জানতে পারেনি মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে তাকেও এখানেই এসে শুয়ে থাকতে হবে অনন্তকাল।

আবেদ আলীর শহীদ পরিবারটি কিছুই পায়নি। এখনো হয়ত ছামাদ খাঁ’র শিমুলিয়ার বাড়ীতেই সূর্য্যের আলো স্থিমিত হয়ে গেছে। ৭১’ এর সন্তানরা এখন বেড়ে উঠছে। পিতৃহারা সন্তানদের কষ্ট কেউ বোঝেনি, যুবতী বিধবার দুঃখটি কেউ জানতে পারেনি। দৈনতা, অবহেলা আর স্মৃতির ছবি নিয়েই কেটে গেছে ৩৯টি বছর। মনেও রাখেনি কেউ।

যে দেশের জন্য আবেদ আলী প্রাণ দিল, সে দেশের মানুষকি এতটাই কৃপণ যে, আবেদ আলীর একটা স্মৃতিসৌধও বানাতে পারলো না! এদেশেই রাজাকার মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপ্রতি হয়েছে, সবুর খানের কবর জাতীয় সংসদের পাশে বাঁধানো হয়েছে অথচ আমরা আবেদ আলীর জন্য কিছুই করতে পারিনি। এই না পারা শুধু লজ্জার নয়, অকৃতজ্ঞতারও। ব্যর্থতাটি কার জানিনা। এখন যখন আবার স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল ক্ষমতায়। স্বাধীনতার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সরকার যখন বদ্ধপরিকর, সেই সরকারের কাছেই আবেদ আলীর আত্মত্যাগের মূল্যায়ন দাবী করছি। মাওয়া থেকে হলদিয়া পর্যন্ত সড়কটি আবেদ আলীর বাড়ী ঘেষেই প্রসারিত হয়েছে। সাতঘড়িয়া গোড়স্থান (যেখানে আবেদ আলী চির নিদ্রায় শায়িত) এবং যেখানে তাকে গুলি করা হয়েছিল সেই স্থানটি ও সড়কের দুইপার, মাওয়া থেক হলদিয়া পর্যন্ত সড়কটি শহীদ আবেদ আলী সড়ক নামকরণের দাবী জানাচ্ছি।

@thebengalitimes.ca

[ad#co-1]