প্রবাসী মুসলিম ও হিন্দুর জমি দখল করেছে আ’লীগ নেতা ও সন্ত্রাসী চক্র

জবরদখল ও চাঁদাবাজির মহোত্সব
মুন্সীগঞ্জে একটি সিন্ডিকেটের অপরাধমূলক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। চলছে নীরব চাঁদাবাজি ও জমি দখলের মহোত্সব। সরকারি পরিত্যক্ত জমিও দখলবাজদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। এসব অপকর্মে জড়িতদের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সুসম্পর্ক থাকায় জনগণ প্রতিকারের আশা করতে পারছে না। অনেকে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানাতেও আগ্রহী নন।

গত ১৬ জুলাই জেলার শ্রীনগর উপজেলার বারৈখালী গ্রামে সৌদিপ্রবাসী শহিদুল ইসলামের ১০৫ শতাংশ জমি ও বাড়ির দখল নেয়ার চেষ্টায় সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। বাধা দেয়ায় শহিদুলের স্ত্রী রহিমা বেগম, ছেলে মোক্তার খান এবং মেয়ে লাভলী সন্ত্রাসীদের হামলায় মারাত্মক জখম হন। এ ব্যাপারে শ্রীনগর থানায় মামলা হয়েছে। অন্যদিকে টঙ্গীবাড়ি উপজেলার দীঘিরপাড় ইউনিয়ন মূলচর গ্রামের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের জায়গা দখল করে নিয়েছেন উপজেলার এক আওয়ামী লীগ নেতা। তিনি আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে দখলকৃত জায়গায় ৪টি ঘর নির্মাণ করেন। এছাড়া দুটি বড় পুকুরও দখল করে নেন। এ ব্যাপারে দীঘিরপাড় মন্দির পরিচালনা কমিটির নেতারা সংবাদ সম্মেলন করেছেন এবং প্রতিকার চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। একই উপজেলার বালিগাঁওয়ে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই রিভারভিউ প্রকল্পের নামে সরকারি জমি দখল ও মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জ জেলা শহরের উপকণ্ঠে পল্লী বিদ্যুত্ অফিসের কাছে সরকারি জায়গা দখল হয়ে গেছে। কয়েকটি দোকানঘরও নির্মাণ করা হয়েছে। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তত্কালীন জেলা প্রশাসক আনিস উদ্দিন মঞ্জুর রাস্তা প্রশস্তকরণের উদ্দেশ্যে দখলমুক্ত করেছিলেন। এদিকে মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মুন্সীগঞ্জের উত্তর চরমুশুরায় মনির হোসেন মাহমুদসহ ৭ বিএনপি নেতাকর্মীর জমি দখল করে নেয় স্থানীয় আ’লীগ সমর্থক নামধারী সন্ত্রাসীরা। গত ১৩ জানুয়ারি সদর উপজেলার চরকেওয়া ইউনিয়নের দরিদ্র কৃষক শাফাজ উদ্দিনের ২০ শতাংশ জমির আলু তুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। তিনি বলেন, দুর্বৃত্তদের বাধা দেয়ার ক্ষমতা আমার ছিল না।

এদিকে সিরাজদিখান থানার শেখরনগর গ্রামের এমএম আজিজুল হকের ৩ একর ২৫ ডেসিমেল জায়গার মধ্যে ১ একর ৩৩ ডেসিমেল দখলের পাঁয়তারা করছে রায়বাহাদুর শ্রীনাথ ইনস্টিটিউটের হেডমাস্টারসহ একটি সিন্ডিকেট। এ জমিতে আজিজুল হকের একটি টিনের ঘর, একটি ডিপ টিউবওয়েল এবং জমির আইলে শতাধিক গাছ লাগানো আছে। আর টিনের ঘরের সঙ্গে লাগানো আছে জমির মালিকানার সাইনবোর্ড। কিন্তু কিছুদিন আগে স্কুল কমিটি সাইনবোর্ডে আজিজুল হকের নাম মুছে রায়বাহাদুর শ্রীনাথ ইনস্টিটিউট লেখে। তবে সম্প্রতি তারা আবার তা মুছে দিয়েছে। আজিজুল হকের দাবি, ডকুমেন্টের মাধ্যমে এ জমি তিনি বিভিন্ন সময় স্থানীয় কৃষকদের কাছে সনকরালি দিয়ে যাচ্ছেন। এখনও এই জমি সনকরালি দেয়া আছে। সাবেক হেডমাস্টার আমিনুল হক লিখিত দিয়েছেন যে, এই সিন্ডিকেট তাকে দিয়ে জোর করে মামলা করিয়েছে। এখানে স্কুল এবং বাড়ি ব্যতীত রায়বাহাদুর শ্রীনাথ রায়ের কোনো জায়গা নেই। রায়বাহাদুরের ছেলে ফনীন্দ্র নাথ রায় ঢাকা চতুর্থ জজ আদালতে মিস মামলা নং-৩৬, ১৯৪৯ (জমির পরিমাণ ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ শেখরনগর-১২, মৌজা দাগ নং-এসএ ৪৯২ ও ৪৯৩) মামলায় চিত্তরঞ্জন সরকার গংয়ের কাছে হেরে যান। কাজেই রায়বাহাদুর শ্রীনাথ রায়ের কোনো জায়গা নেই। এ জমি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলী আহমেদ প্রভাব খাটিয়ে ১ একর ৩৩ ডেসিমেল জায়গা আরএস রেকর্ডে স্কুলের সেক্রেটারি হিসেবে রেকর্ড করান। নিয়ম অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক স্কুলের সেক্রেটারি থাকার কথা থাকলেও আলী আহমেদ রেকর্ডে নিজেকে স্কুলের সেক্রেটারি হিসেবে উল্লেখ করেন। যদিও তিনি কোনো সময়ই স্কুলের সেক্রেটারি বা মেম্বার কিছুই ছিলেন না। তিনি এ ধরনের অনেক জমি নিজের এবং স্ত্রীর নামে রেকর্ড করিয়েছেন।

আগের হেডমাস্টার এবং স্কুল কমিটির সভাপতি ও সদস্যরা জানান, এখানে স্কুলের কোনো জায়গা নেই। হয়রানি ও চাঁদাবাজি করার জন্য এধরনের কাজ তারা করে যাচ্ছেন। জানা যায়, ১৯৯০ সাল থেকে যে কমিটিই আসছে, তাদের একটি প্রভাবশালী অংশ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রায়বাহাদুর স্কুল ও অন্যান্য সংস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে। এই সিন্ডিকেট এলাকার কতিপয় টাউট, চাঁদাবাজ ও জাল দলিলকারীদের নিয়ন্ত্রণ করে। এদের নিয়ে অতীতে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তাদের কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। গতবছর স্কুলের ৯০ লাখ টাকার কাজ বিনা টেন্ডারে দেয়া হয়েছে। স্কুল কমিটির প্রভাবশালী কয়েকজন শিক্ষক, স্কুল কমিটির মেম্বার এবং স্থানীয় সন্ত্রাসীরা অর্থের বিনিময়ে এ কাজ ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছে এবং স্কুলের জায়গায় নির্মিত দোকানপাট তারা ভাগ করে নিয়েছে। দোকানগুলো তারা অন্যদের ভাড়া দিয়েছে। এসব দোকানের ভাড়ার টাকা স্কুল ফান্ডে জমা দেয়া হয় না। বিগত কমিটিতে এমন কয়েকজন মেম্বার ছিলেন যাদের কোনো সন্তান এ স্কুলে পড়ত না। অন্যের সন্তানের অভিভাবক হয়ে তারা স্কুল কমিটির মেম্বার হয়েছিলেন।

এদিকে স্কুল সংলগ্ন অন্যের জায়গা দখল করে স্কুলের যে ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ। এগুলোতে এক বছর যেতে না যেতেই ফাটল দেখা দিয়েছে এবং ভেঙে পড়ছে। এসব ভবন নির্মাণেও দুর্নীতির মাধ্যমে ওই সিন্ডিকেট মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এছাড়া স্কুল সংলগ্ন পুকুরে বালি ভরাটের কাজেও তারা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে স্কুলের একজন স্বামী পরিত্যক্ত শিক্ষিকাকে নিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষক ও বিগত কমিটির প্রভাবশালী কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অনৈতিক কাজের অভিযোগ উঠেছে। এজন্য এই শিক্ষিকা আত্মহত্যা করতে হারপিক খেয়েছিলেন এবং মাসাধিককাল হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছিলেন। তিনি এখন বহাল তবিয়তে শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন। এ নিয়ে স্কুলের ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকরা বিব্রতকর অবস্থায় পড়লেও তারা কিছুই বলতে পারছেন না। এসব কারণে স্কুলের লেখাপড়ার মানও কমে গেছে। এলাকার সাধারণ মানুষ এসবের প্রতিকার চান।

তবে এ সবকিছু অস্বীকার করে স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক আবদুল মোত্তালিব ফকির বলেন, আজিজুল হক যে জমি নিজের বলে দাবি করছেন, তা ঠিক নয়। এটা স্কুলের জমি। এ জমি স্কুলের পক্ষে আলী আহমেদের নামে রেকর্ড করা হয়েছে। তবে এই আলী আহমেদ যে স্কুলের সেক্রেটারি ছিলেন না—এটা স্বীকার করে তিনি বলেন, আলী আহমেদ একসময় স্কুল কমিটির মেম্বার ছিলেন। স্কুলের একজন শিক্ষিকাকে নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা অনেকদিন আগের ব্যাপার। এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এসব নিয়ে আমরা এখন কিছু ভাবছি না।

অন্যদিকে জমির ব্যাপারে আলী আহমেদ বলেন, আজিজুল হক সাহেবের দাবি সঠিক নয়। এটা স্কুলের জমি। এটা আমার পক্ষে স্কুলের নামে রেকর্ড করা হয়েছে। তবে আমি স্কুলের সেক্রেটারি ছিলাম না। ভুল করে আমার নামের আগে সেক্রেটারি লেখা হয়েছে।

জাকির হোসেন, মুন্সীগঞ্জ থেকে ফিরে

[ad#co-1]