হুমায়ুন আজাদ প্রয়াত কিন্তু বিগত নন

অনন্য আজাদ
লাল-সবুজের স্বাধীন দেশ, স্বাধীন জাতি হিসেবে আমরা ১৯৭১ সালে নাম লেখালেও পরাধীনতা আমাদের প্রতিনিয়ত তিলে তিলে খেয়েছে। বিজয় পেয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু স্বাধীনভাবে চলার মতো, কথা বলার মতো স্বাধীনতা কোনো সময় পাইনি। মুক্ত মনে চিন্তা করার অধিকার যেন আমাদের কোনো সময় দেওয়া হয়নি। আমরা বন্দি ছিলাম।

এক অসময়ে জন্মগ্রহণ করা প্রতিবাদী কণ্ঠের নাম হুমায়ুন আজাদ। কথা বলার চেয়ে কাজ যিনি বেশি করতেন, সময়ের থেকে দ্রুত চলতে যিনি ভালোবাসতেন, কলমকে যিনি একমাত্র অস্ত্র ভাবতেন, মেধাকে ব্যবহার করে যিনি বিশ্বকে জয় করতে চেয়েছিলেন; বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে যিনি এক নতুন মাত্রায় দাঁড় করিয়েছিলেন; মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে যিনি নিজ বুকে লালন করেছিলেন; দেশকে যিনি ভালোবাসতে পেরেছিলেন সত্যিকাররূপে; দেশের মানুষের জন্য যেভাবে কঠিন সত্যগুলো প্রকাশ করেছিলেন, তা অনন্য।

কলমের মতো অস্ত্রের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে ধারালো অস্ত্রও ব্যর্থ হয়ে যায়। পৃথিবীতে কত অপশাসক চেষ্টা করেছে লেখককে স্তব্ধ করে দিতে, চেয়েছে গোটা জাতিকে চুপসে দিতে; কিন্তু কোনো শাসকই পারেনি। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পাকিস্তানের গর্ভে প্রবেশ করাতে চেয়েছিল, যারা দেশকে অস্থিতিশীল করে তালেবানি রাষ্ট্র বানাতে চেয়েছিল, যারা ধর্মকে পুঁজি করে নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ভারী করতে চেয়েছিল, যারা ইতিহাস বিকৃত করে নতুন কল্পকাহিনী বানাতে চেয়েছিল, যারা সত্য স্বীকার করতে ভয় পেত, যারা হিংস্র পশুর মতো আচরণ করত_তাদেরই শিকার হুমায়ুন আজাদ।

মানুষটি, যিনি ছিলেন অন্য সবার থেকে আলাদা, মুক্তচিন্তার প্রতীক হিসেবে লিখে গেছেন নাম, করে গেছেন প্রথাবিরোধী সব কর্মকাণ্ড। তিনি কোনো সাবধানী, সংশয়াচ্ছন্ন পোশাকি কলমবাজ ছিলেন না। লেখার মতো কোনো মানুষ ছিল না, তাই তিনি কলম ধরেছিলেন। বলার মতো কোনো মানুষ ছিল না, তাই তিনি বলে গেছেন অজস্র সত্য। ভিন্ন ছিল তাঁর চিন্তা, নির্ভীক ছিলেন মানুষটি। নির্ভয়, অকপটে জীবনসাগর পাড়ি দিয়েছিলেন এই রক্তজয়ী প্রতিমা। নির্ভীক এই সৈনিক আজীবন লিখে গেছেন, তুলে ধরেছেন সেইসব চিত্র, যা আগে কেউ কোনো সময় ভাবেনি, তুলে ধরেনি, সাহসে কুলায়নি; স্বাধীনতার বিপক্ষে আজও যারা মাথা উঁচু করে আছে, মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির মানুষগুলো যাদের জন্য হুমকিস্বরূপ, রাজনীতিবিদ ও তার সন্তানদের ক্ষমতার অপব্যবহার করার কৌশল, যা যা অনৈতিক এই দেশে, সব কিছু সম্পর্কে তিনি লিখে গেছেন। তিনি কোনো রাজনীতি করতেন না কোনোকালেই। ছিলেন না কোনো দলের। তিনি ছিলেন শুধু বাংলার মানুষের। অর্থকে প্রাধান্য দেওয়া থেকে জ্ঞানের সাগরে ভাসতে ও ভাসাতে পছন্দ করতেন। রাজনীতিবিদদের মতো মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া থেকে কাজ করে দেখাতে পছন্দ করতেন। হিংস্র পশুদের কাছ থেকে দেশকে বাঁচাতে মরিয়া ছিলেন। বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের সব কয়টি দেশে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ ছিল তাঁর লেখা সর্বশেষ উপন্যাস। সর্বশেষ এ উপন্যাসটি সর্বনাশ ঘটিয়েছিল এক মহলের। সহ্য করতে না পেরে মাঠ গরম করে তোলে ‘মাওলানা’ হিসেবে পরিচিত, আসলে যুদ্ধাপরাধী সাঈদী। সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া যেদিন থেকে ‘প-কিস্তানি’ সহযোগী জামায়াতকে বৈধ করেন, সেদিন থেকেই সাঈদীর উত্থান এবং গত আমলে তার রূপ ছিল ভয়াবহ। বাংলার এ মহান পুরুষকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে ক্ষান্ত হন। এভাবে একজন শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠের অধ্যাপকের জীবনাবসান ঘটানো হয়। সৃজনশীল লেখক ও শিল্পী কেউই প্রথাগত নয়, বন্দি নয়, তিনিও মুক্ত হতে চেয়েছিলেন। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করা ছিল তাঁর ধর্ম। তাঁর রক্তের বিনিময়ে দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে যে-জাগরণ ও গণ-আন্দোলন ঘটেছিল, তা রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সারা বিশ্বে তোলপাড় হয়েছিল। বুঝতে পারেনি সেই যাযাবররা। কলমের কাছে চাপাতি বন্দি। শারীরিকভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া সম্ভব; কিন্তু চিন্তাচেতনাকে মিশিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর ওপর আঘাত, তাঁকে হত্যা করা শুধু ব্যক্তিবিশেষের ওপর নয়_ মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষদের ওপর আঘাত। তিনি কেবল একজন লেখকই ছিলেন না_সবচেয়ে সাহসী ও স্পষ্টভাষী, অন্যতম মেধাবী, প্রতিভাবান এবং সৃজনশীলতা, জনপ্রিয়তায় এগিয়ে থাকা একজন বাঙালি সেবক_সামাজিক অনাচার ও রাষ্ট্রিক নীতিবৈষম্য ও স্খলন উঠে আসে এই সচেতন দেশবরেণ্য লেখকের কলমে। বাংলা সাহিত্যের এ মহান পুরুষকে হারিয়ে বাংলাদেশ হারিয়েছে এ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ পুরুষদের একজনকে।

ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক : প্রয়াত ড. হুমায়ুন আজাদের ছেলে

[ad#co-1]

One Response

Write a Comment»
  1. ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ যেমন বইই হোক, একটা বই মাত্র। সে বই লেখার জন্য যদি হুমায়ুন আজাদকে সাঈদর হাতে শহীদ হতে হয়, তবে সাঈদীর কি হয়া উচিত?

    আমার কান্না পাচ্ছে।

Leave a Reply