সরোজিনী-সংবাদ

করুণাময় গোস্বামী
শুরুতেই মহাত্দা গান্ধীর স্মৃতিচারণা থেকে খানিক উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় জেলে বন্দি। সে সময়কার একটি অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি জানাচ্ছেন, ‘আমার আজও মনে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার এমনই এক হাসপাতালের কথা। আমি সেখানে পুলিশের পিটুনিতে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন। শরীরের অনেক জায়গায় ব্যান্ডেজ বাঁধা। ব্যথায় ক্ষতস্থানগুলো যেন দপদপ করছে। আমার এক বন্ধুর মেয়ে প্রায়ই আসত হাসপাতালে আমাকে দেখতে। ভারি সুন্দর ভজন গাইত সে। একটি বিখ্যাত ভজন ‘জ্বালাও তোমার দয়ার আলো’ গেয়ে অনেক সময় সে আমার ক্ষতস্থানগুলো ছুঁয়ে দিত। সে গানে ও তার স্নেহস্পর্শে আমি আমার ক্ষতস্থানের যন্ত্রণা ভুলে যেতাম।’ মহাত্দার স্মৃতিচারণার এ কথাগুলো আমার মনে পড়ল কয়েক দিন আগে কালের কণ্ঠে একটি সংবাদ পড়তে গিয়ে। এর দু-তিন দিন আগে থেকেই আমি জ্বরে ভুগছিলাম। ডাক্তার বললেন, ভাইরাল ফিভার, ভোগাবে কিন্তু মারবে না। ওষুধও দিলেন বেশ চড়া দামের ও কড়া মেজাজের। কিন্তু বড়ই তেজি জ্বর, প্যারাসিটামল খানিক টেনে নামাতে না-নামাতে এক লাফে উঠে যায় চার ডিগ্রিতে। শরীরের এ অবস্থায় সকালে পত্রিকা হাতে নিয়ে একটি খবরে চোখ পড়তেই আমি যেন শারীরিক যন্ত্রণাবিস্মৃত হয়ে গেলাম। খবরটি ছিল সরোজিনী নাইডুর স্মৃতি রক্ষাসংক্রান্ত। খবরটির শিরোনাম ছিল ‘সরোজিনী নাইডুর চেতনা অনুসরণীয় : রাষ্ট্রপতি’। শিরোনামটি দেখেই আমি এমন অবাক হই যে বহুদিন কোনো সংবাদ শিরোনাম দেখে এতটা অবাক হয়নি এবং এই অবাক হওয়ার চোটে আমি ভুলেই যাই যে চার দিন ধরে দুর্দান্ত জ্বরে ভুগছি ও সোজা হয়ে বসতে গেলেও কষ্ট হয়। ছোট্ট সংবাদ বিবরণ, কিন্তু পড়তে পড়তে সেই ছোট্ট খবরই আমার কাছে একটা মহাসংবাদের ব্যঞ্জনা নিয়ে উপস্থিত হয় এবং অল্পক্ষণের জন্য হলেও তা যন্ত্রণার সীমা থেকে আমাকে আনন্দের অপার সীমায় টেনে নিয়ে যায়। ঘটনা হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা কফিলউদ্দিন মাহমুদ কবি সরোজিনী নাইডুর স্মৃতি রক্ষার জন্য একটি স্মৃতি পরিষদ গঠন করেছেন ও বঙ্গভবনে গিয়েছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে এ ব্যাপারে অবহিত করতে। রাষ্ট্রপতি এ সংবাদে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছেন এবং সরোজিনী নাইডুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়েছেন। বাসস পরিবেশিত এ সংবাদটি যেভাবে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, সেটির উল্লেখ করলাম : ‘রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান কবি সরোজিনী নাইডুকে অসাম্প্রদায়িক চেতনার অগ্রদূত উল্লেখ করে বলেছেন, তাঁর মূল্যবোধ ও আদর্শ অনুসরণযোগ্য। গতকাল সোমবার বঙ্গভবনে কবি সরোজিনী নাইডু জাতীয় স্মৃতি পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক উপদেষ্টা কফিলউদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এ কথা বলেন। বিক্রমপুরের কন্যা কবি সরোজিনী নাইডু ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে হিন্দু-মুসলিম উভয় সংস্কৃতির পটভূমিকে কেন্দ্র করে কাব্যচর্চা করেন। তাঁর অনেক কাব্যগ্রন্থ ইংরেজি ভাষায় বিলেত থেকে প্রকাশিত হয়। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘কবি সরোজিনী নাইডু ছিলেন কুসংস্কারমুক্ত, উদারমনা, অসাধারণ বাগ্মী এবং নারী প্রগতির পথিকৃৎ। এই মহীয়সী নারীর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।’

আমি এ সংবাদটি অবাক করা বলছি এ জন্য যে কোথাও সরোজিনী নাইডুর স্মৃতিরক্ষার জন্য কিছু করা হয়েছে বা হচ্ছে এমন কোনো ঘটনা এর আগে জানা যায়নি। সাবেক উপদেষ্টা কফিলউদ্দিন মাহমুদ যে এ উদ্যোগটি গ্রহণ করলেন, তাতে একটা অসাধারণ অবাক করা আনন্দ পেয়ে গেলাম। এই আনন্দের রেশ কাটতে খানিক সময় লাগল এবং বুঝতে শুরু করলাম যে সত্যি সত্যি আমার গায়ে যথেষ্ট জ্বর। বিক্রমপুরের কন্যা সরোজিনী নাইডুর স্মৃতি রক্ষার জন্য কফিলউদ্দিন মাহমুদ কী কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন সে সম্পর্কে সংবাদে কিছু জানা যায়নি। তৎক্ষণাৎ যে জানতেই হবে এমন কিছু কথা নেই। তবে উদ্যোক্তা যে সমস্ত ব্যাপারটি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন এবং সেই গুরুত্ব অনুযায়ী কার্যসূচি গ্রহণ করবেন_এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়।

সরোজিনীর (১৩/০২/১৮৭৯-০২/০৩/১৯৪৯) জন্ম বিক্রমপুরের ব্রাহ্মণগাঁ গ্রামে। বাবা ডাক্তার অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়, মা বরদাসুন্দরী চট্টোপাধ্যায়। অঘোরনাথ হায়দরাবাদে চাকরি করতেন। সেখানেই সরোজিনীর জন্ম। হায়দরাবাদের পরিবেশে বড় হওয়ায় তাঁর বাংলা শেখা হয়নি। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি প্রবেশিকা পাস করেন। এ সময় ইংরেজিতে দুই হাজার লাইনের একটি নাটিকা রচনা করে নিজাম বাহাদুরের কাছ থেকে বিদেশে শিক্ষার জন্য বার্ষিক ৩০০ পাউন্ড বৃত্তি পান। ১৮৯৫ খ্রি. ইংল্যান্ড গিয়ে সরোজিনী কিংস কলেজে ও পরে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গার্টন কলেজে পড়াশোনা করেন। ছাত্রাবস্থায়ই সরোজিনী অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসায়ও কোনো আরোগ্য হচ্ছে না দেখে চিকিৎসক বাবা তাঁকে হায়দরাবাদে ফিরিয়ে আনেন এবং সুস্থ হয়ে ওঠার কয়েক মাস পর ডাক্তার মতিয়ালা গোবিন্দ রাজুলু নাইডুর সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন। সে থেকে তাঁর নামের সঙ্গে বিবাহসূত্রে নাইডু পদবি যুক্ত হয়। লন্ডনে থাকাকালে বিশিষ্ট সাহিত্য সমালোচক এডম্যান্ড গুজ ও অ্যাসথার সাইমন্সের সানি্নধ্যে আসেন সরোজিনী। তাঁরা দেখতে পান এই মেয়েটির কবি-প্রতিভা অত্যন্ত তীক্ষ্ন। তাঁরা তাঁকে কাব্য রচনায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে বলেন। সরোজিনী নিজেও অশেষ উৎসাহ নিয়ে কবিতা লিখতে শুরু করেন এবং পাশাপাশি দেশ সম্পর্কে ভাবতে ও কর্মপ্রণালি গ্রহণ করতে উদ্যোগী হন। অল্প বয়সে কবি হিসেবে তিনি যশস্বী হয়েছিলেন। তাঁর কাব্য গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে গোল্ডেন থ্রেশোল্ড, দ্য বার্ড অব টাইম, দ্য ব্রোকেন উইং, দ্য সংস অব ইন্ডিয়া প্রভৃতি। তিনি ১৯১৫ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯১৯ খ্রি. ভারতীয় নারীর অধিকার সাব্যস্ত করার জন্য ইংল্যান্ডে যান। তিনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতেন এবং যথার্থ বাগ্মী বলতে যা বোঝায়, তিনি ছিলেন সেই শ্রেণীর বক্তা। ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়ায়, সরোজিনী নাইডু আর ইংরেজিতে অনর্গল তীক্ষ্ন তীব্র বক্তৃতা_সমার্থক হয়ে যায়। আমি শৈশবে আমার জ্যাঠামশায়দের কাছে সরোজিনী নাইডুর বক্তৃতার কথা শুনেছি। তাঁদের একজন বলতেন, সরোজিনীর বক্তৃতায় দেয়াল ভেঙে পড়ার অবস্থা হতো। এমন তেজ ছিল তাঁর গলায়, ভাষায়, ভাবে ও ভঙ্গিতে। ১৯২৫ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯২৮ সালে আমেরিকার জনসাধারণকে ভারতের স্বাধীনতার তাৎপর্য বোঝাতে সেখানে যান ও নানা সভায় অংশগ্রহণ করে আমেরিকার মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে ইংরেজদের পক্ষে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভারতবর্ষ ছেড়ে আসাটা তাদের জন্যই শুভ হবে। ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দিয়ে সরোজিনী নাইডু গ্রেপ্তার হন ও মুক্তি পাওয়ার পর মহাত্দা গান্ধীর সঙ্গে লবণ সত্যাগ্রহে যোগ দেন। ১৯৩১ সালে তিনি গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে তিনি স্বাধীন ভারতের উত্তর প্রদেশের রাজ্যপাল নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু সে পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। তিনিই ভারতের প্রথম মহিলা রাজ্যপাল।

সরোজিনী নাইডু সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাঁর জীবনকাহিনীর সামান্য উল্লেখ করলাম। তাঁর রচনাসমগ্র আমি কখনো কিনতে পাইনি। তবে মকরন্দ পারানজাপে সম্পাদিত ‘সরোজিনী নাইডু সিলেকটেড পোয়েট্রি অ্যান্ড প্রোজ’ বইটি আমি বেশ কয়েক বছর আগে কিনেছিলাম। ১৯৯৩ সালে হারপার কলিন্স ইন্ডিয়ার উদ্যোগে এ সংকলনটি প্রকাশিত হয় এবং সে বছরই এর দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। বইটির কাভারে চেয়ারের হাতলে ভর করে সরোজিনী বসে আছেন_এমন একটি চমৎকার ছবি মুদ্রিত আছে। বইটির ভেতরে সরোজিনীর আরো কয়েকটি ছবি আছে, তবে অধিকাংশই তাদের উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফেলেছে। সরোজিনী যে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির ব্যাপারটিকে অত্যন্ত মূল্যবান মনে করতেন এবং এ বিষয়ে যে বিস্ময়কর কিছু কবিতা তিনি লিখেছিলেন, তা সংকলন করার ব্যাপারে সম্পাদক অত্যন্ত যত্ন নিয়েছেন। সরোজিনীর রাজনৈতিক চিন্তার মূল সূত্রটি ধরিয়ে দেওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ এখানে সংকলিত আছে। আমি বইটি উল্লেখ করলাম এ জন্য যে সরোজিনী নাইডু সম্পর্কে কেউ যদি কিছু পড়তে চান, তাহলে যেন সহজেই এ বইটি জোগাড় করতে পারেন। আমি সর্বশেষ সরোজিনীর একটি চিঠি উল্লেখ করব এবং সরোজিনী স্মৃতি রক্ষা সংসদের উদ্যোক্তা কফিল মাহমুদকে অভিনন্দন জানাব এই মহান নারীনেত্রী ও কবির স্মৃতি রক্ষার ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়ার জন্য। যদি তিনি প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে আমাদের পরামর্শ এ ব্যাপারে গ্রহণ করতে পারেন। আমি যে চিঠিটির উল্লেখ করছি সেটি সরোজিনী ২৬ ডিসেম্বর ১৯৪৬ মহাত্দা গান্ধীকে লিখেছিলেন। গান্ধী তখন দাঙ্গাপীড়িত নোয়াখালীতে আসছেন শান্তি মিছিল করার জন্য। সরোজিনী ইংরেজিতে ছোট্ট একটি চিঠি লিখছেন। তিনি বলছেন, আমার এই চিঠিটি সত্যি সত্যি কোনো চিঠি নয়। এর দ্বারা আমি প্রেম ও বিশ্বাসের প্রতি আমার অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি। যদি সম্ভব হতো আমি নিশ্চয়ই কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও আপনার সঙ্গে থাকার চেষ্টা করতাম। আমি জানি, এ মুহূর্তে আমাকে যে বাংলার বাইরে যেতে হচ্ছে সে ব্যাপারে আপনি প্রকৃতই জানেন। আপনার সঙ্গে আমার দেখা করার বা কথা বলার কোনো বাস্তবিক প্রয়োজন নেই। আপনি আমার অন্তর্দৃষ্টিতে সারাক্ষণ রয়েছেন। আমি আপনাকে সততই দেখতে পাচ্ছি। আমি আমার হৃদয় দিয়ে সারা পৃথিবীতে নিয়তই আপনার শান্তি বার্তা প্রচার করছি।

প্রিয় তীর্থযাত্রী, আপনি যে তীর্থকার্যে যাচ্ছেন সে হচ্ছে আশা ও ভালোবাসার তীর্থযাত্রা। একটি হিস্পানি প্রবাদ আছে ঈশ্বরের সঙ্গে যাও। আপনিও ঈশ্বরের সঙ্গে যাচ্ছেন, ঈশ্বরও আপনার সঙ্গে আছেন। আমি মোটেই ভয় পাচ্ছি না। আমি আপনার মিশনের সাফল্য কামনা করছি। ইতি সরোজিনী।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

[ad#co-1]