রাষ্ট্রের মুখোমুখি রবীন্দ্রনাথ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
এটা জানা আছে আমাদের যে, রবীন্দ্রনাথ রাষ্ট্রে আস্থা রাখতেন না, আস্থা রাখতেন সমাজে। রাজনীতিকে তিনি পছন্দ করতেন কম, রাজনীতিকদের নিয়ে পরিহাস করতে কার্পণ্য করেন নি মোটেই। স্বদেশী এজিটেটর ‘ঘরে বাইরে’র সন্দীপ মানুষ হিসেবে সৎ নয়, ‘চার অধ্যায়ে’র সন্ত্রাসবাদীরা কেউ খুঁজছে ব্যক্তিগত ব্যর্থতার ক্ষতিপূরণ, কেউ চালিত রিপুর তোড়ে। অন্যদিকে হাতে-দরখাস্ত রাজনীতিকরা ভয়ংকর রূপে হাস্যকর। অতি অল্পবয়সে, ১৮৮৩-তে টৌন হলে তামাসা দেখে ‘ভারতী’ পত্রিকায় তিনি লিখেছিলেন, ‘সেদিন টৌন হলে মস্ত একটা তামাসা হইয়া গিয়াছে। দুই চারিজন ইংরাজে মিলিয়া আশ্বাসের ডুগডুগি বাজাইতেছিলেন ও দেশের কতকগুলি বড় লোক বড় বড় পাগড়ি পরিয়া নাচ আরম্ভ করিয়া দিয়াছেন।’ রবীন্দ্রনাথ বোমা পছন্দ করেন নি, দরখাস্তও নয়, এমনকি পলিটিক্সও নয়। তাঁর আস্থা ছিল সমাজে। সমাজকে রাষ্ট্রের চেয়ে বড় মনে করবার কারণ ছিল। সমাজকে তিনি দেখতেন আশ্রয় হিসেবে, যেন মায়ের মতো। রাষ্ট্র ছিল বহিরাগত, পিতৃতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী। রাষ্ট্রকে উপেক্ষা করা গেলেই তিনি সুখী হতেন; কিন্তু তা সম্ভব ছিল না। কেননা একটি পরাধীন রাষ্ট্রে তাঁর বসবাস, এবং তার বাইরেও ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতি।


রবীন্দ্রনাথকে সাম্রাজ্যবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেই ১৯১৩ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বহুবিধ রণধ্বনি যখন শোনা যাচ্ছিল, তখন তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্যে এ সত্যের স্বীকৃতি হয়তো ছিল যে, তিনি ভিন্ন সুরে কথা বলছেন, তাঁর কণ্ঠে গান আছে। সে গান সংঘর্ষের নয়, মৈত্রীর। আমরাও তো মূলত কবি হিসেবেই তাঁকে জানি। তাঁর লেখা গান আমাদের কাছে অন্যসব গানের চেয়ে প্রিয়। তিনি বহুভাবে আমাদের প্রভাবিত করে রেখে গেছেন। আমাদের রুচি গঠনেও তাঁর ভূমিকা অসাধারণ; কিন্তু তিনি যে বিশ্ব রাজনীতির বিষয়েও খুব ভালোভাবেই জানতেন এবং না জানলে অত বড় মাপের কবি ও ব্যক্তি হতেন না, তা মোটেই ভোলার নয়। তাঁর লেখা পড়লে আমরা কেবল যে নন্দনতাত্ত্বিকতা পাই তা নয়, নানান বিষয়ে তাঁর কৌতূহল ও জ্ঞান দেখে বিস্মিত হই; এবং আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনীতি সম্পর্কে তিনি কত যে সচেতন ছিলেন তাও লক্ষ করি।

১৯২২ সালে গান্ধী যখন অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তখন রবীন্দ্রনাথ তার ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘ইম্পেরিয়ালিজম হচ্ছে অজগর সাপের ঐক্যনীতি।’ কেবল যে সাম্রাজ্যবাদের অজগর সাপের গিলে খাওয়ার নীতির কথা বলেছেন তা তো নয়, বলছেন আন্তর্জাতিকতার কথাও। সে আন্তর্জাতিকতার ভিত্তি হচ্ছে প্রত্যেক জাতির নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যের প্রতিষ্ঠা। স্বতন্ত্র হয়েই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং সেই ঐক্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সমস্ত বিশ্বের মুক্তি। রবীন্দ্রনাথ এটাই বলেছেন। বলেছেন ১৯২২ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সবেমাত্র শেষ হয়েছে। আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ যে বাধবে সে নিয়ে মানুষ ভাবছে না। রবীন্দ্রনাথ তেমনি যে ঘটতে পারে সে আশঙ্কা ঠিকই করেছেন ঘটনার এক-দুই নয়, সতের বছর আগে। বিংশ শতাব্দীর শেষে একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বায়নের দস্যুসুলভ পীড়নে আজ যে আমরা বিধ্বস্ত সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছি, বিশ্বায়নের অন্তর্নিহিত সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য আন্তর্জাতিকতা কত বেশি প্রয়োজন।

ওই প্রবন্ধ লেখার দশ বছর পর ১৯৩২ সালে ভারতবর্ষে যখন সাম্রাজ্যবাদী নিপীড়ন আবার তার হিংস্রতাকে উšে§াচিত করেছে, গান্ধীসহ আন্দোলনরত কংগ্রেসের নেতারা কারারুদ্ধ হয়েছে, তখন রবীন্দ্রনাথ ‘প্রশ্ন’ নামে যে কবিতাটি লেখেন, সেটি আমাদের অনেকেরই পরিচিত। তবু সে কবিতার বক্তব্যটি স্মরণ করলে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের ধিক্কারটিকে বোঝা যায়। ভগবান যুগে যুগে শান্তির দূত পাঠিয়েছেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁর চারপাশে ভালোবাসা নয়, দেখতে পাচ্ছেন শাসকদের নৃশংসতা, তাই তিনি লিখছেন-

‘আমি যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে
হেনেছে নিঃসহায়ে।
আমি যে দেখেছি, প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে
বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।
আমি যে দেখিনু, তরুণ বালক উš§াদ হয়ে ছুটে
কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।’

মার্কসবাদীদের মতো করে ইতিহাসের ব্যাখ্যা রবীন্দ্রনাথের করবার কথা নয়, তা তিনি করেনও নি; কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের চালিকাশক্তি যে মুনাফার লোভ এবং সাম্রাজ্যবাদীদের বিশেষ আগ্রহ যে ভোগবাদিতায়, তা তিনি জানতেন এবং সে বিষয়ে লিখেছেনও।

১৮৮১ সালে তাঁর বয়স যখন মাত্র ২০, তখনই তিনি ‘চীনে মরণের ব্যবসায়’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে ব্যবসায় জিনিসটা যে কেমন ভয়ঙ্কর বস্তুতে পরিণত হয় এবং অপরদিকে ব্যবসায় যে সাম্রাজ্যবাদী মুনাফা লাভের প্রকৃষ্টতম উপায়-এই উভয় সত্যের উšে§াচন রয়েছে। তরুণ রবীন্দ্রনাথ লিখছেন-

‘‘একটি সমগ্র জাতিকে অর্থের লোভে বলপূর্বক বিষপান করান হইল। এমনতর নিদারুণ ঠগীবৃত্তি কখনো শুনা যায় নাই। চীন কাঁদিয়া কহিল, ‘আমি আফিম খাইব না।’ ইংরেজ বণিক কহিল, ‘সে কি হয়?’ চীনের হাত দুটি বাঁধিয়া তার মুখের মধ্যে কামান দিয়া আফিম ঠাসিয়া দেওয়া হইল; দিয়া কহিল, যে আফিম খাইলে তাহার দাম দাও। বহুদিন ইংরাজরা এইরূপ অপূর্ব বাণিজ্য চালাইতেছেন।’’

সাম্রাজ্যবাদ শব্দটি প্রয়োগ করেন নি; কিন্তু এ যে সাম্রাজ্যবাদেরই মুখ্যরূপ এ তো একালে আমাদের সবারই জানা।

আসলে পুঁজিবাদই আসল দুর্বৃত্ত। পুঁজিবাদের তৎপরতা রবীন্দ্রনাথের কাছে অস্পষ্ট ছিল না। চীনে আফিমের মরণের ব্যবসাই করেছে ইংরেজরা; জাপানে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ দেখলেন, সেখানেও পুঁজিবাদের বীভৎস তৎপরতা চলছে; তবে সেটা যে বাইরের ব্যবসায়ীরা ঘটাচ্ছে তা নয়, ভেতর থেকেই। তবু ব্যবসাটা একই-মুনাফার লোভ। মুনাফার লোভে পুঁজিবাদ যে কেমনভাবে ভোগবাদিতার লালন-পালন ঘটায় এবং কেবল মানুষ নয়, প্রকৃতিরও সর্বনাশ করে ছাড়ে, তার হতভাগ্য সাক্ষী আজকের বিপন্ন বিশ্ব। বিপদটাকে রবীন্দ্রনাথ প্রায় ১০০ বছর আগেই দেখতে পেয়েছিলেন। ১৯১৬ সালে তিনি জাপান যান এবং সেখানে তিন মাস থাকেন। সে সময়ই জাপানে শিল্পায়নের যে তৎপরতা দেখেছেন, তা তাঁকে ভীত করেছে। ‘জাপানযাত্রী’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-‘মানুষের দরকার আছে, এই কথাটাই ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে হাঁ করতে করতে, পৃথিবীর অধিকাংশকে গ্রাস করে ফেলেছে। প্রকৃতিও কেবল দরকারের সামগ্রী, মানুষও কেবল দরকারের মানুষ হয়ে আসছে।’

রবীন্দ্রনাথ ‘জাতি’ শব্দের পরিবর্তে ‘দেশ’ শব্দটিকে পছন্দ করতেন। তাঁর কাছে জাতি মনে হতো ইংরেজি ‘নেশন’-এর বাংলা অনুবাদ। তাঁর নিজের পক্ষপাত ছিল খাঁটি বাংলা ‘দেশ’ কথাটির প্রতি।

নেশন-কে তবু সহ্য করতে প্রস্তুত ছিলেন; কিন্তু ‘ন্যাশনালিজম’কে রবীন্দ্রনাথ মোটেই গ্রহণযোগ্য ভাবেন নি। ১৯১৬ সালে বিশ্বযুদ্ধ যখন চলছে, সেই সময় তিনি জাপানে গেছেন। জাপান থেকে আমেরিকায় যান এবং উভয় দেশে ‘ন্যাশনালিজম’-এর ওপর বক্তৃতা দেন। সে বক্তৃতা পরে একত্রে সংকলিত হয়েছে। ‘ন্যাশনালিজম’ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ছিল এই যে, বিশ্বের জন্য এটি হলো একটি ভয়াবহ বিপদ এবং এর পেছনের চালিকাশক্তি হচ্ছে লুণ্ঠনের অতি উগ্র বাসনা। কেবল এটা বলেন নি যে, যাকে তিনি ন্যাশনালিজম বলছেন, আসলে তা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ; বললে তাঁর অবদান লেনিনের কাছাকাছি চলে যেত।

‘শিক্ষার মিলন’ নামে যে প্রবন্ধটিতে রবীন্দ্রনাথ ইম্পেরিয়ালিজমকে ক্ষুধার্থ অজগর সাপের ঐক্যনীতি বলে চিহ্নিত করেছেন, সেই প্রবন্ধেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, জাতি বা নেশন গড়ে উঠেছে ‘সত্যের জোরে’, কিন্তু ন্যাশনালিজম সভ্য নয়, অথচ সেই জাতীয় গণ্ডিদেবতার যারা পূজারি তারা শিক্ষার ভেতর দিয়ে নানান ছুতোয় আত্মম্ভরিতার চর্চা করাকে কর্তব্য মনে করে। এই আত্মম্ভরিতাকে তিনি দুর্বুদ্ধি বলে চিনেছেন এবং বলেছেন, ‘এই দুর্বুদ্ধিরই নাম ন্যাশনালিজম, দেশের সর্বজনীন আত্মম্ভরিতা। এ হলো রিপু, ঐক্যতত্ত্বের উল্টোদিকে অর্থাৎ আপনার দিকটাতেই এই টান।’

কিন্তু পরিত্রাণের উপায় কী? ইংরেজ ভারতবর্ষে এসেছে, এসে দৌরাত্ম্য করেছে। তাঁর সময় তারা ভয়ঙ্করভাবে সেটা করছিল। সে এসেছিল বাণিজ্য করবার নাম করে এবং তার বাণিজ্য যে কেমন ভয়াবহ হতে পারে, চীন তা বুঝেছে যখন তাকে জোর করে আফিম খাওয়ানো হয়েছে। ভারতবর্ষ যে বোঝে নি তাও নয়, ভারতবর্ষকে সে দখল করে নিয়েছে এবং তাকে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছে। গোটা ব্যাপারটা পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী-রবীন্দ নাথ তা জানতেন। আন্তর্জাতিক পটভূমিতে তার বিরুদ্ধে তিনি বলেছেন। দেশীয় নির্যাতনের ক্ষেত্রেও তাঁর প্রতিবাদ বারবার আমরা শুনেছি। অনেক সময় আন্দোলনের একেবারে সামনে ছিলেন তিনি। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে তিনি মিছিলে ছিলেন। তখন তিনি অসংখ্য গান লিখেছেন, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন দেশপ্রেমে। জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তাঁর মতো করে অন্য কোনো ‘অরাজনৈতিক’ ব্যক্তিত্বকে করতে শুনি নি, এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও পিছিয়ে গেছেন। বন্দিমুক্তি আন্দোলনেও তিনি ছিলেন। তবু সাম্রাজ্যবাদকে হটিয়ে দেশকে মুক্ত করা যায় কীভাবে তার পথনির্দেশ রবীন্দ নাথের কাছ থেকে পাওয়া যায় নি। স্বদেশী সমাজ গড়ার কথা তিনি জোর দিয়ে বলেছেন। ১৯০৪ সালে লিখিত ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে রাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে সামাজিক কাজকে প্রধান করে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন।

লিখেছেন-

‘প্রত্যেক জেলায় ভদ্র শিক্ষিত সম্প্রদায় তাহাদের জেলায় মেলাগুলিকে যদি নবভাবে জাগ্রত, নবপ্রাণে সজীব করিয়া তুলিতে পারেন, ইহার মধ্যে দেশের শিক্ষিতগণ যদি তাহাদের হƒদয় সঞ্চার করিয়া দেন, এই সকল মেলায় যদি তাহারা হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্ভাব স্থাপন করেন-কোনো প্রকার নিষ্ফল পলিটিক্সের সংশ্রব না রাখিয়া বিদ্যালয়, পথঘাট, জলাশয়, গোচরভূমি প্রভৃতি সম্বন্ধে জেলায় যে সমস্ত অভাব আছে তাহার প্রতিকারের পরামর্শ করেন, অতি অল্পকালের মধ্যে স্বদেশকে যথার্থই সচেষ্ট করিয়া তুলিতে পারেন।’

সমাজ সংস্কারের কাজ তো করা গেল, কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতার কী হবে? মূল প্রশ্ন তো এটাই। রাষ্ট্র ক্ষমতায় কামান-বন্দুকে সুসজ্জিত হয়ে ইংরেজরা বসে রইল এবং দেশের মানুষকে শোষণ ও পীড়ন করতে থাকল আর দেশের লোকজন ব্যস্ত রইল জেলায় জেলায় নন-পলিটিক্যাল মেলাতে প্রাণসঞ্চারের কাজে তাতে ইংরেজের তো কোনো অসুবিধা নেই, বরং সুবিধারই সম্ভাবনা প্রচুর পরিমাণে। দ্বিতীয় ওই যে ভদ্র-শিক্ষিত সম্প্র্রদায় তার ওপরই বা কতটা নির্ভর করা যায়? তারা তো ইংরেজ শাসনের সৃষ্টি এবং ভেতরে ভেতরে ইংরেজনির্ভর। তাদের শিক্ষা তো জনগণ থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে এবং এমনকি স্বদেশী আন্দোলনের কালেও তারা নিজেদের ‘বাবুত্ব’কে অবলুপ্ত করে দিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে নি। না, ওটি যে পথ নয় তা প্রমাণিত হয়ে গেছে এবং রবীন্দ্রনাথের মতো বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে ওই পথের অকিঞ্চিৎকরতা অজানা থাকবার কথাও নয়। মূল সত্যটা হলো সাম্রাজ্যবাদকে বিতাড়িত করার পথ তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

এমনকি সামাজিক বয়কটের কথাও বলেছেন তিনি। ১৮৯৩ সালে লিখিত ‘ইংরাজ ও ভারতবাসী’ প্রবন্ধে আছে-

‘আজ আমি বলিতেছি, ভারতবর্ষের দীনতম, মলিনতম কৃষককে আমি ভাই বলিয়া আলিঙ্গন করিব, আর ওই যে রাঙা সাহেব টম টম হাঁকাইয়া সর্বাঙ্গে কাদা ছিটাইয়া চলিয়া যাইতেছে উহার সহিত আমার কানাকড়ি সম্পর্ক নাই।’

সমাজ পরিবর্তনের জন্য যে ধরনের শিক্ষা অত্যন্ত আবশ্যক ছিল, পরাধীন ভারতবর্ষে তা দেয়া সম্ভব ছিল না। প্রধান কারণ, ওই পরাধীনতাই সাম্রাজ্যবাদ কেন সহ্য করবে তেমন শিক্ষা যা সাম্রাজ্যবাদকে বিতাড়নে সাহায্য করবে? করে নি। তবে রাষ্ট্র ক্ষমতা যদি সমাজ বিপ্লবীদের করায়ত্ত হয়, তাহলে শিক্ষা যে বৈপ্লবিক কাজ করতে পারে তার নিদর্শন তিনি স্বচক্ষে দেখতে পেয়েছিলেন বিপ্লব-পরবর্তী রাশিয়াতে। রবীন্দ্রনাথ সোভিয়েত ইউনিয়নে যান ১৯৩০ সালে এবং সেখানে গিয়ে যা দেখেন তেমনটা তিনি অন্য কোনো দেশে দেখতে পান নি; যদিও তিনি তাঁর কালের বহু দেশই ভ্রমণ করেছেন। ‘রাশিয়ার চিঠি’তে তিনি লিখছেন, ‘রাশিয়ায় এসেছি-না এলে এ জšে§র তীর্থদর্শন অত্যন্ত অসমাপ্ত থাকত।’ তাঁকে বিশেষভাবে যা বিস্মিত করেছিল, তা হলো শিক্ষা। রাশিয়ার চিঠিতে বলা হয়েছে-

‘আট বছরের মধ্যে শিক্ষার জোরে সমস্ত দেশে লোকের মনের চেহারা বদলে দিয়েছে। যারা মূক ছিল তারা ভাষা পেয়েছে, যারা মূঢ় ছিল তাদের চিত্তের আবরণ উদ্ঘাটিত, যারা অক্ষম ছিল তাদের আত্মশক্তি জাগরুক, যারা অবমাননার তলায় তলিয়ে ছিল, আজ তারা সমাজের অন্ধ কুঠুরি থেকে বেরিয়ে এসে সবার সঙ্গে আসন পাবার অধিকারী। এত প্রভূত লোকের যে এত দ্রুত এমন ভাবান্তর ঘটতে পারে তা কল্পনা করা কঠিন।’

অন্য কোথাও তিনি শিক্ষার এমন বিশাল সামাজিক মূল্য ও তাৎপর্যের অভিব্যক্তি প্রত্যাশা করেন নি; কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে এই অভূতপূর্ব অর্জনের যে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানা, কৃষিতে নতুন ব্যবস্থাপনা এবং মানব ব্যক্তিত্বের নতুন ধারণাযুক্ত-এ সমস্তই খেয়াল করে দেখেছেন তিনি। দেখেছেন দেশ জুড়ে শ্রমিকদের কর্তৃত্ব এবং তথাকথিত ‘ভদ্দর লোকেরা’ প্রকৃতই উধাও, উধাও ধন-গৌরবের কুৎসিত অহঙ্কার। এই যে ভদ্রলোকজনের অন্তর্ধান-এ তো কিছুতেই সম্ভব হতো না যদি না ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব ঘটত। তিনি অত্যন্ত প্রীত হয়েছেন এটা দেখে, উপরতলার অনেক জিনিস তলিয়ে গেলেও ‘টিকে রয়েছে এবং ভরে উঠেছে মিউজিয়াম, থিয়েটার, লাইব্রেরি ও সঙ্গীতশালা’ এবং শিক্ষার চর্চার দ্বারা সাধারণভাবে ‘ব্যক্তির অন্তর্নিহিত শক্তি’কে বাড়িয়ে তোলার কাজটা অব্যাহতভাবে চলছে।

কিন্তু বিপ্লব মানেই তো বলপ্রয়োগ, জবরদস্তি; যা রবীন্দ্রনাথের পছন্দ নয়। সে জন্য রাশিয়ার ওই দিনকটাকে তিনি পছন্দ করেন নি। আর রয়েছে ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ যা চেয়েছেন, তা হলো সামঞ্জস্য-‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকবে; অথচ তার ভোগের একান্ত স্বাতন্ত্র্যকে সীমাবদ্ধ করে দিতে হবে।


এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় যে রবীন্দ্রনাথের গান যেমন ভারতের তেমনি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় ছিলেন, কিন্তু মূলত ছিলেন বাঙালী। সাতচল্লিশে ভারত যখন স্বাধীন হলো তখন ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে-ভারত ভাগ্যবিধাতা’র চেয়ে গ্রহণযোগ্য কোনো সঙ্গীতের সন্ধান ভারতের নেতারা পান নি। আর ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ তো খুব স্বাভাবিক ভাবেই বাংলাদেশের জন্য গ্রহণযোগ্য হয়েছে, কেননা এটি তো একান্তই বাংলাদেশের ও বাঙালীর গান। কিন্তু যে সামাজিক পরিবর্তন রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন সেটা ভারতে ঘটে নি, বাংলাদেশেও নয়। আর এই না-ঘটার মধ্যেই রয়ে গেছে রবীন্দ্রনাথের একটি অতিরিক্ত প্রাসঙ্গিকতা, যেটি তাঁর শিল্পগত সাফল্যের চেয়ে কম মূল্যবান নয়।

[ad#co-1]