মুন্সীগঞ্জের মালিগাঁও গ্রামের রব কাজীর লালসালু ব্যবসা

সেতু ইসলাম, মুন্সীগঞ্জ
মুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলার মালিগাঁও গ্রামে জারিগানের শিল্পী রব কাজী তার নিজ বাবা-মার কবরের পাশে রাতারাতি ১২ হাত লম্বা গায়েবি কবর আবিষ্কার করে সেখানে লালসালু কাপড়ে ঢাকা মাজার তৈরি করে মানুষ ঠকানোর কারবার শুরু করেছেন। ভ-পীর রব কাজী গ্রামের লোকজনের কাছে এটাকে ওয়াজ করনি (রা.)-এর মাজার বলে প্রচার করেছেন। এ ছাড়া পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির কবরের ওপর তিন-স্তর পাকা করে মালিগাঁও কাজীবাড়ি বায়তুল আমান জামে মসজিদের দেয়াল লাগোয়া আরো একটি মাজার গড়ে তুলেছেন রব শাহ। এটির নামকরণ করা হয়েছে ওয়াশিয়া (রা.) দরবার শরিফ। গ্রামের লোকজন বলছেন, এই দুটি মাজার গড়ে তোলার পেছনে উদ্দেশ্য একটাই, মসজিদের বিশাল সম্পত্তি দখল করা এবং পীর ব্যবসার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া। এ যেন বাংলা সাহিত্যের সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর ‘লালসালু’ উপন্যাসের আব্দুল মজিদ। তবে এই আব্দুল মজিদ দূরে যাননি, নিজ গ্রামেই গড়ে তুলেছেন লালসালু ঘেরা পীর ব্যবসা।

যেভাবে গড়ে উঠে মাজার
পীর রব শাহ চিশতীর আসল নাম কাজী আব্দুর রব। ঢাকার মোহাম্মদপুরের আদাবরে কাজী আব্দুর রব বসবাস করতেন। গ্রামের বয়স্ক ও সচেতন ব্যক্তিরা তাকে বলেন ভ-পীর রব শাহ। তার কণ্ঠে গাওয়া ‘চিশতী রব শাহের জারি গান’ নামে একটি অডিও ক্যাসেটও বাজারে বেরিয়েছিল মাজার গড়ে ওঠার আগে। যদিও সেটা তেমন কোনো বাজার পায়নি। ঢাকা থেকে মাঝেমধ্যে আব্দুর রব নিজ গ্রামে আসা-যাওয়া করতো। বছর দুয়েক আগে তিনি প্রচার করতে শুরু করেন যে তিনি স্বপ্নে দেখেছেন নিজ বাড়ির আঙিনায় বাবা কাজী মহিউদ্দিন ওরফে মিয়া কাজী ও মায়ের কবরের পাশে খোয়াজ-খিজির বা ওয়াজ করনির ২২ হাত লম্বা গায়েবি কবর উঠেছে। তিনি ওই স্বপ্নের কথা গ্রামে ছড়িয়ে দেন। তারপর তিনি বাবা-মার কবরের পাশে গোয়াল ঘর ভেঙে এবং বড় একটি বরই গাছ কেটে ২২ হাত লম্বা কবর তৈরির চেষ্টা করেন। কিন্তু জায়গা কম থাকায় ১২ হাত দীর্ঘ ওয়াজ করনির (রা.) কবর গড়ে তোলেন। মাসখানেকের ব্যবধানে ১২ হাত দীর্ঘ কবর ও বাবা-মার কবর পাকা করেন তিনি। ওই কবরের চারপাশে দেয়াল নির্মাণ করে দরবার শরিফ গড়ে তোলেন। এক পর্যায়ে ১২ হাত লম্বা গায়েবি কবর গিলাপে ঢাকা পড়ে। সাদা রঙের গিলাপে ঢাকা হয় দাদা-দাদির কবর। আব্দুর রবের মাজার গড়ে ওঠার এই কাহিনী ওয়াশিয়া দরবার শরিফের খাদেম এবং কথিত ভ-পীরের আপন ভাতিজা কাজী আফজাল (৩০) দৈনিক ডেসটিনির এ প্রতিনিধির কাছে এসব তথ্য জানান। তবে তিনি জানান, তার চাচা পীরের এই ভ-ামীর তথ্য ফাঁস হওয়ার আগে এই গ্রামের প্রায় সব লোকসহ ঢাকা থেকে অনেক বড় বড় নামিদামি লোক গাড়ি করে এখানে আসতো। তাদের আশা ছিল, অনেকে মোটা অঙ্কের টাকা-পয়সা আয় করবেন এখান থেকে। কিন্তু তা আর বুঝি হলো না। গত বুধবার গ্রামবাসীর প্রতিরোধের মুখে রব কাজী গ্রাম ছাড়েন। গ্রামের তরুণ মো. সেন্টু শেখ (২০) জানান, ৩ বছর আগেও আব্দুর রবের বাবা-মায়ের কবরের পাশে এটি গরু ঘর এবং একটি বরই গাছ ছিল। মালিগাঁও গ্রামের পঞ্চায়েত কমিটির সদস্য হাজি আব্দুল আজিজ বলেন, রব হঠাৎ করেই নিজেকে পীর বলতে শুরু করে। জীবনে দেখিনি বা শুনিনি রবের বাড়িতে ১২ হাত লম্বা কবর ছিল। আর এখন সেখানে ১২ হাত লম্বা কবর পাকা করে শালু কাপড় লাগিয়ে রব কাজী মাজার বানিয়েছে। আবার রবই নাকি ওই মাজারের পীর। এক ওয়াক্ত নামাজের বালাই নাই, পীর হয় কিভাবে আল্লাই জানেন।

আড়ালে-কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন

কথিত পীর রব শাহ চিশতীর বাবা কাজী মহিউদ্দিন, দাদা কাজী মোনতাজ উদ্দিন ১৯৪৬ সালে নিজ বাড়ির ১ একর ২৭ শতাংশ সম্পত্তি মসজিদ নির্মাণের জন্য ওয়াকফ করে দেন। পরে সেখানকার একটা অংশে মালিগাঁও গ্রামের কাজী বাড়ি বায়তুল আমান জামে মসজিদ নির্মিত হয়। ওই মসজিদের মোতোয়ালি তারই আপন ভাতিজা কাজী আবু বাহার জানান, বছর তিনেক আগে গ্রামের এই মসজিদের উন্নয়ন কর্মকা- নিয়ে কথা ওঠে। সে সময় চাচা কাজী আব্দুর রব মসজিদ কমিটির লোকজনের কাছে সরকারের কাছ থেকে ৪ কোটি টাকা বরাদ্দ এনে মসজিদের উন্নয়নের আশ্বাস দেন। সে মোতাবেক মসজিদের ওয়াকফ প্রদানের কাগজপত্রাদি তাকে দেয়া হয়। কিছুদিন পর আব্দুর রব মসজিদের ওই ওয়াকফ সম্পত্তি তার নিজের বলে দাবি করেন। বাবা কাজী মহিউদ্দিনের ছেলে হিসেবে উত্তরসূরি হিসাবে আব্দুর রব ওই জায়গার মালিকানা দাবি করেন। সেখানে তিনি নিজের সম্পত্তিতে ওয়াশিয়া দরবার শরিফ গঠনের প্রস্তাব দেন। গ্রামবাসী জানান, আব্দুর রব নিজেকে পীর বলে ঘোষণা দেন। এবং বলেন, আমি রব, আমিই সব কিছুর মালিক। আমি সবকিছু করতে পারি। মাত্র কিছুদিন অপেক্ষা করুন। এই এলাকায় কি করে ফেলি আপনারা নিজেদের চোখেই দেখবেন। কোটি কোটি টাকার সম্পদ এখানে আসবে। দেশের সব বড় লোকরা এখানে ভিড় জমাবে। একটি মসজিদ দিয়ে কি হবে। মাজার অনেক কিছু দিতে পারে। এসব কুপ্রস্তাবে রাজি না হয়ে রব মিয়ার কুমতলবে বাধ-সাধলেন গ্রামবাসী। এ নিয়েই মসজিদের পরিচালনা কমিটি ও কথিত পীর রব শাহের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয় বলে সরেজমিন মালিগাঁও গ্রামে গিয়ে এলাকাবাসীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়। মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাজি আলী হোসেন বলেন, মসজিদের জায়গা-সম্পত্তি দখল করা এবং অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার কুমতলবে আব্দুর রব এ গ্রামে গায়েবি মাজার গড়ে তোলে। আর ওই মাজার ব্যবসার আড়ালে লুকিয়ে আছে রবের সম্পত্তি দখল ও কোটিপতি হওয়ার কুমতলব।

কথিত পীরের হজ দর্শন
গায়েবি মাজারের পীর রব শাহের দরবারের প্রতিদিন গ্রাম-গঞ্জের সহজ-সরল মানুষের আগমন ঘটতো। এদের ধর্মান্ধতার সুযোগ নিয়ে গ্রামের কিছু লোককে তার মুরিদ বানায় রব শাহ। তবে তার মুরিদানদের বেশির ভাগ আসতেন ঢাকা থেকে। দামিদামি গাড়িতে করে এসে মুরিদানদের নিয়ে নামাজের সময় কাজী বাড়ি মসজিদের লাগোয়া দাদা-দাদির মাজারে বসে ঢাকঢোল পিটিয়ে নাচ-গান শুরু করতো সে। গ্রামের মানুষের তথ্য মতে আব্দুর রব কখনো নামাজ পড়তো না। সে তার মুরিদানদের নিয়ে হইহল্লা করতো। তার মুরিদানদের মধ্যে একাংশ রয়েছে গ্রামের নারীরা। তিনি ১২ হাত লম্বা সেই গায়েবি কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মুরিদানদের হজ পালন করাতো। মুরিদানদের বলতো, হজ করতে মক্কায় যাওয়ার দরকার নেই। নারী মুরিদানের বুকে জড়িয়ে ওই ১২ হাত কবরের চারপাশ ঘুরিয়ে সে হজ পালন করাতো। আর পুরুষ মুরিদানরা কবরের পাশে গিয়ে তার মুখোমুখি হয়ে চোখের দিকে তাকাতো। এ সময় সে বলতো আমার চোখে মক্কা শরিফ দেখতে পাচ্ছো। এখন ওই মক্কার চারপাশ ঘুরে বেড়াও এভাবেই নারী-পুরুষ মুরিদানরা পীর বাবা রব শাহের হজের দর্শন পেতো।

গ্রাম ছেড়েছে রব কাজী

কথিত পীর আব্দুর রব গত দুদিন ধরে গ্রামবাসীর বিক্ষোভের মুখে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। সে এখন কোথায় আছে তা জানা সম্ভব হয়নি। তবে তার পরিবারের লোকজন জানায়, সে ঢাকায় থাকতে পারে। এ প্রতিবেদক তার বাড়ি গেলে তার স্ত্রী ঝর্ণা বেগম, ছেলে সিফাত ও মেয়ে রিফাত সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি পেয়ে বসতঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে অন্যত্র সরে যায়। সংবাদকর্মীদের সামনে আসেনি। আর এ কারণেই পীর কাজী আব্দুর রব বা তার পরিবারের লোকজনের কোনো বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

পুলিশের বক্তব্য

মুন্সীগঞ্জের এএসপি সদর শাহেদ ফেরদৌস ও সদর থানার অফিসার্স ইনচার্জ শহীদুল ইসলাম সরেজমিন জেলা সদরের মালিগাঁও গ্রামের কথিত পীরের মাজার শরিফ তদন্তে যান। তারা সেখানে গিয়ে কবর দেখতে পেয়েছেন। লম্বা কবরের বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো যুক্তি খুঁজে পাননি তারা। তবে ওই মাজার গড়ে ওঠার নেপথ্য কারণ হিসেবে সদর থানার অফিসার্স ইনচার্জ শহীদুল ইসলাম বলেন, মসজিদের সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করেই পীর দাবিদার আব্দুর রব শাহের মাজার গড়ে উঠেছে।

গ্রামবাসীর বিক্ষোভ
গত বুধবার সকালে কথিত পীরের মাজার শরীফের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করে গ্রামবাসী। কাজী বাড়ি বায়তুল আমান জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির মোতোয়ালির নেতৃত্বে ওই মিছিল করা হয়। মিছিলে ভ-পীরের গ্রাম থেকে বিতাড়িত করার দাবিতে সেøাগান দেয়া হয়। মসজিদের সম্পত্তি ওই ভ-পীরের কবল থেকে রক্ষা করার দাবি জানায় এলাকাবাসী।

[ad#co-1]