বাপ-বেটার খুনসুটি…

বাবার মতো ছেলের গানেও মুগ্ধ এ দেশের দর্শক-শ্রোতা। ছেলে যেন বাবাকেও ছাড়িয়ে! দুজনের সম্পর্কটা বন্ধুর, বেশ মজার। সেই সম্পর্কের রং বদলায় ক্ষণে ক্ষণে। ফেরদৌস ওয়াহিদ ও হাবিব ওয়াহিদকে নিয়ে লিখেছেন রবিউল ইসলাম জীবন।
হাবিব তখন নবম শ্রেণীতে। বাবা নতুন একটি গান রেকর্ড করে এনে শোনালেন তাঁকে। ‘বাবা, গানটির শেষ মাত্রা উল্টে গেছে।’ ছেলের মুখে এমন কথা শুনে হেসে ওঠেন ফেরদৌস ওয়াহিদ। বলে কি! ভালো করে শুনে দেখেন কথাটা ঠিকই। কতজন মিলে গানটি তৈরি করেছেন; কেউ ধরতে পারেননি। গানের কোনো ব্যাকরণ জানা নেই। অথচ এত্তটুকুন ছেলেই কিনা ভুলটা ধরিয়ে দিল। ছেলের প্রতিভায় সেদিন মুগ্ধই হয়েছিলেন বাবা। হাবিব বলেন, ‘সেদিন আমি ন্যাচারালিই বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলাম। আমার গান শেখাটাও এমন ন্যাচারাল।’ ছেলের সঙ্গে ‘অবশেষে’ শিরোনামে একটি অ্যালবাম বের করেছেন বাবা। সম্প্রতি গেয়েছেন ‘প্রজাপতি’ চলচ্চিত্রের ‘টাকা’ গানটির একটি অংশ। গানটি গাইতে বেশ পরিশ্রমই করতে হয়েছে। হাবিবের পছন্দমতো গাইতে না পারলে যে রেহাই নেই।

এত দিন বাবার জন্য চলচ্চিত্রের গান করেননি কেন? ‘এখানে কোনো খাতির নেই।’ বাবা হিসেবে একটু খাতির করা যায় না? কথা শুনে হাবিব হাসেন_’যে গান যাঁর কণ্ঠে মানায় তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে দিই না।’ চশমার ফ্রেম ঠিক করতে করতে ফেরদৌস ওয়াহিদ_’আমি তাকে ভালো করেই চিনি। বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা এসেও যদি তার কাছে গান চায়, কণ্ঠ পছন্দ না হলে দেবে না_এমন গ্যারান্টি দিতে পারি।’ বাবার কথা শুনে হাসেন ছেলে। বাবাও যোগ দেন সেই হাসিতে। দুজন এক হলেই আজব সব আলোচনা। বাসায় থাকলে সঙ্গী হন হাবিবের মাও। ‘এক সন্তানের চান্সটা ভালোভাবেই কাজে লাগাই’_জানালেন হাবিব।

বাপ-বেটা একসঙ্গে রাস্তায় বেরোলেও মজার সব কাণ্ড ঘটান। বিষয়গুলো তাঁদের জন্য বেশ আনন্দেরই বটে। কিছুদিন আগে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিকলেনে গান করতে যান দুজন। এক বিকেলে বের হন ঘুরতে। ৯০ ডিগ্রি একটি রাইডে চড়ে বসেন হাবিব। সে দৃশ্য মুঠোফোনে রেকর্ড করে রাখছিলেন বাবা। খানিক বাদে নিজেও যোগ দিলেন। দুই গায়কের সম্পর্কটা এমনই অন্তরঙ্গ!

মাঝে কিছু রাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি হাবিব। ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমের জন্য বিশেষ মোনাজাতও করতে হয়েছে। শেষতক ঘুমের রাজ্যের ঠিকানা খুঁজে পেয়েছেন। কেন এমন হতো? ‘কিছু অদ্ভূত চিন্তা ঘোরে আমার মাথায়। হঠাৎ যদি আমরা মরে যাই তাহলে কী হবে? কোথায় যাব? আল্লাহ আমাদের কেনই বা সৃষ্টি করেছেন? এর পেছনে নিশ্চই কোনো কারণ আছে! এভাবে নিজের কাছে নিজে হাজার প্রশ্ন রাখি। উত্তর মেলে না সব সময়। এসব ভেবেই রাতে ঘুম হতো না।’ ছেলের কথার ইতি টানলেন বাবা। ‘ও যে এত ভাবে, দেখে কিন্তু বোঝার উপায় নেই। সব সময় চুপচাপ থাকে।’ মাথাটাকে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে হাবিব বলে উঠলেন, ‘এবার খারাপটা জিজ্ঞেস করুন।’ সেটা কী? ‘এই যে হুট করে মাথা গরম হয়ে যায়।’ বাবা যেন ছেলের পক্ষই নিলেন_’এটা তো সবারই হয়। ও অনেক সময় অল্পে রাগ করে। আবার পরক্ষণেই বুঝতে পারে।’ কথার গাড়ি চলতে চলতেই ফেরদৌস ওয়াহিদের মুঠোফোন বেজে ওঠে। এক ভক্তের কল। বাবা নয়, ছেলের সঙ্গেই কথা বলতে চায় সে। ‘আমার ফোনে প্রতিদিন অন্তত ২০০ কল আসে হাবিবের।’ ‘মনে হয় আমার তুলনায় বাবার ফোনেই আমার ভক্তদের কল বেশি আসে। মাঝেমধ্যে ভাবি, ভাগ্যিস বাবার সময়ে মোবাইল ফোন ছিল না। থাকলে যে কী হতো!’ ‘কী আর হতো, আমার বাবার ব্যবসা লাটে উঠত।’ বাবার কথা শেষ না হতেই উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলেন। সুরে সুরে বেজে উঠল হাততালিও। তাঁর অভিমত_ইচ্ছে করেই এসব থেকে দূরে থাকেন। শুধু শুধু বিব্রতকর অবস্থায় পড়ার দরকার কী?

ভক্তদের সঙ্গে কথা বলার সময় কি আর আছে! কথা তো একজনের সঙ্গেই বলেন। এমন প্রশ্নে হাবিব যেন একটু লজ্জাই পেলেন। তাঁর অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছিল, মোনালিসার সঙ্গে প্রেমের কথা। ‘সম্পর্ক আছে। এখন পর্যন্ত ভালোভাবেই এগোচ্ছে।’ তো বিয়ে করছেন কবে? বাবার দিকে তাকিয়ে_’কার বিয়ে? আমার, না বাবার!

এ কথা নিয়ে অনেকক্ষণ ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো হাসলেন দুজন। ‘বিয়ে তো ভাই আল্লাহর হাতে। আল্লাহ যদি সব কিছু ঠিক রাখেন তবে অবশ্যই হবে। এসব আসলে কপালের ব্যাপার।’ বাবার কূটনৈতিক জবাব, ‘ভাগ্যে থাকলে হোক। আমার আপত্তি নেই।’ ‘বাবা, আমার হয়ে তুমিই বরং একটা বিয়ে করে ফেলো। পুরো ফোকাসটা তখন তোমার দিকে থাকবে।’ ‘আরে বাপ! আমাকে নিয়ে কেউ লিখবে না। দশটা করলেও লিখবে না। তুই একটা বিয়ে করলে যে আলোচনা হবে, আমি দশটা বিয়ে করলেও তা হবে না।’ ‘আরে আমি তখন বলব, আমার বাবা তো বিয়ে করেছেন। একই তো কথা। লেখার হেডিং দিয়ে দেন_আমি চাই আমার হয়ে বাবা আবার একটা বিয়ে করুন!’

এবার ফিরে গেলেন কাজের কথায়। হাবিব জানালেন, আসছে ঈদে তাঁর সুর ও সংগীতায়োজনে মুহম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ পরিচালিত ‘প্রজাপতি’ চলচ্চিত্রের অ্যালবাম আসবে বাজারে। আপাতত তিনি ‘মার্কস অলরাউন্ডার প্রতিযোগিতা’র বিচারকাজ এবং বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল তৈরি নিয়ে আছেন। ফেরদৌস ওয়াহিদ ব্যস্ত ‘পায়েল’ চলচ্চিত্রের পরিচালনা নিয়ে। জানালেন, সামনে আরেকটি চলচ্চিত্র বানাবেন। সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব দেবেন ছেলেকে। ‘গান যদি ফ্লপ হয় আমি কিন্তু কিছু জানি না।’ ছেলেকে অভয় দিলেন বাবা_’সে চলচ্চিত্রে থাকবে সব লোকগীতি। লোকসংগীত কখনো এ দেশে ফ্লপ হবে না।’ আবার মুঠোফোন বেজে উঠল ফেরদৌস ওয়াহিদের। হাবিবের মায়ের ফোন। তাঁর শরীররটা আজ ভালো না। একটু পরেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে তাঁকে। কথা আর না বাড়িয়ে বেরিয়ে পড়লেন বাপ-বেটা।

[ad#co-1]