জরাজীর্ণ ভবনে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ওষুধ

সিরাজদিখান স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
ওমর ফারুক
মুন্সীগঞ্জের ইছাপুরায় সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক ডাক্তার উধাও হয়ে গেছেন। গত বছর কর্মস্থলে যোগদানের পর দু’দিন মাত্র দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর থেকে তিনি আর নেই। কোথায় গেছেন কেউ জানে না। নিখোঁজ হওয়া ওই ডাক্তারের নাম মাহফুজা খন্দকার। পদবিতে মেডিকেল অফিসার। মাহফুজা খন্দকারকে নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার আছে ১৬ জন। এদের মধ্যে চারজন হাসপাতাল এলাকায় এবং বাকিরা ঢাকায় বসবাস করেন। ১৬ জনের মধ্যে সহকারী সার্জন মোঃ সাখাওয়াত হোসেন ২৪ জুলাই থেকে দু’মাসের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে গেছেন। মেডিকেল অফিসার আবুল কালাম আজাদ ও জুনিয়র কনসালটেন্ট মোঃ ফজলুর রহমান মুন্সীগঞ্জ সদর হাসপাতালে ডেপুটেশনে কাজ করছেন। জুনিয়র কনসালটেন্ট মোঃ আবদুল মোকাদ্দেস সোমবার থেকে চার দিনের ছুটিতে গেছেন।

ইএমও ডা. মহিবুর রহমান সম্প্রতি অন্যত্র বদলি হয়ে চলে গেছেন। তার স্থলে নতুন কেউ আসেননি। যে কোন হাসপাতালের জন্য অত্যন্ত জরুরি আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) পদে কেউ নেই। শিশু ও মেডিসিন বিভাগের দুটি জুনিয়র কনসালটেন্ট পদ এখনও শূন্য আছে। রাতে কোন ডাক্তার পাওয়া যায় না। নার্সদেরও ডাকলে আসে না। রোববার রাতে এক শিশু রোগীকে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসায় সন্তুষ্ট না হওয়ায় অভিভাবকরা শিশুটিকে নিয়ে ঢাকা চলে গেছে এ অভিযোগ হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডের রোগী ময়নার (২৫)। মঙ্গলবার সকালে হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলাপকালে তিনি জানান, ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে পেটে অপারেশন (সিজার) হয়।

এরপর অপারেশন স্থানে ইনফেকশন হলে ৩১ জুলাই তিনি এ হাসপাতালে ভর্তি হন। গাইনি বিভাগের ডাক্তার ফৌজিয়া ইয়াসমিন নিজে তার শরীর ড্রেসিং করেন। নার্সদের তখন পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, প্রায় সময়ই বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন হাসপাতালকে মনে হয় দোজখ। বহির্বিভাগের সামনে একটি বেঞ্চে বসে থাকা রোগী ইয়াসমিন বললেন, সকাল ১০টায় তিনি হাসপাতালে এসে ডাক্তারের অপেক্ষায় আছেন। ১০টার কিছু আগে ডাক্তার আসেন। এসেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন অপারেশন নিয়ে। তাই তিনি ডাক্তারের অপেক্ষায় আছেন। হাসপাতালের দোতলায় পুরুষ ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, রোগীদের বেডের নিচে ময়লা জমে আছে। সুইপার সামান্য কিছু অংশ ঝাড়- দিয়ে ঝাড়-টি সেখানে ফেলেই কোথায় যেন গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় আÍীয়রা হাতপাখা দিয়ে রোগীদের বাতাস দিচ্ছে। সেবা কেমন পাওয়া যায় জানতে চাইলে এক রোগীর আÍীয় ইমাম উদ্দিন বলেন, ডাকলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার বা নার্স আসে না।

বিদ্যুৎ চলে গেলে নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। রাজধানী ঢাকার জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে ও সিরাজদিখান শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ইছাপুরা গ্রামে অবস্থিত ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে এমন হাল দীর্ঘদিন ধরে চলছে। ডাক্তারদের সময়মতো হাসপাতালে না আসা ও হাসপাতাল এলাকায় বসবাস না করা এবং বিদ্যুৎ সমস্যা যেন কিছুতেই ছাড়ছে না। ঢাকা থেকে যারা আসেন তাদের কেউই সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছতে পারেন না। সকালে বহির্বিভাগে রোগীর জটলা লেগে যায়। জানা গেছে, হাসপাতালে ওষুধের সরবরাহ কম। পর্যাপ্ত এন্টিবায়োটিক থাকে না।

মেট্রোনিডাজল, প্যারাসিটামল, কট্রিম, হিস্টাসিন নামের যেসব ওষুধ সরবরাহ করা হয় সেগুলোর মান খুব একটা ভালো নয়। মঙ্গলবার দুপুরের পর হাসপাতালের সেবা নিয়ে কথা হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. স্বপন কুমার তপাদারের সঙ্গে। সীমিত ব্যবস্থাপনায় তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। এরপরও কিছু রোগীর অভিযোগ তো থাকবেই। তিনি বলেন, কোন ডাক্তার হয়তো সিরিয়াস রোগী দেখছেন, তখন অপর এক রোগীর আÍীয় গিয়ে ওই ডাক্তারকে ডাকাডাকি করছেন। একজন ডাক্তার বোঝেন কোন রোগী কতটা সিরিয়াস। সে অনুযায়ী তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কিন্তু রোগীর আÍীয়রা এটা বুঝতে চান না। তারা তাদের রোগীকেই সবচেয়ে বেশি সিরিয়াস মনে করে তখন নানা অভিযোগ আনেন।

হাসপাতাল এলাকায় ডাক্তারদের বসবাস না করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেউ যদি সকাল সাড়ে ৮টায় এসে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন, তাহলে তাকে তো কিছু বলা যায় না। এছাড়া হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ডাক্তারদের জন্য যে কোয়ার্টার রয়েছে সেগুলোর অবস্থা ভালো নয়। নিখোঁজ ডাক্তার মাহফুজা খন্দকার সম্পর্কে তিনি বলেন, তার ব্যাপারে তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরে নোট পাঠিয়েছেন। তিনি জানান, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রতিদিন রোগী আসে গড়ে ৪০-৫০ জন এবং বহির্বিভাগে ২৫০-৩০০ জন। মঙ্গলবার সব বেডে রোগী ভর্তি ছিল। হাসপাতালের জন্য নার্স আছেন ৭ জন। এদের মধ্যে মঙ্গলবার একজন ছুটিতে ছিলেন। সিরাজদিখান স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধীনে উপজেলার সিরাজদিখান বাজার, ইমামগঞ্জ, শেখেরনগর, কোলা, পাউলদিয়া ও মধ্যপাড়ায় উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ রয়েছে ছয়টি। প্রতিটিতে একজন করে এমবিবিএস ডাক্তার দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে ২৮টি।

এগুলো স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার পরিকল্পনা সহকারীরা পর্যায়ক্রমে পরিচালনা করে থাকেন।< নৎ>সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সিরাজদিখান উপজেলা শহরে অবস্থিত উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ টির করুণ দশা। নদীর তীরে বটতলা এলাকায় সীমানা প্রাচীরবিহীন এ কেন্দে র পাকা ভবনটি শত বছরের পুরনো। সকাল ১০টায় ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, বেশ ক’জন মহিলা রোগী ডাক্তারের রুমের সামনে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের বসার জন্য চেয়ার বা বেঞ্চ নেই। রুমের ভেতরে একটা কাঠের চেয়ারে বসে রোগী দেখছেন মেডিকেল অফিসার ডাক্তার আমিনুল আলম সিজার। একজন বয়োবৃদ্ধ মহিলা রোগীকে বসানো হয়েছে ভাঙা টুলে। রোগী দেখা শেষে তিনি জানান, নতুন চাকরি। এটাই তার প্রথম পোস্টিং। এক মাস হল এসেছেন। কেন্দে র অবস্থা খারাপ হলেও ভালোই লাগছে। তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ে চিকিৎসার প্রথম ধাপ হল এ উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ । এখানে আসা রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয়। রোগীদের থেকে কোন ভিজিট নেয়া হয় না। জ্বর, আমাশয়, ঠাণ্ডা, কাশি, অ্যাজমা ও ডায়রিয়াসহ কয়েকটি রোগের ওষুধ দেয়া হয় বিনা পয়সায়।

রোগ জটিল হলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠিয়ে দেয়া হয়। উপ-কেন্দে র সমস্যা সম্পর্কে ডা. আমিনুল আলম সিজার বলেন, এখানে চারটি রুম রয়েছে। দুই রুমে তিনি এবং ডা. এমএ মতিন বসেন। একটা স্টোর রুম ও বাকিটা ফার্মাসিস্টের জন্য বরাদ্দ। কিন্তু বৃষ্টি হলে কোন রুমেই বসা যায় না। ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। ফার্মাসিস্ট ইউসুফ মিয়া চেয়ার-টেবিল পেতে বসেন রোগীদের ওয়েটিং রুমে। ডা. এমএ মতিন স্বপন বলেন, বেশি বৃষ্টি হলে রুমের ভেতর ছাতা খুলে বসতে হয়। কবে যে ছাদ ধসে পড়ে সে আশংকায় থাকেন তারা। তিনি বলেন, উপ-কেন্দে ডাক্তারদের রুমে রোগীদের পরীক্ষা করার জন্য ভালো বিছানা (পেশেন্ট কট) নেই। তার রুমে পেশেন্ট কটে ওয়াল ক্লথ বিছিয়ে রোগী দেখা হয়। ডা. আমিনুল আলম সিজারের রুমে স্কুলের হাই বেঞ্চ পেতে পেশেন্ট কটের কাজ চালানো হয়।

উপ-কেন্দে কোন বাথরুম কিংবা পানির টিউবওয়েল নেই। বাথরুমের প্রয়োজন পড়লে আশপাশের বাড়ি কিংবা প্রাইভেট হাসপাতালে দৌড়াতে হয়। তিনি জানান, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দে প্রতিদিন গড়ে ৭০ জন রোগী আসে। রোগীদের বেশিরভাগই চরের বাসিন্দা। সিরাজদিখান উপ-স্বাস্থ্য কেন্দে র ভবনটি ১৯১৭ সালে নির্মিত। হিন্দু জমিদাররা নির্মাণ করেছিল এটি। এ ভবনের পাশে আরও একটি ভবন নির্মাণ করা হয় ১৯২৬ সালে। এটা মেডিকেল অফিসারের সরকারি বাসা। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে এখানে তিনি থাকেন না। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, মেডিকেল অফিসারের রুমে সাপ বসবাস করে। কিছুদিন আগে সেখানে সাপের খোলস পাওয়া গেছে। এছাড়া কর্তৃপক্ষের সুনজর না থাকায় উপ-কেন্দে র নিজস্ব জমি ও পুকুরে অবৈধ দখলদারদের উৎপাত চলছে। সিরাজদিখান থানা থেকে মাত্র ২শ’ গজ দূরে হলেও সন্ধ্যার পর সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, শহরের কেন্দ্রস্থলে হওয়ায় উপ-কেন্দ টির গুরুত্ব অনেক বেশি। এর আধুনিকায়ন করা হলে সাধারণ মানুষ আরও বেশি করে উপকৃত হতে পারে। জানা গেছে, ইমামগঞ্জ স্বাস্থ্য উপ-কেন্দে র নিজস্ব জমি থাকলেও সেখানে কোন ভবন নেই। এ কারণে বাসাইল ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের একটি রুমে উপ-কেন্দে র কাজ চালানো হচ্ছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের একটিতেও বিদ্যুৎ নেই।

[ad#co-1]