একজন তরুণের গল্প বলি।

ইমদাদুল হক মিলন
ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় তখনকার পাকিস্তানে তার বাবা তৈরি করলেন প্রথম ছোটদের চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের নাম ‘প্রেসিডেন্ট’। সেভেনে পড়া ফুটফুটে বালক হলো সেই চলচ্চিত্রের প্রধান অভিনেতা। নায়ক। তার বাবা তখনকার দিনের সাংস্কৃতিক জগতের বিখ্যাত মানুষ। মা নামকরা লেখক। স্বাধীনতাযুদ্ধ তাদের জীবন ওলট-পালট করে দিল। স্বাধীনতার পর পর বাবা সাংস্কৃতিক জগতে নতুন করে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলেন, নতুন উদ্যমে নানা রকম ব্যবসা করার চেষ্টা করলেন। কী যেন কী কারণে ব্যর্থ হয়ে সংসারবিবাগী হলেন। সংসারে স্ত্রী, দুই ছেলে আর দুই মেয়ে। আমি যে তরুণের কথা বলছি সে চার ভাইবোনের মধ্যে বড়। তখন নটর ডেম কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। মা লেখালেখি করে সংসারের হাল ধরার চেষ্টা করছেন। মাকে সাহায্য করছে তরুণ। মা-বাবার কাছ থেকে সে পেয়েছে সাংস্কৃতিক প্রতিভা। বালক বয়স থেকেই টুকটাক লেখালেখি, রেডিও-টিভির ছোটদের অনুষ্ঠান উপস্থাপন করা। মঞ্চে ছোটদের নানা রকম অনুষ্ঠান পরিচালনা। তখন বিটিভি খুবই জমজমাট। সে কলেজ করার ফাঁকে ফাঁকে টিভিতে গিয়ে অনুষ্ঠান উপস্থাপন করে, প্রতিদিনই দুই-চারটা অনুষ্ঠানের গ্রন্থনা করে। এতে পয়সা যা আসে মায়ের হাতে তুলে দেয়। ঢাকার বিখ্যাত একটা বাণিজ্যিক এলাকায় বাবা একটা বড়সড় স্পেস নিয়েছিলেন। সেখানে নতুন আঙ্গিকে শুরু করেছিলেন ঘড়ির দোকান। তারপর করলেন পিঠার দোকান। তখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কেউ কল্পনা করেনি পিঠার দোকান হতে পারে। কিন্তু তিনি কোনোটাই চালাতে পারেননি।

সেই তরুণ একদিন চিন্তা করল, ওই দোকানটাকে কিভাবে কাজে লাগানো যায়। এক বন্ধুকে নিয়ে দোকানটা খুলে বসল সে। মূলধন বলতে কিচ্ছু নেই। শুধুই আইডিয়া। বাবার পিঠার দোকান করার কনসেপশনটা তার মাথায় আছে। সঙ্গে সে বাঙালির অতিপ্রিয় খিচুড়ি যোগ করল। বিকেলবেলা জিলিপি আর মুখরোচক তেলেভাজা। আগেই বলেছি মূলধন বলতে ১০টা নগদ টাকাও নেই। তবু সে শুরু করল। নটর ডেম কলেজে পড়ছে। যে বন্ধু তার সঙ্গে আছে সেও নটর ডেমের ছাত্র। কলেজের ফাঁকে ফাঁকে সে চলে যাচ্ছে টেলিভিশন ভবনে, বন্ধু চালাচ্ছে রেস্টুরেন্ট। টিভির কাজ শেষ করে সে এসে বন্ধুর সঙ্গে যোগ দিল, বন্ধু চলে গেল তার কাজে। অর্থাৎ সময় এবং কাজ ভাগ করে তারা চালাতে লাগল রেস্টুরেন্ট। দিন দিন তমুল জমে গেল রেস্টুরেন্ট। কয়েকজন সমমনা এবং অতিপ্রিয় বন্ধুকে নিয়ে তারপর সে শুরু করল অন্যান্য ব্যবসা। এসবের ফাঁকে বোন দুটোকে পড়াশোনায় যথাযোগ্য করে খুবই বড় ঘরে, বড় এবং সৎপাত্রে বিয়ে দিল। ছোট ভাইটিকে বুয়েট থেকে আর্কিটেক্ট করাল। ২৪ ঘণ্টায় তখন ১৮ ঘণ্টাই পরিশ্রম করছে সে। এত কিছুর ফাঁকে লেখালেখিটাও চালিয়ে যাচ্ছে, টিভির ছোটদের অনুষ্ঠানগুলো দাপটের সঙ্গে করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে তারপর প্যাকেজ অনুষ্ঠান নির্মাণের কাল শুরু হলো। তরুণ তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে এসব অনুষ্ঠান নির্মাণ এবং বাজারজাত করতে লাগল। একসময় এই বন্ধুদের নিয়েই বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি টিভি চ্যানেল খুলে ফেলল। ১০ বছরে সেই টিভি চ্যানেল হয়ে উঠল বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম টিভি চ্যানেল। এসবের মাঝখানে প্রতিষ্ঠা করল একটি ফার্মাসিউটিক্যালস কম্পানি। প্রায় রাতারাতি সেই কম্পানি হয়ে উঠল বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। তরুণ তত দিনে পঞ্চাশ অতিক্রান্ত। কিন্তু বয়স তাকে বিন্দুমাত্র কাবু করতে পারেনি। তার শরীর-চেহারায় কোথাও বয়সের ছাপ নেই। এখনো সেই নটর ডেমে পড়ার সময়কার মতো ১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম করছে। সারাক্ষণ মুখে লেগে আছে বিনয়ী হাসি। কাজকর্মে উপচে পড়ছে তারুণ্য। শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য কয়েক বছর আগে পেলেন বাংলা একাডেমী পুরস্কার। এত ব্যস্ততার মধ্যেও প্রতিবছরই ৮-১০টা বই লিখছেন ছোটদের জন্য।

এ বিস্ময়কর তরুণের নাম ফরিদুর রেজা সাগর। আর ওই যে বন্ধুটিকে নিয়ে তিনি রেস্টুরেন্ট শুরু করেছিলেন সেই বন্ধুর নাম শাইখ সিরাজ, কৃষির ক্ষেত্রে যিনি বিস্ময়কর অবদান রেখেছেন। নিজে পরিণত হয়েছেন প্রতিষ্ঠানে, জীবিত কিংবদন্তিতে।

এই দুই তরুণের দিকে তাকালে আমি টের পাই তারুণ্যের শক্তিটা কী বিপুল! এই শক্তিটা ধরে রাখতে পারলেই একটা দেশ দাঁড়িয়ে যায়। তারুণ্যের সঙ্গে বয়সের সম্পর্ক থাকে, শরীরের সম্পর্ক থাকে। তারুণ্য কোনো কিছু মানতে চায় না, তারুণ্যই পুরনো প্রথা ভেঙে নতুন পথ তৈরি করে। তবে কোনো কোনো মানুষ তারুণ্যের শক্তিটা ধরে রাখেন তাঁদের কর্মে আর মনের ভেতরে। বয়স তাঁদের কাবু করতে পারে না। যেমন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, যেমন মতিউর রহমান। যেমন ফরিদুর রেজা সাগর, যেমন শাইখ সিরাজ। তাঁরা এখনো প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে তরুণ।

কিছু সম্ভাবনাময় তরুণ আমি এখন আমার চারপাশে দেখতে পাই। তাঁরা এগোচ্ছেন, তাঁরা পথ তৈরি করছেন। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে নাফিসের কথা। তাঁর পুরো নাম নাফিস বিন জাফর। এ বিস্ময়কর তরুণ থাকেন হলিউডে। জেমস ক্যামেরনের প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ক্যামেরন হচ্ছেন ‘টাইটানিক’ ছবিটির পরিচালক। নাফিস গত বছর সায়েন্টিফিক অস্কার জয় করেছেন। বাংলাদেশি এ তরুণের তৈরি সফটওয়্যার ব্যবহৃত হচ্ছে হলিউডের সাড়া জাগানো ছবি ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’-এ। নাফিস আমাদের গৌরব, বাংলাদেশের গর্ব। আমরা চাই আমাদের চারপাশে এমন আরো অনেক নাফিস তৈরি হোক। হৃদয়ে বাংলাদেশ ধারণ করে তাঁরা আমাদের প্রিয় দেশটিকে আলোকিত করুক।

ih-milan@hotmail.com

[ad#co-1]