দুঃখের তিমিরে জেগে থাকা হৃষ্ট শব্দাবলি

নূহ-উল-আলম লেনিনের কবিতা
আ ব্দু ল আ লী ম
বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতি, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নূহ-উল-আলম লেনিন (জ. ১৯৪৭) একটি উজ্জ্বল ও পরিচিত নাম। অর্থশতাব্দীর অধিক সময় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন রাষ্ট্র ও সমাজহিতৈষণামূলক কর্মকা-ে। ষাটের দশক এবং স্বাধীনতা-উত্তর ছাত্ররাজনীতিতে তিনি ছিলেন সামনের সারির নেতা। মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক তিনি। মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য ছুটে বেড়িয়েছেন দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। খুব কাছে থেকে দেখেছেন মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, সমস্যা এবং সংকটকে। এসব বিষয় তাঁর সংবেদনশীল মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। শব্দের কারুকার্যে এবং ভাষায় সাবলীলতায় এগুলোর প্রকাশ ঘটিয়েছেন গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ এবং কলামে। সমাজ-রাজনীতির সক্রিয় কর্মী হলেও তিনি শিল্পকে উপেক্ষা করেননি। এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন : ‘আমি মূলত রাজনৈতিক ও সমাজকর্মী। সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা ঘটনা, বৈপরীত্য এবং অসঙ্গতি আমাকে বেশি আলোড়িত করে। তবে আমি শিল্পকে উপেক্ষা করি নি।’

‘কবির পক্ষে সমাজকে বোঝা দরকার, কবিতার অস্থি-র ভিতরে থাকবে ইতিহাসচেতনা ও মর্মে থাকবে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান।’_ জীবনানন্দ দাশের এ উক্তি যথার্থ। কারণ কোনো প্রতিভাই স্বয়ংম্ভু নয়, দেশ-কাল-সমাজ-ইতিহাস ও সভ্যতার সত্যকে শিরোধার্য করেই তার সৃষ্টিকর্ম বাস্তবরূপ লাভ করে। শিল্পীর শিল্পবোধ অনিবার্যভাবেই তার কালের ঘটনাপ্রবাহে লালিত ও বর্ধিত। তবে দেশ-কাল ও পারিপাশ্বর্িক ভিন্ন পরিবেশের কারণে শিল্পীর স্বকীয়তা স্বমূর্তিতে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির বিশিষ্ট কর্মী নূহ-উল-আলম লেনিন দেশ-কাল-সমাজ ও পারিপাশ্বর্িকতাকে আত্মস্থ করেই শিল্প-অন্বেষণে অবতীর্ণ হয়েছেন। স্বপ্ন করপুটে (১৯৯২), অনেকদূর যেতে হবে (২০০৯), ভালোবাসা হিসেব জানে না (২০১০)_ এসব কবিতাগ্রন্থে গত চার দশকের দৈশিক ও বৈশ্বিক জীবনের নানা চিত্র শিল্পরূপ লাভ করেছে।

নূহ-উল-আলম লেনিন শৈশব-কৈশোরে পারিবারিক পরিম-লে পেয়েছেন বাম রাজনীতির দীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর পরিসর থেকে লাভ করেছেন শোষিত মানুষের মুক্তির মন্ত্র। ফলে কবিতা রচনার সময় ‘সামাজিক-রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে শিল্পের সাযুজ্য’ স্থাপন করতে চেয়েছেন। রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে শিল্পের সাযুজ্য স্থাপনের দৃষ্টান্ত বাংলা সাহিত্য এমনকি বিশ্বসাহিত্যেও প্রচুর। ফ্যাসিবাদের হিংস্র থাবা থেকে মানবজাতিকে বাঁচানোর জন্য অনেক লেখক এগিয়ে এসেছিলেন। সাংগঠনিকভাবে এবং শিল্পের মাধ্যমে তাঁরা ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে, সুভাষ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুকান্ত ভট্টাচার্য ছাড়াও বিজয়লাল চট্রোপাধ্যায়, অরুণ মিত্র, সমর সেন, মণীন্দ্র রায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিমলচন্দ্র ঘোষ, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, দিনেশ দাস, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ কবি রাজনীতির সঙ্গে শিল্পের মেলবন্ধন স্থাপন করেছিলেন। নূহ-উল-আলম লেনিনের কবিতায় রাজনীতি-মনস্কতা তাঁকে এসব কবি-সাহিত্যিকের উত্তরসূরির মর্যাদা দান করেছে। বিষ্ণু দে শ্রমজীবী মানুষের জয়গান করে লিখেছিলেন :

কতবার এল কত না দস্যু। কত না বার
ঠগে ঠগে হল আমাদের কত গ্রাম উজাড়
কত বুলবুলি খেল কত ধান,
কত মা গাইল বর্গির গান,
তবু বেঁচে থাকে অমর প্রাণ
এ জনতার_
কৃষাণ, কুমোর, জেলে, মাঝি, তাঁতি আর কামার।
(“এ জনতার”, ‘সাত ভাই চম্পা’)

শোষিত মানুষের দুর্বিষহ জীবনের কথা বলতে গিয়ে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র লিখেছিলেন : ‘পারিশ্রমিক হীন শ্রমে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া আয়ু/নিয়ে রুগ্ণস্বপ্ন দেখি, দীর্ঘশ্বাসে ভরে যায় বায়ু।’ (“মধুবংশীর গলি”, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’) দিনেশ দাস পুঁজিবাদী সভ্যতার নির্মমরূপ অবলোকন করে উচ্চারণ করেছিলেন : ‘এই যে খুনে সভ্যতা/অনেকজনের অন্ন মেরে কয়েকজনের ভব্যতা’, (“ডাস্টবিন”, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’) সুভাষ মুখোপাধ্যায় লক্ষ করেছেন : ‘বণিত প্রভু চোখ রাঙায়,/কারখানায় বন্ধ কাজ।’ (“পদাতিক”, ‘পতাতিক’) আর শোষক-বণিকদের উদ্দেশে সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছেন : ‘শোন্রে মালিক শোন্রে মজুতদার/তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড়/হিসাব দিবি কি তার?’ (“বোধন”, ‘ছাড়পত্র’)। নূহ-উল-আলম লেনিনের কবিতায়ও শোষিত মানুষের দুর্ভোগ, আশা-নিরাশার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে :

১. আমি এক ভূমিপুর শ্রমের বৈভবে ঋদ্ধ
… আমি পরমায়ু ক্ষয় করি শ্রমে ও মননে
অবিকল মানুষের মতো
অথচ মানুষ নই।
(“ভূমিপুত্র”, ‘স্বপ্ন করপুটে’)

২. পুঁতিগন্ধ শোষণের কফিন
ত্রস্তে দেবে চাপা মানবিক বিশ্বায়নে।
সাম্রাজ্যবাদের আরজ জন্ম
বন্ধ হবে এ ঋদ্ধ মাটিতে
পবিত্র পৃথিবী ছড়াবে মুক্তির সৌগন্ধ সুষমা।
(“শ্রমিকের গান”, ‘অনেক দূর যেতে হবে’)

নূহ-উল-আলম লেনিন বাম রাজনীতির সক্রীয় কর্মী ছিলেন। তিনি ‘পথে পথে ফেরি’ করেছেন ‘লাল ইস্তেহার’। মে দিবসের চেতনা তাঁকে শুনিয়েছে মুক্তির গান। তিনি লক্ষ করেছেন, প্রতিবছর মে দিবস আসে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বার্তা নিয়ে_ এছাড়া অক্টোবর বিপ্লবের চেতনাপ্রবাহ বিশ্বজুড়ে ছড়ায় সাম্যের মন্ত্র। তিনি লিখেছেন:

১. … মে-দিনে সসাগরা পৃথিবীর সব চরাচরে
মানুষের জয়োদ্ধত মৈত্রীর মশাল।
(“এই বৈশাখে”, ‘স্বপ্ন করপুটে’)

২. অক্টোবর সংক্রামক পৃথিবীর বিভিন্ন প্রদেশে
দেশে দেশে কালান্তর জলস্রোত যেন
বয়ে চলে নিরবধি মৈত্রীর মহান সঙ্গমে।
(“শাশ্বত”, ‘স্বপ্ন করপুটে’)

যুগে যুগে শোষণের শৃঙ্খল ভাঙতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আগমন ঘটেছে বিপ্লবী মুক্তিযোদ্ধাদের। অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং শোষণের হাত থেকে মুক্তি পেতে তাঁরা রুখে দাঁড়িয়েছেন। ইতিহাসের সেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রসঙ্গে তাঁর উচ্চারণ :

আমরা মুক্তিযোদ্ধা বংশপরম্পর
যেখানেই মুক্তিযুদ্ধ সেখানেই আমরা স্পার্টাকাস
আমরা বরেন্দ্র ছিলাম কৈতর্ব দিব্যক
প্রুশিয়ার শস্যক্ষেত্রে আমরা নুরুলদিন
ঢাকার মসলিন হাতে বিদ্রোহী ফকির
সাইলেসিয়ার তাঁতি প্যারির জ্যাকোবিন
আমরা কমিউনার্ড
পৃথিবীতে শ্রমিকের প্রথম স্বরাজ।
(“আমরাও ছিলাম অনেকে”, ‘স্বপ্ন করপুটে’)

দুই.
সমকালীন যুগের জটিলতা, সভ্যতার সমস্যা-সংকট এবং অন্তঃসারশূন্যতা তাঁর কবি ভাবনায় স্থান পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম, ‘৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক সংকট, আশির দশকের স্বৈরশাসন, নব্বই দশকের জীবন প্রতিবেশ, এমনকি এক-এগারোর ঘটনাপ্রবাহ তাঁর কবিতায় শিল্পমূর্তি লাভ করেছে। আন্তর্জাতিক পরিসরের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি, স্নায়ুযুদ্ধ, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, আমেরিকার একাধিপত্য, গুজরাটের দাঙ্গা, উপসাগরীয় যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দাকে তিনি কবিতায় তুলে এনেছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর গৌরবদীপ্ত উচ্চারণ :

জন্মযুদ্ধে ছিলাম সৈনিক
হাজার বছরেও যার সুযোগ মেলে না
সে আমি সৌভাগ্যবান, পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী
সবচেয়ে মহত্তম গৌরবের আমি অংশীদার
একজীবনে এর চেয়ে বেশি, আর কী আছে পাওয়ার?
(“সার্থক জনম আমার”, ‘ভালোবাসার হিসেব জানে না’)

মুক্তিযুদ্ধের অগি্নঝরা দিনগুলোতে বাঙালির প্রতিরোধ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, পাকসেনাদের নিষ্ঠুরতা, মুক্তিযোদ্ধাদের দৃপ্ত শপথ, আশা-নিরাশা এবং ভয়াবহ সেই দিনগুলোর বাস্তব দলিল লেনিনের কবিতা। পাকবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের ভয়ে অনেকে বাস্তুহারা হয়েছিল, আশ্রয় নিয়েছিল শরণার্থী শিবিরে। এরপর ভিটে-মাটি ছাড়া মানুষগুলো শৈশব-কৌশোরের স্মৃতিবিজড়িত আপন ঠিকানায় ফিরে আসার জন্য ছট-ফট করেছে। লেনিনের কবিতায় শরণার্থীদের গৃহে ফেরার আকুতি প্রকাশিত হয়েছে গভীর মততায় :

আমি ফের ফিরব সেখানে
সেই গ্রামে, যেখানে শৈশবে
সাজাতাম কতদিন খেলার বাসর
মাঝে মাঝে পরস্পর ক্ষুব্ধ অভিমানে
গাইতাম সমবেত কান্নার কোরাস।
(“ইচ্ছে”, ‘স্বপ্ন করপুটে’)

দেশে দেশে নব্য সাম্রাজ্যবাদী শোষণ, একক আধিপত্য বিস্তারকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবসংহারী ক্রিয়াকলাপ লেনিনের সংবেদনশীল কবিমনকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। আমেরিকাকে তিনি ‘হিরক রাজার দেশ’ বলেছেন; বলেছেন আমেরিকা ধ্বংসের, বর্বরতার, লুণ্ঠনের, গণহত্যার, শিশুহত্যার, মৌলবাদের, বর্ণবাদের, হিংসার, ক্রুসেডের, যুদ্ধের এবং বিকৃতির হোতা। তাঁর মনে হয়েছে :

আমেরিকা দেশ নয়, তাই ওরা দেশপ্রেমের মূল্য জানে না,
আমেরিকা জাতি নয়, তাই ওরা অন্য জাতিকে শ্রদ্ধা করে না,
আমেরিকা সভ্যতা নয়, তাই ওরা সভ্যতা ধ্বংসে দ্বিধা করে না
আমেরিকা মানে একমে অদ্বিতীয়ম।
(“আমেরিকার চোখে”, ‘অনেকদূর যেতে হবে’)

তিন.
নূহ-উল-আলম লেনিন আশাবাদী মানুষ। জীবনের নেতিবাচক দিক অপেক্ষা ইতিবাচক দিককেই তিনি অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, স্বাধীনতার স্বপ্ন-সম্ভাবনার মৃত্যু, হত্যা, ক্যু-পাল্টা ক্যু, ষড়যন্ত্র, মূল্যবোধের সামূহিক বিপর্যয়_ এসব ছিল তাঁর সমসাময়িক কালের জীবনচিত্র। বিরূপ বিশ্বের সমাজ-পরিবেশে দাঁড়িয়ে ত্রিশোত্তর কালের অনেক কবির মতো জীবনের গ্লানি আর হতাশায় নিমজ্জিত হননি, বরং প্রতিকূল যুগ-পরিবেশের মধ্যে তিনি জীবনের জয়গান করেছেন, আশা বাণী শুনিয়েছেন। পুঁজিবাদীদের সর্বৈব সংকট যুদ্ধের বিভীষিকা, মানুষের অসহায়ত্ব_এসব কিছুর মধ্যেও তিনি আস্থাশীল মানুষের প্রতি। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন মানুষই মানুষের ঈশ্বর, মানুষই মানুষের শেষ আশ্রয়। রবীন্দ্রনাথ সভ্যতার চরম সংকটের মধ্যেও বলেছিলেন : ‘মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ’। জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন : ‘মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়।’ নূহ-উল-আলম লেলিন উচ্চারণ করেন : ‘মানুষই একমাত্র মানুষের প্রকৃত ঈশ্বর।’ (“মনীষা”, ‘স্বপ্ন করপুটে’) তিনি আরও বলেছেন :

১. তবুও শেষ সত্য জনগণ, ইতিহাস নির্মাতা
আমি তার অংশীদার গর্বিত মানুষ।
আপন ভাগ্য গড়ার নিজেই বিধাতা
(“গর্বিত মানুষ”, ‘স্বপ্ন করপুটে’)

২. মাটিতে প্রোথিত করো বিশ্বাসের বীজ
মুক্তির আশ্বাসে নাচুক প্রসন্ন পৃথিবী।
(“প্রসন্ন পৃথিবী”, ‘ঐ’)

৩. জানি তা সে মিথ্যা নয় মানুষের মুক্তির সাধনা
ক্রমশ মানুষ যখন মানুষের ভাগ্যবিধাতা।
(“অত্যাশ্চর্য শব্দ”, ‘অনেকদূর যেতে হবে’)

মানুষের উপর বিশ্বাস এবং আস্থা স্থাপন করেছেন বলেই তাঁর কবিতায় মানবতার জয় ধ্বনিত হয়েছে। ‘শুনহে মানুষ ভাই/সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’_ এ উক্তির প্রতিধ্বনি শোনা যায় তাঁর কবিতার পরতে পরতে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট, দুর্ভোগ-লাঞ্ছনা তাঁকে মর্মাহত করেছে। সকল প্রকার শোষণের হাত থেকে মানুষের মুক্তিই তাঁর কবিচেনতার মূল উৎস। জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের ভেদাভেদ ও সংঘাতে তিনি বেদনাবোধ করেছেন। গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তাঁর কবিচেতনায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ধর্মের নামে সংঘাতের পরিবর্তে মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর লেখনীতে এসেছে :

মানুষের সত্য পরিচয় মুছে ফেলে ইসলামের নিশানবরদার
রাম রহিমের রক্তে খোঁজে শ্রেষ্ঠত্ব কাহার
এবার ব্যর্থ বটে মানবিক সত্যের উদ্ভাসে
ধর্মের উপরে সত্য মানুষ, অক্লেশে।
‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’
‘মানব ধর্ম’ সত্য, মানুষের ভবিতব্য মানুষের ঠাঁই।
(“গুজরাট পর্ব”, ‘অনেক দূর যেতে হবে’)

নূহ-উল-আলম লেনিনের কবিতার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ প্রেম। জীবনকে ইতিবাচক দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন বলে তাঁর প্রেমের কবিতা নৈরাশ্যে ভারাক্রান্ত করে না_ এমনকি বাঙালির সমাজ, জীবন মূল্যবোধের উপরও হানে না আঘাত। তিনি বিশ্বাস করেন : ‘প্রেম ব্যাপারটা সহৃদয় সংবেদী এবং আবেগ উৎসারিত। তবে আবেগ তীব্র হলেও সামাজিক চৈতন্য রহিত নয়’। তাঁর ‘ভালোবাসা হিসেব জানে না’ কবিতাগ্রন্থেও অধিকাংশ কবিতায় প্রেমের আবেগ উচ্ছ্বাস ও বিচিত্র অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে। প্রেমের তীব্র আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি উচ্চারণ করেছেন :

সুপ্ত আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের মতো আমার ভালোবাসার লাভাস্রোত
পৃথিবীর সকল জনপদ সাগর নদী হিমাদ্রিশিখর ল-ভ- করে
নক্ষত্রপুঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছে : মহাকাশের ওপারে আল্লাহর আরশ আর
ইন্দ্রের সভার সবকিছু ভস্মীভূত হয়ে গেছে।
(“ভালোবাসা হিসেব জানে না”, ‘ভালোবাসা হিসেব জানে না’)

তিনি ভালোবাসার চিরন্তন রূপের পূজারী। তাঁর ধারণা : ‘ভালোবাসা পুরনো হয় না কখনো, যেমন চাঁদ_ /যদিও কলঙ্ক থাকে তাতে।’ জনম জনম ধরে ভালোবেসেও মেটে না সাধ_ এই বৈষ্ণবীয় প্রেমভাবকেই তিনি মূর্ত করে তুলেছেন। যুগ যুগ ধরে হিয়ার উপর হিয়া রেখেও হিয়া জুড়ায় না যেন_ প্রেমের এই শাশ্বত ভাবের প্রকাশে তিনি লিখেছেন :

‘হাজার-শত বছর ধরে চর্যাপদের সুরে/তোমার জন্য আমার অপেক্ষা জন্ম-জন্মান্তরে।’ প্রেয়সীর অাঁচল দিয়ে পাল বানিয়ে তিনি পাড়ি দিতে চান প্রেমের সমুদ্র, ভালোবাসার অথৈ সাগরে ভাসাতে চান জীবনের ভেলা। প্রিয়ার ক্ষণিক বিচ্ছেদ তাঁর কাছে অকল্পনীয়।

এজন্য বলেন :

তুমি আমি যদি কখনো বিচ্ছিন্ন হই, ঠিক তখনি, সেই মুহূর্তে,
লুুপ্ত হয়ে যাবে সভ্যতা, মহাবিশ্ব এবং স্বয়ং ঈষিতা।
(“বিস্ময়ীকে”, ‘ভালোবাসা হিসেব জানে না’)

মনের মানসীকে তিনি নানা নামে, নানারূপে এবং নানা অনুভবে প্রকাশ করেছেন। শ্যামলিমা, স্বপি্নলা, চন্দ্রিলা, জয়িতা, সর্বজয়া, চিন্ময়ী, মনীষা কত নামেই না তিনি নারীকে সম্বোধন করেছেন। তবে বিভিন্ন নামে সম্বোধন করলেও মূলত শাশ্বত মানবীর রূপই এতে উঠে এসেছে। নারীকে তিনি ‘সৃষ্টি স্বরূপিণী’ ও অসুন্দর নাশিনীরূপে কল্পনা করেছেন। তিনি লিখেছেন :

… জয়িতা আমার প্রিয়তমা প্রথম মানবী, আদিমাতা
তারপর কালস্রোতে কন্যা-জায়া-জননী সে বিশ্বরূপেণ সংস্থিতা।
প্রেমিকা সে ভুবনমোহিনী, অকল্যাণ অসুন্দর ও অশুভের কাছে সে
মহিষমর্দিনী। কখনো স্বপ্লিলা সে, কখনো চিন্ময়ী কখনো বা চন্দ্রিলা_
কখনো মনীষা_সৃষ্টি স্বরূপিণী।
(“জয়িতা সে সৃষ্টি স্বরূপিণী”, ‘ভালোবাসা হিসেব জানে না)

চার.
নূহ-উল-আলম লেনিন কবিতার শিল্পকাঠামো সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। বিষয় অনুষঙ্গী ভাষা সৃষ্টি, ছন্দের বিচিত্র ব্যবহার এবং অলঙ্কারের প্রয়োগনৈপুণ্যে তিনি কবিতার শিল্পোৎকর্ষ সাধন করেছেন। সহজ-সরল ভাষারীতি, সংলাপধর্মিতা, দেশি-বিদেশি পুরাণের ব্যবহার এবং কথ্য ও আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগদক্ষতায় তার কবিতা সার্থকতা লাভ করেছে। নীলকণ্ঠ, ঈশ্বর, জতুগৃহ, আল্লাহ, ঈষাণ, মাবুদ, দ্রৌপদী, অপ্সরা, যীশুখ্রিস্ট, শস্ত্রপাণি, হরিবোল, আসমানী কিতাব, হুজুর, হুর, বেহেশত, স্বর্গ_ এ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করে হিন্দু-মুসলিম ঐতিহ্য ও পুরাণকে তিনি কবিতার ভাষামধ্যে বাস্তবসম্মত করে তুলেছেন। আঞ্চলিক ও কথ্য ভাষার বহুমাত্রিক বিন্যাসে তিনি লিখেছেন :

১. এই কেচ্ছা কত কব দুঃখ অফুরান।
লহুর দইরার মাঝে ভাসে সোনাভান
(“জঙ্গনামা”, ‘স্বপ্নকরপুটে’)

২. কোন হুমুন্দি ঠ্যাকায়া রাহে যদি থাহে ন্যায়ের তাগদ
থাহে যদি বিশ্বাসের বল
মানুষ সমান হইবে একদিন গরিবের হইব আছান।
(“সাহসের ঝড়”, ‘ঐ’)

৩. তোমাকে পাব বলেই আমি গন্ধম খেয়ে স্বর্গচ্যুত
হয়ে এই পৃথিবীতে ছুটে এসেছিলাম।
(“পাথরের ফুল”, ‘ভালোবাসা হিসেব জানে না’)

কবিতার ছন্দ সৃষ্টিতেও নূহ-উল-আলম লেনিনের কৃতিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। বিভিন্ন ছন্দের প্রয়োগকুশলতায় তাঁর কবিতা শিল্প সার্থকতা লাভ করেছে। তিনি কবিতার ভাষাকে সাজিয়েছেন নানাবিধ অলঙ্কারে। অনুপ্রাস, উপমা, রূপক, সমাসোক্তি, অতিশয়োক্তি_ এসব অলঙ্কার ব্যবহার করে তিনি কবিতায় ভাষাকে চিত্তাকর্ষক করে তুলেছেন। ‘সুপ্ত আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের মতো আমার ভালোবাসার লাভাস্রোত’, ‘আমি ফুলের রেণু হয়ে তোমার দু’চোখে স্বপ্ন-অঞ্জন এঁকে দিলাম’; ‘ছোট বুকে তার বেদনার সিস্ফনি বেজে ওঠে যেন সমুদ্র, গর্জনে।’ ‘মহাদেবের মতো জটাধারী/অবাধ্য তরুণ’; ‘পেঁয়াজের কোষের মতো আমার দেহ ছিন্ন-ভিন্ন করলে।’ ‘বুকের ভেতরে নায়াগ্রাপ্রপাত অবিরাম/রক্তক্ষরণে হয়েছিল লাল।’ ‘আমার সব অভিমান আর জমাট যন্ত্রণা/কর্পুরের মতো উবে গিয়েছিল।’ ‘ধিকি ধিকি তুষের অনল জ্বলে আদমের বুকে।’ ‘কালের কপোলে জমে স্বেদ’, ‘ইচ্ছের সুতোয় ছিঁড়ে স্বপ্নের ঘুড়ি’, ‘হৃদয়ের জঠরে লালিত ইচ্ছের ভ্রূণ’_ এভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, লেনিন বিচিত্র অলঙ্কারের সনি্নবেশে সৌন্দর্যম-িত করেছেন কবিতার অন্তর এবং বহিরাঙ্গিক দিক।

পরিশেষে বলব, নূহ-উল-আলম লেনিন একজন রাজনৈতিক কর্মী হলেও কবিতাকে জীবনের সঙ্গী করেছেন। প্রবন্ধ এবং কলাম লেখায় সিদ্ধহস্ত হলেও কবিতা রচনায় তাঁর দক্ষতা কম নয়। আত্মগোপনে, কারাজীবনে, রণাঙ্গনে কিংবা একান্ত অবসর মুহূর্তে মনের স্বতঃস্ফূর্ত ভাবকে কবিতার শিল্পরূপে বেঁধে রেখেছেন। তাঁর কবিতা সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে মহাদেব সাহা বলেছেন : ‘কবিতা একটি দুরূহ শিল্পকর্ম। এই শিল্পের নিবিষ্ট চর্চার অখ- অবসর লেনিন পাননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার কবিতার মধ্যে সর্বত্রই একটি সজীব কবিমনের পরিচয় পাওয়া যায়।’ এ উক্তি যথার্থ, কারণ আপন মনের আনন্দেই লেনিন কবিতা রচনা করেন। যদিও তিনি বলেছেন : ‘যে বয়সে কাব্যলক্ষ্মী তাড়া করে রোমাঞ্চিত বুকের ভেতরে/ সে বয়স হয়েছে পার বিপ্লব সন্ধানে।’ এতে বুঝা যায়, অল্প বয়সে নয়, বেশ পরিণত বয়সে অভিজ্ঞতার ভা-ার সমৃদ্ধ করেই তিনি কাব্যলক্ষ্মীর আরাধনা শুরু করেছেন। কবিতার শিল্প সম্পর্কে সচেতন বলেই তিনি উচ্চারণ করেন : ‘আমি এখনো কবিতা লিখি আপন স্বভাবে/যদিও স্বভাব কবি নই/ যে সকল হৃষ্ট শব্দাবলি জেগে থাকে দুঃখের তিমিরে/আমি খুঁজি সেই শব্দাবলি স্বপ্নে জাগরণে।’ একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন তিনি, যেখানে থাকবে না শোষণ, বঞ্চনা ও মানুষের দুর্ভোগ। তাই সংকটপূর্ণ সমাজ, সংঘাতপূর্ণ রাজনীতি এবং যন্ত্রণাজর্জর মানবজীবনের মধ্যে বাস করেও সর্বদা তুলে ধরেন ইতিবাচক রূপের ছবি। তাঁর কবিতা কখনো সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নভাষ্য, কখনো শোষিত মানুষের মুক্তির প্রেরণামন্ত্র, কখনো পুঁজিবাদের দোর্দ- প্রতাপের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ, কখনো ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি ও প্রেমের প্রতিচ্ছবি, কখনো আবার দুঃখের তিমির ভেদ করা আশা জাগানিয়া শব্দমন্ত্র। মূলত, একজন সচেতন ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে দেশপ্রেমের দীপ্র প্রকাশে উজ্জ্বল নূহ-উল-আলম লেনিনের কবিতা। তাঁর কাব্যচর্চা অব্যাহত থাকুক, যেমন করে রাজনীতিক হয়েও কবিতাচর্চা অব্যাহত রেখেছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বার বার যেন তাঁর লেখনীতে আসে ‘জননী জন্মভূমিশ্চ/নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ।’ তিনি যেন বলতে পারেন : ‘সর্বসাধন মরণজয়ী বেহুলা সুন্দরী/অপরাজেয় বাংলাদেশের এই তো প্রতিচ্ছবি।’

[ad#co-1]