'শেকড় ছেঁড়ার কষ্ট কাউকে বোঝানো যায় না'

বাংলাদেশের হীরা আরতি মুখোপাধ্যায়। আজীবন দ্যুতি ছড়িয়েছেন ভারতে। সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছিলেন গাইতে। একফাঁকে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন ফারাহ্ দিবা। ছবি তুলেছেন আলিফ হোসেন রিফাত
‘তোমার তখন ২১ বছর বোধ হয়, আমি তখন অষ্টাদশীর কোঠায়’। আপনার অত্যন্ত জনপ্রিয় গান। আপনার অষ্টাদশী সময়ের কথা বলুন।
এই গানগুলো খুব স্মৃতিময়। গীতিকার, সুরকার এবং শিল্পীর অনুভূতি মিলে তৈরি হয় একটা গান। এই অনুভূতিগুলোই একটা গানকে অমর করে। এটা এমনই একটা গান। আমি যখন অষ্টাদশী তখন সবাই আমার গুণমুগ্ধ ছিলেন। আমি তখন ক্যারিয়ার নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। গানই আমার অষ্টাদশী, আমার একুশ! গানেই একাত্দ হয়ে থাকতাম। গান থেকে দূরে_ভাবতেই পারি না। আজও না।

বাংলাদেশের সঙ্গে আপনার মনের যোগ কতটুকু? কলকাতায় জন্মেছি ঠিকই, কিন্তু শেকড় গেঁথে আছে বাংলাদেশে। বজ্রযোগিনীতে এখনো আমাদের বাড়ি আছে। ঢাকার গোপীবাগে আমাদের বাড়ি। আমার বাবা ছিলেন পোস্টমাস্টার জেনারেল। মা নারী শিক্ষা মন্দিরে পড়াশোনা করেছেন। বাবা পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার নানা ছিলেন বিক্রমপুরের জমিদার। বিক্রমপুর মধ্যপাড়ায় আজও আমাদের জমিদার বাড়িটা আছে। আমার বড় দাদু দেশ ভাগের সময় বাধ্য হন নিজের ভিটা ছেড়ে কলকাতা চলে যেতে। এই কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারেননি। কলকাতায় এসেই তিনি মারা যান। শেকড় ছেঁড়ার কষ্ট কাউকে বোঝানো যায় না। তাই তো ঢাকা থেকে ডাক পেলেই ছুটে আসি। যতই ভাগ-বাটোয়ারা হোক এ দেশটা আমার।

নিজের গাওয়া কোন গানটা আপনার সবচেয়ে পছন্দের এবং কেন?
একটা গানের কথা বলা প্রায় অসম্ভব। ওস্তাদ বাহাদুর খাঁর সংগীতে গাওয়া ‘সুবর্ণরেখা’ আমার খুব প্রিয়। আরো আছে ‘দেওয়া-নেওয়া’ সিনেমার গান। রবীন্দ্র জৈনের ‘শ্যাম তেরি বনশী পুকারে রাধা নাম’ গানটি গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো। গুলজার সাহেবের ‘মাসুম’ সিনেমার ‘দো ন্যায়না’ গানটির জন্য ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলাম। একটা গানের কথা না বললেই নয়_’এক বৈশাখে দেখা হলো দু’জনার।’ সহজ-সরল অথচ কী গভীর বাণী। গানটি আমার মনে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

তবে কী দাদার সঙ্গে বৈশাখে দেখা হয়েছিল?
[এক ঝলক হাসির তরঙ্গ বয়ে গেল] সেটা বৈশাখ ছিল কি-না তা তো এখন মনে নেই। তবে দেখা হয়েছিল বন্ধুদের মাধ্যমে। শ্রেয়াস (শ্রেয়াস মুনিম) ছিলেন আমারই মতো। ভীষণ গানপাগল। ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক খুব শুনতেন। একদিন দেড় হাজার-৭৮ এমআরপি নিয়ে বাসায় এসে হাজির। এভাবেই ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব। আজও আমাদের মনের বয়স বাড়েনি। আগের মতোই আছি। ছেলে সোহামও আমাদের মতো হয়েছে। দিনরাত গান আর বই নিয়ে থাকে।

আপনার প্রথম প্লে-ব্যাকের গল্পটা বলুন।
১৯৫৭ সালের কথা। আমার বয়স তখন ১৪ কী ১৫। মারফি মেট্রো সিংগিং কনটেস্টে অংশ নিয়ে প্রথম হই। বিচারক ছিলেন মদন মোহন, নৌশাদ, অনিল বিশ্বাস, শ্রীরাম চন্দ্র। পুরস্কার হিসেবে তাঁদের প্রত্যেকের সিনেমায় প্লে-ব্যাক করেছিলাম। তখনই ‘সাহারা’ সিনেমায় প্রথম লতাদিদি ও হেমন্তদার সঙ্গে ডুয়েট গেয়েছিলাম।

হিন্দি প্লে-ব্যাকের গল্পটা জানলাম। বাংলা সিনেমায় কিভাবে প্লে-ব্যাক শুরু করলেন?
কলকাতায় ১৯৬৫ সালে প্রথম প্লে-ব্যাক করি ঋতি্বক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’য়! ওস্তাদ বাহাদুর খাঁর কাছে ধ্রুপদ, ধামার শিখতাম। ওস্তাদজী ছিলেন এই সিনেমার সংগীত পরিচালক। ওস্তাদজী ঋতি্বক দাকে আমার গান শুনতে বললেন। গান শুনে বললেন, তাঁর সিনেমায় গাইতেই হবে। অভিনয়ও করতে হবে। আমি তো ভয়ে অস্থির। পালানোর পথ খুঁজছি। বহুকষ্টে কেবল গান গেয়েই রক্ষা পেলাম। বাংলা সিনেমায় মাধবীর ঠোঁটেই আমি প্রথম কণ্ঠ দিয়েছিলাম।

পুরনো গানগুলো আজও জনপ্রিয়। অথচ এখনকার গান তেমন দাগ কাটছে না।
এখনো ভালো গান হচ্ছে। তবে সুর আর বাণীর গভীরতা তেমন নেই, এটা সত্যি। এর জন্য দায়ী আমাদের আবেগ। শ্রোতা এবং যাঁরা গান তৈরি করেন [সংগীত পরিচালক থেকে শুরু করে শিল্পী পর্যন্ত] সবার মাঝেই রয়েছে আবেগের অস্বচ্ছতা। পুরোটাই পেশাদারি ভালোবাসা। ভালোবাসা না থাকলে কোনো অমর সৃষ্টি সম্ভব নয়।

আপনি তো প্রবাদপ্রতিম গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালকদের গান করেছেন। বর্তমানে যাঁরা কাজ করছেন তাঁদের গানও করেছেন। কতটুকু ব্যবধান অনুভব করে।
ব্যবধান নয়, এটা পার্থক্য। পার্থক্য মগ্নতায়। যেকোনো সৃষ্টিকর্মে চাই মগ্নতা। যেটা পুরোপুরি অনুপস্থিত। আমাদের সময় সবার লক্ষ্য ছিল, যত সময়ই লাগুক এমন একটা গান তৈরি করব, যা সারা জীবন আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে। এখন সবাই দিনে ১০-১২টা গান তৈরির প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। আমরা অর্থ-খ্যাতির পেছনে ছুটিনি, তবু সব পেয়েছি। বর্তমান প্রজন্ম এটা বোঝে না।

প্লে-ব্যাক ছেড়ে দিলেন কেন?
১৯৮৯ সালে ‘তানহা’র পর আর কোনো হিন্দি সিনেমায় প্লে-ব্যাক করা হয়নি। ছেলে সোহামকে নিয়ে পণ্ডিচেরিতে তার দাদু বাড়িতে চলে যেতে হলো। তা ছাড়া বেশ অসুস্থও হয়ে পড়েছিলাম। অবশ্য কলকাতায় ফিরে আসার পর কিছু বাংলা সিনেমায় প্লে-ব্যাক করেছি।

[ad#co-1]