প্রকাশিত ছবি আমার নয় কখনো ছাত্রদল করিনি

গোয়েন্দা তথ্য এবং ঢাবির ছাত্রলীগ নেতা জীবনের বক্তব্য
‘বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এমপির ওপর হামলাকারীর পরিচয় মিলেছে। হামলাকারী একসময় ছাত্রদলের সক্রিয় নেতা ছিলেন। ক্ষমতার হাতবদলের সঙ্গে ছাত্রদলের কর্মী এখন ছাত্রলীগের বড় নেতা বনে গেছেন। হামলাকারী ছাত্রদল নেতা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসিম উদ্দীন হলের ছাত্রলীগের সভাপতি। তার নাম আব্দুর রহমান জীবন। ইতোমধ্যে গোয়েন্দারা জীবনের ছাত্রদলের রাজনীতিতে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে’।

দৈনিক ইত্তেফাকে গতকাল ‘ছাত্রদলের সক্রিয় ক্যাডার এখন ছাত্রলীগ নেতা: এই নেতাই সেদিন বিএনপি নেতা এ্যানির ওপর লাঠি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গোয়েন্দাদের বরাত দিয়ে উপরোক্ত তথ্য প্রকাশিত হয়।

এ ব্যাপারে গতকাল আমাদের সময়কে জীবন বলেন, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আমি একসময় ছাত্রদলের নেতা ছিলাম। কিন্তু ছাত্রদলের কোন স্তরে কোন পদধারী নেতা ছিলাম তা উল্লেখ করতে পারেনি। প্রতিবেদনটি যে অসত্য এটি এর প্রথম যুক্তি। হরতালের দিন এ্যানির ওপর হামলার কথাও সত্য নয়। অবশ্য এ সংক্রান্ত ছবিটি আমার নয়, এটা বলবো না। যে স্থানের (শাহবাগ) কথা বলা হয়েছে সেখানে এ্যানির ওপর কোনো হামলা হয়নি। ছাত্রলীগের হাতে তিনি আহত হননি। তার ওপর হামলা হয়েছে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে। সেখানকার কতিপয় চিকিৎসক-কর্মচারী তার ওপর হামলা করে। আমি নিজেই হাসপাতালে তাকে আহত অবস্থায় দেখে বিস্মিত হই।

তাহলে এ্যানিকে আপনি লাঠি দিয়ে আঘাত করছেন এ ছবিও কি মিথ্যা? জীবনের দাবি, হ্যাঁ মিথ্যা। আসলে ঐদিন সেখানে হরতালের সমর্থক ছাত্রদলের কিছু কর্মীর সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষ হয়। এসময় এ্যানি ছাত্রদলের ছেলেদের রক্ষায় এগিয়ে আসে। কম্পিউটারের মাধ্যমে সেই ছবিকে ক্লোজ করে এ্যানির ওপর হামলা বলে চালানো হচ্ছে।

‘নিজেকে ছাত্রলীগের যোগ্য নেতা হিসেবে পরিচিত করার জন্য এ্যানির ওপর পরিকল্পিতভাবে সে (জীবন) হামলা করে। হামলার জন্য ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের কোনো নির্দেশনা ছিল না’ প্রতিবেদনের এ তথ্য সম্পর্কে জীবন বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই হরতালের দিন আমরা রাজপথে অবস্থান নিই। শুধু আমি নই, আমার পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই দলের জন্য আমার ও পরিবারের অনেক ত্যাগ আছে। অথচ এ পর্যায়ে এসে এখন সতীত্বের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। আপনি বললেন দলীয় সিদ্ধান্ত ছিল, কে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন আপনাকে? জানতে চাইলে কারো নাম বলতে রাজি হননি জীবন।

‘২০০৫ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অমর একুশে বই মেলার উদ্বোধন মঞ্চে তার (জীবন) সরব পদচারণা ছিল। সেই মঞ্চে বিএনপিপন্থি বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গে জীবনের ফটো গোয়েন্দাদের হাতে পৌঁছেছে। ছবিতে বিএনপিসহ ছাত্রদলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদেরও দেখা গেছে’।

এ অভিযোগ সম্পর্কে আব্দুর রহমান জীবন বলেন, আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি এ ছবি আমার নয়। কম্পিউটারের মাধ্যমে গলা কেটে আরেকজনের দেহের ওপর আমার মাথা বসানো হয়েছে। আমি ঐ দিন খালেদা জিয়ার অনুষ্ঠানেও যাইনি। তিনি বলেন, আমি আবারো চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, ছবিটি সত্য হলে এর নেগেটিভ দেখানো হোক, ছবিটি আমার প্রমাণ হলে নাকে খত দিয়ে রাজনীতি ছেড়ে দেব।

‘ছাত্রলীগ নেতা আব্দুর রহমান জীবনের ছাত্র রাজনীতি শুরু হয় ছাত্রদলের হাত ধরে। ছাত্রদলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকা অবস্থায় তিনি ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। জীবন ২০০৩-২০০৪ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন’।

ইত্তেফাকের প্রতিবেদনের এ তথ্য সম্পর্কে জীবন জানান, ২০০২ সাল থেকেই তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও তিনি ছাত্রলীগেই ছিলেন, এখনো আছেন। তিনি বলেন, একজন সাধারণ শিক্ষার্থীও বলতে পারবে না আমি ক্যাম্পাসে কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম করেছি। আমার বর্তমান হল প্রভোস্টকে এমনকি জোট সরকারের আমলে যেই মাহবুব স্যার প্রভোস্ট ছিলেন তাদেরকে জিজ্ঞাস করলেও তারা আমার সম্পর্কে বলতে পারবেন।

‘২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি (জীবন) সরাসরি ছাত্রদলের রাজনীতি করেছেন। রাতে ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে দেখা করতেন। সেই সময়ের হলের ছাত্রলীগ সভাপতিও ছিলেন মুন্সীগঞ্জ এলাকার। ক্ষমতার হাত বদলের পরপরই সুবিধাবাদী জীবন ছাত্রলীগের কর্মী সংকটের সুযোগে হলের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন’।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে জীবনের ভাষ্য, ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায়। তখন যদি দিনে ছাত্রদল করতাম আর রাতে ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে দেখা করতাম তাহলে এতে কি বোঝা যায়? যদিও তথ্যটি সত্য নয় তবুও এতে বরং প্রমাণিত হয় যে, আমি তাহলে প্রকৃত অর্থে ছাত্রলীগেরই ছিলাম। তাছাড়া আমি কখনো ছাত্রদলকে পছন্দ করতাম না, ভালোবাসতাম না। জীবন বলেন, আমি হঠাৎ হল শাখার সভাপতি হইনি। আমি আমার এলাকায় ও উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি পদে প্রার্থী ছিলাম। তাছাড়া প্রতিবেদনে আমার এলাকার নামও ভুল ছাপা হয়েছে। আমার বাড়ি মুন্সীগঞ্জের মোল্লাকান্দিতে। আমার বাবা স্থানীয় ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের এখনো সভাপতি। তার দাবি, তার এলাকার লোকজন কিংবা স্থানীয় থানায় খোঁজ নিলেও জানা যাবে তিনি ছাত্রদল করেছেন কিনা।

অন্যসব অভিযোগ সম্পর্কে জীবন বলেন, ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, আমি ক্যাম্পাসে হিযবুত তাহ্রীর ও ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী, এজন্যই একটি গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে লেগেছে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়ে জীবন গতকাল ঢাবি ক্যাম্পাসেও সংবাদ সম্মেলন করেছেন।

শামছুদ্দীন আহমেদ: আমাদের সময়
—————————————————————–

ইত্তেফাকের রিপোর্ট ও জীবনের সাংবাদিক সম্মেলন

গতকাল শনিবার ইত্তেফাকে ‘ছাত্রদলের সক্রিয় ক্যাডার এখন ছাত্রলীগ নেতা’ শিরোনামে সংবাদটি প্রকাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ছাত্রলীগ নেতারা সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীম উদ্দীন হলের সভাপতি আব্দুর রহমান জীবনের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে বিব্রত।

এদিকে, প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে ছাত্রলীগ নেতা জীবন। তিনি বলেন, কোনদিন ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল না। বরং পরিকল্পিতভাবে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার জন্য সংবাদটি প্রকাশ করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আব্দুর রহমান জীবন যে ছাত্রদল করত তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে গোয়েন্দাদের হাতে। ইতিমধ্যে ২০০৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অমর একুশে বই মেলার উদ্বোধন মঞ্চেও জীবনের সঙ্গে অন্যদের ছবির নেগেটিভ সংগ্রহ করেছে গোয়েন্দারা। এছাড়াও জীবনের ছাত্রদলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার আরো একাধিক ছবি রয়েছে। তবে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে তাকে কোন ধরনের সহযোগিতা করা হবে না বলে সংবাদ মাধ্যমকে জানানো হয়েছে।

জীবনের সংবাদ সম্মেলন

কবি জসীম উদ্দীন হলের ছাত্রলীগ সভাপতি আব্দুর রহমান জীবন ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার হীন চক্রান্তের অংশ হিসাবে এই মনগড়া সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। আমি কলেজ জীবন থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। আমার বাবা দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত রয়েছেন। ছাত্রলীগের রাজনীতি করার কারণে আমাকে ছাত্রদল একাধিকবার হল থেকে বের করে দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, ২০০৫ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বইমেলার আগমন প্রতিহত করতে ছাত্রলীগের ঘোষিত কর্মসূচিতে মুখে কালো কাপড় বেঁধে অংশ নিয়েছিলাম। প্রকাশিত সংবাদে যে ছবি ছাপা হয়েছে তা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে কাট-পিছের মাধ্যমে তৈরি করা। তিনি ঐ ছবির নেগেটিভ উপস্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদককে আহবান জানান।

প্রতিবেদকের বক্তব্য

প্রকাশিত সংবাদটি মনগড়া হিসাবে উপস্থাপন করা হয়নি। সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে করা হয়েছে। এছাড়াও ইত্তেফাকের কাছে খালেদা জিয়ার মঞ্চের ছবিসহ জীবনের একাধিক ছাত্রদল সংশ্লিষ্ট প্রমাণ রয়েছে। জীবন যে ছাত্রলীগের সক্রিয় নেতা তা সংবাদে অস্বীকার করা হয়নি। তবে তার অতীত ছাত্রদলের রাজনীতি করার কিছু প্রমাণ দেখানো হয়েছে মাত্র।

ইত্তেফাক

[ad#co-1]