ছাত্র রাজনীতি: বিকল্পের সন্ধানে

নূহ-উল-আলম লেনিন
সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ছাত্র রাজনীতি। একদার গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র রাজনীতির বর্তমান অধোগতি এবং তার ভয়ঙ্কর সংহার মূর্তি দেখে সমগ্র জাতি স্তম্ভিত, উদ্বিগ্ন। যখন যে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে, তখন তার অনুসারী ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের আশুরিক তাণ্ডবই কেবল একমাত্র উদ্বেগের বিষয় নয়, সেই সঙ্গে চরম দক্ষিণপšি,’ ধর্ম ব্যবসায়ী জামায়াত-শিবির ও হিযবুত তাহিরিরের মতো মৌলবাদী সংগঠনগুলোর ছাত্র-তরুণদের কর্মকাণ্ড ও দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত আমার সর্বশেষ লেখাটিতে (আমি যদি একদিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী হতাম) আমি ছাত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ড তিন বছরের জন্য স্থগিত (সাসপেন্ড) রাখার পক্ষে অভিমত দিয়েছিলাম।

এ প্রসঙ্গে আমার কোনো কোনো সহকর্মী আমার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, একজন সাবেক ছাত্র আন্দোলনের কর্মী হিসেবে ‘ছাত্র রাজনীতি’ বন্ধের কথা আমি কীভাবে বলতে পারলাম? যে বা যারা আমার অভিমতের সঙ্গে একমত পোষণ করেননি, তাদেরও অভিমত হচ্ছে ‘ছাত্রলীগ’ অথবা যে কোনো নামধারী ছাত্র-যুবকদের চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। তারা আরও বলেন, সরকার চাইলে (তাদের ইঙ্গিতটা প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে) ছাত্র নামধারী দুর্বৃত্তদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

ছাত্র রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করার প্রশ্নে কারো দ্বিমত নেই। তবে ছাত্র রাজনীতি বহাল রেখেই এটা করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তাদের যুক্তি হচ্ছে কতিপয় ছাত্রলীগ নামধারী দুর্বৃত্তের অপকর্মের জন্য ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে অথবা এককভাবে ছাত্রলীগকে অকার্যকর করলে প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনগুলো তো বসে থাকবে না। বরং ছাত্রদল, ছাত্র শিবির প্রভৃতি আওয়ামী লীগ বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাস দখল করে নেবে, একতরফা সুযোগ নিয়ে সাধারণ ছাত্র সমাজকে সরকার বিরোধী কর্মকাণ্ডে সংগঠিত ও প্ররোচিত করবে। অতএব এ ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত না নিয়ে ছাত্রলীগকে দুর্বৃত্তমুক্ত করতে হবে এবং অন্য ছাত্র সংগঠনের দুর্বৃত্তদেরও শায়েস্তা করতে হবে। কোনো কোনো বাম রাজনীতিবিদ এ প্রসঙ্গে লিখেছেন বা বলেছেন, মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলতে হবে- এটা হতে পারে না। ছাত্র রাজনীতিকে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি মুক্ত করে আদর্শবাদের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করতে হবে। নীতিগতভাবে আমি এসব যুক্তির বিরুদ্ধে নই। এটাই তো হওয়া উচিত। কিন্তু গত দেড় দশকের অভিজ্ঞতা বলে, উচিত কর্মটি হয়নি। গত দেড় বছরের অভিজ্ঞতাও তো কোনো আলোর দিশা দেখায় না। ছাত্রলীগ নামধারী দুর্বৃত্তদের একর পর এক নিয়ন্ত্রণহীন কর্মকাণ্ডে অতিষ্ট হয়েই তো ছাত্রলীগের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন করেন। ছাত্রলীগের ‘সাংগঠনিক নেত্রী’ হিসেবে বিশেষ পরিস্থিতিতে নেয়া অস্বাভাবিক পদটির বিলুপ্তি ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্রলীগের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবসান ঘটান। পক্ষান্তরে নির্বাচন কমিশন জনপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোকে ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনকে অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন হিসেবে রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ফলে দলের রেজিস্ট্রেশন চূড়ান্ত করার সময় সহযোগী সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের নাম অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয় না। দৃশ্যত ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের বা ছাত্রদল বিএনপির অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন নয়। সকল ছাত্র সংগঠনই স্বাধীন সংগঠন।

কিন্তু বাস্তবে এই কেতাবি কথার কোনো মূল্য নেই। সকল ছাত্র সংগঠনই চূড়ান্তভাবে রাজনৈতিক দলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। নিয়ন্ত্রণের মাত্রার সামান্য হেরফের হতে পারে। সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনকে রাজনৈতিক দলের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন না করার ওপর যে শর্তারোপ করা হয়েছে আমি তার দৃঢ় সমর্থক। কিন্তু একই সঙ্গে এই বাস্তবতাও ভুলে গেলে চলবে না যে, আইন করলেই বা দৃশ্যত সম্পর্কহীন ঘোষণা করলেই অতীতের ধারাবাহিকতা আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। কার্যক্ষেত্রে তা হয়নি।

আমি দেখতে পাচ্ছি ছাত্রলীগের কমিটি গঠন নিয়ে আওয়ামী লীগের উপজেলা ও জেলা নেতৃবৃন্দের সংশ্লিষ্টতা, দলাদলি এবং বিরোধ কেবল দলীয় নিয়ন্ত্রণ নয়, ছাত্র সংগঠনকে, ছাত্র সমাজকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগতভাবে নিয়ন্ত্রিত করা এবং তাদেরকে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করার উš§ত্ত প্রতিযোগিতা গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ বন্ধ করতে পারেনি। আর তা পারবেও না। রাজনৈতিক দলগুলো এ ব্যাপারে অর্থবহ এবং ভিতরে-বাইরে অভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে ছাত্র রাজনীতিকে দলীয় লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করা যাবে না। আপনি কোনো না কোনোভাবে ছাত্র সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণ/পরিচালনা করবেন অথচ তাদের কর্মকাণ্ডের দায়-দায়িত্ব নেবেন না তা হতে পারে না। এটা আমার একার কথা নয়। সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ওবায়দুল কাদের প্রকাশ্যেই বলেছেন ছাত্রলীগের ভালোমন্দের দায়-দায়িত্ব আওয়ামী লীগ এড়াতে পারে না। পক্ষান্তরে সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, কেতাবি কথা, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন নয়। কাজেই তাদের কর্মকাণ্ডের দায়-দায়িত্ব আওয়ামী লীগের ওপর বর্তায় না। আমার প্রশ্ন হচ্ছে এসব কথা উঠছে কেন? আজ যদি ছাত্রলীগের একাংশের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, নিজেদের মধ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এরকম নিয়ন্ত্রণহীন ও ভয়াবহ রূপ ধারণ না করতো এবং জনগণের মধ্যে সমালোচনার ঝড় না উঠতো তাহলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছাত্রলীগের সম্পর্ক নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হতো না।

আমার যে বন্ধুরা আমাকে ‘ছাত্র রাজনীতি’ বন্ধ করার কথা বলেছি বলেছেন, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, আমি আমার নিবন্ধে ছাত্র রাজনীতি নয়, ছাত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ড তিন বছরের জন্য স্থগিত করার কথা বলেছি। আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি বর্তমানে বাংলাদেশে ছাত্র সংগঠনগুলো ‘রাজনীতি’ ছাড়া আর সবই করছে। ওদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সংঘাতকে কী আপনি রাজনীতি বলবেন? আসলে তো ছাত্র সংগঠনগুলো ছাত্র সমাজ ও জাতির স্বার্থে কোনো রকম রাজনৈতিক ইস্যু বা শিক্ষার দাবি-দাওয়া নিয়ে কোনো কোনো তৎপরতা করছে না। ছাত্রদল ও ছাত্র শিবির যথাক্রমে বিএনপি ও জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। আর ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের এজেন্ডা ভন্ডুল করছে। কোনোটাই ছাত্র রাজনীতির সংজ্ঞায় পড়ে না। ছাত্র রাজনীতিকে বাঁচাতে হলে বিদ্যমান ছাত্র সংগঠনগুলোর তৎপরতা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না।

আমি আমার আগের লেখায় ছাত্র রাজনীতিকে সুস্থ ও সৃজনশীল মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে প্রতিভাবান ছাত্রদের ছাত্র রাজনীতিতে আকৃষ্ট করার পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেছি। এই তিন বছরে একদিকে শিক্ষাঙ্গন থেকে মাস্তানি, চাঁদাবাজি, দলবাজিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে। অন্যদিকে ‘ছাত্র সংসদ’গুলোকে ছাত্র সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল সংস্থায় পরিণত করার লক্ষ্যে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন দেয়া, নির্বাচিত ছাত্র সংসদকে ছাত্র সমাজের গণতন্ত্র চর্চার মিনি পার্লামেন্টে রূপান্তরিত করা (প্রয়োজনে এ লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে)। ছাত্র সংসদের মাধ্যমে ছাত্র সমাজ ও শিক্ষার কল্যাণে বহুমুখী সৃজনশীল কর্মসূচি গ্রহণ করার পদক্ষেপ গ্রহণ। পঞ্চাশের দশক থেকে ষাটের দশক, এমনকী স্বাধীনতা উত্তরকালেও ছাত্র সংসদগুলোর ভূমিকা বিশেষ করে ডাকসুর ভূমিকা এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য।

অথচ দুঃখের বিষয় হলো নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান ও সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর গত দশক ধরে ছাত্র সমাজের নিজস্ব গণতন্ত্র চর্চার কেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সহ কোনো ছাত্র সংসদের নির্বাচন হচ্ছে না। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় গিয়েও বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ- কেউই, কোনো সরকারই ছাত্র সংসদের নির্বাচন দেয়নি। নিজ অনুসারী ছাত্র সংসদের জয় সুনিশ্চিত না হলে কেউই নির্বাচন দিতে ভরসা পান না। এটা গণতন্ত্রের মর্মবাণীর পরিপন্থি। দ্বিতীয়ত ছাত্রদের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চার সুযোগের এই অভাব ছাত্র সংগঠনে অছাত্র, আদুভাই এবং বহিরাগত চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজদের জেঁকে বসার পথ করে দিয়েছে। মহাজোট সরকারকে সাহস করে এই খারাপ ঐতিহ্যের বৃত্ত ভেঙে বের হয়ে আসতে হবে। তাহলে ছাত্র রাজনীতিতে নতুন হাওয়া বইবার পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

ছাত্র রাজনীতির সংজ্ঞা নিয়েও ধাঁধা আছে। পরাধীন এবং স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকাও যে এক নয় অনেকেরই এই উপলব্ধি নেই। পরাধীন দেশে জাতীয় আন্দোলনের মূল ধারার এমনকী কখনো কখনো অগ্রবাহিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে ছাত্র সমাজকে। ছাত্র রাজনীতি এখন জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের অগ্রসর ঝটিকা বাহিনীর ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু স্বাধীন দেশে একই রকম ভূমিকা পালনের অবজেকটিভ প্রয়োজনীয়তা আর থাকে না। উন্নয়নশীল দেশগুলোর, যেখানে গণতন্ত্র অনুপস্থিত, সামরিক বা স্বৈরশাসন দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, সেখানেও সমাজের সবচেয়ে সচেতন ও শিক্ষিত অংশ হিসেবে ও শিক্ষিত অংশ হিসেবে ছাত্র-তরুণরা স্বৈরাচার-বিরোধী সংগ্রামে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। একথা মানতে হবে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমাজ নানা মত ও নানা পথে বিভক্ত থাকে। ছাত্রসমাজেও তার প্রভাব থাকা স্বাভাবিক। নানা সীমাবদ্ধতা, চড়াই-উৎরাই এবং দোষ-ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের ধারা চলে আসছে। ইতিমধ্যে তিনটি সরকার তাদের পূর্ণ মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। পপুলার ভোটে নির্বাচিত চতুর্থ সরকার-মহাজোট সরকার এখন দলের অঙ্গীকার নিয়ে দেশ পরিচালনা করছে। বিগত তিনটি সরকারের আমলেই কার্যত ধীরে-ধীরে ছাত্রসমাজে ‘অপ-রাজনীতি’ ছাত্র রাজনীতির স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের স্বাধীন সত্তা হারিয়ে ক্ষমতাসীনদের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। একদার প্রবল বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্লাবে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের ছাত্র-আন্দোলনে ঐতিহ্যবাহী বাম ধারাটি দুর্বল হতে হতে প্রায় নিঃশেষিত হওয়ার পথে রয়েছে। পক্ষান্তরে ধর্ম ব্যবসায়ী মৌলবাদী জামায়াত এবং অন্যান্য ধর্মান্ধ শক্তির অনুসারী ছাত্র সংগঠনগুলো বিপুল শক্তি সঞ্চয় করেছে।

ছাত্র আন্দোলনের আজকের পরিণতির জন্য দায়ী প্রথমত জিয়া এরশাদের সামরিক ও স্বৈরশাসন। দ্বিতীয়ত রাজনীতি ও অর্থনীতির দুর্বৃত্তায়ন। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানই প্রথম ১৯৭৬ সালে আইন করে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে ছাত্র, যুব, শ্রমিক, কৃষক ও অন্য সংগঠনগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে অঙ্গসংগঠন হিসেবে রাখার বিধান করেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ বিলিয়ে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীকে দিয়ে বিএনপি নামক রাজনৈতিক দল গঠনের পাশাপাশি জিয়াউর রহমান ছাত্র, যুব, শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনও গড়ে তুলেন। জিয়ার সামরিক গোয়েন্দারা সরাসরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যারয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং নানারকম প্রলোভন দেখিয়ে তাদেরকে ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। জিয়াউর রহমান মেধাবী ছাত্রদের নিয়ে হিজবুল বাহার নামক নৌযানে করে প্রমোদ ভ্রমণে যান এবং তাদের স্বপ্নিল ভবিষ্যতের প্রলোভন দেখান। কেমন করে মেধাবী ছাত্র ছাত্রদলের নেতা হয়ে ঠ্যাঙারে, খুনী ও সন্ত্রাসীতে পরিণত হয় তার প্রমাণ তো ‘অভি’ঃ প্রমুখ। বাংলাদেশের রাজনীতিকে কলুষিত, ছাত্রদের বিপথগামী করা এবং অপ-রাজনীতিতে ছাত্রসমাজকে জড়ানোর প্রধান নায়ক জিয়াউর রহমান। জিয়ার এই উত্তরাধিকার তার স্ত্রী বেগম খালেদা কেবল যোগ্যতার সঙ্গেই বহন করেননি, বেগম জিয়া তথাকথিত মেধাবী ছাত্রদের বাদ দিয়ে অছাত্র ও পেশাদার মাস্তান নাসিরুদ্দিন পিন্টুকে ছাত্রদলের সভাপতি বানিয়ে ছাত্রদলের মধ্যে যেটুকু নৈতিক আদর্শবোধ ছিল তাকেও ধ্বংস করেন। খালেদার আমলেই মেধাবী ছাত্ররা ছাত্র রাজনীতি থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। ছাত্রদের বদলে অছাত্ররা ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে চেপে বসে।

স্বৈরশাসক এরশাদ অবশ্য চেষ্টা করেও ছাত্র আন্দোলন ও সংগঠনে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। বিকাশমান গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রদের ঐতিহাসিক ভূমিকা এরশাদকে বরং বিপন্ন করে।

নব্বইয়ের দলকে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি’র ক্ষমতারোহণের পর ছাত্রদলকে “ক্যাডার বাহিনীতে” পরিণত করা হয়। তাদেরকে লুটপাট, হল দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপরাধের অবাধ সুযোগ দেওয়া হয়। এভাবেই ছাত্র আন্দোলন থেকে ‘ছাত্র রাজনীতি’ ধীরে ধীরে অপসৃত হয় এবং ছাত্রসমাজকে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করার ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। বলাবাহুল্য ছাত্রলীগেও এই প্রবণতা সংক্রমিত হয়। শেখ হাসিনা ছাত্রদের হাতে অস্ত্র ও অর্থের বদলে বই তুলে দিলেও ছাত্রলীগকে এই সামগ্রিক পচনশীলতা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

দ্বিতীয় কারণটিও জিয়ার হাতে সূচিত হয়। আমাদের দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে যে লুটেরা অর্থনীতি গড়ে উঠেছে তারও সূত্রপাত ঘটে জিয়ার আমলে। আশি ও নব্বইয়ের দলকে অর্থনীতির দুর্বৃত্তায়ন চূড়ান্তরূপ ধারণ করে। এই অর্থনীতি গড়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এবং রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায়। জিয়া রাজনীতিকেও দুর্বৃত্তায়নের পথে নিয়ে যান। রাজনীতি রাজনীতিবিদদের জন্য ‘ডিফিকাল্ট’ করে তোলার ঘোষণা দেন। অন্যদল ভাঙিয়ে রাজনীতিবিদদের কেনা-বেচার পণ্যে পরিণত করার ব্যাপারে জিয়া এবং পরবর্তীতে তার সামরিক উত্তরসূরী স্বৈরশাসক এরশাদ অসামান্য কৃতিত্ব দেখান। এভাবেই দেশপ্রেম, মানব হিতৈষণা, সততা, ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং জনকল্যাণে আত্মনিবেদনের ঐতিহ্যকে গলাটিপে হত্যা করা হয়। অর্থ এবং পেশীশক্তিই হয়ে ওঠে রাজনীতির নিয়ামক। বলাবাহুল্য আওয়ামী লীগও এই ফাঁদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়।

বাংলাদেশের গণ-রাজনীতির সূতিকাগার আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতা সংগ্রামসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে এই দল। অতুলনীয় আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এই দল। অতীতমুখিতা থেকে বের হয়ে একুশ শতকের উপযোগী আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক এবং সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলার মহান ব্রত নিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দিনবদলের সংগ্রামে নিয়োজিত এই দল। গত সাধারণ নির্বাচনে এবারই যারা প্রথম ভোটার হয়েছে সেই ২২ শতাংশ তরুণ-তরুণীর সামনে নতুন এক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার রূপকল্প তুলে ধরেছে আওয়ামী লীগ। ফলে ওই ২২ শতাংশসহ ১৮ থেকে ২০/৩৫ বছর বয়সের ২৯ শতাংশ ভোটারের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এবার আওয়ামী লীগকে তথা মহাজোটকে ভোট দিয়েছে। আওয়ামী লীগে টাকাওয়ালাদের যেটুকু প্রভাবই থাক না কেন, আওয়ামী লীগের বিজয়ে অর্থ ও পেশীশক্তি নিয়ামক হয়ে উঠতে পারেনি। ব্যাপক গণজোয়ার এবং পরিবর্তনের পক্ষে বাংলাদেশের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছাই নির্বাচনের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের পর দলের একটি অংশের মধ্যে অর্থলোলুপতা, রাতারাতি যেনতেন প্রকারে অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়ার প্রবণতা, সর্বোপরি দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ আমলাতন্ত্রের যোগসাজশ গত ষোল/সতের মাসের মহাজোট সরকারের অর্জনগুলোকে নস্যাৎ করতে উদ্যত হয়েছে।

ছাত্রলীগকে তাদের কৃতকর্ম বা অপরাধ প্রবণতার জন্য এককভাবে দায়ী করলে ভুল করা হবে। আমরা দলের নেতারা, প্রবীণরা তরুণ, কোমলমতি ছাত্রদের সামনে কী দৃষ্টান্ত স্থাপন করছি? ছাত্র-তরুণরা কাদের দেখে শিখবে? কাকে বা কাদেরকে অনুসরণ করবে? বই পড়ে, তত্ত্ব পড়ে কেউ ছাত্র সংগঠনে বা ছাত্র রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ হয় না। সাধারণত: তরুণরা অনুসরণযোগ্য ‘আইডল’ বা ‘রোল মডেল’ খোঁজে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মূলধারার আন্দোলনের ‘রোল মডেল’ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার যোগ্য সহকর্মীরা। গোটা ছাত্রসমাজকে তারা তাদের সংগ্রামী জীবন, সততা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, সাহস ও মেধার সম্মিলনে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছেন। ‘আদর্শবাদ’ই ছিল ছাত্র রাজনীতির নিয়ামক। বামধারার বিশ্বজনীন প্রভাব এবং বাম নেতাদের জীবন ও সংগ্রামও ছাত্র আন্দোলনকে আলোড়িত করেছে। ফলে জাতীয়তাবাদী ছাত্রলীগের সমান্তরাল বামপন্থি ছাত্র ইউনিয়নও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে পপুলার সংগঠন হিসেবে গড়ে ওঠে।

এখন সময় বদলেছে বলে ছাত্র-তরুণরা ‘রোল মডেল’ বা ‘আইডল’ খুঁজবে না তা’ ভাববার অবকাশ নেই। এখনো দেশপ্রেম, সততা, নিষ্ঠা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, সাহস এবং প্রতিভার মূল্য আছে। এর কোনো বিকল্প নেই। বাজার অর্থনীতি ও বাজার রাজনীতিই শেষ কথা নয়। দুর্বৃত্তায়নের কাছে আত্মসমর্পণ বিধিলিপি হতে পারে না। অতএব ছাত্র রাজনীতিকে সুস্থ-স্বাভাবিক ধারার ফিরিয়ে আনতে হলে দেশের গোটা রাজনীতিকেও দুর্বৃত্তায়নের ফাঁদ থেকে বের করে আনতে হবে। রাষ্ট্রে, রাজনীতিতে, দলের নেতৃত্বে সৎ, যোগ্য ও প্রতিভাবানদের অধিষ্ঠান বা তাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের জীবনযাত্রা, আচার-আচরণ দ্বারা মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলেই তারা ছাত্র-তরুণদের কাছে অনুসরণযোগ্য রোল মডেল হয়ে উঠতে পারবেন। নিজে দুর্নীতি করে, অন্যকে দুর্নীতিমুক্ত থাকার উপদেশ দিলে তা কেউ শুনবে না। নিজে বিলাসী ও অনৈতিক জীবনযাপন করবো আর ছাত্র-তরুণদের ত্যাগ করতে বলব, এই দ্বিচারিতা কেউ মানবে না। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ছাত্র রাজনীতিকে বাঁচাতে হলে আসুন আবার নিজেদের বদলে ফেলি। আমাদের সন্তানদের কাছে আমরা মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করি।

আমি ‘ছাত্র রাজনীতি’ পুনরুদ্ধার ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে। আর এজন্যই একটা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কিছুটা ব্রিফিং টাইম নেয়ার জন্য তিন বছর বর্তমান ছাত্রসংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড স্থগিত রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করছি। রোগের মূলে হাত দিতে হবে। কেবল ভয় দেখিয়ে কাজ হবে না। ছাত্র রাজনীতিকে দিনবদলের-নিজেদেরকে বদলানোর গোটা প্রক্রিয়ার অবিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

[লেখক: রাজনীতিক]

[ad#co-1]