জাপানে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ প্রসঙ্গে

রাহমান মনি
একজন সৎ ও যোগ্য লোক জাপানে রাষ্ট্রদূত হয়ে আসছেন এই সংবাদে জাপান প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। খবরটি চাউর হওয়ার পর বর্তমান আন্তঃর্জালের কল্যাণে মুহূর্তের মধ্যে প্রবাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সত্যতা যাচাইয়ের জন্য দূতাবাস এবং স্থানীয় মিডিয়াগুলোর সঙ্গে অনেকেই যোগাযোগ করেন। তাদের অনেকেই আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, তার মতো একজন যোগ্য দেশপ্রেমী ও সৎলোক এলে জাপানে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।

বর্তমান ভুটানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মজিবুর রহমান ভূঁইয়া জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ পাচ্ছেন এ সংবাদে প্রবাসীরা এভাবেই জানান তাদের উচ্ছ্বাস। কারণ তিনি জাপান প্রবাসীদের পরিচিত এবং প্রিয় মুখ। একজন আদর্শবান নির্লোভ, সৎ এবং যোগ্য লোক হিসেবেই তিনি জাপান প্রবাসীদের কাছে পরিচিত।

পুরনো এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রবাসীরা বলেন, জাপানীরা সহজাতভাবে পূর্ব পরিচিত এবং সৎ লোককে সব সময় প্রাধান্য দিয়ে থাকে। যেহেতু ভুঁইয়া ইতোপূর্বে জাপান ছিলেন এবং সৎ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তাই এই নিয়োগ জাপান বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে কাজে আসবে। কর্মক্ষেত্রেও যদি কোনো একজন উর্ধতন কর্তৃপক্ষ কিংবা মালিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন, তা হলে তিনি হয়ে ওঠেন ওই প্রতিষ্ঠানের মধ্যমণি। কোম্পানির নীতি নির্ধারণে তার মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হয়। সে হিসেবে মজিবুর রহমান ভুঁইয়া যেহেতু তিন বছরেরও বেশি সময় জাপানে কর্মজীবন অতিবাহিত করেছেন, কূটনৈতিক শিষ্টাচার লংঘন করেননি; উচ্চশিক্ষা শিক্ষিত এবং ব্যক্তিজীবনেও সৎ, তাই তার নিয়োগ জাপান বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নে টনিক হিসেবে কাজ করবে বলে অভিজ্ঞ প্রবাসীরা মন্তব্য করেন।

প্রবাসীরা যখন এমন সংবাদে উচ্ছ্বসিত তখনই বাংলাদেশের একটি দৈনিকে গত ২৮ জুন ২০১০ দু’জন জাপান প্রবাসীর উদ্ধৃতি দিয়ে একটি উদ্দেশ্যমূলক রিপোর্ট ছেপে প্রবাসীদের উচ্ছ্বাসকে ম্লান করে দেয়। পত্রিকাটির কূটনৈতিক রিপোটার জাপান প্রবাসী দুইজন বিতর্কিত ব্যক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ভুঁইয়াকে জাপানে নিয়োগ দিলে জাপান প্রবাসীদের একাংশের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়বে।

যদিও সর্বস্তরের প্রবাসীরা একে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করছেন কোনো স্বার্থান্বেষী মহল-এর নেপথ্যে কাজ করছে। তাদের মতে, জাপানের পদটি খুবই আকর্ষণীয় কূটনৈতিক মহলে। তাই এই মিশনে যেন ভুঁইয়া নিয়োগ না পান তাই নেপথ্যে থেকে তারাই ষড়যন্ত্র করছেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন সদ্য রাষ্ট্রদূত হওয়া একজনকে এমন মিশনে নিয়োগ পেলে এটা তাদের জন্য মেনে নেয়া কষ্টকর। নেপথ্যের কলকাঠি তৃতীয় পক্ষ নাড়ছেন। সংবাদটি বেশ কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো হলেও একমাত্র ওই পত্রিকাটিই ছাপে। এই ক্ষেত্রে পত্রিকাটিও ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রবাসীরা মনে করেন।

খোঁজ নিয়ে যতদূর জানা গেছে, যারা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন, দেশকে ভালোবাসেন, তারা কোনো বিরোধিতা করছেন না। তাদের মতে একজন রাষ্ট্রদূত কাজ করবেন দেশের, তিনি ভালো, সৎ এবং যোগ্য লোক হলেই হলো। কোন রাজাকার কিংবা স্বাধীনতাবিরোধী না হলেই হলো।

আর যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন কিংবা রাজনীতিবিমুখ তারা কিন্তু বিরোধিতা করছেন না। জাতীয় নির্বাচনে ভোট প্রদানের সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে বলা যায় আওয়ামী লীগকে মোটামুটি ৩৮% থেকে ৪৩% ভোটার ভোট প্রদান করে থাকে। এবং এই ৩৮ ৪৩% এর একাংশ বিরোধিতা করছেন মাত্র। বৃহৎ অংশ কিন্তু নয়। তাদের সঙ্গে যোগ রয়েছে বাকি ৫৭% থেকে ৬২% পর্যন্ত নন আওয়ামী লীগার। তা হলে যোগফল কি দাঁড়াল? তা ছাড়া একটি দেশে আরেকটি দেশ রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেবে তখন একটি দলের একাংশ যখন বিরোধিতা করে তখন বুঝতে হবে তাদের উদ্দেশ্য ভালো নয়। এই ক্ষেত্রে দলের নাম ভাঙিয়ে দলের বদনাম করছে অথবা দলকে মিস্গাইডেড করছে। তারা না দল না দেশের ভালো চান। তারা আসলে যাদের ওপর কর্তৃত্ব করতে পারবেন এমন কোনো পুতুল রাষ্ট্রদূত চান। রাষ্ট্রদূত-এর ওপর খবরদারি করে তাদের ক্রীড়নকে পরিণত করতে চান। মজিবুর রহমান ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রচারণ চালানো হচ্ছে। ২০০৫ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তার জাপান কর্মজীবনে তিনি বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ তারা উল্লেখ করেননি। চারদলীয় জোটের সময় তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এমন নিয়োগ আরো ৪৬টি মিশনে একাধিক দেয়া হয়েছে। বদলি হয়েছেন, ক্লোজও হয়েছেন এবং কেউবা অবসরে গেছেন। এটাই স্বাভাবিক। পৃথিবীর সব দেশই এমনটি করে থাকে। কিন্তু তাই বলে বিগত সরকারের সব নিয়োগকে যদি অযৌক্তিকভাবে কালার করা হয় তা হলে প্রশাসন নামক সংস্থাটি স্থবির হয়ে পড়বে।

অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ২০০৮ সালে জাপান থেকে প্রকাশিত একটি প্রত্রিকায় উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয় ঐ সময় (২০০৮) ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে দূতাবাস বঙ্গবন্ধু প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন পূর্বক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেনি, এ জন্য অঙ্গুলি নির্দেশ করানো হয় তার প্রতি। যদিও সেই সময় রাষ্ট্রদূতের আসনে একজন আসীন ছিলেন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। দূতাবাসগুলো সব সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিদের্শনা পালন করে মাত্র। পররাষ্ট মন্ত্রণালয় যে নির্দেশনা দেয় সেই মোতাবেক মিশনগুলো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা থাকে।

২০০৮ সালের ১৫ আগস্ট শুক্রবার সকাল ৯টায় দূতাবাসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং অর্ধঃনমিতকরণ, বিশেষ মোনাজাত, বাণী পাঠ এবং আলোচনা সভার আয়োজন করে। সেখানে দূতাবাসের কর্মকর্তা, কর্মচারীবৃন্দ এবং মাত্র কয়েকজন প্রবাসী উপস্থিতি ছিলেন। তাদের একজন এই প্রতিবেদক। একই অবস্থা হয়েছিল ২০০৯ সালে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরও। এ বছর প্রবাসীদের উপস্থিতি ছিল আরো করুণ। দূতাবাস কর্মকর্তা এবং কর্মচারী ছাড়া একমাত্র প্রবাসী হিসেবে এই প্রতিবেদক উপস্থিত ছিল। যদিও সেই সময় বর্তমান সংসদের ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী এবং জিল্লুর হাকিম এমপি ১৫ আগস্ট উপলক্ষে জাপান সফররত ছিলেন। এ নিয়ে সাপ্তাহিক বর্ষ ২ সংখ্যা ১৮তে আমার একটি রিপোর্টও ছিল। যার শিরোনাম ছিল ‘জাতীয় শোক দিবস এবং কিছু কথা’। ঐ রিপোর্ট নিয়ে জাপানে অনেক হৈচৈও হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দূতাবাস কর্মকর্তা মজিবুর রহমান এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য এই প্রতিবেদক নিজে। একজন বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং অধঃনমিতকরণের সময় সশরীরে উপস্থিত থাকাটাই মোক্ষম সময়।

এই রকম বিতির্কত কর্মকাণ্ড যদি হয়েই থাকে তাহলে প্রতিটি মিশনেই তা হয়েছে। কারণ দূতাবাস একই মন্ত্রণালয়ের আন্ডারে। দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা হয়ে যদি এই কাজের জন্য সমালোচিত হয়ে থাকেন। তা হলে রাষ্ট্রদূত কেন সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকবেন? আর তিনিও যদি সমালোচিত হন তা হলে সিনিয়র কূটনীতিক-এর প্রশ্ন আসে কেন? তাদের নির্দেশদাতা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দায় এড়াতে পারে কি?

মহাজোট সরকারের সময় তাকে প্রমোশন দিয়ে ভুটানে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়া হয়। প্রথম রাষ্ট্রদূত হয়েই তিনি প্রধানমন্ত্রীর দু’দুটি রাষ্ট্রীয় সফর সফলতার সঙ্গে সমাপন করেন। তার এই সাফল্যে অনেকেই ঈর্ষান্বিত। এবং অনেকেই চান না যে একজন নবীন, রাষ্ট্রদূত মজিবুর ভূঁইয়া জাপানের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশে নিয়োগ পান। জাপান মিশনটি বিভিন্ন কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য প্রবাসীদের অবদান এই ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। তাছাড়া টোকিও মিশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেয়া টার্গেট ফুল ফিল করেছে। যেগুলো অন্যান্য সিনিয়র কূটনীতিকদের নিয়োগ পাওয়া মিশনগুলো সফল হতে পারেনি।

জাপানে রাষ্ট্রদূতের চেয়ার গত মার্চ থেকেই শূন্য রয়েছে। জাপানে মজিবুর ভূঁইয়ার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এবং ভুটানে সফলভাবে প্রধানমন্ত্রীর সফর মোকাবেলা করা উচ্চ শিক্ষিত এবং একজন সৎ ও দেশপ্রেমী হিসেবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসেন। তাই তাকে ঢাকায় তলব করা হয় এবং জাপানে নিয়োগ প্রসঙ্গে অবহিত করা হয় বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়। প্রবাসীরা এই সিদ্ধান্ত সে স্বাগত জানায় এবং প্রধানমন্ত্রীর দূরদৃষ্টির প্রশংসা করেন। সরকার যখন সব প্রক্রিয়া প্রায় শেষ করে এনেছে, জাপান সরকার থেকেও গ্রিন সিগনাল মিলেছে তখনি একটি স্বার্থান্বেষী মহল যে কোনো মূল্যে এ নিয়োগ বাচনাল করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। আর এই জন্য ব্যবহার করেন নিজ ঘরানার আরো দুই ব্যক্তিকে। যেকোনো ভালো কাজে বাধা আসেই, এটা অনাকাক্সিক্ষত হলেও বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রবাসের ব্যস্ততম জীবন সত্ত্বেও ছুটে যান বাংলাদেশ। তদবির শুরু করেন যেন এ নিয়োগ ঠেকানো যায়। এ যেন নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা রোধ করা।

কিন্তু এতে ক্ষতি হবে দেশের। বদনাম হবে জাপানে প্রবাসীদের, প্রবাসীদের বদনাম, দেশের ক্ষতির কথা তারা চিন্তা করেননি। বৃহৎ স্বার্থের কথা তারা চিন্তা করেন না। করেন নগদ পাওনার কথা, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই লবিংয়ের সঙ্গে জাপান আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা সম্পূর্ণই তথাকথিত একাংশের নিজস্ব চাওয়া-পাওয়া। তারা যেমন ব্যবহৃত হয়েছেন, তেমনি ব্যবহার করতে চেয়েছেন দলের পরিচয়ে দলকে। এ ব্যাপারে নেতৃস্থানীয় প্রবাসী আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারা যায় জাপান আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই এর সঙ্গে জড়িত নয়। এ ব্যাপারে তারা সরকারের সিদ্ধান্তকেই স্বাগত জানাবেন বলে নেতৃবৃন্দ জানান।

rahmanmoni@gmail.com

[ad#co-1]