মনের মানুষের খোঁজে

আসছে সেপ্টেম্বরে মুক্তি পাচ্ছে লালন শাহকে নিয়ে গৌতম ঘোষের ছবি ‘মনের মানুষ’। ৭ জুলাই কালের কণ্ঠে দলবল নিয়ে হাজির হয়েছিলেন গৌতম ঘোষ। সঙ্গে ছিলেন ছবির প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান, অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচী, তাথৈ, জিসান ও শিহাব। তাঁদের সঙ্গে আড্ডায় বসেছিলেন ইমদাদুল হক মিলন। গ্রন্থনা করেছেন দাউদ হোসাইন রনি

রঙের মেলা : লালনকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে_এই তাড়না আপনি প্রথম কবে অনুভব করেছিলেন?
গৌতম ঘোষ : নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন বাবরি মসজিদ ভাঙা হলো, তখনই আমার মাথায় এল, লালনকে নিয়ে ছবি নির্মাণ করতে হবে। বিশ্বজুড়ে ধর্মীয়, রাজনৈতিক যে অসহিষ্ণুতা, এর বিপক্ষে দাঁড়ানোর শক্তি একমাত্র লালনেরই আছে। একটা চিত্রনাট্যের খসড়াও করে ফেলি সে সময়। কিন্তু ছবিটা শেষ পর্যন্ত হয়নি। সুনীলদার (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়) সঙ্গে কথা হলো। বললেন, লালনকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখবেন। লেখা শেষ হলো, আমিও ছবি বানানোর কাজ শুরু করে দিলাম।
ইমদাদুল হক মিলন : লালনের যে দর্শন, তার কতটা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন?
গৌতম ঘোষ : আমি শুরু থেকেই লালনের জীবনী নির্মাণ করতে চাইনি। তাঁর দর্শনটাকেই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। অনেকেই জানেন না, লাঠি হাতে লালন মারামারিও করেছিলেন। সতীদাহের চিতা থেকে বিধবাদের উদ্ধার করার ঘটনাও আছে তাঁর।
রঙের মেলা : ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগার কি কোনো অবকাশ আছে এখানে?
গৌতম ঘোষ : মোটেই না। লালনের সময় সাধারণ গ্রামবাসীর মধ্যেও উচ্চমার্গীয় চিন্তাচেতনা দেখা যেত। শরিয়ত, মারফত সব মেনেই সে সময় সুষ্ঠু বিচারকাজ চলত।
রঙের মেলা : ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র পর ‘মনের মানুষ’। দুটি ছবিই বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত। মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রতি আপনার আলাদা একটা টান রয়েছে।

গৌতম ঘোষ : বলতে পারেন রক্তের টান, প্রাণের টান। আমার বাবা ছিলেন ফরিদপুরের, মা বিক্রমপুরের। জানেন, আমার খুব দুঃখ। ছোটবেলায় দেখতাম ছুটিতে বন্ধুরা সবাই গ্রামের বাড়ি বেড়াতে যেত। আমারই কোনো গ্রামের বাড়ি ছিল না। মাকে জিজ্ঞেস করলে বলত, গ্রামের বাড়ি আছে আমাদের, কিন্তু বাবা, সেখানে তো যাওয়া যাবে না। একজন বাঙালির জায়গায় দাঁড়িয়ে দুই বাংলাকে একসুরে গাঁথতে আমার ভালো লাগে। দেখবেন, আমার শিল্পী তালিকায় এখানকার শিল্পীরাও প্রাধান্য পান।
রঙের মেলা : দুই বাংলার প্রতি আপনার অনুরাগের মধ্যে কেউ যদি অন্য কোনো উদ্দেশ্য খোঁজেন, তাহলে আপনি কী বলবেন?
গৌতম ঘোষ : রাজনীতি আমার ভালো লাগে না। দেশভাগ ইস্যু বাঙালির কলঙ্কিত অধ্যায়। তবে যা হয়ে গেছে, তা নিয়ে মাথা ঘামাতে চাই না। ভবিষ্যতে হয়তো দেশভাগ নিয়েও কাজ করব।
ইমদাদুল হক মিলন : প্রযোজকরা সাধারণত এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে পাঁচ কোটি টাকা ফেরত পাওয়ার আশা করেন। হাবিব ভাইয়ের কাছে জানতে চাইব, প্রযোজক হিসেবে ‘মনের মানুষ’ নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
হাবিবুর রহমান খান : দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়বে, এ আশা আমি করি না। আমি যখন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ প্রযোজনা করি, তখনো এমন আশা ছিল না। এই ছবিতে আমার সঙ্গে ইমপ্রেস টেলিফিল্মও জড়িত। চলচ্চিত্র আমার ভালোলাগার জায়গা। একটা ভালো ছবির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখার আনন্দ অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করার মতো নয়। কলকাতায় একবার এক সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আচ্ছা দাদা, এই ছবিগুলো যদি আপনাকে ব্যবসা না-ই দেবে, তাহলে করছেন কেন? আমি তাঁকে কানে কানে বললাম, পুরনো দিনের চিত্রশিল্পীদের একটা চিত্রকর্ম এখন লাখ লাখ ডলারে বিক্রি হয়। আমি তো কম পয়সায় একটা ভালো ছবির মালিক হয়ে গেলাম! ভদ্রলোক আর কোনো কথা বললেন না। ‘মনের মানুষ’ ছবির ফাইনাল প্রিন্ট দেখার পর আমার মনে হয়েছে, এর চেয়ে ভালো হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আই অ্যাম মোর দ্যান স্যাটিসফায়েড।
রঙের মেলা : গৌতম ঘোষের কাছে আবার ফেরত যেতে চাই। ছবিটা কতটা সুনীলের আর কতটা গৌতমের ‘মনের মানুষ’?
গৌতম ঘোষ : বলতে পারেন এটা আমাদের ‘মনের মানুষ’। দুজনের অভিজ্ঞতার মিশেল আমাদের এই ছবি।
রঙের মেলা : লালনকে নিয়ে এর আগে বাংলাদেশে আরো একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। আপনি দেখেছেন সেটা?
গৌতম ঘোষ : হ্যাঁ, দেখেছি। তানভীরের (তানভীর মোকাম্মেল) সঙ্গে আমার কথাও হয়েছে। তবে লালনের মতো একটা বিষয় নিয়ে ২০টি ছবি নির্মিত হলেও এর আবেদন শেষ হবে না।
রঙের মেলা : রোকেয়া প্রাচীর কাছে আসি। আমাদের দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে, এমন বেশ কয়েকটি ছবির অভিনেত্রী আপনি। ‘মনের মানুষ’ ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল আপনার?
রোকেয়া প্রাচী : এককথায় বলব, স্বপ্নের মতো। শিল্পীর বাইরে আমি এমন একজন মানুষ, যে লালনকে অন্তরে লালন করে। দাদার সঙ্গে প্রথমবার কাজ করলাম। তিনি এমন একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে শিল্পীকে ফেলে দেন, শিল্পীর তখন তাঁর সেরাটা দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। দাদা কখনো আমাকে বুঝতে দেন না, আমার আরো ভালো করা উচিত ছিল। তাঁর সঙ্গে কাজ করে শিল্পী এবং মানুষ হিসেবে আমার অনেক সমৃদ্ধি ঘটেছে। অনেকটা সন্তানের মতো লালন করে তিনি আমাকে লালনের কাছে নিয়ে গেছেন।
হাবিবুর রহমান খান : শুটিংয়ের জন্য গৌতম আমার কাছে এমন একটা লোকেশন চেয়েছে, যেখানে একই সঙ্গে কুয়াশা, পাখি ও পানি থাকতে হবে। আমি তো চিন্তায় পড়ে গেলাম। গৌতম আমাকে বাংলাদেশের মানচিত্রে আঙুল দিয়ে বলল, ঠিক এইখানে। সেই জায়গাটা হলো টাঙ্গুয়ার হাওর। লোকেশনে গিয়ে গৌতম তো খুব খুশি। কিন্তু আমি পড়লাম চিন্তায়। এখানে শুটিং করব কিভাবে! এখানে এত শিল্পী-কলাকুশলী থাকবে কোথায়! গৌতম বলল, এখানে একপাশে তাঁবু টানিয়ে দাও। তবে প্রশাসন খুব সাহায্য করেছিল।
রঙের মেলা : আচ্ছা, প্রসেনজিতের মধ্যে লালনকে খুঁজে পাওয়ার গল্পটা একটু খুলে বলুন।
গৌতম ঘোষ : তাঁকে কাস্ট করার আগে আমার মাথায় এসেছিল, তাঁর চোখগুলো আমার খুব কাজে লাগবে। খেয়াল করলে দেখবেন, তাঁর চোখগুলো জ্বলে। মাঝবয়সী থেকে শুরু করে লালনের বিভিন্ন বয়সের গেটআপ তাঁকে দিয়ে করানো সম্ভব।
হাবিবুর রহমান খান : তবে দর্শক যখন ছবিটা দেখবে, তখন সেই চিরচেনা প্রসেনজিৎকে খুঁজে পাবে না।
রঙের মেলা : এখানে ‘মনের মানুষ’-এর আরো তিনজন সদস্য রয়েছেন, তাঁদের গল্প শুনি।
তাথৈ : এই প্রথম অভিনয় করলাম। নাচ করি ছোটবেলা থেকেই। অভিনয়ের বাসনা ছিল, তবে এভাবে হয়ে যাবে ভাবিনি। পুরো ইউনিটের মধ্যে আমিই ছিলাম সবার ছোট। আমার প্রথম দৃশ্য ছিল বুম্বাদার (প্রসেনজিৎ) সঙ্গে। প্রথমে তো ভয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম। বুম্বাদা আমাকে এত সহজ করে নিলেন, দেখিয়ে দিলেন কিভাবে অভিনয় করতে হবে। এমনকি একটা দৃশ্যে দুই সেকেন্ডের মধ্যে তিনি আমাকে কেঁদে দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে কাঁদতে হয়।
জিসান : ছবিতে আমি ছোটবেলার লালনের চরিত্রে অভিনয় করলাম। মজার কথা হলো, আমি অভিনয় করার পর আমার এক চাচা বললেন, যখন বড় হবে বুঝবে, কিসে কোথায় কার সঙ্গে অভিনয় করেছ। আমি আসলেই বুঝতে পারিনি। তবে এখন এটা বুঝতে পারছি, শুরুটা অনেক বড় কাজ দিয়েই হয়েছে।
শিহাব : আমি এ ছবির নির্বাহী প্রযোজকের কাজটা করেছি।
রঙের মেলা : আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ, রঙের মেলার আড্ডায় শামিল হওয়ার জন্য।

[ad#co-1]

Leave a Reply