রাশেদের বাবাকে বলি বাড়িটা আপনার কিন্তু সংসারটা আমার

রিতার ডায়রি-৫
রাশেদ আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে থাকে। সবটাই যে তাদের প্ল্যান অনুযায়ী হচ্ছে। রাশেদের সঙ্গে কথা বললেই রাশেদের বাবা ও মা আমাকে দোষ দিচ্ছে, কী নিয়ে ঝগড়া? আমি পুরনো কথা বলি। আসলে সবার কাছে আমার দোষ তুলে ধরা। কারণ বিষয়টা যখন প্রকাশ পায় তখন সবাই বুঝতে পারে রাশেদ ও আমার সমস্যার কথা। এর জন্য রাশেদ যে দোষী, তা প্রমাণিত হয়। রাশেদের দোষ ঢাকার জন্য তার বাবা, মা ও বোন সব সময় বলত, রিতা, তুমি পাপ করছ, কারণ তুমি স্মৃতিরে বাসায় রাখছ। আমি সবাইকে প্রমাণ করে দেখাতে চাই, হেরোইনখোর মামার মেয়েকে লেখাপড়া, কাপড়চোপড় দেওয়া, সাহায্য করার মানসিকতা নিয়ে এবং সবচেয়ে বড় কথা বোন হিসেবে বাসায় রাখা যদি পাপ হয়, সে পাপ আমি করেছি।

রাশেদ আবার নাটক করে বলে, না মা, এইটা বইলা লাভ নাই। কেউ বাসায় এলেই এটা হবে, এটা ভাবা উচিত না।

৫ অক্টোবর অনেক ঝগড়াঝাঁটি হয়। রাশেদ আমাকে অনেক মারে, পাবনের সামনে। রাশেদের মা, বোন ওপরে আসে। মা-বোনকে দেখে রাশেদের শক্তি চার গুণ বেড়ে যায়। আমি তখন রাশেদকে বলি, দেখ রাশেদ, এবার যদি আমি মরি একা মরব না। আমি আমার সন্তানদের নিয়ে মরব। রাশেদ বলে, যা খুশি তাই কর। রাশেদের মা, বোন রাশেদকে নিচে নিয়ে যায়। আমি তিন গ্লাস দুধ বানিয়ে ঘুমের ওষুধ দেই। ভাবি, দুই বাচ্চা নিয়ে মরে যাব, রাশেদকে আর বিশ্বাস করা যায় না। পাবনকে এক ঢোক খাওয়ানোর পর আমার হুঁশ ফিরে আসে। আম্মা বাসায় ছিল, পুরো ঝগড়াটা আম্মার সামনেই। দরজা খুলে আম্মাকে বলি, রাশেদকে ডাকো। মা, রাশেদ নিচে। আম্মা কান্না করতে থাকে_আমার নাতিরে তুই কী করছস? আম্মা নিচে গিয়ে দেখে লাইট বন্ধ করে শুয়ে পড়েছে ওরা। তারপর সুখন ও ওর মা আসে। আমি এর মধ্যে পাবনকে তেঁতুলের শরবত খাওয়াচ্ছি যাতে বমি করে। আমি রাশেদকে ডাকতে বলি। তারা বলে, রাশেদ বাঘ এসে তুলকালাম করে ফেলবে। আজান দেওয়ার পর তারা রাশেদকে ডাকে। এর মধ্যে রাশেদের মা বলে, একটু খাওয়াইছো কেন? পুরা গ্লাস খাওয়াইতা। আমি তখন বলি, খোঁটা দিয়ে আর কথা বলবেন না। দেরি করে রাশেদকে ডাকার কারণে এবং পাবনকে হসপিটালে নেওয়ার কারণে ওষুধের রিঅ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে। রাশেদ হসপিটালে আমাকে নিতে চায় নাই। আমি জোর করে যাই, সাথে আব্বাছ মামা, মমী, সুখন যায়। কবিতা ও পাটোয়ারী হসপিটালে, পাটোয়ারী দৌড়াদৌড়ি করে টাকা দিয়ে আইসিইউতে বেড নিয়ে দেয়। এর জন্য অবশ্যই তাকে ধন্যবাদ। হসপিটালেই রাশেদের কাছে আমি মাফ চাই এবং বলি, রাশেদ আমাকে মাফ করে দাও। পাবনের ওপর তোমার যে হক আছে, আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আমি ভেবেছি, পাবন শুধু আমার। এত কিছুর মধ্যে রাশেদ ওই স্মৃতির সঙ্গে যোগাযোগ করছে। আমাকে হসপিটালেই বলে, তোমার আর আমার সম্পর্কের জন্য পাবনের এ অবস্থা। আমি তখন বলি, তোমার আমার সম্পর্কের জন্য পাবন দুনিয়াতে আসছে। তোমার আর স্মৃতির সম্পর্কের জন্য পাবনের এ অবস্থা। আমার ছেলে হসপিটালে বিছানায়। আর এদিকে রাশেদের বাবা, মা, বোন, ভাই সবাই মিলে প্ল্যান করে, আমাকে বাসায় ঢুকতে দিবে না। রাশেদ বলে, সমস্যা কী, তুমি কযেক দিন আব্বাছ মামার বাসায় থাকো। পরিস্থিতি ভালো হলে বাসায় আইসো। আমি রাশেদকে বলি, তোমার মাথা খারাপ। আমার অসুস্থ ছেলে রেখে থাকব কী করে? রাশেদ বলে, আব্বা মানছে না। আব্বার তো একটা ঘাউরা রাগ আছে, তুমি জানো। আমি পাবনকে এ কথা বলি। পাবন রাশেদকে ডেকে বলে, আম্মুকে ছাড়া আমি বাসায় যাব না। মোবাইল দিয়ে ওর দাদাকে ফোন করে বলে, দাদা আমি আম্মুকে ছাড়া বাসায় আসব না।

বাসায় আসি। আসার পর আব্বাছ মামাকে ডাকা হয়। রাশেদের বাবা বলে, রাশেদের মাথা ঠিক নাই। কথা বলবা না। ছেলেদের অনেক সময় একজনকে ভালো লাইগা যায়। ওটা কোনো দোষের না। তোমারও কাউকে ভালো লাগতে পারে। রাশেদের বাবা ও মা সব জানত বলেই সব সময় এইগুলো বলত।

এরপর রাশেদ অফিসে যেত, দুপুর ১টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত স্মৃতির সঙ্গে থেকে আসত। অফিসের সামনে ইস্কাটনে ১৮ হাজার টাকার ফ্ল্যাট নিয়ে ওরে রাখছে, আর আমাকে বলতো অফিসের কাজে থাকলে ফোন ধরি না। অফিস থেকেও আমাকে ফোন করত অনেকে, রাশেদ সাহেব দুপুরে লাঞ্চে গেলে দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে আসে না, ফোনও ধরে না। ব্যাপারটা সন্দেহজনক। আমি দুই দিন ফোন দেই, পাবন ফোন দেয়, ধরে না। দুপুরে ওর সঙ্গে থেকে ভালো ছেলের মতো সন্ধ্যায় বাসায় চলে আসত। আমাকে বলে, ওই মেয়েকে ফোন করছি না। কিন্তু তোমার সঙ্গেও থাকতে পারছি না। আমি বলি, রাশেদ তুমি ওর সঙ্গে আমার জোড়া দিচ্ছ কেন? ওই মেয়ের সঙ্গে প্রতিদিন দুপুরে থেকে এসে আমাকে অসহ্য দেখাত। একদিন বলল, তুমি যদি পাবন পায়েলকে আমাকে দাও, তাহলে আমি কোনো দিন সন্তান হওয়াব না। আমি বলি, বিয়ে ছাড়া একটা মেয়ের সঙ্গে থাকতে পারলে সন্তান দিয়ে কী হবে? আমার এত ঘৃণা লাগত যে, কাউকে বলতে পারছিলাম না। রাশেদ নোংরা কথা আমাকে বলতো অথচ ওর বাবা-মায়ের সামনে বলতো, আমি পুরনো কথা বলছি। রাশেদের বাবা আমার ওপর রাগারাগি করছে। এমনই ছোট ইস্যুকে বড় করে রাশেদ বলে, আমি বাসায় থাকতে চাই না। বাসায় না এলে বলবে, আমি স্মৃতির সঙ্গে থাকছি। এটা যে তাদের সবার জানা প্ল্যান, আমি জানি না। রাশেদ বাসায় আসে না। মেসেজ পাঠায়, আমি হোটেলে, ঘুমাতে চাই। রাশেদের বাবা আমাকে বলে, আমার ছেলে বাসার বাইরে ঘুরতেছে। আর তুমি বাসা দখল করে বসে আছ। তখন আমি বলি, বাড়িটা আপনার কিন্তু সংসারটা আমার। সে অনেক কথাই বলে যাতে আমি বাসা ছেড়ে চলে যাই, কিন্তু আমি তা করি নাই। (চলবে)

[ad#co-1]