রাশেদের থাপ্পড় খেয়ে আমি বলি এটা কি বিয়েবার্ষিকীর উপহার

রিতার ডায়রি-২
স্মৃতি যখন আমার বাসায় আসে তখন আমি রাশেদের বাবার সঙ্গেই খেতাম। যখন পায়েল পেটে আসে ও সুখনের আচরণে আমি রাশেদকে বলি, আমার একটা বাচ্চা হয়েছে আর একটা হবে। আমি আমার মতো করে সংসার করতে চাই, যেখানে আমার বাচ্চারা নিজেদের মতো করে বড় হবে। রাশেদ মন খারাপ করে এবং বলে, ঠিক আছে। সংসার আলাদা হয় পায়েল হওয়ার আগে। স্মৃতি আমার বাসায়। পাবন ওর কাছে যায়, ওকে চেনে। এর মধ্যেই রাশেদ ও স্মৃতিকে নিয়ে কাজের মানুষরা টুকটাক কথা বলা শুরু করে। আমি গুরুত্ব দিয়ে দেখিনি। কারণ আমি রাশেদকে বিশ্বাস করতাম। পায়েল পেটে থাকা অবস্থায় স্মৃতির বিষয় নিয়ে রাশেদের সঙ্গে কথাকাটাকাটি হলে রাশেদ আমার গায়ে হাত তোলে এবং বলে, ওকে আমার ভালো লাগে।

আমি আম্মাকে বললে স্মৃতিকে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ ব্যাপারটা যখন প্রকাশ হয় রাশেদ বলে, রিতা, আমি রাগের মাথায় বলেছি। এখন তো সবাই আমাকে ভুল বুঝবে। আমি আবার রাগের মাথায় পাবনকে বিছানায় আছাড় মেরেছিলাম। রাশেদ আমাকে টেলিফোনের তার পেঁচিয়ে মারতে চেয়েছিল। তখন এ বাসায় কবিতাও ছিল। সবাই যখন জানতে চায় তখন আমি বলি, পাবনকে আছাড় মারাতে। তখন রাশেদ আমাকে বলে_ধন্যবাদ। নতুবা সবাই ভাবত আমি স্মৃতির জন্য এটা করেছি। আমাকে রাশেদ বুঝায়, পাবনকে কোলে রাখে, এর জন্য বলেছি ওকে ভালো লাগে। এর বেশি কিছু না। আমিও ভাবলাম, রাশেদ পাবনকে অনেক ভালোবাসে হয়তো, তাই। পায়েল হওয়ার সময় হয়ে আসে। আমি হসপিটালে এডমিট হব। আমি কাঁদতে কাঁদতে শেষ। আমি পাবনকে কার কাছে রেখে যাব। তখন আম্মা আবার স্মৃতিকে আনে। এবং প্রতিদিন পাবনকে রাতে রাশেদ হসপিটাল থেকে আসার পর বাসায় দিয়ে যেত ও স্মৃতি সকালে নিয়ে যেত। তখন থেকেই স্মৃতি ও রাশেদের শারীরিক সম্পর্ক। পাবন ও পায়েল পেটে, দুইটা সিজার বাচ্চার দায়িত্ব, আমি রাশেদ থেকে দূরে সরে যাই। স্মৃতি পুরোপুরি রাশেদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। অনেক কিছু বোঝা সত্ত্বেও আমি কনফার্ম হতে পারছিলাম না। আমি রাশেদকে এত ছোট ভাবতে পারছিলাম না, যার জন্য আশপাশ থেকে ধোয়া ওঠা সত্ত্বেও আমি কিছু কাউকে বলছিলাম না। আমি নতুন সংসার, নতুন মেহমান, এদেরকে ঘিরে আমার যে সংসার, তা নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। রান্না শিখতে যেতাম। তখন গাড়িও ছিল না। সিএনজি করে কোথায় কোথায় গিয়ে রান্না শিখতাম রাশেদের জন্য! রাশেদ খেতে পছন্দ করত। আমি জীবন সাজাতে ব্যস্ত, রাশেদ আর স্মৃতি শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে ব্যস্ত। কাজের মেয়েরা বলত, আমি স্কুলে চলে যাওয়ার পর স্মৃতি আমার বেডরুমে গিয়ে রাশেদের সঙ্গে শুয়ে থাকত। রাশেদের ওপর আঙুল তোলা আমার জন্য কষ্টকর ছিল এই জন্য_আমি রাশেদকে নিজে থেকে বিয়ে করেছি এবং রাশেদের পারিবারিক ও সামাজিক যে ইমেজ ছিল, তার ওপর আমার সঙ্গে রাশেদের ঝগড়া বাড়তে থাকে, সম্পর্ক খিটমিট পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু রাশেদের কোনো চেঞ্জ নেই। রাতের পর রাত স্মৃতিকে নিয়ে ঝগড়া, সকালে ঘুম থেকে উঠে স্মৃতি, রাশেদ আমাকে বুঝাত এগুলো আমার সব অসুস্থ মনের চিন্তাভাবনা, কিছুই না। আমি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে থাকি। কখনো রাশেদকে বিশ্বাস করার চেষ্টা করি, কখনো আশপাশের কথাকে। এভাবে ছয় বছর স্মৃতি আমার বাসায় ছিল। আমি স্মৃতিকে কাপড় থেকে, লেখাপড়ার খরচ থেকে, কলেজে যাওয়ার রিকশা ভাড়াও দিতাম। কিন্তু এত সমস্যার পরও ওকে আমি কিছু বলতাম না, যা বলার রাশেদকে বলতাম। এই যে আমার যন্ত্রণা, সবকিছু কাউকে বলতাম না। শেষে ২০০৩ সালে স্মৃতি আমার বাসা থেকে যায়।

যে রাশেদ পাবন ও পায়েলের জন্য সন্ধ্যায় বাসায় চলে আসত আমি বাইরে গেলে, সে রাশেদ স্মৃতি চলে যাওয়ার পর রাত ১১টার আগে আসত না। শুরু হলো আবার ঝগড়া, কথাকাটাকাটি। রাশেদ আমাকে বলত ২+২=৪ করার চেষ্টা করো না। আমি ৪ করার চেষ্টা করছিলাম না। হয়ে যাচ্ছিল। ২০০৩, ৮ জুলাই আমাদের ১২তম বিবাহবার্ষিকী। সেটা বেশ বড় করে করা, রাশেদের বন্ধুবান্ধব সবাই আসে। স্মৃতি চলে যাওয়ার আগে রাশেদ একদিন ছোট একটা বিষয়কে ইস্যু করে আমাকে অনেক মারে (রাশেদের মা তখন উপরে আসে। রাশেদ ওর মার সামনেই অনেক মারে এবং বলে, এ মেয়েকে আমার ভালো লাগে না। রাশেদের মাকে আমি বলি, দেখছেন মা, কি বলে! তখন রাশেদের মা বলে, সব দোষ তোমার। রাশেদের মা ব্যাপারটা জানল।)

১২তম বিবাহবার্ষিকীতে স্মৃতিকে না বলা সত্ত্বেও ও আসে। তখন রাশেদের মা আমাকে বলে, ও আসছে কেন? ওকে অপমান করে বিদায় কর। আম্মা ছিল, আমি বললাম ঝামেলা করার দরকার নেই। বাসায় গেস্ট ভরা। যে জানে না সেও জানবে। যা হোক, বন্ধুদের সঙ্গে রাশেদ ব্যস্ত ছিল, একটু অন্যমনস্ক ছিল, গেস্ট সব বিদায় হলে রাতে রাশেদকে বলি মার কথা, মা যে স্মৃতিকে অপমান করতে চেয়েছিল। রাশেদ আমার ওপর রেগে যায় এবং গালে থাপ্পড় মারে। আমি রাশেদকে বলি, এটা কি আমার বিবাহবার্ষিকীর উপহার?

পরের দিন রাশেদ খুব সকালে চিটাগাং চলে যায়। রাশেদ তখন ঘন ঘন চিটাগাং যেত। আমার কানে আসত যে, স্মৃতিকে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি প্রমাণ করতে পারছিলাম না। একদিন ঝগড়া লাগলে ও বলে, দীপুকে জিজ্ঞেস করো। আমি দীপু ভাইকে ফোন করি, জিজ্ঞেস করি। দীপু ভাই বলে, না তো ভাবী। আমি চুপ করে যাই। যা হোক, ২০০৩-এর বিবাহবার্ষিকীর ঝগড়ার পর রাশেদ বলে, ঝগড়া বাদ দেও। চলো, দেশের বাইরে ঘুরতে যাই। আমি খুশি, রাজি হয়ে যাই। রাশেদ আমাকে নিয়ে সিঙ্গাপুরে যায়। ঘুরে আসার পর শুনতে পাই, রাশেদ ও স্মৃতিকে টিএসসিতে একসঙ্গে দেখা গেছে। স্মৃতির অনেক বন্ধু আমার বাসার টেলিফোন নাম্বার জানত। সে সবার কাছে আমার নাম্বার দিয়ে রেখেছিল। এসব উল্টাপাল্টা কথা শুনলে কার মাথা ঠিক থাকে? রাশেদকে বলতাম, ও বলত_প্রমাণ করো। আমি প্রমাণ করতে পারতাম না। যারা ফোন করত, সব টিঅ্যান্ডটিতে। তখন কলার আইডিও ছিল না যে নাম্বার ট্রেস করা যাবে। রাশেদ আমাকে বলত, সব তোমার অসুস্থ মনের কল্পনা। ২১ জুলাই ২০০৩, দুটি ঘুমের ওষুধ খেয়ে বিকেলে শুয়ে ছিলাম। আমি সকালে ফোন পাই, রাশেদ ও স্মৃতি একসঙ্গে। রাশেদ বাসায় আমার সঙ্গে অনেক খারাপ ব্যবহার করে ঘুমের ওষুধ খাওয়ার জন্য। সকালবেলা ওর মাকে ডেকে বলে, মা, এ মেয়েকে বাসা থেকে বের করেন। ওর আত্দীয়স্বজনকে ফোন করেন। ওর মা উপরে আসে। কী নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া, তা না শুনে রাশেদকে বলে, বলেছিলাম না, রাস্তাঘাটের মেয়ে বিয়ে করিস না। আমার আব্বা না থাকাতে আমি রাস্তাঘাটের মেয়ে, গরিবের মেয়ে, আব্বাছ মামার রিকশা ব্যবসার জন্য রিকশাওয়ালার ভাগি্ন, এগুলো ছিল। রাশেদের বাসায় আমি রিতা, হিরোনচির ভাগি্ন। আমি কাউকে ফোন করতে না করি। রাশেদ বাড়াবাড়ি করতে থাকে ওর মা ও ছোট বোনকে নিয়ে সঙ্গে। আমি তখন বলি, যে মেয়ের জন্য জীবন নষ্ট হয়েছে তার সঙ্গে তোর বিয়ে দিয়ে বাসা থেকে বের হবো। তখন রাশেদ ৫ বছরের পাবনকে বলে, যা পাবন, খালার সঙ্গে স্মৃতিকে নিয়ে আসো। আমি স্মৃতিকে বিয়ে করে ওকে বাসা থেকে বের করবো, খালা সাক্ষী।

আব্বাছ মামা, আম্মা আসে। রাশেদের মা সব সময় ছেলেকে উসকে দিত, সেদিনও তাই। আম্মা ও আব্বাছ মামা আমাকে বুঝিয়ে চলে যায়। দুপুরটা চুপচাপ, বিকেলে রাশেদের মা উপরে আসে ও বলে, কেমন মা ও মামু, মাইয়াটা রেখে গেল? রাশেদের মার সামনেই রাশেদ আমার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়, বলে পুড়ে মর। বলে মা ও ছেলে নিচে চলে যায়। পরের দিন আমি সবার কাছে বলি, আমি আগুন দিয়েছি। কারণ আমার পাবন+পায়েলের মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক কিছুই সহ্য করেছি। পরে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাশেদের মা ও বোন সবই জানত, তার পরও চুপচাপ। আমি হাসপাতাল থেকে এসে কাউকে কিছুই বলি নাই। সবাইকে বলি, আমিই অপরাধী। রাশেদের অপরাধ ঢাকতে গিয়ে নিজেই অপরাধী হয়ে যাই। কারণ, রাশেদ পাবন ও পায়েলের বাবা_এটা আমি কখনই ভুলি নাই। রাশেদকে আমি হসপিটাল থেকে আসার পর বলি, তুমি ভালো স্বামী না, কিন্তু তুমি ভালো বাবা। আমি রাশেদের সঙ্গে স্মৃতির ব্যাপারটা নিয়ে বসি এবং ক্লিয়ার হতে চাই। যত ক্লিয়ার হতে চাচ্ছিলাম ততই জটলা পেকে যাচ্ছিল। রাশেদের অত্যাচার বেড়ে যাচ্ছিল। আমাকে গায়ে হাত উঠানো যেন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে গিয়েছিল। আমি বুঝে গিয়েছিলাম রাশেদের মানসিক পরিবর্তনের কথা। কিন্তু কাউকে বলছিলাম না, কারণ সেটা আমার ও আমার সন্তানদের জন্য ভালো হবে না। যত মানুষ জানবে ততই রাশেদের লজ্জা-শরম চলে যাবে। আমি শুধু রাগ করতাম আর রাশেদ গায়ে হাত দিত। রাশেদ মুখে কিছু বলত না। হঠাৎ করে গায়ে হাত ছেড়ে দিত। আমি নিজেকে বাঁচানোর জন্য অনেক সময় রাশেদের গায়ে হাত দিয়েছি, খামচি দিয়েছি। অস্বীকার করব না। এভাবেই জীবন যাচ্ছিল, কখনো ভালো কখনো মন্দ। (চলবে)

[ad#co-1]