নিজের চেয়ে কাউকে বেশি ভালোবাসবেন না

রিতার ডায়েরি-১
রাজধানীর জুরাইনে গৃহবধূ ফারজানা কবির রিতা তাঁর দুই সন্তান পায়েল আর পাবনকে নিয়ে আত্দহত্যা করার কয়েক দিন আগে তাঁর বাসার কাঠের আলমারিসহ বেশ কিছু মালামাল পাঠিয়ে দেন মামারবাড়িতে। ওই আলমারি থেকে সিআইডি রিতা, পায়েল আর পাবনের লেখা বেশ কয়েকটি ডায়েরি, চিঠি ও স্ট্যাম্প দলিল উদ্ধার করে। কালের কণ্ঠের সরেজমিন অনুসন্ধানেও আমাদের হাতে আসে রিতার লেখা একটি ডায়েরি। পুলিশের চোখে পড়েনি এই ডায়েরি। এই ডায়েরিটি পাওয়ার পর কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে পুলিশকে দেখিয়ে এবং পুলিশের কাছে জব্দ তালিকায় সংরক্ষিত ডায়েরির সঙ্গে মিলিয়েও নিশ্চিত হওয়া গেছে, এই ডায়েরির হাতের লেখা রিতারই। রিতার মা মাজেদা বেগম আর মামা আব্বাস দেওয়ানও শনাক্ত করেন, ডায়েরিটি রিতার লেখা। আজ থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে এই ডায়েরি। মুদ্রণের ক্ষেত্রে আপত্তিজনক মনে হওয়ায় ডায়েরির কোথাও কোথাও সামান্য সম্পাদনা করতে হয়েছে।

রাশেদের বাবা শফিকুল কবির যখন ইত্তেফাকের চিফ রিপোর্টার আমি তখন এই ২২৯ নম্বর সোনার তরীতে আসি। রাশেদের বাবা হচ্ছে এক নাম্বার চাপাবাজ, মিথ্যুক এবং চরিত্রহীন। একপর্যায়ে এমন কিছু ঘটে, যাতে তার সাথে আমি বাধ্য হয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিই। সেটা রাশেদও জানে। আমার সন্তান হওয়ার আগের ঘটনা। রাশেদের মা-বোন জানত না, রাশেদ জানত, কারণ সে দিন রাশেদ বাসায় ছিল।

রাশেদের মা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মা, কারণ ছেলের বৌকে কথা শুনাতে হবে। উনি শুনাতেন না, উনি শুধু কবির সাহেবের কানে দিতেন, রাশেদের মা হয়ে কবির সাহেব যখন ছেলের বৌকে বকা দরকার বকা দিতেন, মেয়ের জামাইকে বকা দরকার, বকা দিতেন, মেয়ে শ্বশুরবাড়ি যাবে না, দরকার নেই, আগে মেয়ে। জামাই দিয়ে কী হবে, ছেলে দ্বিতীয় বিয়ে করছে, সমস্যা নেই, নাতি+নাতনি দিয়ে কী হবে, ছেলের শারীরিক সুখই মায়ের কাছে বড় সুখ।

কবিতা ও সুখন দুই বোন হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ ননদ। দুইজনের কেউ মুখে কথা না বলে, যা করার তা কাজ করে দেখাতে অভ্যস্ত। রাশেদও তাই, মুখে না কাজে বিশ্বাসী।

সুখন-কবিতা, তোরা যেমন আমার শত্রু স্মৃতিকে সমর্থন দিয়ে পাবন+পায়েলের সঙ্গে বেইমানি করছস, তোদের তিন মেয়ের সঙ্গে আল্লাহ বেইমানি করবে। সুখন তুই বড় সাংবাদিকের মেয়ে হয়ে ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারস নাই। তুই যত কষ্ট করে তোর মেয়ে বড় করস না কেন? কোনো দিন ভালো করতে পারবি না। কারণ পাবন+পায়েলের বদদোয়া কখনোই বৃথা যাবে না।

আমি সমাজের সবাইকে একটা কথা বলি। নিজের চেয়ে কাউকে বেশি ভালোবাসবেন না। আমি রাশেদ+পাবন+পায়েলকে ছাড়া দুনিয়াতে কিছু দেখি নাই। নিজেকে ভালোবাসুন সবাই। আর মুখ বুজে কিছু সহ্য করবেন না, ভালোবেসে যা সহ্য করবেন, অপর পক্ষ ভাববে আপনার দুর্বলতা। আমার সহ্য করার যতটুকু ছিল করেছি। আর না। আইনে আমার বিশ্বাস নেই। কবির সাহেব প্রশাসনিকভাবে, সামাজিকভাবে চাপ দিচ্ছে। আমি কতটুকু সহ্য করতে পারব জানি না। যদি সহ্য করতে না পারি, ওদেরকে আমি ছাড়ব না। যা হয় হবে। কিসমতে যা হবে তাই মেনে নিব। সবাইকে তাই মেনে নিতে হবে। আমি সুস্থ ও সজ্ঞানে একথা লিখলাম।

শফিকুল কবির আমার পাবনের দাদা। রাশেদের চরিত্র খারাপ আরেকটা বিয়ে করেছে। তাই উনি পাবন, পায়েলকে বলে কোনো চিন্তা নেই, আমি দাদা আছি না। অথচ পাবন+পায়েলকে একবেলা নিয়ে খাওয়ানো প্রয়োজন বোধ করে নাই। রাশেদের বাবা লন্ডনে নেংটা মেয়েদের নাচ দেখেছে। সেটা সে গর্ব করে আমাকে বলেছে। এগুলো কোনো ব্যাপার না। রাশেদের ছোট চাচা দুই বিয়ে করেছে তাই রাশেদ চাচার চরিত্র পেয়েছে। এটা রাশেদের বাবা আমাকে বলেছে। রাশেদের একটা ফুফু। রাশেদের বাবা তার সাথে কথা বলে না। সেটা বলতেও উনি প্রাউড ফিল করে।

আমি রিতা আমার জীবনের কিছু অংশ সবার সাথে শেয়ার করতে চাই। যা এত দিন সমাজ, পরিবার ও নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎ মানসম্মান-এর চিন্তা করে বলতে পারি নাই এবং নিজেও বলতে চাই নাই। আমরা সবাই বাঁচতে চাই। আমিও চাই, কিন্তু আমি মানসম্মান বিসর্জন দিয়ে বাঁচতে চাই নাই বলে দুইবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসছি, এবার কি হবে তাও জানি না।

এবার আসল কথায় আসি। আমার বিয়ে হয় রাশেদের সাথে ১৯৯১ সালে ৮ জুলাই। আমরা দুইজন পছন্দ করে নিজেরা বিয়ে করি, রাশেদের বাবা তখন ইত্তেফাকের চিফ রিপোর্টার। রাশেদ তাদের একমাত্র ছেলে। অন্যদিকে আমার আব্বা ও ভাই কেউ নাই। আমি যখন দেড় বৎসরের তখন আব্বা মারা যায়। আম্মা মামাদের সাথে জুরাইনে বাড়ী কিনে। কারণ আম্মাও একা ছিল, মামাদের মানসিক সাপোর্ট আম্মার জন্য দরকার ছিল। জুরাইনের পরিবেশ তখন ভাল ছিল না বলে আম্মা আমাকে ভারতেশ্বরী হোমসে রেখে লেখাপড়া শেখায়। আমার বিয়ের পর রাশেদের বাবা ও মা ও বোনরা কখনই মন থেকে মেনে নেয় নাই। সমাজকে দেখানোর জন্য অনুষ্ঠান করে ওদের বাসায় নিয়ে আসে। এত জটিল ফ্যামিলি এর আগে দেখি নাই। কারণ বাংলা সিনেমায় যেমন নায়কের সামনে একরকম, নায়ক সরে গেলে আর এক রকম। রাশেদের সামনে ওর মা, বোনের ভূমিকা ছিল এক। রাশেদের সামনে মা থাকে আর এক রকম। আমি আবার ডিপ্লোমেটিক মেন্টালি নিয়ে বড় হই নাই। যা সত্য তা সত্য, যা মিথ্যা তা মিথ্যা। মিথ্যাটা পছন্দ করি না। কারণ একটা মিথ্যা বলে দশটা মিথ্যা বলার পক্ষপাতী ছিলাম না। এগুলো আমার সমস্যা তৈরি করছিল। কারণ রাশেদ ভণ্ডামিটা খুব পছন্দ করত, আমি না। আমার বিয়ে ১৯ বৎসর চলছে। চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যে জীবন চলছিল। আমার বাচ্চাও হচ্ছিলো না, কনসেফ করে এবরসন হয়ে যাচ্ছিল। রাশেদ যেহেতু এক ছেলে তাই বংশ রক্ষার একটা মানসিক চাপ ছিল। একে তো নিজের ইচ্ছায় বিয়ে, তারপর আবার বেবি না হওয়ায় আমি প্রচণ্ড মানসিক চাপে ছিলাম। রাশেদের সামনেই একদিন ওর ছোট বোন সুখন আমাকে বলেছিল যতদিন বাচ্চা না হয় ততদিন আমি রাশেদের বাবার বাড়িকে আমাদের বাড়ি বলতে পারি না। তারপর আমি টি চৌধুরীর আন্ডারে চলে যাই। রাশেদের বড় বোন কবিতার এক বাচ্চা। আর একটা হবে। দিন দিন মানসিক চাপ বাড়ছিল, রাশেদের দুই বোন সব সময় আমাকে বলত, আমরা বাবারটা খাই ভাইও খায়। তাই কেউ কাউকে কিছু বলার নাই। রাশেদ তখন কিচ্ছু করত না।

টি. এ চৌধুরীর আন্ডারে লেপোরোস্কপির পর ১৯৯৭ সনে আমার একটি সন্তান পেটে আসে। একটা সন্তানের জন্য করি নাই এমন কিছু বাকি ছিল না। তাবিজ কবজ যে যা বলত তাই। সেই সন্তান যখন পেটে আসে আমার দুনিয়াটা অন্যরকম হয়ে যায়। তখন সুখনের বাচ্চাও পেটে ছিল। কবিতার দুই মেয়ে। ৮ মাসের সময় আমার প্রচুর ঠাণ্ডা লাগে। সুখনের মেয়ে হয় এক মাস আগে পাবনের। সুখনের মেয়ে নরমাল হয় নাই, কেমন যেন বিকট ধরনের। সবার কথায় বুঝতে পারছিলাম। আমাকে দেখতে না বলা হলে মনের ভিতর ভয় ঢুকে গেল, আমার যেন কি হয়। ভয়ে বিপি বেড়ে গেল। বাচ্চার মুভমেন্ট কমে গেল। তাড়াতাড়ি ডাক্তার-এর আন্ডারে চলে গেলাম। সিজার হল। পাবন হল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আল্লার দান। মানুষের পেটে মানুষ। আমি ও বাসার সবাই অনেক খুশি। রাশেদের বাবা নাতির উপলক্ষে ১২ দিনের দিন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আমিও পেট বেঁধে মার্কেটে সবার জন্য কাপড় কিনে আনলাম। একটা সন্তান মানুষের জীবন পাল্টে দেয়। আমি মেয়ে, বৌ এবং তারপর মা হয়ে গেলাম। এর মধ্যে সমস্যা হলো পাবন অসুস্থ হওয়ায় ওর প্রতি রাশেদ বা আমার কেয়ারিং অনেক বেশি ছিল।

আমি যেন ভুলেই গেলাম রাশেদের কথা। শুধু পাবন। এর মধ্যে সুখনের শ্বশুরবাড়িতে ওর মেয়ে হওয়াতে খুশি না। তার উপর বিকট। চার মাসের মাথায় সুখন শ্বশুরবাড়িতে যায় এবং ব্যাক করে বলে, সে আর কোন দিন যাবে না। রাশেদের সামনে তার মা আগে পরে আমাকে বলতো, আমার ১ ছেলে না আমার দুই ছেলে। আমি এগুলোকে মনে কিছু মনে করতাম না বললে ভুল হবে, তবে পাবনকে নিয়ে ব্যস্ত থাকাতে বাদ দিয়ে চলছিলাম। কিন্তু সমস্যা হলো তখন, যখন সুখন সব বিষয়ে ঝামেলা শুরু করল। কারণ পাবন ছেলে। রাশেদের বাবা বলত, এটা আমার বংশধর, আমার উত্তরাধিকার। এই কথা সুখনের ভাল লাগত না। সে ৬ মাসের পাবনকে বলত এটা তোর বাপের মাল না। যা খাওয়ার খেয়ে নে। বড় হয়ে আমার মেয়ে তোদের খাওয়া ছুটাবে। তখন আর ভাল লাগল না। ৬ মাসের মাথায় পায়েল পেটে। রাশেদ জানে না। আমি কর্নফাম হয়ে রাশেদকে বলি। ওর খুব মন খারাপ হয়ে যায়। ডাক্তারের পরামর্শ নিলে ডাক্তার এবরশন করতে না করে। আমি খুব অসুস্থ হয়ে যাই। পাবনের এক মাসের মধ্যে স্মৃতিকে আম্মা আবার বাসায় আনে। ওর মেট্রিক পাস করার পর, আম্মা বলে, নাতিকে কোলে রাখবে, তোর একটু সাহায্য হবে। স্মৃতিকে আমি বা আমরা বলতে আমি, আম্মা, মিতালী কখনও মামাতো বোন ভাবি নাই। বোনতো বোনই।

[ad#co-1]