আমি যদি একদিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী হতাম

নূহ-উল-আলম লেনিন
পাঠক ক্ষমা করবেন। লেখাটা প্রতীকী অর্থে ধরবেন। আমি শতভাগ নিশ্চিত ব্যক্তিগতভাবে আমার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য হওয়ারও কোনো যোগ্যতা নেই এবং সেই সম্ভাবনাও নেই। আমার অনেক শুভানুধ্যায়ী আমাকে বলেন, তুমি একটা পার্লামেন্টারি পার্টি করো অথচ নির্বাচন করতে চাও না। তুমি কী নির্বাচন বা জনগণকে ভয় পাও নাকি দল তোমাকে নমিনেশন দেবে না ভেবে আগাও না। আমি বলি, তোমরা যা বলেছ তার সবগুলো কারণই সত্য হতে পারে। এমনকি আমার মনে হয় আমার ইউনিয়ন পরিষদে সদস্য হওয়ার যোগ্যতাও নেই। এখন সেই আমি কিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চাচ্ছি! আমার লেখার এরকম শিরোনাম দিচ্ছি শুনে আমার একাধিক বন্ধু বললেন, ‘তোমার মাথা ঠিক আছে তো।’ আরেকজন বললেন, দলীয় পদটাও হারাতে পার হে।

আমি অবশ্য এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে, আমার কিছুই হবে না। কারণ আমি যা হতে পারব না তা নিয়ে কারো মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। আর যে কথাগুলো বলব সে কথাগুলো শোনার ধৈর্য্যও কারো আছে বলে মনে হয় না। কথাগুলো কথার কথাই থেকে যাবে।

সে যাক এবার আসল কথাই আসি। বাংলাদেশে অনেক মানুষই ভারতের একটি জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমা দেখে থাকবেন। সিনেমাটির নাম ‘নায়ক’। এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন অনিল কাপুর। অনিল কাপুর একদিনের জন্য একটি রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। ইন্টারেস্টিং পপুলিস্ট কাহিনী ও চরিত্রটি দারুণ দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ওই হিন্দি ছবিটি আমাকে এ লেখায় উদ্বুদ্ধ করেছে। গৌরচন্দি কা এখানেই শেষ।

ধরা যাক আমি একদিনের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হলাম। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আমার প্রধানমন্ত্রীত্বের কাল। এই স্বল্প সময়ে আমি কী কী কাজ করব? প্রথমেই বলে রাখি আমি হিন্দি ফিল্মে দর্শকের হাততালি পাওয়ার মতো কোনো কাজ করব না। আমি প্রথমেই দেশের বিশিষ্ট ও সৎ দেশপ্রেমিক নাগরিকদের নিয়ে একটি ছোট কমিটি করব। তাদের দায়িত্ব হবে, কী কী সম্ভাব্য কারণে একটি জনপ্রিয় সরকার জনপ্রিয়তা হারাতে পারে তা চিহ্নিত করা এবং আগামী নির্বাচন পর্যন্ত সরকারের জনপ্রিয়তা ধরে রেখে কীভাবে আবার বিজয় নিশ্চিত করা যায় সেসম্পর্কে একদিনের মধ্যে প্রতিবেদন রচনা করা। বলাবাহুল্য আমি চাই আগামী নির্বাচনেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান মহাজোট বিপুলভাবে বিজয় লাভ করুক। আমার কমিটি তাদের প্রতিবেদন তৈরী করতে থাকবে আর এ সুযোগে আমি কয়েকটি নির্বাহী আদেশ জারি করব।

আমার প্রথম আদেশ হবে, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রদত্ত অঙ্গীকার অনুযায়ী সকল মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বার্ষিক আয়ের বিবরণী গেজেট আকারে বেলা ১২টার মধ্যে প্রকাশ করতে হবে। যারা তাদের বার্ষিক আয়ের প্রতিবেদন প্রকাশে ব্যর্থ হবেন তাদের সংসদ সদস্যপদ/মন্ত্রীত্ব সাময়িকভাবে খারিজ হবে। দ্বিতীয়ত আমি একটি অর্ডিন্যান্স জারি করে নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতা অর্পণ করব ১) নির্বাচনের আগে প্রার্থীগণ বিশেষত নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ তাদের আয়ের উৎস ও সম্পদের যে বিবরণ দিয়েছেন, সে বিবরণ যথার্থ কিনা তা নির্বাচন কমিশন পরীক্ষা করে দেখবেন। যদি কারো আয়ের উৎস বা সম্পদ বিবরণী যথার্থ এবং প্রমাণসহ বিশ্বাসযোগ্য না হয় তাহলে মিথ্যা বিবরণ দেয়ার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সংসদ সদস্যপদ বাতিল বলে ঘোষিত হবে। ২) বার্ষিক আয় ও সম্পদ বিবরণী নির্বাচন কমিশন পরীক্ষা করে দেখবেন। এ বিবরণ ও নির্বাচনকালে দেয়া বিবরণীতে যদি কোনো অসঙ্গতি থাকে অথবা তথ্য গোপন করা হয় বা আয়ের উৎস অযথার্থ বলে প্রতিয়মান হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের সদস্যপদ বাতিল এবং অবৈধ আয় ও তথ্য গোপনের অপরাধে তাকে গ্রেফতার করে বিচার ও শাস্তির বিধান করা হবে। আমি এ দুটি কাজ করব জাতীয় সংসদের সদস্যদের মর্যাদা সমুন্নত করতে এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতাকে নিশ্চিত করা এবং বিশেষ করে মহাজোটের প্রতি জনগণের আস্থা সমুন্নত করার লক্ষ্যে। জনগণ মনে করবে মহাজোট যে অঙ্গীকার দেয় তা পূরণ করে এবং সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীরাও কোনো অন্যায় করলে রেহাই দেয়া হয় না।

অত:পর আমি আরেকটি অধ্যাদেশ জারি করব। এ অধ্যাদেশটি সম্পর্কে বলার আগে একটু ভূমিকা দিয়ে নেই। এ কথা সবাই জানেন আমাদের দেশের একটি প্রধান সমস্যা হচ্ছে দুর্নীতি ও দুর্বাত্তায়ন। বিএনপি জামাত জোট সরকারের দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাটের ঘটনা সকল সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে উপর্যোপরি ৫ বছর শীর্ষ স্থান দখল করেছে। বাংলাদেশকে মনে করা হত অকার্যকর রাষ্ট্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান দলগুলো জেহাদ ঘোষণা করে থাকে। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট দুর্নীতি নির্মূলকে তাদের ১ নম্বর এজেন্ডা হিসেবে ঘোষণা করেছিল। কিন্তু পাঠক জানেন ক্ষমতায় গিয়ে তারা করেছেন ঠিক বিপরীত কাজ। দুর্নীতি কমিশন গঠন করলেও তাকে হাস্যকর ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করা হয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগও তার নির্বাচনী ইশতেহারে ৫টি অগ্রাধিকারের মধ্যে ২ নম্বরেই র্দ্নুীতির বিরুদ্ধেই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার করেছে।

দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি মোটামুটি শতকরা ৭০ ভাগও যদি কমিয়ে আনা যায় তাহলেও উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার ডাবল ডিজিটে পৌঁছাতে পারে। এমনকি দুর্নীতি ৫০ ভাগ কমিয়ে আনতে পারলেও উন্নতির পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে ৭০ ভাগ বেশী হওয়া সম্ভব। অবিশ্বাস্য মনে হয় না এ তথ্য? কিন্তু প্রকৃত সত্য এর কাছাকাছি। এটাই বাস্তবতা। এ যাবৎ সবগুলো সরকার নির্বাচনে হেরেছে অথবা ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ বা কলঙ্ক মাথায় নিয়ে।

কেউ চায় না দিন বদলের সরকার দুর্নীতির অভিযোগে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হোক এবং দুর্নীতির কারণে নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া অঙ্গীকার ব্যর্থ হোক। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমি যদি একদিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী হই তাহলে আমি ১) দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি অর্ডিন্যান্স জারি করব। এতে থাকবে দলমত নির্বিশেষে বড় ধরনের দুর্নীতিবাজদের সংক্ষিপ্ত আদালতে বিচার এবং ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ডের বিধান, যাবৎজীবন সশ্রম কারাদণ্ড, তার সকল সম্পত্তি বাতিল এবং সারাজীবনের জন্য যেকোনো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া অযোগ্য ঘোষণা করা। ২) আমি দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রকৃত স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ক্ষমতা অর্পণ করব। ৩) জনপ্রতিনিধিদের মতো সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের আয় ও সম্পদের উৎস প্রতি বছর প্রকাশ্যে বার্ষিক প্রতিবেদন দেয়া বাধ্যতামূলক করব। তাদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে এবং নামে বা বেনামে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ থাকলে উপরে উল্লেখিত শাস্তি তাদের ব্যাপারেও প্রযোজ্য হবে।

আমি জানি একদিনে এদেশকে স্বর্গ বানানো যাবে না এবং সকল কেন কোনো সমস্যার সমাধান হয়তো রাতারাতি করা যাবে না। তবে একদিনে নয়, এক মুহূর্তে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে যার প্রতিক্রিয়া হবে সুদূরপ্রসারী।

দেশের সবাই জানে বাংলাদেশের প্রধান আর্থ সামাজিক সমস্যা হচ্ছে দারিদ্র্য। দারিদ্র্য দূরীকরণ তাই মহাজোট সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারের বিষয়। রাতারাতি দারিদ্র্য দূর না হোক তবুও এমন কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে সমাজে বিদ্যমান আয় ও ধন বৈষম্য আর না বাড়ে এবং ধনী ও দরিদ্রের ধন বৈষম্যের পরিমাণ একটি মানবিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়। মুক্ত বাজার অর্থনীতি চালু থাকবে।

তবে মুক্ত বাজারের নামে নিয়ন্ত্রণহীন শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্য নয়। ব্যক্তি মালিকানা থাকবে। কিন্তু যার যত বেশী আয় তাকে প্রগতিশীল হারে তত বেশী কর প্রদান করতে হবে এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে অবদান রাখতে পারে এ ধরনের খাতে বাধ্যতামূলকভাবে কিছু না কিছু বিনিয়োগ করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে রাষ্ট্রীয়, ব্যক্তিগত এবং সরকার ও ব্যক্তির যৌথ মালিকানায় শ্রমঘন স্থানীয় কাঁচামাল ভিত্তিক ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প গড়ে তুলতে সর্বাত্মক উৎসাহিত করা হবে। এবং এ ধরনের কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনমূলক প্রকল্পে সকল প্রকার কর মওকুফ করা হবে। শ্লোগান হবে ‘দারিদ্র্য সবার জন্য লজ্জা!’ ‘আমরা কেউ দরিদ্র থাকতে চাই না।’

কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দেশী বিদেশী বিনিয়োগ। এ বিনিয়োগের পথে এখন দুটি প্রধান বাধা। ১) জ্বালানী ও বিদ্যুৎ সমস্যা ২) আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা।

আমি জানি বাংলাদেশে সস্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস যে প্রাকৃতিক গ্যাস (বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় গ্যাসে) তা ফুরিয়ে আসছে। খালেদা-নিজামীর সরকারের লুটপাট ও দুর্নীতি এ খাতের ১২ টা বাজিয়েছে। ৫ বছরে তারা ১ মেগাওয়াটও নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন করে নাই। বর্তমান সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য অতিরিক্ত খরচে রেন্টাল ও পিকিংপাওয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদনের বেশ কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এতে আশু সমস্যার সমাধান হয়ত কিছুটা হবে কিন্তু ইউনিট প্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে খরচ পড়বে তা অর্থনীতিকভাবে আখেরে লাভজনক হবে না। সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য আমাদের নির্ভর করতে হবে মাটির তলায় সঞ্চিত কয়লা বা আমাদের কালো সোনার উপর। বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে উš§ুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন ও কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। বাস্তবতা বর্জিত দায়িত্বহীন কিছু লোকের মায়াকান্নার জন্য উš§ুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন থেকে বিরত থাকা হবে উন্নয়ন বিরোধী আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আমি প্রধানমন্ত্রী হলে নির্দেশ জারী করব যেখানে যেখানে সম্ভব আজ থেকেই উš§ুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের কাজ শুরু হবে। খনি অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের উন্নত নাগরিক সুযোগ-সুবিধাসম্মত পুর্নবাসন ব্যবস্থা করব। এভাবে আমাদের কয়লা সম্পদের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করে আমরা আগামী ৫০ বছরের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করব।

টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে। কিছু সংখ্যক চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ ছাত্রলীগ বা যে নামধারী হউক না কেন তাদের ভোটে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়নি। তাদের জন্য আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা ক্ষুণœ হোক অথবা মানুষের আস্থা হারাক কোন সুস্থ মানুষ এটা চাইতে পারে না। ইতিমধ্যেই তারা মহাজোট সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ করেছে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার দিনবদলের সনদ ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার আহবান এবং এই কর্মসূচি নতুন প্রজš§কে উৎসর্গ করা ছাত্র তরুণদের মধ্যে প্রবল ইতিবাচক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সবগুলোর নির্বাচনী গবেষণাপত্রেই বেরিয়ে এসেছে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশে নির্দলীয় ছাত্র তরুণদের নিরুঙ্কুশ সমর্থন পেয়েছেন শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ। এবার যারা প্রথম ভোটার হয়েছেন তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কোন দল না করলেও আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন। এখন এ সাধারণ ছাত্র তরুণরা কিছু সংখ্যক ছাত্রলীগ নামধারীর কর্মকাণ্ডে হতাশ এবং ক্ষুব্ধ। আমরা যদি মূলধারার ছাত্র তরুণদের সমর্থন ধরে রাখতে চাই এবং তাদের জাতি গঠনের কাজে লাগাতে চাই তাহলে চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজদের ছাড়তে হবে।

আমি প্রধানমন্ত্রী হলে আগামী ৩ বছরের জন্য সকল ছাত্র সংগঠনের তৎপরতা নিষিদ্ধ করব। একইসঙ্গে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজিতে কোনো ছাত্র তরুণ জড়িত থাকলে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে তাৎক্ষণিকভাবে তাদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার, গ্রেফতার এবং কঠোর শাস্তির নির্দেশ দেব। আমি ছাত্র সংসদগুলোর কর্মকাণ্ড চালু করব এবং ছাত্র সংসদকে ঘিরে ছাত্রদের শিক্ষা বর্হিভূত গঠনমূলক নানামুখী কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করব। স্থানীয় সরকারের মতো নির্দলীয় ভিত্তিতে আপাতত ৩ বছরের জন্য ছাত্র সংসদগুলোর নিয়মিত নির্বাচনের ব্যবস্থা অনুমোদন করব। আমি ছাত্র রাজনীতিকে সুস্থ ও সৃজনশীল মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে প্রতিভাবান ছাত্রদের ছাত্র রাজনীতিতে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে পরিবেশ সৃষ্টির পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। ছাত্র রাজনীতিকে দলীয় লেজুড়বৃত্তি এবং কলুষমুক্ত করার লক্ষ্যে প্রকৃত সৎ প্রতিভাবান ও দেশপ্রেমিক ছাত্রদের নতুন ধারার ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলার দিক-নির্দেশনা দেব।

আমি নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক দল আইন ও বিধি অধিকতর সংশোধন এবং আধুনিক করতে বলতাম। আমি আইন করতাম ১) প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নির্দিষ্ট মেয়াদের সদস্য নবায়ন ও সদস্য সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা হবে এবং দলীয় সদস্যদের ডিজিটাল তালিকার সিডি নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হবে।

নির্দিষ্ট মেয়াদে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্য নবায়ন অথবা নতুন সদস্য করতে ব্যর্থ হলে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল অথবা তার যেকোনো জেলা বা উপজেলা কমিটিতে বাতিল বলে ঘোষণা করতে পারবে। বাতিল ঘোষিত জেলা উপজেলা থেকে কেউ কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। এ কাজটি রাজনৈতিক দলের উপরও ছেড়ে দেয়া যায়। তবে রাজনৈতিক দল কাজটি বিধিমাফিক করছে কিনা তা দেখার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনকে দেয়া হবে।

বস্তুত বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য পদের প্রকৃত রেজিষ্ট্রার নেই। জামাত ও সিপিবি ছাড়া বড় দলগুলো সদস্যপদের ধার ধারে না। শক্তিশালী ও সংগঠিত রাজনৈতিক দলের বিকাশের এটি একটি বড় বাধা। আমি এ সংস্কৃতিকে বদলে দিতাম। ২) কেন্দ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত গোপন ব্যালটে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের বাধ্যতামূলক কমিটি নির্বাচন করার ব্যবস্থা করতাম। কাউন্সিলের পরেও বছরের পর বছর কমিটি না করা অথবা কেবল সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক করে অন্য পদগুলোকে শূন্য রাখা নিষিদ্ধ করতাম। পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকলে নির্বাচন কমিশন যেকোনো রাজনৈতিক দলের রেজিষ্ট্রেশন বাতিল করতে পারবে।

আমি প্রধানমন্ত্রী হলে অধ্যাদেশ জারি করতাম, জনগণের নির্বাচিত কোনো প্রতিনিধি বা কোনো সংসদীয় রাজনৈতিক দল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকতে পারবে না। ওয়াক আউট করা যাবে, একনাগারে সর্বোচ্চ একদিনের অধিবেশন বর্জন করতে পারবে, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে সংসদ বর্জন নিষিদ্ধ হবে। এইভাবে সংসদ বর্জন করলে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্যগণ সংসদ সদস্য হিসেবে প্রাপ্য সকল সুযোগ-সুবিধা হতে বঞ্চিত হবেন। দ্বিতীয়ত উন্নয়নের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতাম। আমি কঠোরভাবে বিনিয়োগের জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করতাম।

প্রিয় পাঠক সর্বশেষ আমি ৩ টি কাজ করতাম। ১) আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা ঘোষণা, ১৯৭২ সংবিধানের জাতীয় ৪ মূলনীতি পুনবহাল এবং সাম্প্রাদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করে সংবিধান সংশোধন করতাম।

সংবিধানকে অধিকতর যুগোপযোগী করার জন্য আমি ১ টি সংবিধান কমিশন গঠন করতাম।

আমি আইন করতাম সংবিধানে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পর তার যেকোনো অবমাননা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তেমনি কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে তাদের দলীয় রাজনীতিতে অথবা নির্বাচনে (বঙ্গবন্ধুর নাম বা প্রতিকৃতি ইত্যাদি) ব্যবহার করতে পারবে না। বঙ্গবন্ধু সর্বজনীন, সমগ্র জাতির সম্পদ। কেবল জাতীয় দিবসগুলোতে (যেমন স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, একুশে ফ্রেব্রুয়ারী, ৭ই মার্চ, ১৭ই মার্চ এবং ১৫ আগস্ট) বঙ্গবন্ধুর নাম ও প্রতিকৃতি ব্যবহার করা যাবে। জাতির পিতাকে দলীয় ও সকল বিতর্কের উর্দ্ধে রাখতে হবে।

২) আমি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচার করার নির্দেশ দিতাম। গ্রেফতার রেখেই তদন্ত কাজ ও বিচার শুরু করতাম। আমি যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থন ও প শ্রদানকারীদেরও যুদ্ধাপরাধের সমার্থক অপরাধ হিসেবে গণ্য করে শাস্তির বিধান করতাম।

৩. আমি কী কী কারণে একটি জনপ্রিয় সরকার জনপ্রিয়তা হারাতে পারে তা অনুসন্ধান এবং আগামী নির্বাচনে কী কী কাজ করলে আবার বিজয় নিশ্চিত করা যায় সে ব্যাপারে যে বিশিষ্ট নাগরিকদের কমিটির কথা প্রথমেই বলেছিলাম সে কমিটির প্রতিবেদনটি বর্তমান প্রধানন্ত্রীকে হস্তান্তর করে আমার ১দিনের প্রধানমন্ত্রীত্বের দায়িত্বভার ত্যাগ করতাম। বিশিষ্ট নাগরিকদের ওই প্রতিবেদনে যেসব সমস্যা চিহ্নিত করা হত তাতে গুরুত্ব দেয়া ছাড়াও মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে যদি অযোগ্যতা, অদক্ষতা, বা অন্য কোনো গুরুতর অভিযোগ আনা হত সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রীসভা পুনর্গঠনের সুপারিশ থাকলে আমি তা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে বিবেচনা করতে বলতাম।

প্রিয় পাঠক এটা হিন্দি ফিল্ম নয়। আমার কল্পকাহিনীর কোনো কিছুই হবে না। তারপরেও কল্পনা করতে দোষ কি!

[লেখক : রাজনীতিক]

[ad#co-1]