ফুটবলের জন্য মন খারাপ হয়

ইমদাদুল হক মিলন
গেণ্ডারিয়াতে বিশাল একখানা মাঠ ছিল। ধুপখোলা মাঠ। আট-দশটা দলে ভাগ হয়ে ফুটবল খেলা হতো সেই মাঠে। ক্রিকেট সিজনে ক্রিকেটও হতো। মাঠের ধারে ইস্ট অ্যান্ড ক্লাব। স্টেডিয়ামে সেই ক্লাবের খেলা থাকলে আমরা দল বেঁধে খেলা দেখতে যেতাম। কী উত্তেজনা, কী রোমাঞ্চ। আমাদের বাড়ির পাশে ফুটবল ধারাভাষ্যকার হামিদ ভাইদের বাড়ি। গৌরব করে বলতাম, আমরা হামিদ ভাইদের বাড়ির পাশে থাকি।

ছোটবেলা থেকেই আমি একটু অপদার্থ টাইপের। কোনো খেলাই তেমন পারতাম না। ছেলেবেলায় নানির কাছে যখন থেকেছি তখন একবার গ্রামের মাঠে মামাদের সঙ্গে খেলতে গিয়েছিলাম। আমার বয়সী আরো কেউ কেউ খেলছিল। বড়দের কে একজন কঠিন একটা শুট করল। বল এসে লাগল সোজা আমার বুকে। দম বন্ধ হয়ে আমার প্রায় মরো মরো অবস্থা। মাঠ থেকে ধরাধরি করে বাড়ি নিয়ে আসা হলো। নানি আমার ফুটবল খেলা বন্ধ করে দিলেন।

ঢাকায় এসে বাড়ির কাছে এত বড় মাঠ পেয়ে, বন্ধুদের দেখাদেখি দু-চার দিন ফুটবল খেলার চেষ্টা করেছি। আমার বন্ধু ইউসুফ খুব ভালো খেলত। ওর দলের হয়ে একদিন মাঠে নেমেছি। দেড় ঘণ্টার খেলায় একবারও পা দিয়ে বল ছুঁতে পারিনি। যখনই বলের দিকে দৌড়ে যাই অন্য প্লেয়ার এসে ছিনিয়ে নেয়। সেই খেলায় হেরে গিয়ে ইউসুফ আমাকে শুধু একটা কথাই বলেছিল, তোর মতো খেলোয়াড় আমি জীবনে দেখিনি। পরে আমি আর খেলিনি। দর্শক হয়ে মাঠের ধারে বসে থাকতাম।

ইউসুফদের সঙ্গে একবার ঠাটারীবাজারের ওদিককার এক টিমের খেলা। খেলা হবে আউটার স্টেডিয়ামে। তখনো মাঠটি পল্টন ময়দান হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেনি। ফুলবাড়িয়ায় রেলস্টেশন। আউটার স্টেডিয়ামে দেয়াল-টেয়াল নেই, একদম ফাঁকা তিন দিক। উত্তর দিকে স্টেডিয়াম। ধুপখোলা মাঠের মতো ১০-১২টি দল আশপাশের এলাকা থেকে এসে ফুটবল খেলে। ও রকম এক দলের সঙ্গে খেলা। গেণ্ডারিয়া থেকে রেললাইন ধরে বলধা গার্ডেনের ওদিক দিয়ে আমরা মাঠে গেছি। খেলার একপর্যায়ে মারামারি লেগে গেল। ঠাটারীবাজারের ওদিক থেকে গরু জবাই করার ছুরি হাতে কসাইরা দৌড়ে এলো আমাদের কাটতে। খেলা ফেলে জান নিয়ে দৌড়।

তখন ফুটবল মানেই উন্মাদনা, ফুটবল মানেই মারামারি, হৈচৈ। ধুপখোলা মাঠেও প্রায়ই ফুটবল নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় মারামারি হতো। নামাপাড়ার ছেলেরা প্রায়ই অন্য পাড়ার খেলোয়াড়দের মারতে যেত। পাড়ার সর্দাররা সেসব ঝামেলা মিটাতেন।

বড় হয়ে ইউসুফ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে খেলতে গেল। ততদিনে তুখোড় খেলোয়াড় সে। মাঠে নেমেই, প্রথম খেলাতেই হ্যাটট্রিক। আমরা, বন্ধুরা গ্যালারিতে বসে ইউসুফের জন্য চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে ফেললাম।

আহা সেই সুখের দিন কোথায় হারিয়ে গেল! বাংলাদেশের ফুটবল কোথায় হারিয়ে গেল?

‘৮২ সালের দিকে আমরা কয়েক বন্ধু মিলে একটা এড ফার্ম করেছিলাম। স্টেডিয়ামের পশ্চিম দিককার রাস্তার ওপাশে ‘খাবার দাবার’ রেস্টুরেন্ট। তার পাশের বিল্ডিংয়ের চারতলায় অফিস। আবাহনী-মোহামেডান খেলার দিন রণক্ষেত্র হয়ে যেত এলাকাটি। বিকেলের দিকে আমরা অফিস থেকে নামতামই না। সমর্থকদের মারামারি, হৈচৈ। পুলিশের লাঠিচার্জ, কখনো কখনো কাঁদুনে গ্যাস। দু-চারজন সমর্থককে টেনেহিঁচড়ে পুলিশের গাড়িতে তোলা_চারতলার রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দৃশ্য আমরা দেখতাম।

এক বিকেলে ওরকম মারামারির সময় আমার ছোট ভাই খোকন, সে তখন নটর ডেম কলেজে পড়ে, দুই বন্ধু নিয়ে ভয়ার্ত ভঙ্গিতে লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠল আমাদের অফিসে। স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে ঢুকেছিল। মারামারি আর পুলিশের লাঠিচার্জের মধ্যে পড়ে গেছে। ভাইয়ের অফিস কাছে দেখে দৌড়ে ঢুকেছে।

আমি খুবই রেগে গেলাম। তুমি জানো আবাহনী-মোহামেডানের খেলায় মারামারি হয়। খেলা দেখতে আসছ কেন?
আমার বন্ধু আরেফিন আমাকে ধমক দিল। আসব না কেন? এত বড় খেলা, স্টেডিয়ামে এসে ওরা দেখবে না?
কখন কোন ফাঁকে যে ফুটবলের এই জৌলুস, এই উন্মাদনা আমরা হারিয়ে ফেললাম, টেরই পেলাম না। কী ছিল তখন আমাদের ফুটবল। বড় টিমের খেলাগুলোর দিন সাজসাজ রব পড়ে যেত ঢাকায়। অফিস-আদালত ফেলে লোকজন ছুটে যেত স্টেডিয়ামে। স্কুল-কলেজ ছুটি হয়ে যেত আগে। নিজ নিজ দলের সমর্থনে মিছিল বেরুত পাড়ায় পাড়ায়। এখনকার ভাষায় কত সুপারস্টার ফুটবলার ছিল আমাদের দেশে।

এই উপমহাদেশের মানুষ ফুটবল খেলে শ খানেক বছর ধরে। দেশ বিভাগের আগে বাঙালিরা ধর্মকে ভিত্তি করে ক্লাব গড়েছিল, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব মুসলমানদের। মোহনবাগান হিন্দুদের। পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম বাংলায় চলে যাওয়ারা দল তৈরি করলেন ‘ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব’। সেই সময়কার বড় বড় রাজনীতিকরা একেকটি ফুটবল ক্লাব তৈরির পেছনে কাজ করলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পরিবার ছিল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব তৈরির নেপথ্যে। বাঙালির ফুটবল একসময় আন্তর্জাতিক মাত্রায় পেঁৗছেছিল। কত কিংবদন্তির খেলোয়াড় তখন। চুনি গোস্বামী, ফুটবলের জাদুকর সামাদ। লোকমুখে প্রচলিত মাঠের জাদুকর সামাদ বলের পেছনে ছুটতেন না, বল ছুটত তাঁর পেছনে। তখনকার বাঙালি সংস্কৃতির রাজধানী কলকাতায় মোহামেডান-মোহনবাগান কিংবা ইস্ট বেঙ্গলের খেলার দিন কলকাতার রাস্তা ফাঁকা হয়ে যেত। সব মানুষ মাঠে। ঢাকায়ও সেই চেহারাই ছিল। পাকিস্তান আমলে তো ছিলই, স্বাধীনতার পর আমাদের প্রজন্ম, আমরাই তো দেখেছি ভয়াবহ ফুটবল উন্মাদনা। তার কানাকাড়িও আজ আর নেই। স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা হচ্ছে কি না, কারা কারা খেলছে এই খবরও সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, ফুটবলপ্রেমীরাও রাখেন না। ফুটবলটা কেন এভাবে মরে গেল তার কারণ খুঁজতে গেলে বহু কথা বলতে হবে। সেই গল্পের মতো। যুদ্ধে হেরে সেনাপতিকে রাজা জিজ্ঞেস করেছেন, আমরা যুদ্ধে হারলাম কেন? সেনাপতি বললেন, ৩১টা কারণ ছিল হুজুর। রাজা বললেন, একটা একটা করে বলো। সেনাপতি বললেন, প্রথম কারণ হলো হুজুর, কামানে গোলা ছিল না। রাজা বললেন, বাকি ৩০টা আর বলার দরকার নেই। আমাদের ফুটবলে কামানের গোলাটিই আসলে নেই। যে গোলা তৈরি হয় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায়, চিন্তাশীল মানুষদের সমবেত চেষ্টায় এবং গভীর ভালোবাসায়। আমাদের এই জায়গাগুলোই নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু খেলোয়াড়দের দোষ দিয়ে লাভ কী?

কেউ কেউ বলেন, ঠিক আছে ভাই, আমাদের ফুটবল না হয় শেষ হয়ে গেছে কিন্তু ক্রিকেটে তো আমাদের দেশ ভালো করছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রেখে আমাদের ক্রিকেট বাংলাদেশের নাম পেঁৗছে দিয়েছে বিশ্বের বহু মানুষের কাছে। ওয়ার্ল্ড কাপে পাকিস্তানকে একবার হারিয়েছিল। অন্যান্য খেলায় একবার বিশ্বসেরা অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে, শচীন টেন্ডুলকারের ভারতকে হারিয়েছে। একবার আইসিসি ট্রফি জিতেছে। এসব ঠিকই আছে। পাশাপাশি আছে ক্রিকেটের লজ্জাজনক এবং হাস্যকর অনেক পরাজয়ের ইতিহাস। কিন্তু ক্রিকেট আছে বলে ফুটবল থাকবে না, আমাদের ফুটবলাররা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গিয়ে একবারও জ্বলে উঠবে না, এটা কেন হবে না?

এর মধ্যে একদিন হুমায়ূন আহমেদের ফ্ল্যাটে গেছি। সেদিন জার্মানির খেলা ছিল। তিনি সেই খেলা দেখছেন না। টেলিভিশনের সামনে বসে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত ক্রিকেট দেখছেন। সেদিন বাংলাদেশ খেলছিল। খুব ভালো খেলছিল না বাংলাদেশ, তবু তিনি মুগ্ধ হয়ে দেখছেন। বললেন, বাংলাদেশের খেলা থাকলে আমি অন্য কিছু দেখি না।
নিজের দেশের প্রতি আমাদের ভালোবাসাটা এই রকম।

কুয়ালালামপুরে আইসিসি ক্রিকেট হচ্ছে। পাইলট দাঁড়িয়ে আছে ব্যাট হাতে। এক বলে এক রান দরকার। তা হলেই ট্রফি আসবে বাংলাদেশের হাতে। সারা দেশ স্তব্ধ হয়ে আছে, কী হয়, কী হয়! আমার বড় মেয়েটি তখন ক্লাস সেভেন না এইটে যেন পড়ে। তাকে দেখলাম পশ্চিম দিককার জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে মোনাজাত তুলেছে, আল্লাহ বাংলাদেশকে জিতিয়ে দাও। উত্তেজনায় চোখ-মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, বিড়বিড় করে দোয়া পড়ছে বাংলাদেশের জন্য। মেয়েটির মুখ দেখে আমি সেদিন বুঝেছিলাম নিজেদের দেশটিকে আমরা কত ভালোবাসি। ডক্টর ইউনূস যেদিন নোবেল প্রাইজ পেলেন, ফজলে হাসান আবেদ যেদিন নাইট উপাধি পেলেন, মুসা ইব্রাহিম যেদিন এভারেস্ট জয় করলেন, বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম যেদিন পাটের জিনোম আবিষ্কার করলেন, সেদিন, সেই দিনগুলোতে বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যেকে দেশের এই কৃতী সন্তানদের জন্য গৌরবে আলোকিত হয়েছে। দেশটাকে আমরা এ রকমই ভালোবাসি।

অনেক সম্ভাবনা থাকার পরও নিজেদের ফুটবলের জন্য এই ভালোবাসাটা আমরা তৈরি করতে পারলাম না। যেটুকু ভালোবাসা একসময় ছিল তাও ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে গেল। অথচ আমরা যে কী ফুটবলপাগল জাতি বিশ্বকাপ ফুটবলের দিকে তাকালেই সেটা টের পাওয়া যায়। বাংলাদেশ এই মুহূর্তে ভাগ হয়ে গেছে দুটো দলে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল। দেশের আনাচকানাচে, ঘরে ঘরে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা। আমার দুই মেয়ের একজন আর্জেন্টিনার, আরেকজন ব্রাজিলের সাপোর্টার। তাদের রুমে পাশাপাশি রাখা দুই দেশের পতাকা। অফিস-আদালত, শিল্প-কারখানা এবং গাড়িতে ফুরফুর করছে এই দুই দেশের পতাকা। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, বিশ্বকাপ ফুটবল বা ক্রিকেট খেলা চলাকালে ভিনদেশি পতাকা উত্তোলনের আইনগত বৈধতা নেই। তবে বিষয়টি স্পর্শকাতর। যুবসমাজের আবেগের কথা বিবেচনায় রেখে এ বিষয়ে আইনগত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা সরকারের নেই।

আমার বন্ধু আরেফিন বলল, বিশ্বকাপ আমি দেখি না। যে খেলায় বাংলাদেশ নেই, সেই খেলায় আমার কোনো আগ্রহ নেই। চারদিকে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের এত পতাকা দেখেও তার মন খারাপ। বাংলাদেশ যখন ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপে খেলে, তখন কি আমরা নিজেদের পতাকা এভাবে টাঙাই?

দিদার আমার আরেক বন্ধু। বিশ্বের সব বড় ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা আবিষ্কার করতে সে খুব ভালোবাসে। বলল, শোন, আমরা কিন্তু ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবলে আছি। মাঠেই আছে বাংলাদেশ। কিভাবে? দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাংলাদেশ ১০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের জার্সি, মোজা, গেঞ্জি, ট্রাউজার, ট্র্যাকস্যুট, ক্যাপ, হাফপ্যান্ট রপ্তানি করেছে। এসব জার্সি পরে মেসি, কাকা, রবিনহো, দ্রগবা, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোরা মাঠে নামছে। প্র্যাকটিস করছে বাংলাদেশের তৈরি ট্র্যাকস্যুট পরে। এটাও একটা বিরাট ঘটনা। বাংলাদেশ তো ওয়ার্ল্ড কাপে আছেই।

আফজাল দুঃখ করে বলল, যদি বাংলাদেশের টিম হিসেবে আমাদের ফুটবলাররা মাঠে থাকত তাহলে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা না, থাকত আমাদের পতাকা। চারদিকে নিজের দেশের পতাকা উড়ছে, এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কী হতে পারে!

নোবেল প্রাইজ পাওয়া পৃথিবী বিখ্যাত লেখক আলবেয়র কামু ফুটবলার ছিলেন। জন্মেছিলেন আলজেরিয়াতে, পরে ফ্রান্সের নাগরিক। কামু তাঁর ছেলেবেলায় আলজিয়ার্সের রাস্তায় ফুটবল খেলতেন। মূল টিমেও খেলেছেন পরে। ইউনিভার্সিটির জুনিয়র টিমের গোলকিপার ছিলেন। যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে ফুটবল ছেড়েছিলেন। ফুটবল নিয়ে তাঁর অসাধারণ একটি উক্তি আছে। নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার যা কিছু আমি শিখেছি তার সবটুকুর জন্য আমার ঋণ ফুটবলের কাছে।

আমরা চাই বাংলাদেশের ফুটবল আন্তর্জাতিক মানের হয়ে উঠুক।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
ই-মেইল : ih-milan@hotmail.com

[ad#co-1]