মদ ব্যবসায়ী রানা শফিউল্লাহ কেনিয়ার অনারারি কনসাল হলেন কি করে?

অবৈধ মদ ব্যবসায়ী রানা শফিউল্লাহ রিপাবলিক অব কেনিয়ার অনারারি কনসাল নির্বাচিত হওয়ায় কূটনৈতিক পাড়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়াসহ নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। সবার প্রশ্ন, চোরাই মদ-বিয়ার বিক্রি করে যার উত্থান, উপযুক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা যার নেই সেই রানা শফিউল্লাহ কীভাবে একটি দেশের কনসাল হয়েছেন। কোন যোগ্যতায় তাকে নির্বাচিত করা হয়েছে? অনেকে মন্তব্য করেছেন, একটি দেশের কনসাল হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও শুধু অবৈধ অর্থ, জোর লবিং, তদবির ও প্রভাবের জোরেই তিনি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, জানুয়ারি মাসে এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে কেনিয়ার অনারারি কনসাল নিয়োগ দেয়ায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে। জানা গেছে, কেনিয়া সরকারের এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাওয়ার পর দ্রুত বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন আদায়ে তার কষ্ট হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তের ফলাফল তার পক্ষে এনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মতি আদায় করেই তিনি এ পদে নিয়োগ পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ নিয়োগ পেতে তিনি বিপুল অংকের অবৈধ অর্থ খরচ করে মদ ও চোরাচালান ব্যবসার দুর্নাম ঘুচিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার অপচেষ্টা করছেন বলে মনে করা হচ্ছে। কেনিয়ার কনসাল নির্বাচিত হওয়ার পর সংবাদপত্রে রানা শফিউল্লাহ সচিত্র বিজ্ঞাপন দিয়ে তা প্রচারও করেছেন। মুন্সীগঞ্জ জেলার টুঙ্গিবাড়ীর জসলং ইউনিয়নের শেরজাবাদ গ্রামের একটি অতিদরিদ্র পরিবারে জš§গ্রহণকারী রানা শফিউল্লাহ এখন দেশের শীর্ষ ধনকুবের। তবে বৈধ পথে নয়, সম্পূর্ণ অবৈধ পন্থায় সরকারের শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি, চোরাই মদ বিক্রি ও লাগেজ ব্যবসার মাধ্যমে অপরাধ জগতে তার উত্থান বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। ১৭ জুন যুগান্তরে ‘মদ বেচে টোকাই রানা এখন দেশের শীর্ষ ধনকুবের’ শিরোনামে তথ্যবহুল সংবাদ প্রকাশের পর কোন প্রতিবাদ না করে রানা শফিউল্লাহ দু’একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে বলেছেন, যুগান্তরে প্রকাশিত রিপোর্ট মিথ্যা।

বিজ্ঞাপন প্রতিবাদে তিনি মদ ব্যবসায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে বলেছেন, বহু আগেই ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ওয়্যার হাউস এইচ কবীর এবং ঢাকা ওয়্যার হাউস তিনি বিক্রি করে দিয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে অন্য মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু কবে তিনি এসব প্রতিষ্ঠান বিক্রি করেছেন তার কোন সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করেননি। প্রতিবাদে তিনি অস্বীকারও করেননি অতীতে এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে শুল্কমুক্ত মদ-বিয়ার তিনি কালোবাজারে বিক্রি করেছেন কিনা। উচ্চ শুল্কের মদ-বিয়ার শুল্ক ফাঁকি দিয়ে কালোবাজারে বিক্রি করেই তিনি আজ দেশের শীর্ষ ধনকুবের এ অভিযোগ খণ্ডন না করে রানা শফিউল্লাহ যে দাবি করেছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যাচার বলে জানা গেছে। শফিউল্লাহ তার প্রতিবাদে নিজেই মদ বিক্রি করে আজকের অবস্থানে পৌঁছার কথা স্বীকার করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রানা শফিউল্লাহ নিজেও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন না। যুগান্তরের এ প্রতিনিধির সঙ্গে প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি তিনি। পরে জানান, সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি কে দেয় না। শুল্কমুক্ত মদ-বিয়ার বিক্রি করেই বড় হয়েছি; কিন্তু কেউ প্রমাণ করতে পারবে কি? তিনি মন্তব্য করেন, ‘এনবিআরের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কাস্টমসের সংশ্লিষ্টরা আমার টাকাতেই আজ কোটিপতি। তাদের সৎ সাহস থাকলে অনেক আগেই ধরা পড়তাম। তিনি বলেন, ওয়ান-ইলেভেনে আমার কিছু হয়নি। যুগান্তর আগেও আমার সম্পর্কে রিপোর্ট লিখেছে। কিন্তু কেউ আমার পশমও ছিঁড়তে পারেনি। আবার রিপোর্ট করে কি হবে?’ এ ধরনের দম্ভ খোদ রানা শফিউল্লাহ তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছেও করে থাকেন। যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসে অবৈধ অর্থের প্রভাবে তারাই টোকাই রানাকে শেল্টার দিচ্ছে বলে জানা গেছে। শুধু মাদক চোরাচালান এবং সরকারের রাজস্ব আÍসাৎ করেই তার এ উত্থান। আন্ডার ওয়ার্ল্ডে এখনও তিনি মাদকের মাফিয়া হিসেবে স্বীকৃত।

জানা গেছে, উচ্চশুল্কের মদ ও বিয়ার শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিক্রি করে তিনি নিজে অকল্পনীয় ধন-সম্পদের পাহাড় বানিয়েছেন। মাদকের অপরাধ সাম্রাজ্যকে শেল্টার দিয়ে নারকোটিক্স ও কাস্টমসের অসংখ্য কর্মকর্তাও কোটিপতি হয়েছেন তার সঙ্গে সঙ্গে। এ জন্য এখনও এ দুটি দফতরে তার প্রভাব অকল্পনীয়। বিশেষ করে কাস্টমস বন্ড কর্মকর্তারাই তাকে সহায়তা করে শুল্কমুক্ত মদ বিক্রিকে বৈধতা দিয়ে যাচ্ছেন। গুলশানের এইচ কবীর ও ঢাকা ওয়্যার হাউস নামের কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যার হাউস তার অবৈধ ধন-সম্পদের প্রধান উৎস বলে জানা গেছে। কূটনীতিক ও প্রিভিলেইজড পারসনদের জন্য সরকারের অনুমোদন নিয়ে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার মদ-বিয়ার আমদানি করে এ দুটি প্রতিষ্ঠান। সাড়ে ৪শ’ শতাংশ শুল্ক কার্যকর থাকলেও কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যার হাউসগুলো সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধায় মদ-বিয়ার আমদানি করতে পারে। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কূটনীতিক ও প্রিভিলেইজড পারসনরা এ সুবিধা পেয়ে থাকেন। আর এ সুযোগেরই অপব্যবহার করে রানা শফিউল্লাহ হাজার কোটি টাকার ধন-সম্পদের মালিক। কাস্টমস, নারকোটিক্স ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রত্যক্ষ যোগসাজশে ঢাকা ওয়্যার হাউস ও এইচ কবীর থেকে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা মদ-বিয়ার পাচার হয় খোলা বাজারে।

জানা গেছে, রাজধানীর প্রতিটি বার, গেস্ট হাউস ও অভিজাত ক্লাবে নিয়মিত উচ্চশুল্কের মদ-বিয়ার সরবরাহ হচ্ছে রানা শফিউল্লাহর মালিকানাধীন এ দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে। যদিও রানা শফিউল্লাহ এ দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বিক্রি করে দিয়েছেন বলে বিজ্ঞাপন দিয়ে দাবি করেছেন। কিন্তু কবে তিনি মালিকানা পরিবর্তন করেছেন তা উল্লেখ করেননি। অবশ্য কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের নথিপত্রে এখনও তিনি এ দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান অংশীদার বলে জানা গেছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষও বলেছেন, ঢাকা ওয়্যার হাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এখনও রানা শফিউল্লাহ। মালিকানা পরিবর্তন সংক্রান্ত কোন বিষয় তারা জানেন না।

জানা গেছে, অতি স্বল্প সময়ে রানার উত্থানও অবিশ্বাস্য। সাইকেলে ফেরি করে বাংলা মদ বিক্রি দিয়ে যার জীবন শুরু, সেই রানা শফিউল্লার বিত্ত-বৈভব রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। জানা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন বারে তিনি দেশে তৈরি মদ সরবরাহ করতেন। এরপর বিদেশ থেকে লাগেজ ব্যবসা শুরু করেন। বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী এনে স্টেডিয়াম মার্কেটে বিক্রি করতেন। একই সঙ্গে কাস্টমসকে ম্যানেজ করে বিদেশী মদ আনা শুরু করেন। এভাবে জড়িয়ে পড়েন উচ্চ মুনাফার মাদক ব্যবসায়। অভিযোগ আছে, তিনি একপর্যায়ে হেরোইন ও সোনা চোরাচালানের সঙ্গেও জড়িত হন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে এক সময় গুলশানের ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ওয়্যার হাউস এইচ কবীরের অংশীদার হন। পরে নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা ওয়্যার হাউস। বর্তমানে তিনি ঢাকা ওয়্যার হাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।

তার বাবা খালেক মোল্লা মুন্সীগঞ্জের বাগিয়া বাজারের একজন ক্ষুদ্র শাড়ি কাপড় ও লুঙ্গি বিক্রেতা ছিলেন। তার অন্য দুই ভাই শহিদুল ও টিটোও রানা শফিউল্লাহর সঙ্গে মদ বিক্রিতে জড়িত। এলাকাবাসী জানান, রানা শফিউল্লাহ স্থানীয় পুরাডিসি হাই স্কুলে মাধ্যমিক পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। তিনি এসএসসি পাস করেছেন। এরপর তিনি আর লেখাপড়া করেননি। তারা জানান, আমরা জানি রানা ঢাকাতে মদ বিক্রি করত। এক সময় নারায়ণগঞ্জের শাজাহান সম্রাট নামের এক চোরাচালানির সঙ্গে মদ বিক্রি ও চোরাচালানের ব্যবসায় জড়িত হয়। টানবাজারের পতিতা ব্যবসা থেকেই শাজাহান সম্রাটের উত্থান। পরে তিনি সিনেমা হলসহ বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হন বলে এলাকার লোকজন জানান।

রানা শফিউল্লাহর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, কূটনীতিক ও প্রিভিলেইজড পারসনদের জন্য শুল্কমুক্ত মদ-বিয়ার এনে কাস্টমস ও নারকোটিক্সের সহায়তায় তা কালোবাজারে বিক্রি করছেন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ বার ও অভিজাত ক্লাবে শুল্কমুক্ত অবৈধ মদ-বিয়ারের সিংহভাগেরই যোগানদাতা গুলশানের ঢাকা ওয়্যার হাউস ও মেসার্স এইচ কবীর। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র তা নিশ্চিত করেছে। ঢাকা ওয়্যার হাউস এবং এইচ কবীর কূটনীতিক এবং প্রিভিলেইজড (সুবিধাভোগী) পারসনদের কাছে শুল্কমুক্ত মদ-বিয়ার বিক্রির জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত। কিন্তু শুরু থেকেই রানার নেতৃত্বে মাফিয়া সিন্ডিকেট কাস্টমস ও নারকোটিক্স কর্মকর্তাদের সহায়তায় শুল্কমুক্ত মদ-বিয়ার কালোবাজারে বিক্রি করতে শুরু করে। এখনও ঢাকার অধিকাংশ বার, ক্লাব, অভিজাত এলাকার অবৈধ গেস্ট হাউসসহ সারাদেশের বারগুলোতে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে মদ-বিয়ার সরবরাহের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রক রানা শফিউল্লাহ। এসব বার ও ক্লাবে মদ সরবরাহ করেই আজ তিনি হাজার কোটি টাকার অর্থসম্পদের মালিক।

[ad#co-1]