ঘুমের বড়ি খেয়ে মারা যান রীতা ও তার দুই সন্তান

গাড়ি চালকের তথ্য
রাজধানীর জুরাইনে ফারজানা কবির রীতা ও তার দুই সন্তান পবন এবং পায়েল মারা গিয়েছিলেন তাদের লাশ উদ্ধারের দুই দিন আগে। ১১ জুন (শুক্রবার) সকালে পুলিশ তাদের লাশ উদ্ধার করে। আর মৃত্যু হয়েছিল বুধবার রাত এগারটার পর। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য জানিয়েছেন রীতার গাড়ি চালক আল আমীন।

ডিবি পুলিশের দাবি, আল আমীনের দেয়া তথ্যগুলোর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে পারছে না তারা। আল আমীন ডিবির জেরার শুরুতেই বলেছিলেন, তিনিসহ তিনজন মিলে এ হত্যাকাণ্ড ঘটান। পরক্ষণেই তিনি পুলিশকে বলেছেন, তিনজনই আত্মহত্যা করেছে। রীতার কথামতো একশটি ঘুমের বড়ি দোকান থেকে তিনি কিনেন। এসব বড়ি খেয়ে মৃত্যু হয় মা ও দুই সন্তানের। প্রথমে ছেলে পবন আরসিকোলার বোতলে পানির সঙ্গে মেশানো বড়ি খায়। এরপর মেয়ে পায়েল অযু করে এসে বড়ি খায়। দুই সন্তান অচেতন হয়ে পড়লে মা রীতা সবশেষে ঘুমের বড়ি খান। এ সময় একটি মগের ভেতর বমিও করেন রীতা।

গাড়িচালক আল আমীনের এসব কথাও পুরোপুরি বিশ্বাস করছে না গোয়েন্দা পুলিশ। যে কারণে আরো জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে দশদিনের পুলিশ রিমান্ড চেয়ে গতকাল দুপুরে আদালতে পাঠানো হয়। তার সঙ্গে আবদুল জব্বার নামে এক ফার্মেসির দোকানদারকেও দশদিনের পুলিশ রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। এ জব্বারের ফার্মেসি থেকে রীতার জন্য একশটি ঘুমের ট্যাবলেট কেনেন আল আমীন। তবে ট্যাবলেটের কোনো খোসা পুলিশ ঘটনাস্থলে পায়নি। ঘুমের ট্যাবলেট গুড়ো করে পানির সঙ্গে মেশানোর বোতলটিও পায়নি পুলিশ। এতে পুলিশের সন্দেহ আরও বেড়েছে। আর মৃত্যুর পর তারা কী করে পরিপাটিভাবে তিনজন পাশাপাশি ঘুমিয়ে ছিলেন এ প্রশ্নের জবাবও খুঁজছে পুলিশ।

গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (সাউথ) মনিরুল ইসলাম বলেছেন, মৃত্যুর ঘটনাটি আত্মহত্যা না পরিকল্পিত খুন তা জানতে ভিসেরা রিপোর্ট ও পারিপার্শ্বিক অন্যান্য সাক্ষ্য প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তিনি আরো বলেন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, অতীতের নানান ঘটনা, পারিবারিক অশান্তি ও স্মৃতির সঙ্গে রাশেদুল কবিরের বিয়ে এসব ঘটনা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মা ও দুই সন্তান আত্মহত্যা করার মতো মানসিকতায় পৌঁছে গিয়েছিল। এজন্য সপ্তাহখানেক আগে থেকেই তাদের প্রস্তুতি চলছিল। বুধবার দিনের বেলা দুই সন্তানের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই রাতে আত্মহত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন রীতা ও তার দুই সন্তান। সে রাতেই তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বলেই এই পুলিশ কর্মকর্তার ধারণা।

গাড়ি চালক আল আমীন বলেছেন, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে রীতা তাকে বলেছিলেন, ‘আমি মারা যাবো। আমার মৃত্যুর সময় অন্তত তুই পাশে থাক। এজন্য তোকে আমার গাড়ি দিয়ে যাচ্ছি।’ এ ঘটনার সাড়ে তিন মাস আগে সাত হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেয় আল আমীন।

ওদিকে গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমকি পরীক্ষায় দেখা গেছে, ঘটনাস্থলের দেয়াল লিখনগুলো মা ও দুই সন্তানের। তবে সিআইডির রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

শাহজাহান আকন্দ শুভ – আমাদের সময়
——————————————————

দুই শিশু সন্তানসহ রিতার মৃত্যু নিশ্চিত করে ড্রাইভার চলে যায়

জুরাইন আলমবাগের ট্র্যাজেডির ঘটনায় জড়িত রাশেদুল কবিরের গাড়ির চালক আল আমিন ঘটনার রাতে ফারজানা কবির রিতা ও তার দুই সন্তান পাবন ও পায়েলের মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে বাসা থেকে বের হয়েছে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মাত্রারিক্ত ঘুমের ট্যাবলেটে মা ও দুই ফুটফুটে শিশু সন্তানের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ চালকের দেয়া তথ্যানুযায়ী মা ও দুই সন্তানের মৃত্যুর ঘটনা পূর্ব পরিকল্পিত বলে নিশ্চিত হয়েছে।

এদিকে গ্রেফতারকৃত চালক আল আমিন ও ওষুধ বিক্রেতা আব্দুল জব্বারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবির তদন্তকারী কর্মকর্তা গতকাল শনিবার ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। আদালত চালক ৫ দিন এবং ওষুধ বিক্রেতার ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। সন্ধ্যার পর তাদেরকে ডিবি অফিসে এনে কর্ম-কর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। ডিসি (ডিবি, দক্ষিণ) মনিরুল ইসলাম ও এডিসি (ডিবি, দক্ষিণ) মাহবুবুল আলমের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল জিজ্ঞাসাবাদ এবং মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। জিজ্ঞাসাবাদে চালক মৃত্যুর ঘটনায় ছয় ধরনের তথ্য দেয়। তবে ঘটনার শুরু থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চালক আল আমিন উপস্থিত ছিল বলে ডিবির কর্মকর্তা তদন্তে নিশ্চিত হয়েছেন। চালক আল আমিন ডিবির কর্মকর্তাদের জানায় যে, ৯ জুন সন্ধ্যা ছয়টায় রিতা ম্যাডাম তাকে বাসায় ডেকেছেন। সে বাসায় গেলে একশ ঘুমের ট্যাবলেট সেডিল আনার জন্য রিতা ম্যাডাম বলেন। রিতা ম্যাডামের কথা অনুযায়ী চালক দয়াগঞ্জ মোহাম্মদীয় মেডিক্যাল স্টোরে গিয়ে গ্রেফতারকৃত আব্দুল জব্বারের কাছ থেকে একশ ঘুমের ট্যাবলেট ক্রয় করে। এর আগে রিতা ম্যাডাম ২০০ ঘুমের ট্যাবলেট বাসায় নিয়ে রেখেছেন। পরদিন সকালে কাজের বুয়া জান্নাত আরা বাসায় এসে দেখে যে, শোয়ার কক্ষে রিতা ও দুই সন্তান ঘুমিয়েছেন। ডাকাডাকি করলে তারা কোন সাড়া শব্দ না করায় কাজের বুয়া চলে যায় বলে গাড়ীর চালক ডিবির কর্মকর্তাদের জানায়।

যেভাবে ঘুমের ওষুধ খেয়েছে

চালক আল আমিন ডিবি কর্মকর্তাদের জানায় যে, তার উপস্থিতিতে ঘটনার রাতে রিতা ম্যাডাম নিজ হাতে তিনশ ট্যাবলেট পানিতে গোলান। আরসি কোলা বোতলে তিনি ট্যাবলেট গুলিয়েছেন। এরপর রাত ৯টায় প্রথম রাশেদুল কবিরের পুত্র কবির ইশরাফ বিন রাশেদ পাবন ঘুমের ওষুধ খায়। এরপর ওযু করে এসে রাশেদুল কবিরের শিশু কন্যা রাইসা রাশমিন পায়েল ঘুমের ওষুধ খেয়েছে। দুই ভাই বোন এক সঙ্গে শুইয়ে পড়ে। রিতা ও গাড়ি চালক কথা বার্তা বলে এবং ৫০ টাকার স্ট্যাম্পে নানা কথা বার্তা লিখেন। স্ট্যাম্প লেখা শেষে রাত ১১টায় রিতা ঘুমের ওষুধ খেয়ে দুই সন্তানের সঙ্গে শুইয়ে পড়েন। ঘণ্টাখানেক পর চালক দেখে যে, রিতা ও তার দুই সন্তানের কোন সাড়া শব্দ নেই। পরীক্ষা করে দেখে যে, তাদের মৃত্যু হয়েছে। রাত ১২টায় চালক আল আমিন বাসা থেকে বের হয়ে তার বাসায় চলে যায় বলে সে ডিবির কর্মকর্তাদের জানায়।

যেভাবে চালক ধরা পড়ে

ঘটনার পর দিন সকালে আল আমিন রাশেদুল কবিরের প্রাইভেট কারটি নিয়ে গোপালগঞ্জ জেলার কোটালিপাড়া উপজেলার প্রবাসী বন্ধুর বাড়িতে যায়। সেখানে রাত যাপন করে। ডিবির কর্মকর্তারা চালকের মোবাইল ফোনের কললিস্ট অনুযায়ী তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হন। প্রবাসী বন্ধুর স্ত্রীর সঙ্গে প্রতিদিন ঘন্টায় কয়েক দফা আল আমিন কথা বলেছে বলে ডিবি কর্মকর্তারা প্রমাণ পেয়েছেন। কললিস্ট অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রবাসীর বন্ধুর কোটালিপাড়ার বাড়ী থেকে ডিবির দলটি আল আমিনকে প্রাইভেটকারসহ গ্রেফতার করে ঢাকায় নিয়ে আসেন। প্রবাসী বন্ধুর স্ত্রীর সঙ্গে আল আমিনের দীর্ঘদিন অবৈধ সম্পর্ক চলে আসছিল। এই সুবাদে আল আমিন গাড়ী নিয়ে প্রবাসী বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে উঠে বলে ডিবির কর্মকর্তাদের জানান। গ্রেফতারের পরদিন চালক গাড়ী নিয়ে খুলনায় চলে যাওয়ার কথা ছিল।

পরীক্ষার শেষে মারা যাওয়ার সিদ্ধান্ত

চালক জিজ্ঞাসাবাদে ডিবির কর্মকর্তাদের জানায় যে, রিতা ম্যাডাম তাকে বলেছিলেন পাবন ও পায়েলের পরীক্ষা শেষ হলে তারা মারা যাবে। মারা যাওয়ার পর প্রাইভেট কারটি আল আমিনকে নিয়ে যাওয়ার জন্য জানিয়ে দেন। চালক গাড়িটি কখন পাবে এই নিয়ে ব্যস্ত। ঘটনার দিন পাবন ও পায়েলের পরীক্ষা শেষ হয়। ইংলিশ মিডিয়ামের ধানমন্ডি মাস্টার মাইন্ডের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র পাবন ও পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী পায়েল। পরীক্ষা শেষে দুই সন্তানকে নিয়ে রিতা বাসায় ফিরেন। ঐ দিন পাবন বাসার দেয়ালে লিখেছে যে, তার পিতা রাশেদুল কবিরের স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্মৃতির পেটের সন্তানের চাকরামি হয়ে তারা বাঁচতে চায় না। তার দাদা শফিকুল কবির, দাদি নূর বানু ও ফুফুদের মায়া মমতাতো পায়নি। বরং উল্টা নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয় পাবন ও বোন পায়েল। এই ধরনের লেখা দেয়ালে ছিল। গত শনিবার চালক আল আমিনকে নিয়ে ডিবির কর্মকর্তারা জুরাইন আলমবাগের বাসায় যান। চালক বাসার ঘটনাস্থলে কোন জায়গা ছিল তা ডিবির কর্মকর্তাদের দেখিয়ে দেয়। দেয়ালের পাবনের লেখা ডিবির কর্মকর্তারা পড়েছেন। তবে এই লেখা পাবনের কিনা যাচাই করা হচ্ছে।

চালক আল আমিন এই ডিবির কর্মকর্তাদের জানায়। ঘটনার ২৫ দিন আগে রিতার সঙ্গে তার শাশুড়ি নূর বানুর ঝগড়া হয়। উভয়পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে বলে চালক জানায়। এ নিয়ে ঐ দিন রাতে রাশেদুল কবির তার বোন ও ভগ্নিপতি এবং পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে আলমবাগের বাসায় বৈঠক বসেন। বৈঠকে রিতাকে দুই সন্তান নিয়ে ৩০ জুন বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য রাশেদুল কবির ও তার অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন জানিয়ে দেন। রাশেদুল কবির বৈঠকে তার দুই সন্তানের উদ্দেশে বলেন যে, তার এ ধরনের সন্তান প্রয়োজন নেই। পিতার এ কথা শুনে পাবন ও পায়েল কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। তখন দুই সন্তান বলে ওঠে এই দুনিয়ায় আমাদের বেঁচে থেকে লাভ কি? ডিবির কর্মকর্তারা নিশ্চিত যে, রিতা ও তার দুই সন্তানকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে চালক। তবে চালককে কেউ ব্যবহার করেছে কিনা এবং মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য দ্বিতীয়পক্ষের হয়ে সে কাজ করেছে কিনা- এ সকল বিষয় ডিবির কর্মকর্তার তদন্ত করে দেখছেন। স্মৃতি ৯ মাসের অন্তঃসত্বা। তবে তিনি ডিবির নজরদারিতে রয়েছেন বলে জানা যায়।

ঘটনাস্থলের পাশে রক্ত পড়া ছিল। রিতা ও দুই সন্তানের নাক ফুলা ছিল। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে মাত্রারিক্ত ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে বিষক্রিয়ায় ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার কথা, রক্ত বের হওয়ার কথা নয়। চালক আল আমিন মাত্রারিক্ত ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ার পর রিতা ও দুই শিশু সন্তান ঘুমিয়ে পড়ার পর তাদের মুখে বালিশ অথবা অন্য কিছু দিয়ে চেপে ধরে তিনজনের মৃত্যু চালক নিশ্চিত করেছে এমন প্রশ্নেরর মুখে প্রথম দফা চালক আল আমিন হত্যা করার কথা স্বীকার করলেও পরে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে মারা গেছে বলে ডিবির কর্মকর্তাদের জানান।

ইত্তেফাক
————————————————————–

গাড়িচালকের সামনেই আত্মহত্যা করে তারা?
গাড়িচালকের সামনেই আত্মহত্যা করে তারা?
চালক আল-আমিন (বাঁয়ে) ও ওষুধ ব্যবসায়ী গাফফারকে গতকাল আদালতে হাজির করে গোয়েন্দা পুলিশ ছবি: প্রথম আলো

‘মারা যাওয়ার মুহূর্তে আমি তাদের সামনেই ছিলাম। বড়ি খাওয়ার পর পাবন কোনো সাড়াশব্দ করেনি। পায়েল বিছানায় ছটফট করতে শুরু করে। একপর্যায়ে ফারজানা রিতাও নিস্তেজ হয়ে পড়েন।’ গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এমনই তথ্য দিয়েছেন ফারজানার গাড়িচালক আল আমিন। গোয়েন্দা পুলিশ এ তথ্য দিয়েছে।
তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে বলেন, আল আমিনের সব বক্তব্য এখনই পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। তাঁকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এটি হত্যা না আত্মহত্যা—তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে পুলিশ।
আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গাড়িচালক আল আমিন ও ওষুধের দোকানি আবদুল গাফফারকে গতকাল রিমান্ডে নেওয়া হয়। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। সহকারী পুলিশ কমিশনার গোলাম আজাদ খান তদন্তকাজ তদারক করছেন।

গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে পুলিশ এ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলেই মনে করেছিল। কিন্তু কিছু বিষয় নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এখন অনেক প্রশ্নেরই জবাব মিলছে না।

গোয়েন্দা পুলিশের সূত্র জানায়, আল আমিন পুলিশকে বলেছেন, ফারজানার মৃত্যু হয়েছে ৯ জুন বুধবার রাত সাড়ে ১১টার পর। ওই দিন বাচ্চাদের পরীক্ষা শেষ হয়। শুক্রবার সকালে ওই বাসা থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়। ফারজানার পরিবাবের সদস্যরাও বলেছেন, বুধবার বিকেলের পর ফারজানার সঙ্গে তাঁর মায়ের পরিবারের কারও কোনো কথা হয়নি। ফারজানার মোবাইল ফোনের তালিকা দেখে পুলিশ জানতে পেরেছে, ফারজানা শেষ ফোন করেছেন বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে একজন চিকিৎসককে।

কিন্তু গৃহপরিচারিকা জিন্নাত বেগম পুলিশকে জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি ফারজানার সঙ্গে কথা বলেছেন। ওই দিন দুপুরে তিনি যে খাবার রান্না করেছিলেন, তা বাড়ির কেউ আর খায়নি। লাশ উদ্ধারের সময় সেসব খাবার স্বাভাবিক পাওয়া যায়। পুলিশের ধারণা, গৃহপরিচারিকা ঠিক কথা বলেননি।

গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, আল আমিন পুলিশকে বলেছেন যে তারা যে আত্মহত্যা করবে, তা তিনি আগে থেকেই জানতেন। তাঁর সামনেই তারা আত্মহত্যা করেছে। ওই দিনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে আল আমিন জানান, ঘটনার তিন-চার দিন আগে তিনি ফারজানার কথামতো ১০০টি ঘুমের বড়ি কিনে আনেন দয়াগঞ্জের মোহাম্মদী ফার্মেসি থেকে। পুলিশ ওই ফার্মেসির মালিক গাফ্ফারকে গ্রেপ্তার করেছে। গাফ্ফার পুলিশকে জানান, এত বড়ি তিনি একসঙ্গে দিতে চাননি। আল আমিন ফোনে রিতার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়ার পর ১০ পাতার ১০০টি বড়ি দেড় হাজার টাকায় বিক্রি করেন তিনি।

আল আমিন পুলিশকে জানান, বুধবার সন্ধ্যার দিকে রিতা তাঁকে ফোনে বাসায় আসতে বলেন। রাত নয়টার দিকে আল আমিন বাসায় এলে রিতা বলেন, ‘তোকে গাড়িটি দিয়ে দিচ্ছি, মারা যাওয়ার মুহূর্তে তুই আমাদের কাছে থাক।’ এই বলে রিতা তাঁর সামনেই ঘুমের বড়িগুলো গুঁড়ো করে একটি বোতলের পানিতে মেশান। প্রথমে পাবন মগে ঢেলে কিছু অংশ খায়। এরপর তার ছোট বোন পায়েল অজু করে এসে মগ হাতে নিয়ে খেয়ে ফেলে। দুই সন্তান এসব খাওয়ার পর রিতা বসে স্ট্যাম্পের ওপর লিখতে থাকেন। লেখা শেষ করে রিতা নিজে এসব পান করেন। রিতা এই পানি মুখে দিয়েই বমি করে ফেলেন।

আল আমিন জানান, তারা মারা গেছে কি না, তা নিশ্চিত হতে তিনি রাত ১২টা পর্যন্ত বাসার ভেতরে অবস্থান করেন। এরপর তিনি গাড়ি নিয়ে চলে যান।

লাশগুলো বিছানার ওপর কী করে পরিপাটি করে সাজানো থাকল? প্রশ্ন করা হলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, আল আমিন পুলিশকে বলেছেন, তিনি নিজেই সবার গায়ের ওপর কাপড় বিছিয়ে দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান। তিনি চলে যাওয়ার পর থেকে বাসার সব দরজা খোলা ছিল। সিম ছাড়া মোবাইল ফোন রিতার বুকের ওপর কে রাখল—এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি আল আমিন।

চালক আল আমিন আরও জানান, বাসার ভেতরে দেয়ালের লেখাগুলো ফারজানার দুই সন্তানের। এসব লেখার জন্য কয়েক দিন আগে তিনি বুড়িগঙ্গা সেতুর নিচে একটি দোকান থেকে তুলি ও রং কিনে আনেন। দুই সন্তান কয়েক দিন ধরেই দেয়ালে এসব লিখে। ওই সময় তারা ঘরে কাউকে ঢুকতে দেয়নি। পুলিশ রঙের ওই দোকানিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তবে রিতা ও তাঁর দুই সন্তান যে ওষুধ খেয়েছিল, তার খালি পাতার কোনো খোঁজ মেলেনি। আবার সেই বোতলটিও বাসায় পাওয়া যায়নি। আল আমিন বলেছেন, এসব ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিয়েছেন তিনি। তবে পুলিশ গাড়িচালকের সব কথা বিশ্বাস করছে না। একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আল আমিন প্রথমে বলেছিলেন, রাশেদুল কবির রিতাকে খুন করেছেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদে অন্যরকম কথা বলেন।

গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার প্রথম আলোকে বলেন, রিতার বাসার তোশকের ওপর ও মেঝেতে রক্তের দাগ ছিল। এ দাগ কী করে হলো সেটাও নিশ্চিত করা যায়নি। তবে রিতা ও তাঁর দুই সন্তানের মানসিক অবস্থা আত্মহত্যার পর্যায়েই ছিল। কিন্তু এর সুযোগ নিয়ে কেউ তাদের মেরে ফেলেছে কি না, সেটা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।

রিমান্ড: গাড়িচালক আল আমিনকে পাঁচ দিন ও ওষুধ বিক্রেতা আবদুল গাফ্ফারকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম তানিয়া কামাল। মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক শেখ মাহবুবুর রহমান তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন করেন।

প্রথম আলো

[ad#co-1]