ঘুমের ওষুধ রঙ তুলি স্ট্যাম্প এনে দিয়েছিল আল আমিন

জুরাইন ট্র্যাজেডি
নুরুজ্জামান লাবু
দুই সন্তান পাবন-পায়েল ও তাদের মা ফারজানা কবির রিতাকে ১০ পাতা (১০০টি) ঘুমের ওষুধ (মিডোলাম ১৫ মিলিগ্রাম) এনে দিয়েছিল গাড়িচালক আল আমিন। এছাড়া দেয়াল ও মেঝেতে লেখার জন্য রঙ-পেন্সিল, রঙ-তুলি, স্ট্যাম্পসহ অন্যান্য জিনিসও সে কিনে আনে। এসবের বিনিময়ে পাবন-পায়েল ও রিতা আল আমিনকে গাড়িটি মৌখিকভাবে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এই ১০০টি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন দুই সন্তানসহ রিতা।

শুক্রবার গোয়েন্দাদের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব কথা স্বীকার করেছে পাবন-পায়েল ও রিতার গাড়িচালক আল আমিন। বুধবার মধ্যরাতে গোপালগঞ্জের রঘুনাথপুর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। ঘটনার পর থেকে আল আমিন গাড়িটি নিয়ে রঘুনাথপুরের পাগল বিশ্বাস নামে এক নসিমন চালকের বাসায় আত্মগোপন করেছিল।

শুক্রবার সকালে আল আমিনকে নিয়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল আলমবাগের ২২৯ নাম্বার সোনারতরী বাসায় যান। পরে তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী যাত্রাবাড়ীর দয়াগঞ্জ এলাকার যে ফার্মেসি থেকে ঘুমের ওষুধ কেনা হয়েছিল, সেই মোহাম্মদিয়া ফার্মেসির কর্ণধার আবদুল গফফারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর আগে আল আমিনকে নিয়ে আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলায় অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চালায় পুলিশ। তবে গতকাল পর্যন্ত কাউকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) গোলাম আজাদ খান জানান, শনিবার (আজ) আল আমিনকে আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হবে। রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরো অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ওয়ারী জোনের উপকমিশনার তওফিক মাহবুব চৌধুরী জানান, দুই সন্তানসহ মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি স্পর্শকাতর।

ভিসেরা রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। এছাড়া আল আমিনকে নিয়ে অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুই সন্তানসহ তাদের মা ১০ পাতা ঘুমের ওষুধ একসঙ্গে গুলিয়ে খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। এত ওষুধ একসঙ্গে খাওয়ার কারণেই তাদের শরীরে রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়। এজন্যই তাদের লাশ দ্রুত পচন ও শরীরে ফোসকা পড়েছিল।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, লাশের পাশ থেকে অর্ধেক পানিসহ একটি জগ ও মগ উদ্ধার করা হয়েছিল। জগের পানি পরীক্ষা করা হচ্ছে। অপরদিকে নিহতদের ভিসেরা রিপোর্টসহ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়া গেলেই বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আল আমিন জানিয়েছে, ঘটনার চার-পাঁচদিন আগে রিতা তাকে ১০ পাতা মিডোলাম ওষুধ আনতে বলে। সে যাত্রাবাড়ীর দয়াগঞ্জ এলাকার মোহাম্মদিয়া ফার্মেসিতে যায়। সেখানে ১০ পাতা মিডোলাম চাইলে ফার্মেসির মালিক একসঙ্গে এত ঘুমের ওষুধ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে আল আমিন রিতার মোবাইল ফোনে কল করে দোকানদারকে ধরিয়ে দেয়। রিতা এ সময় দোকানদারকে জানান, তারা আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া চলে যাচ্ছে। তার নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খেতে হয়। কিন্তু বাইরে এসব ওষুধ পাওয়া যাবে না। তাই একসঙ্গে ১০ পাতা ঘুমের ওষুধ মিডোলাম নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। পরে দোকানদার রিতার কথা বিশ্বাস করে আল আমিনকে ১০ পাতা মিডোলাম দেন।

আল আমিন জানায়, একই দিন সে রিতার নির্দেশ অনুযায়ী বুড়িগঙ্গা ব্রিজের কাছে ডিআইটি মার্কেটের উজালা পেইন্ট নামে একটি দোকান থেকে রঙ-তুলি ও রঙ-পেন্সিল কিনে দেয়। পরে দুটি ৫০ টাকার স্ট্যাম্পও কিনে নিয়ে যায়। চার-পাঁচদিন আগে থেকেই তারা ঘরের দেয়ালে এসব লিখতে শুরু করে।

জানা গেছে, ৯ জুন বুধবার সন্ধ্যায় রিতা মোবাইলে আল আমিনকে ডেকে পাঠায়। পরে রাত ৯টার দিকে সে রিতার বাসায় যায়। এ সময় আল আমিনের সামনেই তারা ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করে। প্রথমে পাবন, পরে পায়েল একটি পেপসির বোতলে ঘুমের ওষুধ গুলিয়ে খায়। এরপর রিতা একটি মগে ঘুমের ওষুধ গুলিয়ে খান। ওষুধ খাওয়ার পর রিতা ওই মগেই একটু বমি করেছিলেন। গতকাল পুলিশ বমিসহ মগটি উদ্ধার করেছে।

আল আমিন পুলিশকে জানিয়েছে, পাবন-পায়েলসহ তাদের মা রিতা যখন ঘুমের ওষুধ খাচ্ছিল, তখন সে ড্রয়িংরুমে পায়চারী করছিল। সে কয়েকবার তাদের শয়নকক্ষে প্রবেশ করে। ওষুধ খাওয়ার ২০-২৫ মিনিট পর যখন তারা ঢলে পড়ে, তখন সে তাদের বিছানায় সোজা করে শুইয়ে গায়ে কাঁথা চাপিয়ে দিয়ে চলে যায়। এ সময় সে ওষুধের খালি পাতাগুলো রান্নাঘরের একটি ময়লা ঝুড়িতে ফেলে দেয়। পরে সে মাইক্রোবাসটি নিয়ে পোস্তাগোলায় তার মেসে যায়। সেখান থেকে মানিকগঞ্জ আরিচাঘাট পার হয়ে গোপালগঞ্জে চলে যায়।

এদিকে গতকাল রিতার বাসার কাজের বুয়া জিন্নাত আরাকে আবারো জিজ্ঞাসাবাদ করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। এতে বুয়া জিন্নাত আরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম তথ্য দিচ্ছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বুয়া আগে ওই বাসা থেকে ১০ জুন বিকাল ৩টার দিকে বেরিয়ে আসার কথা বলেছিল। এ সময় রিতার সঙ্গে তার কথাও হয়েছিল বলে সে জানায়। গতকাল আল আমিনের স্বীকারোক্তির কথা তাকে জানালে সে বৃহস্পতিবার না বুধবার রিতার সঙ্গে কথা বলেছিল, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু বলতে পারেনি। এ সময় সে বৃহস্পতিবার না হয়ে সেটা বুধবার হতে পারে বলে জানায়। বর্তমানে বুয়া জিন্নাত আরাকে পুলিশের নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বৃহস্পতিবার কাজের বুয়া না বুঝেই অনেক আলামত নষ্ট করে ফেলেছে। যেমন আল আমিনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী রান্নাঘরের ময়লার ঝুড়িতে ওষুধের খালি পাতার খোঁজ করে পাওয়া যায়নি।
ধারণা করা হচ্ছে, বৃহস্পতিবার কাজের বুয়া ময়লার ঝুড়ি পরিষ্কার করায় সেগুলো পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বুয়া ও আল আমিনের পৃথক দিনের স্বীকারোক্তির কারণে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে।

১১ জুন শুক্রবার রাজধানীর কদমতলীর আলমবাগের ২২৯ নাম্বার বাসা থেকে দুই সন্তান পাবন-পায়েলসহ তাদের মা ফারজানা কবির রিতার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশের ধারণা, তারা আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার আগে তারা ঘরের দেয়াল, মেঝে ও চিরকুটে তাদের আত্মহত্যার কারণ লিখে গেছে। আত্মহত্যার জন্য দুই সন্তান তাদের বাবা রাশেদুল কবির, রাশেদুল কবিরের দ্বিতীয় স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্মৃতি, দাদা প্রবীণ সাংবাদিক শফিকুল কবির, দাদি নূরবানু, দুই ফুফু কবিতা কবির, সুখন কবির ও ফুফা দেলোয়ার হোসেন পাটোয়ারীকে দায়ী করে গেছে। পরে ওইদিন রাতেই আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে পাবন-পায়েলের নানি ও রিতার মা মাজেদা বেগম বাদী হয়ে কদমতলী থানায় ওই সাতজন এবং গাড়িচালক আল আমিনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন।

[ad#co-1]