নেতা যে রাতে নিহত হলেন

আমরা কেমন আছি
ইমদাদুল হক মিলন
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমি একটা গল্প লিখেছিলাম। গল্পের নাম ‘নেতা যে রাতে নিহত হলেন’। ‘৯০ সালের কথা। ‘কিশোর তারকালোক’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। ছোটদের জন্য মাসিক পত্রিকা। কাঁটাবনের ওখানে অফিস, প্রেস। পত্রিকার যিনি মালিক, আরেফিন বাদল, তিনি ‘তারকালোক’ নামে একটি পাক্ষিক বিনোদন পত্রিকা বের করেন, ‘আগামী’ নামের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাও বের করেন। ‘কিশোর তারকালোক’ তাঁর নতুন প্রজেক্ট। আমাকে নিয়েছেন সম্পাদক হিসেবে। ‘আগামী’ পত্রিকার একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। আমাকে বলা হলো গল্প লিখতে। বেশ কিছুদিন ধরে মাথায় ঘুরছিল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গল্প লিখব। বাংলাদেশের অতিসাধারণ মানুষরাও যে বঙ্গবন্ধুকে কতটা ভালোবাসেন এ রকম একটা বিষয় নিয়ে লিখব। ‘কিশোর তারকালোক’ অফিসে বসে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একটানা লিখে শেষ করলাম ‘নেতা যে রাতে নিহত হলেন’।

পদ্মার ওপারের বহু দূরের এক নিভৃত গ্রাম উদয়পুর। সে গ্রামের ভাগচাষি রতন মাঝি। মাঝি হচ্ছে তাদের পদবি। একেবারেই মাটির মানুষ, গ্রামের খেটে খাওয়া দরিদ্রজন। নিজের জমি নেই। অন্যের জমি ভাগে চাষ করে বলে ভাগচাষি। বঙ্গবন্ধুকে প্রচণ্ড ভালোবাসে রতন। বাড়ির লাগোয়া কয়েক কদম জমিতে ‘কালোজিরা ধান’ নামের অতি সুস্বাদু চিঁড়া হয় এমন কিছু ধান লাগিয়েছিল সে। ধানটা হওয়ার পর তার কৃষাণী অতিযত্নে সেই ধান থেকে দেড়-পৌনে দুসেরের মতো চিঁড়া তৈরি করেছে। রতনের ইচ্ছা এই চিঁড়াটুকু সে তার প্রিয় নেতার জন্য নিয়ে যাবে। নেতাকে দুচোখ ভরে একবার দেখবে, তাঁর পায়ের কাছে নামিয়ে রাখবে চিঁড়ার পোঁটলা, আর সেই ফাঁকে নেতার পা-টা একটু ছুঁয়ে তার শ্রদ্ধা-ভালোবাসা জানাবে, নিজের জীবন ধন্য করবে। অতিকষ্টে রাস্তা খরচ জোগাড় করে, চিঁড়ার পোঁটলা বুকের কাছে ধরে আগস্ট মাসের এক মধ্যরাতে সে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। তার বাড়ি থেকে লঞ্চঘাট পাঁচ-সাত মাইল। লঞ্চ ছাড়ে একেবারে ভোরবেলা। ভোরবেলার লঞ্চ ধরবে রতন। এ কারণে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে।

এভাবে ঢাকায় এসে পেঁৗছাল সে। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে নেতার বাড়ির সামনে গিয়ে হাজির। ততক্ষণে রাত হয়ে গেছে। এত রাতে নেতাকে সে কী করে দেখবে? ভাবল, এই বাড়ির সামনেই সারা রাত বসে থাকবে। সকালবেলা নেতা যখন বেরোবেন তখন দুচোখ ভরে তাঁকে দেখবে রতন, চিঁড়ার পোঁটলা পায়ের কাছে নামিয়ে নেতার পা স্পর্শ করবে।

পুলিশ সন্দেহ করল রতনকে। ধরে নিয়ে গেল থানায়। পুলিশ অফিসার তাকে জেরা করতে লাগল। রতন সরল ভঙ্গিতে বলে গেল সব কথা। অফিসার হাসলেন। নেতাকে দেখতে এসেছ মানে কী?

নেতাকে তুমি চেনো? নেতা তোমাকে চেনেন?

রতন অমায়িক মুখ করে বলল, নেতাকে কে না চেনে সাহেব? তাঁরে চিনব না, এ হয় নাকি? নেতাও তো দেশের সব মানুষকেই চেনেন। মুখখানা দেখলে আমাকেও চিনবেন। আমিও তো দেশের মানুষ।

পোঁটলায় কী?

চিঁড়া। খুব ভালো চিঁড়া সাহেব। বাড়ির লাগোয়া একচিলতে জায়গায় কালোজিরা ধান হয়েছিল। খুব অল্প হয়েছিল। পৌনে দুসেরের মতো চিঁড়া হয়েছে। চিঁড়াটা সাহেব নেতার জন্য নিয়ে এসেছি। নেতা একমুঠ মুখে দিলে জীবন ধন্য হয়ে যাবে আমার। আমি সাহেব নেতাকে খুব ভালোবাসি। গরিবের ভালোবাসা নেতাকে কেমন করে জানাব? ম্যালা দিনের স্বপ্ন ছিল তাঁরে একবার সামনাসামনি দেখব। পায়ের কাছে চিঁড়ার পোঁটলাটা নামিয়ে রেখে পা দুখানা একবার ছুঁয়ে দেব। আমার ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা জানাব।

রতন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে আর হলো কই? আপনার লোকজন ধরে নিয়ে এল। আমি একটাও মিথ্যা বলি নাই সাহেব। মানুষ গরিব হতে পারি কিন্তু ভালোবাসাটা খাঁটি। আমাদের মতো গরিব মানুষরাই নেতাকে বেশি ভালোবাসে।

পুলিশ অফিসার একদমই বিশ্বাস করলেন না রতনের কথা। প্রচণ্ড ধমক দিলেন। বুক থেকে চিঁড়ার পোঁটলা ছিনিয়ে নেওয়া হলো কেমিক্যাল টেস্টে পাঠাবার কথা বলে, আর রতনকে পোরা হলো হাজতে। রতনের মুখে তারপর আর কথা নেই। পাথর হয়ে গেছে সে। হাজতে রাতভর বসে রইল এমন ভঙ্গিতে যেন সে কোনো মানুষ নয়, যেন সে সত্যি সত্যি পাথর।

ভোরবেলা কী রকম একটা গুঞ্জন উঠল থানায়। কী রকম একটা ছুটোছুটি, চাপা ফিসফাস। খানিকপর সেই দুজন পুলিশ এসে গরাদ খুলল। রতন মাঝি, বেরোও।

একজন পুলিশের প্যান্টের দুপকেট বেশ ফোলা। রতন নিঃশব্দে হাজতখানা থেকে বেরোলো। পুলিশ দুজন ঠেলে ঠেলে তাকে এনে দাঁড় করালো সেই অফিসারের সামনে।

অফিসার কী রকম দুঃখী মুখ করে চেয়ারে বসে আছেন। চোখে উদাসীনতা কিংবা অন্য কিছু। রতনকে দেখে চোখ তুলে তাকালেন। গভীর দুঃখের গলায় বললেন, নেতা কাল রাতে নিহত হয়েছেন। তোমাকে সন্দেহ করে তোমার ওপর আমি অবিচার করেছি ভাই। যাও, বাড়ি যাও তুমি।

পকেট ফোলা পুলিশটি তখন তার প্যান্টের পকেট থেকে চিঁড়া বের করে অবিরাম মুখে পুরছে। রতন বুঝে গেল এই সেই চিঁড়া। ভালোবেসে বহুদূর থেকে নেতার জন্য নিয়ে এসেছিল সে। কালোজিরা ধান কত যত্নে বুনেছিল বাড়ির সামনে। সেই ধান শুকিয়ে কত যত্নে চিঁড়া কুটে দিয়েছিল কৃষাণী।

এসব ভেবে জলে চোখ ভরে আসার কথা রতনের। কিন্তু হলো উল্টো। চোখ দুটো জ্বলে উঠল তার। অফিসারের দিকে তাকিয়ে শীতল গম্ভীর গলায় বলল, আমাকে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না সাহেব। আমাকে হাজতেই রাখেন। ছেড়ে দিলে নেতা হত্যার প্রতিশোধ নেব আমি।

এই হচ্ছে গল্প।

‘আগামী’ পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর বিভিন্ন পত্রিকায়, সংকলনে অবিরাম ছাপা হতে লাগল গল্পটি। ‘৯৬-৯৭ সালের দিকে বাদল রহমান বললেন, বিটিভির জন্য ‘নেতা যে রাতে নিহত হলেন’ নাটক হিসেবে তৈরি করবেন তিনি।
বাদল রহমান বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা, বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক। পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনায় ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন। জার্মান লেখক এরিখ কাস্টনারের ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ তৈরি করে হৈচৈ ফেলে দিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ ছোটদের জন্য তৈরি করা প্রথম সার্থক চলচ্চিত্র। সদা হাসিমুখের প্রাণবন্ত মানুষ বাদল ভাই। আমাকে একটু বেশিই প্রশ্রয় দেন, বেশিই ভালোবাসেন। কোন এক এনজিও বৃক্ষবিষয়ক একটা ধারাবাহিক তৈরি করবেন ১৩ পর্বের। বাদল ভাইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাদল ভাই আমাকে বললেন লিখে দিতে। সিদ্ধেশ্বরীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের উল্টো দিকে তাঁর ফ্ল্যাট। প্রায়ই যাই সেখানে, সিরিজ নিয়ে আলোচনা হয়। সেই সিরিজ তৈরি হলো। নাম দিলাম ‘রঙ করা পুতুল’। এই সিরিজ লিখতে গিয়ে বাদল ভাইর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আরো বাড়ল। আর সিরিজটি এত সুন্দর, নিখুঁতভাবে তৈরি করলেন তিনি, আমি তো মুগ্ধই, বিটিভির কর্তাব্যক্তিরা মুগ্ধ, দর্শকরা মুগ্ধ। সুতরাং এই বাদল রহমান যখন ‘নেতা যে রাতে নিহত হলেন’ তৈরি করতে চাইলেন আমি খুবই ভরসা পেলাম। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা আমার গল্পটি তাহলে যোগ্য লোকের হাতে পড়ল। স্ক্রিপ্ট করলাম। রতন মাঝির চরিত্রে বাদল ভাই নিলেন খালেদ খানকে। কৃষাণীর চরিত্রে তানিয়া আহমেদ। পুবাইলের ওদিককার এক গ্রামে গিয়ে শুটিং করলেন। খালেদ খান হৃদয় উজাড় করে অভিনয় করলেন। তখনকার যিনি তথ্যমন্ত্রী, নাকি তথ্য প্রতিমন্ত্রী আমার ঠিক মনে নেই, তিনি নাটকটিকে অযথাই একটু কাটাছেঁড়া করলেন। নাটকের মূল সুরটা অনেকখানি নষ্ট করে ফেললেন। কেন যে এটা তিনি করলেন, কারণটা আজও আমি ঠিক বুঝতে পারি না। একধরনের মানুষ হাতে ক্ষমতা পেলে অকারণেও কিছু মাতব্বরি করেন, ব্যাপারটা তেমনও হতে পারে।
বাদল ভাই বললেন, কাটাছেঁড়া করা নাটক তিনি চালাবেন না। বিটিভির কর্তাব্যক্তিরা বুঝিয়ে-শুনিয়ে তাঁকে রাজি করালেন। নাটক দেখে আমি খুবই মন খারাপ করলাম। কিন্তু বাদল রহমান দমবার পাত্র নন। তিনি সেই নাটকের আসল প্রিন্ট নিয়ে গেলেন ‘লেজার ভিশন’ নামের এক সিডি কম্পানির কাছে। যেমন করে হোক এ নাটকের সিডি বের করতে হবে। ‘নেতা যে রাতে নিহত হলেন’ নামটাও বদলে দিতে বলেছিলেন সেই মন্ত্রী ভদ্রলোক। বাদল ভাই বাধ্য হয়ে নাম দিয়েছিলেন ‘কোথায় পাবো তারে’। কিন্তু জেদটা তাঁর ভেতর রয়ে গেছে। আসল নামের আসল নাটকটি তিনি দর্শকদের দেখাতে চান। সিডি কম্পানিকে রাজি করিয়ে তিনি সিডি আকারে প্রকাশ করলেন ‘নেতা যে রাতে নিহত হলেন’। বাদল রহমানের সেই সময়কার একাগ্রতা দেখে, বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা-ভালোবাসা দেখে আমি অভিভূত হয়েছিলাম। মাঝে মাঝেই তখন বাদল রহমানের অফিসে যাই, নাটকটি নিয়ে তাঁকে যে রকম ভাবতে দেখি, কথা বলতে দেখি, অস্থির হতে দেখি, সব কিছু মিলিয়ে বাদল রহমানকেই একসময় ‘নেতা যে রাতে নিহত হলেন’ গল্পের রতন মাঝি মনে হচ্ছিল আমার।

এই বাদল রহমান মাত্র ৬২ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে গেলেন। কয়েক দিন আগে এলেন ‘কালের কণ্ঠ’র চলচ্চিত্রবিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে। তার কয়েক দিন পর কাটালেন সব মায়ার বন্ধন। স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে ২০০৫ সালে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর ফ্ল্যাটে একদিন আগুন ধরে গিয়েছিল। নিজে ঘোরতর ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন, হার্টের সমস্যা ছিল। তার পরও তাঁর মুখ দেখে কখনো বোঝা যায়নি শরীরে কোনো ব্যাধি আছে, মনে আছে অল্প বয়সে স্ত্রী হারানোর বেদনা। সব সময় হাসিমুখ, প্রাণবন্ত। সব সময় নতুন কিছু না কিছু করার চিন্তা।

কত প্রিয় মানুষ অসময়ে চলে যাচ্ছেন আমাদের ছেড়ে।

বাদল রহমানের কথা যখনই ভাবি, আমার শুধু মনে হয় আমার গল্পের রতন মাঝি চলে গেছেন। প্রিয় নেতার জন্য রতন মাঝি ওই যে চিঁড়াটুকু নিয়ে এসেছিলেন ঠিক তেমন শ্রদ্ধায় এবং ভালোবাসায় বাদল রহমান রেখে গেলেন তাঁর ‘নেতা যে রাতে নিহত হলেন’। তাঁর প্রিয় নেতা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁর ভালোবাসার চিহ্ন, শ্রদ্ধার চিহ্ন।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
ই-মেইল : ih-milan@hotmail.com

[ad#co-1]