মদ বেচে টোকাই রানা এখন দেশের শীর্ষ ধনকুবের

কল্পকাহিনীকেও হার মানিয়েছেন রানা শফিউল্লাহ। এক সময় টোকাই পরিচয়ে পেট ভরে খাওয়ার জন্য যে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরত তার এখন ধন-সম্পদ কত? অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, শুধু চোরাচালান এবং সরকারের শুল্ক ফাঁকি দিয়ে মদ বিক্রি করে রানা শফিউল্লাহ এখন দেশের অন্যতম ধনকুবের। এখন সমাজের উঁচু মহলে তার পদচারণা। রাজনৈতিক মহলেও বিশাল প্রভাব-প্রতিপত্তি। অবৈধ অর্থ দিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, কাস্টমস, পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নীতিনির্ধারকরাও নাকি তার পকেটে। এ দম্ভ খোদ রানা শফিউল্লাহ তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছেই করে থাকেন। যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসে অবৈধ অর্থের প্রভাবে তারাই টোকাই রানাকে শেল্টার দিচ্ছে বলে জানা গেছে। শুধু মাদক চোরাচালান এবং সরকারের রাজস্ব আÍসাৎ করেই তার এ উত্থান। আন্ডার ওয়ার্ল্ডে তিনি মাদকের মাফিয়া ডন হিসেবে স্বীকৃত।

শুধু তাই নয়, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরাই মদ-বিয়ার বিক্রি করে যার উত্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতাহীন সেই রানা শফিউল্লাহ এখন টাকার জোরে কেনিয়ার অনারারি কাউন্সিলর। মদ ব্যবসায়ী অনারারি কাউন্সিলর হলেন কোন যোগ্যতায় এ প্রশ্ন উঠেছে জোরেশোরে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও বিভিন্ন গোয়ান্দা সংস্থার তদন্তের পরই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মতি আদায় করে তিনি এ পদে নিয়োগ পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জানা গেছে, উচ্চশুল্কের মদ ও বিয়ার শুল্ক ফাঁকি দিয়ে তিনি নিজে অকল্পনীয় ধন-সম্পদের পাহাড় বানিয়েছেন। মাদকের অপরাধ সাম্রাজ্যকে শেল্টার দিয়ে নারকোটিক্স ও কাস্টমসের অসংখ্য কর্মকর্তাও কোটিপতি হয়েছেন তার সঙ্গে সঙ্গে। এ জন্য এখনও এ দুটি দফতরে তার প্রভাব অকল্পনীয়। বিশেষ করে কাস্টমস বন্ড কর্মকর্তারাই তাকে সহায়তা করে শুল্কমুক্ত মদ বিক্রিকে বৈধতা দিয়ে যাচ্ছেন। গুলশানের এইচ কবীর ও ঢাকা ওয়্যার হাউস নামের কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যার হাউস তার অবৈধ ধন-সম্পদের প্রধান উৎস বলে জানা গেছে। কূটনীতিক ও প্রিভিলেইজড পারসনদের জন্য সরকারের অনুমোদন নিয়ে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার মদ-বিয়ার আমদানি করে এ দুটি প্রতিষ্ঠান। সাড়ে ৪শ’ শতাংশ শুল্ক কার্যকর থাকলেও কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যার হাউসগুলো সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধায় মদ-বিয়ার আমদানি করতে পারে। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কূটনীতিক ও প্রিভিলেইজড পারসনরা এ সুবিধা পেয়ে থাকে। আর এ সুযোগেরই অপব্যবহার করে রানা শফিউল্লাহ হাজার কোটি টাকার ধন-সম্পদের মালিক। কাস্টমস, নারকোটিক্স ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রত্যক্ষ যোগসাজশে ঢাকা ওয়্যার হাউস ও এইচ কবীর থেকে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা মদ-বিয়ার পাচার হয় খোলা বাজারে। রাজধানীর প্রতিটি বার, গেস্ট হাউস ও অভিজাত ক্লাবে নিয়মিত উচ্চশুল্কের মদ-বিয়ার সরবরাহ হচ্ছে রানা শফিউল্লাহর মালিকানাধীন এ দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে। রানা শফিউল্লাহ নিজেও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন না। যুগান্তরের এ প্রতিনিধির সঙ্গে প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি তিনি। পরে জানান, সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি কে দেয় না। শুল্কমুক্ত মদ-বিয়ার বিক্রি করেই বড় হয়েছি; কিন্তু কেউ প্রমাণ করতে পারবে কি? তিনি মন্তব্য করেন, এনবিআরের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কাস্টমসের সংশ্লিষ্টরা আমার টাকাতেই আজ কোটিপতি। তাদের সৎ সাহস থাকলে অনেক আগেই ধরা পড়তাম। তিনি বলেন, ওয়ান-ইলেভেনে আমার কিছু হয়নি। যুগান্তর আগেও আমার সম্পর্কে রিপোর্ট লিখেছে। কিন্তু কেউ আমার পশমও ছিঁড়তে পারেনি। আবার রিপোর্ট করে কি হবে?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতি স্বল্প সময়ে রানার উত্থানও অবিশ্বাস্য। সাইকেলে ফেরি করে বাংলা মদ বিক্রি দিয়ে যার জীবন শুরু, সেই রানা শফিউল্লার বিত্ত-বৈভব রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন বারে তিনি দেশে তৈরি মদ সরবরাহ করতেন। এরপর বিদেশ থেকে লাগেজ ব্যবসা শুরু করেন। বিভিন্ন ধরনের ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী এনে স্টেডিয়াম মার্কেটে বিক্রি করতেন। একই সঙ্গে কাস্টমসকে ম্যানেজ করে বিদেশী মদ আনা শুরু করেন। এভাবে জড়িয়ে পড়েন উচ্চ মুনাফার মাদক ব্যবসায়। অভিযোগ আছে, তিনি এক পর্যায়ে হেরোইন ও সোনা চোরাচালানের সঙ্গেও জড়িত হন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে এক সময় গুলশানের ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ওয়্যার হাউস এইচ কবীরের অংশীদার হন। পরে নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা ওয়্যার হাউস। বর্তমানে তিনি ঢাকা ওয়্যার হাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, কূটনীতিক ও প্রিভিলেইজড পারসনদের জন্য শুল্কমুক্ত মদ-বিয়ার এনে কাস্টমস ও নারকোটিক্সের সহায়তায় তা কালোবাজারে বিক্রি করছেন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ বার ও অভিজাত ক্লাবে শুল্কমুক্ত অবৈধ মদ-বিয়ারের সিংহভাগেরই জোগানদাতা গুলশানের ঢাকা ওয়্যার হাউস ও মেসার্স এইচ কবীর। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র তা নিশ্চিত করেছে। ঢাকা ওয়্যার হাউস এবং এইচ কবীর কূটনীতিক এবং প্রিভিলেজড (সুবিধাভোগী) পারসনদের কাছে শুল্কমুক্ত মদ-বিয়ার বিক্রির জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত। কিন্তু শুরু থেকেই রানার নেতৃত্বে মাফিয়া সিন্ডিকেট কাস্টমস ও নারকোটিক্স কর্মকর্তাদের সহায়তায় শুল্কমুক্ত মদ-বিয়ার কালোবাজারে বিক্রি করতে শুরু করে। ঢাকার অধিকাংশ বার, ক্লাব, অবৈধ গেস্ট হাউসসহ সারাদেশের বারগুলোতে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে মদ-বিয়ার সরবরাহের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রক রানা শফিউল্লাহ। এসব বার ও ক্লাবে মদ সরবরাহ করেই আজ তিনি হাজার কোটি টাকার অর্থ-সম্পদের মালিক।

জানা গেছে, রানা শফিউল্লাহ এখন প্রতি মাসে ভোগবিলাসে ব্যয় করেন কোটি কোটি টাকা। বিলাসবহুল লেটেস্ট মডেলের মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ, হ্যামার গাড়ি ছাড়া চলেন না। সঙ্গে থাকে একাধিক দেহরক্ষী। গুলশানের অভিজাত মার্কেট শপার্স ওয়ার্ল্ড, ফার্মগেটের আনন্দ-ছন্দ সিনেমা হল, একাধিক গার্মেন্টস, ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ঢাকা ওয়্যার হাউস এবং এইচ কবীর ছাড়াও আছে নামে-বেনামে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কয়েকশ’ বিঘা জমি, বারিধারায় বিশাল ডুপ্লেক্স, অভিজাত এলাকায় একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাট। এছাড়া লন্ডন ও দুবাইয়ে রয়েছে ফ্ল্যাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এসবই হয়েছে বিদেশ থেকে শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা মদ কালোবাজারে বিক্রি করে।

অভিযোগ রয়েছে, রাজস্ব আÍসাৎ করে টোকাই রানা শফিউল্লাহ অবিশ্বাস্য পরিমাণের অর্থ-সম্পদের মালিক হলেও সরকারকে নিয়মিত আয়কর দেন না। আয়কর বিবরণীতে তার সঠিক অর্থসম্পদের বিবরণী নেই। স্ত্রী ও সন্তানদের নামে-বেনামে অকল্পনীয় অর্থ-সম্পদের পাহাড় বানালেও তা গোপন করছেন। অসাধু আয়কর কর্মকর্তারা সব জেনেও তাকে সহায়তা করেছেন। কিন্তু জরুরি অবস্থা চলাকালে এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল একটি অভিযোগের সূত্র ধরে তার সম্পদের তদন্ত শুরু করলে তিনি প্রভাব সৃষ্টি করেন। এ পর্যায়ে তদন্ত থমকে যায়। তারপরও প্রাথমিক অনুসন্ধানে রানা শফিউল্লাহ ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে সম্পদ গোপন করে আয়কর ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়। মাত্র দুই বছরে সাড়ে ৪ কোটি টাকার কর ফাঁকির মামলা হলে উপায়ান্তর না দেখে তিনি সম্পূর্ণ কর পরিশোধ করেন অলিখিত এই শর্তে যে, তার বা তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর কোন তদন্ত হবে না। যারা তদন্ত করেন তাদের তিনি প্রাণনাশেরও হুমকি দেন বলে কয়েকটি সূত্রে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বারিধারায় মার্কিন দূতাবাসের পাশে ১০ নম্বর রোডের ২২ নম্বর বাড়িটিই প্রমাণ করে তিনি কি ধরনের বিলাসবহুল জীবন কাটান। প্রায় ২ বিঘা জমির ওপর রাজকীয় বিলাসিতায় ভরপুর এ বাড়িটি রাজপ্রাসাদকেও হার মানায়। আয়কর বিবরণীতে বাড়িটির মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে বারিধারার কূটনৈতিক এলাকার প্রতি বিঘা জমির মূল্যই কমপক্ষে ৪০ কোটি টাকা। সূত্র জানিয়েছে, তার অর্থায়নে বিদেশ থেকে কম শুল্কের পণ্যের কনটেইনারে করে বাংলাদেশে মদ-বিয়ার আনা হয়। বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরে কমলাপুর আইসিডি দিয়ে ফ্রিজ ও এয়ারকন্ডিশনের চালানে শত শত কোটি টাকার মদ-বিয়ার আসছে। কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে বৈধ কনটেইনারে বছরের পর বছর মাদকের চালান এলেও তা কখনও ধরা পড়েনি। যারা ধরবেন তারা নিজেরাই তার অর্থ ও প্রভাবে পোষ মেনেছেন। এ চক্র এতই শক্তিশালী যে, মাদকের চালান নিরাপদে খালাসের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরে তাদের পছন্দসই কাস্টমস কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, গুলশানের শপার্স ওয়ার্ল্ডের মালিক রানা শফিউল্লাহ অবৈধ হীরক ব্যবসা করেও প্রচুর অর্থ কামিয়েছেন। নকল হীরা আসল হীরার দামে বিক্রি করে তিনি ও তার সহযোগীরা কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন। এ হীরা চোরাচালান করতে গিয়ে বগুড়ায় তিনি গ্রেফতার হলেও প্রভাবশালীদের চাপে ছাড়াও পেয়েছেন। যারা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করবেন, তারাই কেনাবেচায় শামিল হয়েছেন। সূত্র জানিয়েছে, রানা শফিউল্লাহ আন্ডার ওয়ার্ল্ডে পরিচিত ‘রানা সাহেব’ নামে। পরিচালনা করেন একাধিক চোরাচালান সেন্ডিকেট। বাংলাদেশে বিদেশী মদ-বিয়ার আমদানির সবচেয়ে বড় কালো ব্যবসায়ী। আন্ডারইনভয়েসিং এবং মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বিদেশী মদ-বিয়ার আমদানির নামে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে তিনি নিজেই বাংলাদেশের ধনকুবেরদের একজন বনে গেছেন। মাত্র ২০ বছরে ‘আলাদিনের চেরাগ’ হাতে পেয়ে এখন রানা বাংলাদেশের মাফিয়া ডন।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, ফুটপাতে মদ বিক্রেতা, পরে লাগেজ ব্যবসায়ী রানা শফিউল্লাহ এখন হাজার কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ আর ধন-সম্পদের মালিক। আশির দশকের শেষ দিকেও হাতে ঝুড়ি-কোদাল নিয়ে যে রানা গুলশান-বাড্ডা এলাকায় কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতেন, এখন তিনি গাড়ির বহর নিয়ে অবকাশ যাপন করতে যান মুন্সীগঞ্জ জেলার টুঙ্গিবাড়ীর শেরজাবাদ গ্রামে তার বাগানবাড়ির প্রাসাদসম অট্টালিকায়। স্থানীয়রা জানান, মাঝে মধ্যেই গভীর রাতে রানা শফিউল্লাহর গাড়ির বহর আসে নিভৃত ওই গ্রামের বাগানবাড়িতে। প্রভাবশালী বন্ধু-বান্ধব নিয়ে বাগানবাড়ির রঙমহলে সারারাত চলে জলসা এবং মদের আসর। রানা শফিউল্লাহর এই কোটি কোটি টাকার উৎস নিয়ে হতবাক তার ঘনিষ্ঠজনরাও। এলাকার মানুষের কাছে তিনি একজন ‘রহস্য মানব’। রাজার বেশে ঢাকা থেকে গাড়ির বহর নিয়ে বাগানবাড়িতে প্রবেশের সময় লোকজন নানা কানাঘুষা করে। কিন্তু কেউ তার কাছে ভেড়ার সাহস করে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জ ছাড়াও রাজধানীর গুলশান, বনানী, মহাখালী ও বারিধারা ডিওএইচএস এলাকায় তার কমপক্ষে আরও ১০টি প্রসাদোপম বাড়ি রয়েছে। নামে-বেনামে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে হাজার কোটি টাকা।

[ad#co-1]