জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
নিয়মটা তো এ রকমেরই যে এক পক্ষ জয়ী হলে অপর পক্ষ পরাজিত হবে এবং এ নিয়মও মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত যে জয়ীর সংখ্যা হবে অল্প, পরাজিতের সংখ্যা অধিক। তা বাংলাদেশে জয়ী হয়েছে কারা, কারা ওই অল্পসংখ্যক লোক, যারা পরাজিত করেছে বিপুলসংখ্যক দেশবাসীকে? এ প্রশ্নের মীমাংসা মোটেই জটিল নয়, বরং খুবই সহজ। যেদিকে তাকাই দেখতে পাব জয়ীদের এবং সঙ্গে সঙ্গে দূরে নয়, কাছেই, বলা যাবে পাশেই চোখ পড়বে পরাজিতদের। এ শহরে তিন কোটি টাকা দামের গাড়িও চলে। দাম জানি না, নিরূপণের সুযোগ নেই, যাঁরা জানেন, তাঁরা বলেন। এরাই তো জয়ী, এই বিত্তবানরা। আর পাশেই, ওই গাড়ি যখন যানজটের জন্য থেমে যায়, তখনই চোখে পড়বে জীর্ণশীর্ণ কিশোরীকে, যে ফুল বিক্রি করে, তিন শ নয়, তিরিশও নয়, তিন টাকা পেলেই বর্তে যায়। এই যে তিন কোটি টাকা ও তিন টাকা_এ কোনো স্থির ছবি নয়, সহাবস্থানের চমৎকার দৃশ্য বলা যাবে না একে, তিন টাকাওয়ালাকে। তিন কোটির মালিক অল্প কয়েকজন, তিন টাকার কাঙাল অসংখ্য, লাখ লাখ।

এই জয়, এই পরাজয়_এ কোনো নতুন ব্যাপার নয়। কিন্তু জয়ী ও পরাজিতের মধ্যে ফারাকটা বাড়ছে, দিনে দিনে, বছরে বছরে। গ্রামে কাজ নেই, আশ্রয় নেই, নিরুপায় মানুষ উপায়ের খোঁজে শহরে আসে, এসে বস্তিতে ওঠে। তারপর বস্তিতে একদিন আগুন লাগে, সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়, বস্তিবাসী নিঃস্ব হয়ে পড়ে। গ্রামে পরাজিত হয়ে যে শহরে এসেছিল, এই শহরে হেরে গিয়ে সে কোথায় চলে যায়, কে জানে! এসব তো বাইরের দৃশ্য। জয়ী মানুষের ঘরের ভেতরের ছবি দেখলে সন্দেহ থাকবে না যে আরব্য রজনীর সেই দৈত্য তাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, হুকুম করার অপেক্ষা মাত্র, অমনি যা চাইবে এনে দেবে!

কে জয়ী আর কে-ই বা পরাজিত, তা নিয়ে কি সন্দেহের কোনো অবকাশ আছে? জয়ীর সংখ্যা শতকরা পাঁচজনের বেশি হবে না, বাদবাকি সবাই বিভিন্ন মাত্রায় পরাভূত। জয়ীরা কারা? তাদের পরিচয় কী? পরিচয় একটাই_তারা ধনী। হ্যাঁ, পেশাগত পার্থক্য আছে, আদর্শগত দূরত্বও থাকতে পারে, কিন্তু তাদের জয় সেসব বিভিন্নতাকে অবলুপ্ত করে দিয়েছে। এরাই এ দেশের ব্যবসায়ী, আমলা, রাজনীতিক এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে পেশাজীবী। এদের মধ্যে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি_সবাই রয়েছে। যেন একই পরিবারের সদস্য, কলহ যা তা পারিবারিক বটে; ভাগাভাগি নিয়ে কাড়াকাড়ি মাত্র, নইলে তারা সমান সুুবিধায়ই রয়েছে। জামায়াতের আমির নিঃসঙ্কোচে বলেছিলেন, সূর্যসেন ছিলেন এ দেশের প্রথম সন্ত্রাসী। জামায়াত একাত্তরে মানুষ খুন করেছে, কিন্তু তা নিয়ে তাদের ক্ষমা চাওয়া দূরের কথা, দুঃখ প্রকাশও করতে হয়নি। জয়ীদের কাতারে তারা অত্যন্ত আরামে বসে গিয়েছিলেন। নব্বইয়ে একটি গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল, পতন ঘটেছিল এক স্বৈরশাসকের। পতনের পর আটক হয়েছিলেন কিন্তু পরে কেবল ছাড়াই পাননি, ওই যে যারা জয়ী তাদের মধ্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে এখন বিরাজ করছেন।

রূপকথায় কল্পজগতের কাহিনী থাকে, সেখানে নিয়মকানুন-কায়দাকানুন সবকিছুই অন্য রকমের, আমাদের দেশে ধনীরাও ওই জগতেরই বাসিন্দা, তাদের কাজ একেবারেই ভিন্ন ধরনের। বিদেশিরা আমাদের গ্যাস-তেল নিতে চায়। বিদেশিরা বন্দর নিয়ে নেবে_এমন আশঙ্কাও থেমে থেমে দেখা দেয়। এ দেশে যাঁরা ক্ষমতায় যাতায়াত করেন, তাঁরা একই শ্রেণীর মানুষ। সেটি হলো শাসকশ্রেণী, সেই শ্রেণীতে দেশপ্রেমের বড়ই অভাব, ছড়াছড়ি আত্দপ্রেমের। একাত্তরে কি তাহলে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি? সেই যুদ্ধে কি জয় হয়নি জনগণের? ৯৫ শতাংশই তো ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, পাঁচজন হয়তো বিপক্ষে। যুদ্ধে জনগণের জয় হয়েছে_এটা একাত্তরের শেষে এবং বাহাত্তরের শুরুতে সত্য ছিল। মনে হয়েছিল বিপ্লব ঘটে গেছে। আমরা নতুন রাষ্ট্র তো বটেই, নতুন এক সমাজও পাব। জনগণ বলতে সেই মুহূর্তে ধনী-দরিদ্র সবাইকে বোঝাত। কেননা, সবাই একসঙ্গে লড়েছিলেন একটি চিহ্নিত শত্রুর বিরুদ্ধে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের ঐক্য তো টেকেনি।

বিজয়ীর বেশে যারা দৃশ্যমান, তারা কি খুব উল্লাসে রয়েছে? না, তা নেই। উল্লাস নেই। তিন কোটি টাকারই হোক অথবা হোক এক কোটি টাকার গাড়ি, রাস্তায় নামালেই বিপদ। যানজট গ্রাস করে নেবে গতি। নিচ্ছেও প্রতিনয়ত। শাসকশ্রেণীকে বাস করতে হচ্ছে বাংলাদেশের দূষিত পরিবেশেই। বন্যা কেবল বস্তিই ভাসায় না, অভিজাত এলাকায় গিয়েও হানা দেয়। মানুষকেও তো তারা ভয় করে। মানুষকেই বরং বেশি ভয়। নির্মম সত্যটা হলো এই যে জনগণ পরাজিত হয়ে গেছে। সমগ্র জাতি একত্র হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছে, বিজয়ের পর তারা পরাজিত হয়ে গেছে। রাষ্ট্রক্ষমতায় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরাও বসেছিল।

বলা হচ্ছে, আরো একটি মুক্তিযুদ্ধ চাই। তার চেয়ে বলা ভালো যে যুদ্ধটা শেষ হয়নি, তাকেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার। যুদ্ধটা ছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। আকাঙ্ক্ষাটা ছিল এই যে নতুন একটি সমাজ গড়ে উঠবে, যেখানে মানুষ মানুষের শত্রু হবে না, হবে পরস্পরের মিত্র। ওই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। যুদ্ধ শেষ হয়েছে, এটা সত্য নয়। আর যুদ্ধ যে একাত্তরেই শুরু হয়েছিল তাও নয়। মুক্তির সংগ্রামটা পুরনো। একাত্তরে তা একটি অত্যন্ত প্রকাশ্য ও নাটকীয় রূপ নিয়েছিল মাত্র। সেখানে তা যে শেষ হয়নি তা তো জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশের মধ্য দিয়েই পরিষ্কার হয়ে যায়। আরেকটা মুক্তিযুদ্ধ নয়, অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধকেই চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এ কাজ করার জন্য দরকার হবে শত্রু-মিত্র নির্ধারণের ব্যাপারে স্পষ্ট হওয়া। শত্রু কারা? মূল শত্রু বিদ্যমান ব্যবস্থা। ব্যবস্থাটা মূর্ত হয়ে রয়েছে এর যারা রক্ষক ও সুবিধাভোগী, তাদের কার্যকলাপের মধ্যে। যুদ্ধটা হবে এদের বিরুদ্ধেই। আর মিত্র হচ্ছে বাদবাকি মানুষ, সংখ্যায় যারা অনেক। তারা যদি জয়ী না হয়, তাহলে বলা যাবে না যে যুদ্ধ শেষ হয়েছে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক

[ad#co-1]