একটি স্বপ্নজয়ের পাদটীকা

নূহ-উল-আলম লেনিন
পাটের জিন প্রযুক্তি আবিষ্কারের খবরে বাংলাদেশ তো বটেই সারা বিশ্বের বিজ্ঞানী মহলে একটা চমক সৃষ্টি হবে নিঃসন্দেহে। সম্প্রতি বাংলাদেশের যুবক মুছা ইব্রাহিম এভারেস্ট জয় করে এসেছে। আজ সমগ্র বাঙালি জাতি একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে এভারেস্ট স্পর্শ করলো। বাঙালি জাতি কেবল নিতে না বিশ্বকে দিতেও পারে এই সত্যই আজ প্রতিষ্ঠিত হলো।

পাটের জেনোম সিকুয়েন্স আবিষ্কারের এই কর্মযজ্ঞটির পেছনে ছোট্ট একটা পটভূমি আছে। বিস্তারিত নয়, এ সম্পর্কে একটা পাদটীকা লেখা আমি জরুরি মনে করছি। আমাদের বিজ্ঞানী ও তরুণদের এই বিস্ময়কর কাজটি করার পেছনের এই সামান্য পাদটীকাটুকু দেশবাসীর জানা প্রয়োজন বলেই আমি তার অবতারণা করেছি। সামরিক স্বৈরাচারের গর্ভে জন্ম নেয়া একটা দুষ্ট শাসকচক্র জাতি হিসেবে বাঙালির যাবতীয় অর্জন, অহঙ্কার এবং আত্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি এবং দেশপ্রেম বর্জিত উৎকট আত্মকেন্দ্রিকতা আমাদের সকল শুভ কামনা, শ্রেয় বোধ সর্বোপরি স্বপ্ন দেখার শক্তিকে পর্যন্ত নিঃশেষিত করে দিয়েছিল। তবু রবীন্দ্রনাথের বরাভয় আর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মদান আমাদের মনের কোণে একটা বোধ জাগিয়ে রেখেছিল, আর তা’ হলো- ‘মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ।’

আমাদের তরুণ বয়সে, মুক্তিযুদ্ধে অনভ্যস্ত অপটু হাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল ধরেও আমরা বলতে পেরেছি, ‘আমরাও পারি।’ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রমাণিত হয়েছিল আমরা পেরেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের আগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন একটি জাতিকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে বিশ্বসভায় আপন জাতিসত্তার স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে জাগিয়ে তুলেছিলেন, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে সেই স্বপ্ন রূপায়িত হওয়ায় আমাদের আত্মবিশ্বাস হয়ে উঠেছিল আকাশচুম্বী। আমরা স্বপ্নের ‘সোনার বাংলাও’ গড়ে তুলতে পারব এই আত্মবিশ্বাসের উন্মাদনায় ে াগান দিয়েছিলাম, “লাখো শহীদের আত্মদানে মুক্ত স্বদেশ,এসো দেশ গড়ি।”

কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ভেতর দিয়ে আমাদের সমগ্র বাঙালি জাতির স্বপ্ন জয়ের সাধনাকে হত্যা করা হয়। জাতি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। আমাদের সকল স্বপ্ন-সম্ভাবনা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। শুরু হয় একটা অন্ধকারের যুগ।

সারা বিশ্বে বাংলাদেশ পরিচিতি লাভ করে সামরিক শাসন, স্বৈরতন্ত্র, হত্যা-ক্যু-এর দেশ আর ভিক্ষাপাত্র হাতে বন্যা-ঝড়-জলোচ্ছ্বাস এবং ক্ষুধা-দারিদ্র্য-মঙ্গার দেশ হিসেবে। বিএনপি-জামাত জোটের বিগত শাসনামলে এর সঙ্গে যুক্ত হয় দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের অভিধা এবং জঙ্গিবাদের চারণক্ষেত্রের দুর্নাম। অথচ জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-সাহিত্যে-শিল্পকলায় এবং সৃজনশীলতায় বিশ্বসভ্যতায় বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ছিল একটি অসাধারণ গৌরবের আসন। দেশের ভেতরে না হোক দেশের বাইরে বহু প্রবাসী বাঙালি তাদের সৃষ্টিশীল কাজ দিয়ে কেবল ব্যক্তিগতভাবেই সুনাম অর্জন করেন নি, বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশের জন্যও বয়ে এনেছেন মর্যাদার আসন। অবদান রেখেছেন বিজ্ঞান, স্থাপত্যকলা, চিকিৎসাশাস্ত্র, শিল্পকলা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিশেষ করে সর্বাধুনিক বায়োইনফরমেটিক্স বা একাধিক উদ্ভিদের জিন প্রযুক্তি আবিষ্কারে।

এসব দেখে শুনে স্বাভাবিকভাবেই আমার মনে নতুন করে একটা আশাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল। আমাদের ছেলেরা, বাঙালিরা দেশের বাইরে পারলে বাংলাদেশের ভেতরে কেন পারবে না? সারা বিশ্বকে চমকে দেয়ার মতো ঘটনা আমাদের দেশের বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, লেখক, শিল্পী যে কারো পক্ষেই সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে আমাদের তরুণরা, যারা প্রায় খালি হাতে বাংলাদেশ নামে একটি দেশকে হানাদারমুক্ত করে স্বাধীন করেছিল।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে যুগান্তকারী বিজয়ের পটভূমিতে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন সরকার রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে। শেখ হাসিনার দিনবদলের সনদের প্রতি দেশবাসী বিশেষত তরুণ সমাজের অভূতপূর্ব সমর্থন এবং বিপুল প্রত্যাশা দেশের সামনে একটা নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। আমরাও ভেতরে ভেতরে বেশ আবেগাপ্লুত ও উত্তেজনা অনুভব করি। প্রবল একটা আশাবাদ জেগে ওঠে : এবার একটা কিছু হবে। সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণের মাস কয়েক পরে আমার ছাত্র জীবনের সহযোদ্ধা-সহকর্মী মাহবুব জামান একদিন আমার বাসায় এসে হাজির। আমি ভাবলাম কোনো ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক তদ্বির বোধহয়। ভেতরে ভেতরে একটু বিরক্তই বোধ করেছিলাম। কিন্তু না, মাহবুব ব্যবসার কথা নয়; একটি ফাইল এগিয়ে দিয়ে আমাকে বললো, “লেনিন ভাই, আমরা পাটের জিন প্রযুক্তি আবিষ্কারের একটা প্রকল্প’ গ্রহণ করেছি। মাকসুদকে আপনি চেনেন। সে ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ায় রাবার এবং পেঁপের জিন আবিষ্কার করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছে। পাট আমাদের জাতীয় সম্পদ। এর জিন প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে পারলে সম্ভবত পাট আবার তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে। আমাদের অর্থনীতিতে আবার পাট ও পাটশিল্প তার পুরনো স্থান ফিরে পাবে। মাহবুব আমাকে আরও জানায়, মাকসুদ আলম হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবাইওলজির অধ্যাপক ও গবেষক। মাকসুদ চায় পাটের জিন প্রযুক্তি আবিষ্কারের আর্থিক দায়িত্বভার যদি বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করে তা’হলে সে নিজে কোনো পারিশ্রমিক না নিয়েই দেশের জন্য এ কাজটি করে দেবে। আর এটি বাংলাদেশে আবিস্কৃত হলে এর প্যাটেন্ট রাইট পাবে বাংলাদেশ সরকার। কেবল আনুষঙ্গিক খরচ বহন এবং সরকারের প্রকল্প গ্রহণ করানোটাই জরুরি। পাট উৎপাদনকারী অন্যান্য দেশও কিন্তু চেষ্টা চালাচ্ছে। মাহবুবের কথায় আবেগ ও একটা স্বপ্নময়তার ছোঁয়া পেলাম। আর মাকসুদের চেহারাটাও আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। লম্বা একহারা লিক লিকে চেহারার লাজুক ছেলেটি। ১৯৭৩ সালে সর্বশেষ বার্লিন যুব উৎসবে মাকসুদ, আলী নকী প্রমুখের সঙ্গে দেখা। আমার কাছে একটা ছবিও আছে। মাকসুদের পরবর্তী জীবন ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। যে মাকসুদকে ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে বসে ‘ভাই চায়ের অর্ডারটা দিয়ে আস না বলেছি অবলীলাক্রমে, সে-কীনা এখন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী! একটা নষ্টালজিয়ায় কিছুক্ষণ চুপ করেছিলাম। মাহবুব আরো জানালো, এই প্রকল্প নিয়ে ওরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খানসহ অধ্যাপক গবেষক ও তরুণ তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছে। তারপর সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ঘোরাঘুরি করেছে। কিন্তু কোথাও থেকে ইতিবাচক সাড়া পায় নি। মাহবুব আমাকে অনুরোধ জানালো আমি যেন শিক্ষামন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী বা সরকারের উচ্চ মহলে এই প্রকল্পটা গ্রহণের ব্যাপারে চেষ্টা করি। তাদের বোঝাই, এটি করলে দেশের কী লাভ ইত্যাদি।

পরে মাহবুবের দেয়া প্রকল্প প্রস্তাবটি এবং সহজবোধ্য বৈজ্ঞানিক ভাষ্যের ব্যাখ্যা আমি পাঠ করি। ২০০৯ সালের মাঝামাঝি আমি এই প্রকল্প নিয়ে প্রথমে সংশ্লিষ্ট একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলি। পরে আমার বাসায় একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এবং অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিতের সঙ্গে আলোচনা করি। মতিয়া আপা আগ্রহভরে আমার কথা শোনেন। মাহবুবের দেয়া প্রকল্প প্রস্তাবের একটি কপিও তাঁকে দেই। কিন্তু এই পর্যন্তই। এ নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ইতিবাচক কথা আর সেদিন আগায় নি। অতঃপর কাজের চাপে আমিও বিষয়টি ভুলে যাই। কিন্তু নাছোড়বান্দা মাহবুব। মাঝে মাঝেই আমাকে তাগিদ দিচ্ছিলো। আমি উপায়ার না দেখে একদিন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন যমুনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সুযোগ বুঝে বিষয়টি উত্থাপন করি। প্রধানমন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে শোনেন। আগ্রহ দেখান। কিন্তু তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেন না। সবকিছু মিলে আমি বেশ কিছুটা হতাশ হয়ে পড়ি। ইতোমধ্যে জাতীয় দৈনিকের ক্রোড়পত্রে বায়োইনফরমেটিক্স ও জিন প্রযুক্তি আবিষ্কারে বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানী মাকসুদের ওপর একটি বড়ো প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। চমৎকার তথ্য সমৃদ্ধ এবং সহজবোধ্য প্রবন্ধটি বহুজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। টেলিফোন করে আমি অনেককে এটি পাঠ করতে বলি। যাই হোক, এ প্রকাশনার ২/৩ দিন পর হঠাৎ করে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া আপা আমাকে ফোন করেন। কণ্ঠে তার স্বভাববিরুদ্ধ উচ্ছ্বাস। তিনি জানান, মাহবুবের কাছ থেকে ফোন নম্বর নিয়ে হাওয়াইতে অবস্থানরত মাকসুদের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন এবং তাকে অবিলম্বে দেশে আসতে বলেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসিনা খানের সঙ্গেও তিনি পাটের জিন আবিষ্কারের প্রকল্প নিয়ে কথা বলেছেন। আমাকে তিনি মাকসুদ এলেই যেন তার সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করি, সে পরামর্শ দেন। মতিয়া আপার কণ্ঠে ছিল প্রবল আগ্রহ ও আশাবাদ।

মতিয়া আপার সঙ্গে কথা বলার পর আমার বুক থেকে যেন একটা পাষাণভার নেমে গেলো। ভেতরে ভেতরে আবেগ ও উত্তেজনা আমাকে বেশ আলোড়িত করে। শেষ পর্যন্ত আমাদের এতদিনের দৌড়ঝাঁপ এবং প্রত্যাশা পূরণ হতে চলেছে। মাহবুবের সঙ্গে কথা হলো। আমরা দু’জনেই একদিকে ভীষণ উৎফুল্ল; অন্যদিকে বেশ একটা চাপা উত্তেজনায় অধীর। আমরা এখন মাকসুদের বাংলাদেশে আসার অপেক্ষায় দিন গুণতে শুরু করি। কথা হলো মতিয়া আপার সঙ্গে। ৯ ডিসেম্বর তাঁর বাসায়, প্রফেসর হাসিনা খান, মাহবুব জামান ও আমি যাবো। যথাসময়ে সবাই মতিয়া আপার বাসায় পৌঁছালেন। বিটিভিতে একটি রেকর্ডিং থাকায় এবং সময়মতো সেটি না হওয়ায় সবচেয়ে কাঙিক্ষত ও দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই বৈঠকটিতে আমি আর যেতে পারলাম না। তবে সভা চলাকালেই মতিয়া আপা ও মাহবুব আমার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন এবং আলোচনার অগ্রগতি জানালেন।

গত ডিসেম্বরে মাকসুদ এলেন। দীর্ঘ তিন দশক পরে ওর সঙ্গে আমার দেখা। তেমনি সপ্রতিভ, হাল্কা-পাতলা গড়ন। বয়সের কারণে একটু যা’ প্রাজ্ঞ অধ্যাপকের মাস্টারসুলভ দেহ ও মনোভঙ্গি। ‘আপনি’ বলায় যথারীতি লজ্জিত এবং সংকুচিত। মাকসুদের সঙ্গে সময় পাওয়া কঠিন। আমরা হোটেলে বসে কথা বললাম। ওর সঙ্গে কথা বলে আমার আস্থা এবং আশাবাদ আরও বেড়ে গেলো। মালয়েশিয়ায় রাবারের জেনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কারের গল্প শুনলাম ওর কাছ থেকে।

ডিসেম্বরের শেষদিকে আমরা মাহবুবের অফিসে মাকসুদসহ বসলাম এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় করলাম। প্রকল্পের বাজেট-এর সম্ভাব্য পরিমাণ নির্ধারণের পর মতিয়া চৌধুরীকে তা’ জানানোর পর তিনি আর কোনো দ্বিধা-সংকোচ না করেই কত শীঘ্র কাজ শুরু করা যাবে এবং শেষ করা যাবে সে বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করলেন। তিনি এ বিষয়ে অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেঁ একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করার কথা জানালেন। আরও জানালেন, এই প্রকল্পের টাকার বিষয়ে তিনি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন। মতিয়া আপার পরামর্শে আমিও মুহিত ভাইয়ের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলি। অতঃপর অর্থ সমস্যার সমাধান হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় নিজস্ব তহবিল থেকেই এই অর্থের ব্যবস্থা করে, অর্থমন্ত্রী সম্মতি দেন। প্রধানমন্ত্রী বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে এর জন্য অতিরিক্ত কোনো অর্থ বরাদ্দের সুপারিশ করতে না হওয়ায় মতিয়া আপা যেন বেঁচে যান। ইতোমধ্যে মাকসুদ হাওয়াই থেকে আবার ঘুরে আসেন। এবার মাকসুদসহ পুরো টিম নিয়ে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রী সব শুনে সোৎসাহে এই কাজে কৃষিমন্ত্রীর নেতৃত্বে মাকসুদদের দ্বিধাহীন চিত্তে এগিয়ে যেতে বলেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় পুরো টিমটি উজ্জীবিত হয়ে তাদের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। তারপর এ বছরের জানুয়ারির ৩ তারিখ থেকে শুরু হয় প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় কৃষি মন্ত্রণালয়, পাট গবেষণা কেন্দ্রকে সম্পৃক্ত করা, মাহবুব জামানের তথ্য প্রযুক্তি সংগঠন “ডাটা সফট্,” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি কে কিভাবে সংশ্লিষ্ট হবে, কারা কী কাজ করবে ইত্যাকার বিষয় মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাকসুদের নেতৃত্বে নির্ধারিত হয়। আমার কাজ ছিল প্রকল্পটি সরকারিভাবে যাতে গৃহীত হয়, গবেষণার পথের বাধাটি যাতে দূর হয় সে ব্যাপারে সহায়তা করা। বস্তুত এ পর্যায়ে এখানেই আমার কাজ শেষ। আমি একজন সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী। বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ বা ক্ষমতাধর আমলা- কিছুই নই। তবু কিছু না করেও এই কাজটির সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত থাকতে পেরেছি শেষ দিনটি পর্যন্ত। আর মতিয়া আপার নির্দেশে এ বিষয়ে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করেছে সবাই। নিজের কৃতিত্ব জাহির করার ব্যাপারে প্রলুব্ধ না হয়ে স্বয়ং মতিয়া আপা যেভাবে মুখবন্ধ করেছিলেন, সেটাও ছিল আমাদের কাছে শিক্ষণীয়। মাকসুদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের একদল তরুণ তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, তরুণ বিজ্ঞানকর্মী এত অল্প সময়ের মধ্যে যে বিস্ময়কর আবিষ্কারটি করেছে- তৃতীয় বিশ্বে এর দৃষ্টান্ত বিরল। মালয়েশিয়া সম্পদশালী দেশ। বাংলাদেশের একমাত্র সম্পদ আমাদের প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা প্রতিভাবান ও পরিশ্রমী এক ঝাঁক তরুণ। তারাই এই প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। এঁদের সবাইকে প্রাণঢালা অভিনন্দন। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের উন্নত দেশের জন্য এটা হয়তো তেমন বড়ো কোনো ঘটনা নয়, কিন্তু দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশের জন্য এটা অবশ্যই বিস্ময়কর। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এবং তার যোগ্য মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর মতো দৃঢ়চিত্ত নিবেদিত কর্মী মানুষের উদ্যোগে যে দিনবদলের অভিযাত্রায় প্রকৃত সাফল্য অর্জন সম্ভব, সোনালী আঁশ পাটের জেনোম সিকুয়েন্স আবিষ্কার সেই সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রধানমন্ত্রীর উৎসাহ ও প্রেরণা এবং বেগম মতিয়া চৌধুরীর তথা সরকারের একনিষ্ঠ উদ্যোগ না থাকলে এই স্বপ্নযাত্রা স্বপ্নই থেকে যেতো। এ ঘটনায় আবার প্রমাণিত হয়েছে- ‘আমরাও পারি।’

আমাদের এই অর্জন এখন বিশ্বের বৈজ্ঞানিক মহলেও স্বীকৃতি অর্জন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত জেনোম সংগঠনের বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী জন ক্রিস ডেটার এবং মালায়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. এম, জাওয়াই ইসলাম বাংলাদেশের এই অর্জনকে স্বীকৃতি জানাতে ঢাকায় ছুটে আসছেন।

এই আবিষ্কারের ভেতর দিয়ে আরো বড়ো কিছু অর্জনের দ্বারোদ্ঘাটন হলো। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোগ থাকলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এর চেয়েও যে বড়ো কিছু করতে পারবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

নূহ-উল-আলম লেনিন: প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

[ad#co-1]